০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩

নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা সংকট: শামা ওবায়েদ

রাখাইনকে ‘রোহিঙ্গামুক্ত’ রাখার বিষয়ে মিয়ানমারের কারেন, কাচিন, বামান, রাখাইন—সবার মধ্যে এক ধরনের ঐকমত্য আছে, বলেন অধ্যপক তৌফিক এম হক।

নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে রোহিঙ্গা সংকট: শামা ওবায়েদ

নীতি গবেষণা কেন্দ্র আয়োজিত জাতীয় নীতি সংলাপে বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Nov 2026, 11:16 PM

Updated : 08 Nov 2026, 11:15 PM

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমার ও আরাকান আর্মির ওপর চাপ বাড়াতে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

রোববার নীতি গবেষণা কেন্দ্রের আয়োজনে জাতীয় নীতি সংলাপের একটি পর্বে দেওয়া বক্তব্যে এ আহ্বান জানান তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, এটা বাংলাদেশের কক্সবাজার, চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য জায়গার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

“সীমান্তে আপনারা জানেন যে, প্রতিদিন এখানে মাদক পাচার হচ্ছে, মানবপাচার হচ্ছে। ওখানে যেহেতু ১০ বছরে বিভিন্ন ধরনের এন্টিটি তৈরি হয়েছে ক্যাম্পগুলোর ভেতরে, নিজেদের মধ্যে তাদের বিভিন্ন সময় কোন্দল এবং সহিংস কোন্দল লাগছে, মানুষের মৃত্যু ঘটছে।”

প্রতিমন্ত্রী শামা এমন এক সময়ে নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বলছেন, যার দুদিন আগে কক্সবাজারের টেকনাফে ‘মানবপাচারকারী চক্রের আস্তানায়’ যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় ব্যাপক গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে।

ওই অভিযানের সময় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন সদস্য নিহত হয়েছেন এবং পাচারকারীদের জিম্মিদশা থেকে ৫৭ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

রোববারের সংলাপে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য গড়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। আলোচনায় অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলের নেতারাও এ বিষয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার কথা বলেছেন।

সংলাপের সঞ্চালনায় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্নেন্স-এসআইপিজির পরিচালক অধ্যাপক এস কে তৌফিক এম হক বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত রয়েছে। কিন্তু রাখাইনকে ‘রোহিঙ্গামুক্ত’ রাখার বিষয়ে মিয়ানমারের কারেন, কাচিন, বামান, রাখাইন—সবার মধ্যে এক ধরনের ঐকমত্য আছে।

“কিন্তু এমন একটি বড় রকমের সংকটে আমাদের এখানে ঐকমত্য অনুপস্থিত। রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্য গড়তে পারলে আমাদের অবস্থানটা শক্তিশালী হবে।”

তার এই বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করে প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবেলার ক্ষেত্রে জাতীয় ঐকমত্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং জনসম্পৃক্ততা অত্যন্ত অপরিহার্য। এটা এক রাজনৈতিক সমস্যা এবং সমাধানই হতে হবে রাজনৈতিক উপায়ে।

“সেই জায়গাটা যদি আমরা হাত দিতে হয়, তাহলে অবশ্যই আমাদের একটা পলিটিক্যাল কনসেনসাস প্রয়োজন।”

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের কৌশল প্রণয়নের ক্ষেত্রে ‘রোডম্যাপ’ তৈরি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যুক্ত করে কূটনৈতিক চাপ বাড়ানো, শরণার্থী ও স্থানীয়দের মানবিক সহায়তা, মিয়ানমারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং স্থানীয় অপরাধ দমনে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

তিনি বলেন, গ্রহণযোগ্য প্রত্যাবাসন কাঠামোর ক্ষেত্রে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের পরিচয় যাচাইকরণ যে প্রক্রিয়ায় রয়েছে, সেটা দুর্ভাগ্যজনকভাবে খুবেই ধীরগতির।

“সেই প্রক্রিয়াটাকে দ্রুততর করার একটি কৌশল আমার থাকতে হবে, তেমনি প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির ন্যূনতম শর্তগুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করার প্রয়োজন আছে।”

রোহিঙ্গা সংকটের ক্ষেত্রে সমন্বিত কূটনৈতিক ‘রোডম্যাপের’ কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে চাপ সৃষ্টির জন্য জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক শক্তিসমূহ এবং প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক অংশীদারদেরকেও সক্রিয় করার কথা বলেন তিনি।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আমাদের চাপ দিতে হবে, যাতে তারা রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরে সুরক্ষা এবং আস্থার পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমারের সঙ্গে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়।”

নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং সামাজিক সহনশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নেতিবাচক পথগুলো ডালপালা মেলার কারণে নানা রকম আন্তঃসীমান্ত অপরাধ জন্ম নিচ্ছে।

“জবাবদিহিমূলক আইন প্রয়োগের পাশাপাশি অপরাধ প্রতিরোধ, সামাজিক সম্পৃক্ততা, ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও যুব সমাজের জন্য সুযোগ তৈরি করার একটা কৌশল আমাদের বের করতে হবে।”

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের কৌশল ঠিক করতে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে এক কমিটি কাজ করছে। নভেম্বরের মধ্যে ওই কমিটির প্রতিবেদন দেওয়ার কথা রয়েছে।

ভালো কোনো সুপারিশ থাকলে তা ওই কমিটির কাছে পৌঁছে দিতে সব রাজনৈতিক দল, গবেষণা সংস্থা এবং সুশীল সমাজের প্রতি আহ্বান জানান প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের ক্ষেত্রে ভারতকে সম্পৃক্ত করার আলাপ উঠলেও নিজেদের স্বার্থেই দিল্লির এখানে যুক্ত না থাকার কথা বলছেন বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি বলেন, রাখাইনে আরাকান আর্মির যে অবস্থান, সেটা আর আগের অবস্থায় ফিরবে বলে মনে হচ্ছে না। হয়ত স্বাধীন হবে না, তবে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে ‘কনফেডারেশন’ হিসেবে শাসন চলবে রাখাইনে।

রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য রাখাইনের স্থিতিশীলতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে অবসরপ্রাপ্ত এই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বলেন, চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে সংযুক্ত করে ত্রিদেশীয় অর্থনৈতিক করিডোর করার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, রাখাইনের স্থিতিশীলতার এক্ষেত্রে সেটা কাজে লাগতে পারে।

সংলাপে বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন বলেন, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে এই সরকার আগে মতো ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যত মিয়ানমার নাগরিক (এফডিএমএন)’ বলছে, নাকি শরণার্থী বলছে, সেটা ঠিক করা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ শরণার্থী হিসাবে আখ্যায়িত করলে আইনিভাবে বিভিন্ন অধিকার দেওয়ার বিষয় চলে আসবে।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের একমাত্র সমাধান যে তাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন এবং এক্ষেত্রে সরকারের অবস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাসদ ভিন্নমত পোষণ করে না। এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা উদ্বেগ হয়ে উঠছে। কিন্তু প্রত্যাবাসন আটকে থাকার মধ্যে এই জনগোষ্ঠীর সদস্যরা স্থানীয়ভাবে নানান সম্পর্কে আবদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন। এখন যে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, তাতে তাদের প্রত্যাবাসনের জন্য হয়ত হাশরের দিন পর্যন্ত লেগে যাবে।

সংলাপের বিকালের পর্বে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নীতি গবেষণা কেন্দ্রের ট্রাস্টি সদস্য মাহবুবুল হক। এ পর্বে অন্যদের মধ্য বিএনপির সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী, জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা ফরিদুল হক এবং আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম আলোচনায় অংশ নেন।