২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

অপ্রতিম হত্যা: এমন নির্মম সমাজ ও সংবাদমাধ্যম কীভাবে আমাদের হলো?

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যর্থতা ও কিশোর গ্যাংয়ের হিংস্রতাকে আড়াল করে কেন বারবার সন্তানহারা মা-বাবার ‘প্যারেন্টিং’কে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হচ্ছে?

অপ্রতিম হত্যা: এমন নির্মম সমাজ ও সংবাদমাধ্যম কীভাবে আমাদের হলো?

ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম;মাত্র ১৩ বছর বয়সের ভুল সিদ্ধান্ত কখনো নির্মম হত্যার দায় হতে পারে না।

শাহরিয়ার নোবেল শাহরিয়ার নোবেল

Published : 22 Sep 2026, 05:58 AM

Updated : 22 Sep 2026, 05:58 AM

কবি নির্মলেন্দু গুণ তার কবিতার নাম রেখেছিলেন, ‘স্বাধীনতা এই শব্দটি কীভাবে আমাদের হলো’। শিশু অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে আমাদের সমাজের ‘স্বাধীন’ মতপ্রকাশের ধরণ আর কিছু সংবাদমাধ্যমের নির্মম আচরণ দেখে মনে প্রশ্ন জাগছে—এই নির্মম সমাজ আর সংবাদমাধ্যম কীভাবে আমাদের হলো?

যেকোনো আলোচিত ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে যখন কাটাছেঁড়া চলে, তখন আমরা মানুষের ভাবনার নানা নির্মম রূপ দেখি। ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের ক্ষেত্রে এর যেন কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। ১৩ বছরের একটি শিশু খুন হয়েছে। তার হত্যার বিচার তো দূরের কথা, ঘটনার সত্যও পুরোপুরি উদ্ঘাটিত হয়নি। অথচ এর মধ্যেই তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি, সে কার সঙ্গে মিশত, কী ডিভাইস ব্যবহার করত, কী ভঙ্গিমায় ছবি তুলত, এমনকি তার মায়ের দুই বছর আগের ফেইসবুক পোস্টও এখন বাংলাদেশের মানুষের ফেইসবুক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে; যেন বিচার করার জন্য আদালত খুলে বসেছে সবাই।

কখনো শিশুটির জীবনযাপনে, কখনো তার বন্ধুত্বে, কখনো আবার তার মা-বাবার অভিভাবকত্বে যে যার মতো করে খুঁজছে এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাখ্যা। যেন পৃথিবী থেকে চলে গিয়ে এই শিশুটি তার ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি অংশ জনসমক্ষে ব্যবচ্ছেদ করার অধিকার আমাদের দিয়ে গেছে।

এই বয়সের শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার, তারা কার সঙ্গে মিশছে, মা-বাবার ভূমিকা কিংবা এই বয়সে তাদের কতটা স্বাধীনতা থাকা উচিত—এসব নিয়ে আলোচনা অপ্রয়োজনীয় নয়। কিন্তু একটি সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা আর সদ্য চলে যাওয়া একটি নির্দিষ্ট শিশুর ব্যক্তিগত জীবন ঘেঁটে সেই আলোচনার রসদ খোঁজা এক বিষয় নয়।

আমাদের এই বিবেচনাবোধের অভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মনিটাইজেশন ও এনগেজমেন্টের অর্থনীতি। জনআগ্রহ আছে এমন যেকোনো ঘটনা ঘটলেই তা নিয়ে লেখা, রিলস, ভিডিও কিংবা অন্য কোনো কনটেন্ট বানানোর প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এসব করতে গিয়ে কার ব্যক্তিগত জীবন উন্মোচিত হলো কিংবা সেই কনটেন্ট একজন ভিকটিম ও তার পরিবারের ওপর নতুন করে কতটা আঘাত তৈরি করল—এসবের বিবেচনা আমাদের এই নির্মম সমাজের নেই।

