২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২ কার্তিক ১৪৩৩

ইউরোপের সংকট: অভিবাসন নয়, মূলে জীবনযাত্রার দুর্দশা

একদিকে আকাশচুম্বী বাড়িভাড়া ও নিত্যপণ্যের দাম, অন্যদিকে ভূরাজনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বোঝা—ইউরোপের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কি তবে ভেঙে পড়ছে?

ইউরোপের সংকট: অভিবাসন নয়, মূলে জীবনযাত্রার দুর্দশা

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে প্যারিসে বিক্ষোভ সমাবেশ। ছবি: রয়টার্স

মঞ্জুরে খোদা মঞ্জুরে খোদা

Published : 27 Oct 2026, 08:07 AM

Updated : 27 Oct 2026, 08:07 AM

ইউরোপের রাজপথে আজ যে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটছে, তার ভাষা ভিন্ন, কিন্তু বেদনা অনেকটাই এক। কোথাও শিক্ষার্থীরা জরাজীর্ণ বিদ্যালয় ও শিক্ষক-সংকটের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছে, কোথাও তরুণেরা বাড়িভাড়া নেওয়ার সামর্থ্য হারিয়ে তাঁবু খাটিয়ে প্রতিবাদ করছে। কোথাও মানুষের ক্ষোভ জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে, কোথাও দুর্নীতি, বেকারত্ব ও রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নিয়ে। সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে পরিচিত ইউরোপের এই দৃশ্য একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে, অর্থনীতি উন্নত হলেই কি মানুষের জীবন উন্নত হয়? রাষ্ট্র যদি নাগরিককে নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে না পারে, তবে সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা কত দিন টিকে থাকবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই অসন্তোষকে ইউরোপের তরুণ প্রজন্মের জন্য একটি ‘শক্তিশালী সতর্কবার্তা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দেশভেদে বিক্ষোভের কারণ আলাদা হলেও এর গভীরে রয়েছে সরকারের সক্ষমতা ও নাগরিকদের প্রত্যাশার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান ব্যবধান।

বর্তমান অস্থিরতার সবচেয়ে দৃশ্যমান কারণ জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সরকারি পরিষেবার অবনতি। ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, ২০১০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাড়ির দাম বেড়েছে ৫৩ শতাংশ এবং ভাড়া বেড়েছে ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ আবাসন এখন শুধু ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়, ক্রমবর্ধমান সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের বিষয়।

২০২৬ সালে এই পরিস্থিতি পরিস্থিতিকে আরো তীব্র করে তুলেছে। ইউরোনিউজের বিশ্লেষণ বলছে, ২০২১-২৬ এই পাঁচ বছরে ইইউতে খাদ্য ও অ্যালকোহলবিহীন পানীয়ের দাম বেড়েছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। ২০২৫ সালে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমে ২.৫ শতাংশে এলেও এর অর্থ এই নয় যে আগের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়ে যাওয়া দাম আবার কমে গেছে। মূল্যবৃদ্ধির গতি কমা আর মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরে পাওয়া এক বিষয় নয়।

পর্তুগালের সংকট এর বাস্তব উদাহরণ। দেশটিতে ২০১৭ সালের পর থেকে বাড়ির দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে, ভাড়ার হারও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। পর্তুগাল ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় তিন লাখ বাড়ির ঘাটতি রয়েছে। ৮৭ বছর বয়সী বৃদ্ধা মারিকারমেনের বাড়িভাড়া ২৩০ শতাংশ বাড়ার পর বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করায় তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আবাসন সংকটের এই ঘটনা জনমনে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। আবাসন সংকটের এই আন্দোলন থেকে পুলিশ অনেককে গ্রেপ্তার করে। স্পেনেও বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও উচ্ছেদ বন্ধের দাবিতে আন্দোলন চলছে।

এই সংকট তরুণদের কাছে আরও গভীর। শিক্ষা শেষ করেও স্থায়ী চাকরি, উপযুক্ত পারিশ্রমিক ও সাশ্রয়ী বাসস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়লে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। তখন অসন্তোষ শুধু অর্থনৈতিক থাকে না, তা রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থায় রূপ নেয়।

ইউরোপের রাজনীতিতে অভিবাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, আশ্রয়প্রার্থীদের পুনর্বাসন, সামাজিক পরিষেবার ওপর চাপ এবং জাতীয় পরিচয় নিয়ে নাগরিকদের উদ্বেগ রয়েছে। এসব প্রশ্নের বাস্তবসম্মত সমাধান প্রয়োজন। কিন্তু ইউরোপের প্রতিটি সংকটের জন্য ঢালাওভাবে অভিবাসীদের দায়ী করা মোটেই সঠিক ব্যাখ্যা নয়।

যদিও ফ্রান্স ও ইতালির কিছু বিক্ষোভে সহিংসতার ঘটনাকে ডান ও অতি ডান রাজনীতিকদের একাংশ অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন, অথচ বিক্ষোভগুলোর মূল দাবির মধ্যে রয়েছে শিক্ষা, আবাসন, মজুরি, জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবা। ফরাসি কর্মকর্তারাও সহিংসতার সঙ্গে অভিবাসনের সরাসরি সম্পর্কের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রচলিত দলগুলো যখন নাগরিকদের অর্থনৈতিক উদ্বেগের কার্যকর সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়, তখন অতি ডানপন্থি দলগুলো সীমান্ত, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অভিবাসনকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। এতে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্ষোভ কখনো কখনো অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন থেকে পরিচয় ও নিরাপত্তার প্রশ্নে সরে যায়।

