২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭ আশ্বিন ১৪৩৩

আয়নায় মিডিয়ার মুখ: গণমাধ্যম সংস্কার কি অধরাই থেকে যাবে?

পুলক চ্যাটার্জি ও বিভুরঞ্জন সরকারের মতো সাংবাদিকদের আত্মহনন কি মিডিয়া খাতের চরম অনিশ্চয়তাকেই উন্মোচিত করে?

আয়নায় মিডিয়ার মুখ: গণমাধ্যম সংস্কার কি অধরাই থেকে যাবে?

বিভুরঞ্জন সরকার ও পুলক চ্যাটার্জি—সাংবাদিকতার চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশার বলি।

খায়রুল আনোয়ার খায়রুল আনোয়ার

Published : 22 Sep 2026, 01:43 PM

Updated : 22 Sep 2026, 01:43 PM

সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির আত্মহননের ঘটনা কোনো কোনো সংবাদপত্রে সিঙ্গেল কলাম খবর হয়েছিল। তিনি কয়েক দিন আলোচনার খোরাক হয়েছিলেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যে দৈনিক পত্রিকা থেকে তিনি চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন, সেই ‘সমকাল’ কর্তৃপক্ষ অবশেষে তার পাওনা পরিশোধ করেছে। পুলক চ্যাটার্জি চাকরি হারান তিন বছর আগে। এই দীর্ঘ সময়েও কর্তৃপক্ষ তার পাওনার হিসাব শেষ করতে পারেনি। পুলক চ্যাটার্জি তার জীবন নিজ থেকে শেষ করে দেওয়ার পর পত্রিকাটির কর্তৃপক্ষ হিসাব সম্পন্ন করে। পুলকের পাওনা পরিশোধের বিষয়টি সংবাদপত্রে ছোট করে খবর হয়েছে। পুলক আর সংবাদপত্রের খবর হবেন না, সামাজিক মাধ্যমে সাংবাদিকসহ বিভিন্নজনের মন্তব্যের খোরাকও হবেন না।

পুলক চ্যাটার্জিকে এখন তার পরিবার আর একান্ত ঘনিষ্ঠজন ছাড়া কেউ মনেও রাখবে না। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতা ‘কেউ কথা রাখেনি’ স্মরণে এনে বলতে হয়, কেউ মনেও রাখে না। যেমন কেউ মনে রাখেনি আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া আরেক সাংবাদিক ও কলামনিস্ট বিভুরঞ্জন সরকারকে। জীবন এবং পেশার পড়ন্ত বেলায় চরম হতাশা থেকে তিনিও আত্মহননের পথ বেছে নেন।

পুলক চ্যাটার্জির আত্মহত্যার পর প্রাসঙ্গিকভাবে বিভুরঞ্জন সরকারের নাম আবার সামনে আসে। না হলে তিনি চলে গিয়েছিলেন বিস্মৃতির অতল গহ্বরে। পুলক এবং বিভুরঞ্জনের আত্মহনন সাংবাদিকতা পেশার অনিশ্চয়তা এবং পরিবারের অসহায়ত্বকে নগ্নভাবে তুলে ধরে। শুধু আত্মহত্যা নয়, বিভিন্ন সময় দেশে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন অনেক সাংবাদিক। নির্মমভাবে হত্যার শিকার হন সাংবাদিক দম্পতিও। পুলক চ্যাটার্জির আত্মহত্যার ঘটনা মিডিয়াকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও পেশা হিসেবে সাংবাদিকতায় জীবিকার নিশ্চয়তা নেই। নিয়মিত বেতন না পাওয়া, চাকরি ছেড়ে দিলে অথবা চাকরিচ্যুত হলে পাওনা না পাওয়া এই পেশার সাধারণ বিষয়। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট হয় না। নেই প্রভিডেন্ট ফান্ড। মাত্র কয়েকটি সংবাদপত্র এবং দুই-একটি টিভি চ্যানেল ছাড়া গ্র্যাচুইটি নেই। সাংবাদিকদের বেতন না বাড়লেও প্রতিবছর তাদের সন্তানদের স্কুল-কলেজে বেতন বাড়ে। প্রতিবছর না হলেও দুই-তিন বছর পর পর বাড়ে বাড়িভাড়া। নিত্যপণ্যের দামও বাড়ে। অথচ একই বেতন বছরের পর বছর নির্দিষ্ট অংকের ঘরে স্থির হয়ে থাকে।