যদিও সামাজিক মাধ্যমের প্রতিটি মানুষের কাছ থেকে নীতিবোধ প্রত্যাশাও করা যায় না; কিন্তু পেশাদার সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা তো আলাদা হওয়ার কথা। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আবেগ, অনুমান, ম্যুরাল পুলিশিং আর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বাছবিচারহীন আলাপকে যাচাই, ফিল্টার ও কিছুক্ষেত্রে সেসব থেকে সাংবাদিকতার দূরত্ব বজায় রাখার কথা ছিল। অথচ সেগুলোকে সংবাদ, এক্সপ্লেইনার কিংবা ভিডিও প্রতিবেদনের মোড়কে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া এবং সেগুলোর একধরনের বৈধতা তৈরি করা সাংবাদিকতার কাজ নয়।

সামাজিক মাধ্যমের একজন কনটেন্ট নির্মাতা আর একটি পেশাদার সংবাদমাধ্যমের মধ্যে প্রধান পার্থক্য তার গেটকিপিং, তথ্য যাচাই ও সম্পাদকীয় বিচারবোধে। আর একজন ভিকটিম ও তার পরিবারের প্রতি সংবেদনশীলতা রক্ষা করা সাংবাদিকতার এসব মৌলিক দায়িত্বগুলোরই একটি।

অথচ অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর আমাদের কিছু সংবাদমাধ্যমের কনটেন্ট দেখলে মনে হয়—এসব মৌলিক ব্যাপার হয় তারা ভুলে গেছে, নয়তো এনগেজমেন্টের লোভ তাদের এতটা নির্মম করে তুলেছে যে তারা আর এসবের ধার ধারছে না। সামাজিক মাধ্যমের নির্মম ন্যারেটিভকে তারা তাদের সাংবাদিকতার উপাদান বানাচ্ছে। নানা মোড়কে সেগুলোকে আরও ছড়িয়ে দিয়ে বৈধতা প্রতিষ্ঠা করছে।

একটি উদাহরণ দিয়েই শুরু করা যাক। দেশের একটি প্রতিষ্ঠিত ও নিবন্ধিত অনলাইন সংবাদমাধ্যমে অপ্রতিমের মৃত্যুর পর, ‘সন্তানকে কখন বাইক কিনে দেবেন, সঠিক বয়স কত?’—এই শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশ করা হয়েছে। ঠিক এই সময়েই যেন আমাদের এই সংবাদমাধ্যমটির মনে হলো, সন্তানকে কখন মোটরসাইকেল কিনে দেওয়া উচিত তা নিয়ে অভিভাবকদের একটি ‘প্যারেন্টিং লেসন’ দেওয়া দরকার!

লেখাটির প্রধান ছবিতে ব্যবহার করা হয়েছিল মোটরসাইকেলে বসে থাকা অপ্রতিমের ছবি। ক্যাপশনেও তার বয়স এবং বাইক চালানোর কথা উল্লেখ করা হয়। কিন্তু সদ্য হত্যার শিকার অপ্রতিমকে যুক্ত করে এমন একটি লেখা প্রকাশের সাংবাদিকতাগত ভিত্তি কী? এই হত্যাকাণ্ডের এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যে কোথায় প্রমাণ হয়েছে যে মোটরসাইকেলে তাকে বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে সেটি তার নিজের, কিংবা তার মা-বাবা সেটি তাকে কিনে দিয়েছিলেন?

সেই একটি ছবিকে ‘পোস্টার’ বানিয়ে দেওয়ার অধিকার একটি সংবাদমাধ্যম কোথায় পেল? যে নীতিমালার অধীনে একটি সংবাদমাধ্যম নিবন্ধিত হয়, সেটি কি এসব কাজের অনুমোদন দেয়? বাংলাদেশের আইন কি বলে? সাংবাদিকতার নৈতিকতার কোন মানদণ্ডে সদ্য নিহত একটি শিশুর ছবিকে, তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয় এমন একটি উপদেশমূলক কনটেন্টের ‘ইলাস্ট্রেশন’ হিসেবে ব্যবহার করা গ্রহণযোগ্য? এমন সাংবাদিকতার প্রয়োজনই বা কোথায় আছে?