অতএব, অভিবাসন ইউরোপের রাজনৈতিক সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলেও একে সব বিক্ষোভের প্রধান কারণ বলা যায় না। অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের নীতি এবং আবাসন, আয় ও সরকারি পরিষেবার সংকট—এই দুই ক্ষেত্রকে পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত।

ইউরোপের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাকে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট থেকেও বিচ্ছিন্ন করা যায় না। রাশিয়া–ইউক্রেইন যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তন ইউরোপীয় সরকারগুলোর নীতিনির্ধারণকে জটিল করে তুলেছে।

জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব উৎপাদন, খাদ্যপণ্য ও পরিবারের দৈনন্দিন খরচে পড়ে। ইউরোপের অর্থনীতি যদি একই সময়ে নিরাপত্তা ব্যয়, ঋণ ও বাজেট ঘাটতির চাপে থাকে, তবে নাগরিকদের সামাজিক চাহিদা পূরণে সরকারের খরচ সংকুচিত হবে। ফ্রান্সে অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে রাজনৈতিক অচলাবস্থাও সরকারের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বাস্তবতাকে সীমিত করছে।

তবে ভূরাজনীতিকে সব সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে বর্ণনা করা ঠিক নয়। আবাসনের ঘাটতি, বাড়িভাড়ার কাঠামো, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগের অভাব ও বৈষম্যের নিজস্ব কারণ রয়েছে। বরং ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে আরও প্রকট করে তুলছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় বলা যেতে পারে, আগামী দিনের ইউরোপীয় রাজনীতিতে তিনটি প্রবণতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে:

প্রথমত, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন আরও গুরুত্ব পেতে পারে। অতি ডানপন্থি দলগুলো বর্তমান অসন্তোষকে নির্বাচনি সমর্থনে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করবে। তবে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা বাড়বে, তা নির্ভর করবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার সমাধানে তারা কতটা বিশ্বাসযোগ্য কর্মসূচি উপস্থাপন করতে পারে তার ওপর।

দ্বিতীয়ত, আবাসন, আয়, শিক্ষা ও সামাজিক সুরক্ষাকেন্দ্রিক রাজনীতির গুরুত্ব বাড়তে পারে। শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী ও আবাসন আন্দোলন যদি বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদের বাইরে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কর্মসূচি গড়ে তুলতে পারে, তবে প্রচলিত দলগুলোর নীতি পরিবর্তনের চাপ বাড়বে। বর্তমান বিক্ষোভ তাই শুধু ডানপন্থিদের উত্থানের গল্প নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও কল্যাণরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও বিতর্ক তৈরি করবে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের কারণে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অতি ডানপন্থিদের পাশাপাশি বামপন্থিদের প্রভাব ও অবস্থানও বাড়ছে।

তৃতীয়ত, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঐক্য ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে। ২০২৭ সালে ফ্রান্স, ইতালি, পোল্যান্ড ও স্পেনের নির্বাচন অভিবাসন, জলবায়ুনীতি, ইউক্রেইনকে সহায়তা এবং ইউরোপীয় সংহতির ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করতে পারে। জাতীয়তাবাদী ও ইইউ-সংশয়ী দলগুলোর প্রভাব একাধিক বড় দেশে বাড়লে যৌথ নীতি গ্রহণ কঠিন হতে পারে। যেমন পোল্যান্ডে যে ডানপন্থি দল আন্দোলন করছে, তারা বলছে, ইইউ একত্রীকরণ তাদের দারিদ্র্য ও দুর্দশার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ভাঙনের মুখে পড়ছে।

ইউরোপের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের কারণকে সাধারণভাবে ভাগ করলে বলা যায়, জনজীবনের সংকট অসন্তোষের প্রধান ভিত্তি, অভিবাসন রাজনৈতিক মেরুকরণের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র, আর ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বিদ্যমান চাপ বাড়ানোর একটি শক্তি। তবে দেশভেদে এই তিনটির প্রভাব আলাদা; কোনো একক অনুপাত দিয়ে পুরো ইউরোপকে ব্যাখ্যা করা কঠিন।

ইউরোপের সামনে এখন দ্বিমুখী সংকট: একদিকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, অন্যদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অনাস্থা মোকাবিলা করা। শুধু কঠোর আইনশৃঙ্খলা কিংবা অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই সংকট সমাধান অসম্ভব। একইভাবে, বিক্ষোভের প্রতিটি দাবি তাৎক্ষণিকভাবে পূরণ করাও সব সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়।

শেষ পর্যন্ত ইউরোপের গণতন্ত্রের শক্তি নির্ধারিত হবে নাগরিকদের ক্ষোভ কতটা দমন করা হলো, তা দিয়ে নয়; বরং সেই ক্ষোভের পেছনের সমস্যাগুলো কতটা বাস্তবভাবে সমাধান করা গেল, তা দিয়ে। তরুণদের কাছে যদি শিক্ষা, কাজ, বাসস্থান ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের পথ আবার উন্মুক্ত না হয়, তাহলে আজকের বিক্ষোভ আগামী দিনের আরও গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।

ড. মঞ্জুরে খোদা: লেখক-গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: torikbd@gmail.com