বাড়ছে জীবনের ঝুঁকি

সাংবাদিকতা পেশার অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বাড়ছে জীবনের ঝুঁকি। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত অনেক সাংবাদিক হত্যার শিকার হয়েছেন। খুলনা বিভাগে বিভিন্ন সময় বেশ কয়েকজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। সাতক্ষীরা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ‘পত্রদূত’ পত্রিকার সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা স. ম. আলাউদ্দিন ১৯৯৬ সালের জুন মাসে ঘাতকের গুলিতে নিহত হন। তিনি সে সময় পত্রিকা অফিসে কর্মরত ছিলেন। ওই অঞ্চলের একজন বিশিষ্ট সাংবাদিক শামছুর রহমান ২০০০ সালের ১৬ জুলাই যশোরে নিজের অফিসে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। তিনি দৈনিক জনকণ্ঠের যশোর অফিস থেকে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতেন। ঘনিষ্ঠজনের কাছে কেবল নামে পরিচিত শামছুর রহমান দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতি এবং সীমান্ত এলাকার চোরাচালান নিয়ে সাহসী প্রতিবেদন তৈরি করতেন। তাকে হত্যার পর ধারণা করা হয়েছিল, তিনি পেশাগত কারণেই চরমপন্থি ও অপরাধচক্রের টার্গেট হয়েছিলেন। যশোরের আরও একজন সাংবাদিক সাইফুল আলম মুকুল ১৯৯৮ সালের ৩০ অগাস্ট বোমা হামলায় নিহত হন। তিনি স্থানীয় দৈনিক ‘রানার’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। খুলনার বিশিষ্ট সাংবাদিক মানিক সাহা ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি চরমপন্থিদের বোমা হামলায় নিহত হন। মানিক সাহা ওইদিন খুলনা প্রেসক্লাব থেকে রিকশায় বাড়ি ফেরার পথে তাকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপ করা হয়। বোমার আঘাতে তিনি ঘটনাস্থলেই নিহত হন। দেখা যাচ্ছে খুলনা-যশোর অঞ্চলে কয়েক বছরের ব্যবধানে চারজন সাংবাদিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এই চার সাংবাদিক হত্যা মামলার চূড়ান্ত বিচার আজও শেষ হয়নি।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি  হত্যাকাণ্ড এখনো আলোচনায় রয়ে গেছে। এর কারণ দীর্ঘ ১৪ বছরেও এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিচার তো দূরের কথা, মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ ১২৯ বারেরও বেশি পিছানো হয়েছে। পুলিশ, ডিবি ও র‍্যাবের পর পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব পেলেও এখনো হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ উদ্ঘাটন করতে পারেনি। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাছরাঙা টেলিভিশনের নিউজ এডিটর সাগর সারওয়ার এবং এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনি দম্পতি নিজ বাসায় নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন।

মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়া

শুধু সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুতি, গণহারে ছাঁটাই বা হত্যাকাণ্ডই নয়, এ দেশে মিডিয়া বন্ধ করে দেওয়ার নজিরও রয়েছে। শেখ হাসিনা প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় গিয়ে বাংলাদেশের সংবাদপত্র জগতের ঐতিহ্যবাহী দৈনিক পত্রিকা ‘দৈনিক বাংলা’ বন্ধ করে দেন। একই সঙ্গে প্রকাশনা বন্ধ করে দেন ‘বাংলাদেশ টাইমস’, সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’ ও ‘আনন্দ বিচিত্রা’র। ওই পত্রিকাগুলো ছিল সরকারি ট্রাস্টের মালিকানাধীন। একসঙ্গে চারটি পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ায় শত শত সাংবাদিক বেকার হয়ে পড়েন। তাদের অধিকাংশই অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হন। শুধু পত্রিকা বন্ধ করা নয়, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে ‘দৈনিক বাংলা’র সম্পাদক ও অবিভক্ত বিএফইউজের সাবেক সভাপতি আহমেদ হুমায়ুনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দেওয়া হয়। তখনকার তথ্য প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে এবং আওয়ামীপন্থি সিনিয়র দুই সাংবাদিক নেতার ইন্ধনে দেওয়া হয় এই মামলা। এই মিথ্যা মামলা আহমেদ হুমায়ুনকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। বিভিন্ন পর্যায়ে শুনানির পর সর্বোচ্চ আদালতে আহমেদ হুমায়ুন নির্দোষ প্রমাণিত হন।

শেখ হাসিনার দ্বিতীয় মেয়াদের শাসনামলে দুটি টেলিভিশন চ্যানেল ‘দিগন্ত টিভি’ ও ‘ইসলামিক টিভি’ এবং একটি দৈনিক পত্রিকা ‘আমার দেশ’ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। একইভাবে বিএনপি সরকারের আমলে ২০০২ সালের ২৯ অগাস্ট টেরেস্ট্রিয়াল সম্প্রচারের আইনি জটিলতা দেখিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল ‘একুশে টেলিভিশন’।