আমি অন্তত এর কোনো সাংবাদিকতাগত প্রয়োজন খুঁজে পাই না, আইনগত ও নীতিগত ভিত্তিও পাই না। বরং খুঁজে পাই এনগেজমেন্টের প্রতিযোগিতায় একটি নিউজরুম কতটা অসংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে, তার একটি নির্মম উদাহরণ।

অবশেষে সমালোচনার জেরে অনলাইনটি তাদের ওই লেখার সঙ্গে ব্যবহৃত অপ্রতিমের ছবি সরিয়ে এআই দিয়ে বানানো একটা ছবি প্রতিস্থাপন করেছে। তবে গুগল সার্চে গেলে পুরোনো ছবিগুলোই দেখায়।

অসংবেদনশীলতা শুধু অপ্রতিমের এই একটি ছবি ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের অন্যতম প্রবীণ একটি টেলিভিশন চ্যানেলের রিলসে অপ্রতিমের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবি দেখিয়ে বলা হয়েছে, বাস্তব জীবনে সে ছিল ‘নিষ্পাপ, এক… বাচ্চা’, অথচ ভার্চুয়াল জগতে তার ছবি ভেসে উঠত ‘একজন পরিণত যুবকের মতো’। এরপর বলা হয়েছে, ‘অল্প বয়সেই বহুমূল্য ডিভাইসের মোহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের লাগামহীন স্বাধীনতা এবং বখাটে তরুণদের সঙ্গে ওঠাবসা অপ্রতিমকে অজান্তেই এক ভয়ানক চোরাবালিতে তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল…।’

শব্দগুলো খেয়াল করা দরকার। এগুলো নিছক তথ্য নয়; প্রতিটি শব্দের মধ্যেই একটি বিচার লুকিয়ে আছে, একই সঙ্গে এসব বিষয়কে অপ্রতিমের পরিণতির ব্যাখ্যা হিসেবে দাঁড় করানোর প্রবণতাও রয়েছে। তদন্তে যদি কোনো নির্দিষ্ট বন্ধুত্ব বা যোগাযোগের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের সম্পর্ক পাওয়া যায়, অবশ্যই সাংবাদিকতা সেটি অনুসন্ধান করবে। কিন্তু সম্পর্ক অনুসন্ধান করা আর একটি নিহত শিশুর ডিজিটাল জীবনের টুকরো টুকরো চিহ্ন জোড়া দিয়ে তার জীবন সম্পর্কে একটি ‘নীতি’ গল্প নির্মাণ করা কখনো এক বিষয় হতে পারে না।

একই রিলসে আবার বলা হচ্ছে, ‘সমাজবিজ্ঞানীদের মতে… এই বয়সের শিশুরা আবেগের বশে ভুল করতে পারে এবং ভালো-মন্দের সূক্ষ্ম সীমারেখা তাদের জানা থাকে না… অন্ধ স্নেহে সব বায়না মেটানো কিংবা অবাধ স্বাধীনতা কোনো সুস্থ অভিভাবকত্ব নয়।’ কিন্তু কোন সমাজবিজ্ঞানী এই নির্দিষ্ট ঘটনায় এমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, কোন গবেষণার ভিত্তিতে দিয়েছেন, কিংবা অপ্রতিমের মা-বাবা সত্যিই ‘অন্ধ স্নেহে সব বায়না’ মেটাতেন কি না—তা সেই সমাজবিজ্ঞানী বা ওই সংবাদমাধ্যমের নিউজরুম কীভাবে জানল, এসবের কোনো তথ্য-প্রমাণ সেখানে নেই।

একই প্রবণতা আরেকটি টেলিভিশন প্রতিবেদনের শিরোনামেই আরও স্পষ্ট: ‘অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড: অসৎ সঙ্গ ও কিশোর গ্যাংয়ের বলি?’ সেখানে অপ্রতিমের ফেইসবুক ও টিকটকের ছবি দেখিয়ে বলা হয়েছে, বয়সে বড়দের সঙ্গে তার ‘অসম বন্ধুত্ব’ গড়ে উঠেছিল। প্রতিবেদনের শুরুতেই ঘটনাটি সামনে এনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে—সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, সে বিষয়ে অভিভাবকদের কতটা সতর্ক থাকা প্রয়োজন। শেষেও পরামর্শ এসেছে—সন্তানের জন্য শুধু ভালো খাবার আর পোশাক নিশ্চিত করলেই হবে না, সে কার সঙ্গে মিশছে সেদিকেও নজরদারি বাড়াতে হবে।

আরেকটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম এই বিতর্ক নিয়ে এক্সপ্লেইনার করেছে: ‘অপ্রতিমের মৃত্যুর জন্য ‘প্যারেন্টিং’ কতটা দায়ী’। এই প্রতিবেদনটিকে আগের উদাহরণগুলোর সঙ্গে পুরোপুরি এক কাতারে ফেললে অবশ্য ন্যায্য হবে না। সেখানে গবেষণার উল্লেখ আছে, মনোবিজ্ঞানীর বক্তব্য আছে এবং সন্তানের নিরাপত্তার দায় শুধু মা-বাবার নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজেরও—এমন পাল্টা বক্তব্যও রয়েছে।

কিন্তু আমার আপত্তি আরও গোড়ায়। একটি ১৩ বছরের শিশু হত্যার শিকার হওয়ার পর তার মৃত্যুর ব্যাখ্যা খুঁজতে শুরুতেই ‘প্যারেন্টিং’কে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে কেন?

এসব সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন নির্জন এলাকায় মাদকসেবীদের উপস্থিতি, চুরি, ছিনতাই ও ইভটিজিংয়ের অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে। গত এক দশকে কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের হাতে অন্তত ১৫ জনের প্রাণ যাওয়ার দাবিও করা হচ্ছে। অর্থাৎ অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডকে জননিরাপত্তার অভাব ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রের দায়িত্বের জায়গা থেকে দেখার উপাদান সংবাদমাধ্যমের কাছেই আছে। কিন্তু প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে অপ্রতিম কার সঙ্গে মিশত, আর বারবার ফিরে যাওয়া হচ্ছে মা-বাবার নজরদারির প্রয়োজনীয়তায়।

অভিভাবকের দায়িত্ব নিয়ে এই আলোচনার ভিড়ে সামাজিক মাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে আরেকটি বড় প্রশ্ন আড়ালে পড়ে যাচ্ছে। একটি শিশু যদি এমন একটি পরিবেশে হত্যার শিকার হয় যেখানে কিশোর গ্যাং, ছিনতাই কিংবা মাদকের মতো সমস্যা নিয়ে আগে থেকেই অভিযোগ আছে, তাহলে প্রশ্ন শুধু ‘তার মা-বাবা কোথায় ছিলেন’ হতে পারে না। প্রশ্ন হওয়া উচিত—আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কী ভূমিকা ছিল? ওই অঞ্চলের স্থানীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন ভঙ্গুর? আর কীভাবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হলো, যেখানে উঠতি বয়সের কিশোর-তরুণেরা এতটা সহিংস হয়ে উঠতে পারছে?

অপ্রতিম হত্যার আলোচনাটি এই মৌলিক জায়গা থেকে ঘুরে গেলে যে শিশুটি হত্যার শিকার হয়েছে এবং যে পরিবার সন্তান হারিয়ে শোকে কাতর, উল্টো তাদের ওপরই দায় চাপানো হয়। অথচ যারা তাকে হত্যা করেছে এবং যে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে এমন অপরাধ ঘটেছে, তাকে ঘিরে তৈরি প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যায়।