মামলা ও হত্যাচেষ্টা মামলা

বিভিন্ন সরকারের সময়ে সম্পাদক এবং সাংবাদিকদের নামে মামলা দেওয়া এবং কারাগারে পাঠানো হয়েছে। বিএনপির ১৯৯১ সালের মেয়াদে দৈনিক জনকণ্ঠের উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান, নির্বাহী সম্পাদক বোরহান আহমেদ এবং সিনিয়র সহকারী সম্পাদক এ টি এম শামসুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা হয়। আওয়ামী সরকারের আমলে গ্রেপ্তার হন ‘যায়যায়দিন’ সম্পাদক শফিক রেহমান এবং ‘আমার দেশ’ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। সম্পাদক শওকত মাহমুদ আওয়ামী লীগ এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় জেল খেটেছেন।

মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সাংবাদিকদের নামে হত্যা মামলা এবং হত্যাচেষ্টা মামলার হিড়িক পড়ে যায়। ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে দেড় শতাধিক সাংবাদিকের নামে এই মামলা দেওয়া হয়। কোনো কোনো সাংবাদিকের নামে একাধিক হত্যা অথবা হত্যাচেষ্টা মামলা দেওয়া হয়। অনেক সাংবাদিক এসব মামলার কারণে মানসিক চাপ নিয়ে দিনযাপন করছেন।

পেশা বদল ও দেশান্তরিত হওয়া

সাংবাদিকতা পেশার অনিশ্চয়তা কমবেশি সবসময়ই ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই অনিশ্চয়তা অনেক বেড়েছে। সংখ্যার বিবেচনায় সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টালের বিস্তার ঘটলেও সে অনুযায়ী এই সংখ্যা সাংবাদিকদের জীবনে স্থিতি এনে দিতে পারেনি। পেশা ও পরিবার নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে সবসময় অস্থিরতা বিরাজ করে। অনেক সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেলে বেতনের নির্দিষ্ট কোনো তারিখ নেই। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে মাসের পর মাস বেতন বকেয়া পড়ে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে তিন-চার মাস পর এক মাসের বেতন দেওয়া হয়। এসব মিডিয়ার মধ্যে ঐতিহ্যবাহী সংবাদপত্র এবং পুরোনো টিভি চ্যানেলও রয়েছে। ফলে অনেকেই পেশা পরিবর্তন করেছেন। চলে যাচ্ছেন মিডিয়া জগৎ ছেড়ে অন্য কোনো পেশায়। অনেক সাংবাদিক দেশান্তরিত হচ্ছেন। বিদেশে গিয়ে অধিকাংশ সাংবাদিক অন্য পেশায় নিয়োজিত হচ্ছেন। অথচ পঞ্চাশের দশক থেকে কয়েক দশক পর্যন্ত পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা বেছে নিয়ে বলতে গেলে সবাই শেষ পর্যন্ত এই পেশাতেই থেকে গেছেন। এখন আর সে অবস্থা নেই।

উপদেষ্টা-মন্ত্রী বদলায়, সংস্কার আর হয় না

গণমাধ্যমের সার্বিক সংস্কার সাধনের লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার সাংবাদিক কামাল আহমেদের নেতৃত্বে গণমাধ্যম কমিশন গঠন করে। কমিশনের প্রতিবেদনে সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল, নিউজ পোর্টাল, রেডিও অর্থাৎ গণমাধ্যমের সব শাখার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সুপারিশ তৈরি করা হয়। কমিশন প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য এমন একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করে দিতে বলেন প্রধান উপদেষ্টা। সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে সেই তালিকাও তৈরি করে দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তথ্য মন্ত্রণালয়ে তিনজন উপদেষ্টা পরিবর্তন হয়। সংক্ষিপ্ত তালিকার একটি সুপারিশও বাস্তবায়ন করে যেতে পারেনি অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি এবার সরকার গঠনের পর বাংলাদেশ সম্পাদক পরিষদ মে মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, গণমাধ্যম বিষয়ে সুপারিশ তৈরির জন্য জুন মাসে একটি কমিটি/কমিশন গঠন করা হবে। জুলাই মাসে তারা রিপোর্ট জমা দেবে।সেপ্টেম্বর মাস শেষ হতে যাচ্ছে, আজ পর্যন্ত সরকার সেই কমিটি বা কমিশন, যে নামেই বলা হোক না কেন, গঠন করতে পারেনি। অবশ্য ইতোমধ্যে এই সরকারের তথ্যমন্ত্রীও বদল হয়েছেন।

পুলক চ্যাটার্জি ও বিভুরঞ্জন সরকার আত্মহত্যা করে সাংবাদিকতা পেশার অনিশ্চয়তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে গেছেন। এরপরেও মনে হয়, গণমাধ্যম সংস্কারের বিষয়টি সুদূরপরাহতই থেকে যাবে।

খায়রুল আনোয়ার: সাংবাদিক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: khairulmukul7@gmail.com