সামাজিক মাধ্যমের নির্মমতা অপ্রতিমের নিজের ডিজিটাল জীবনেই থামেনি, পৌঁছে গেছে তার মায়ের দুই বছর আগের ডিজিটাল জীবনেও। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় অপ্রতিমের মা ফেইসবুকে কী লিখেছিলেন, শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে কী করেছিলেন—সেসব আবার টেনে আনা হয়েছে ২০২৬ সালে তার সন্তান হত্যার পর। সামাজিক মাধ্যমে কেউ কেউ সেই পুরোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে তার সন্তান হারানোর ঘটনাকেও যুক্ত করে মন্তব্য করছেন।

এর মধ্যেই একটি জাতীয় দৈনিক অনলাইনে শিরোনাম করেছে, ‘অপ্রতিমের মা ড. নাহিদার চব্বিশের সেই ফেসবুক পোস্ট আলোচনায়’। সন্তান হারানো একজন মায়ের দুই বছর আগের, সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ের ফেইসবুক পোস্ট এই মুহূর্তে একটি জাতীয় দৈনিকের কাছে কী সংবাদমূল্য বহন করে? সামাজিক মাধ্যমে যখন এমনিতেই একটি আলোচিত ঘটনাকে ঘিরে নানা অনুমান, সন্দেহ ও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ঘুরে বেড়ায়, তখন সাংবাদিকতার কাজ হয় প্রমাণিত তথ্য আর অনুমানের মাঝখানে সীমারেখা টানা এবং প্রয়োজনে সেসব থেকে সম্পাদকীয় দূরত্ব বজায় রাখা; কাভারেজ দিয়ে ঘটনাকে আরও বড় করা নয়।

অপ্রতিমের হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে এই দায়ের আলোচনা রাজনৈতিক বক্তব্যেও এসেছে। সরকারের এক ঊর্ধ্বতন রাজনৈতিক প্রতিনিধি বলেছেন—সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং তার বন্ধুদের বৃত্ত কেমন, তার খোঁজ রাখা মা-বাবার দায়িত্ব। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড সেই দায়িত্বের কথা আরও স্মরণ করিয়ে দেয় বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন।

কিন্তু একটি শিশু যদি কথিত কিশোর গ্যাংয়ের হাতে হত্যার শিকার হয়, তাহলে শুধু তার মা-বাবা সন্তানের বন্ধুদের খোঁজ রেখেছিলেন কি না, সেই প্রশ্ন কেন উঠছে? কিশোর গ্যাং যাতে তৈরি হতে না পারে, তারা যেন অপরাধ করতে না পারে এবং একটি শিশু যাতে নিরাপদে চলাচল করতে পারে—সেই পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্বের কথা আমরা তাহলে কাকে স্মরণ করিয়ে দেব?

একটি সামাজিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা আর সদ্য হত্যার শিকার একটি নির্দিষ্ট শিশুকে সেই সমস্যার প্রতীক, উদাহরণ কিংবা প্রমাণ বানিয়ে ফেলা এক বিষয় নয়। অপ্রতিমের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। এই বয়সের আর দশটি শিশুর মতো তার সিদ্ধান্তেও ভুল থাকতে পারে; কিন্তু তার কোনো ভুলই তাকে নিজের মৃত্যুর জন্য দায়ী করতে পারে না।

সাংবাদিকতার মূল দায়িত্ব হলো—কী ঘটেছিল, কারা দায়ী, কোন তথ্য প্রমাণিত, কোনটি অনুমান, কোথায় নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কী করা প্রয়োজন সেগুলো অনুসন্ধান করা; একটি শিশুর মধ্যে তার হত্যার নৈতিক ব্যাখ্যা খোঁজা নয়। আর সমাজ হিসেবে আমাদেরও বুঝতে হবে—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে অন্যের শোক, মর্যাদা ও ব্যক্তিগত জীবনকে ইচ্ছেমতো ব্যবচ্ছেদ করার সীমাহীন অধিকার নয়।

শাহরিয়ার নোবেল: যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ম্যারিল্যান্ডে জার্নালিজম স্টাডিজে পিএইচডি করছেন। ইমেইল: nobelmcj35@gmail.com