হাঁটুর ব্যথার আসল কারণ ও রোগ নির্ণয়ের উপায়
হাঁটুর ব্যথায় হাঁটতে পারছেন না? অথচ সমস্যা হয়ত হাঁটুতেই নয়, বরং কোমরে।
মধ্যবয়সী বা প্রবীণ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে হাঁটুর ব্যথার জন্য সাধারণত ‘অস্টিওআর্থ্রাইটিস’ বা হাড়ের জোড়ে ক্ষয়জনিত বাতকে দায়ী করা হয়।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই ধারণা সঠিক হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে হাঁটুর জোড়ের ভেতরে ও চারপাশে থাকা একাধিক সূক্ষ্ম কাঠামোর সমস্যার কারণেও এই ব্যথা হতে পারে।
ব্যথার আসল উৎস খুঁজে বের করতে এবং সঠিক চিকিৎসা নির্ধারণে চিকিৎসকেরা কিছু সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক প্রশ্ন, শারীরিক পরীক্ষা এবং ‘ইমেজিং স্টাডিজ’ বা এক্স-রের সাহায্য নিয়ে থাকেন।
যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের অধিভুক্ত এবং বোস্টনের ‘ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেন’স হসপিটাল’-এর ‘অর্থোপেডিক সার্জন’ ডা. রিচার্ড এম. উইলক বলেন, “কোনও রোগী হাঁটুর ব্যথা নিয়ে এলে শুরুতেই কিছু মৌলিক ও কাঠামোগত প্রশ্ন করা জরুরি, যা ব্যথার মূল উৎসটি চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।”
‘হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং’-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে হাঁটুর ব্যথার নানান কারণ এবং চিকিৎসকদের রোগ নির্ণয়ের সঠিক পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি।
ব্যথার উৎস সন্ধানে চিকিৎসকদের প্রধান প্রশ্নসমূহ
ডা. রিচার্ড উইলকের মতে, “হাঁটুর সঠিক চিকিৎসার জন্য রোগীকে নিচের প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে হয়।”
আঘাতের ইতিহাস: হাঁটুতে কোনও আঘাত লেগেছিল কি না, নাকি এই ব্যথা কোনও কারণ ছাড়াই ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়েছে?
ব্যথার সুনির্দিষ্ট স্থান: ব্যথাটি ঠিক কোথায় হচ্ছে— হাঁটুর সামনে, পেছনে, ভেতরের দিকে নাকি বাইরের দিকে, নাকি পুরো হাঁটু জুড়েই?
হাঁটুর অদ্ভুত আচরণ ও শব্দ: হাঁটু কি কোনও জায়গায় আটকে বা ‘লক’ হয়ে যায়? হাঁটার সময় হাঁটু থেকে কি কোনও মটমট, ‘ক্লিকিং’ বা হাড় ঘষার মতো শব্দ পাওয়া যায়?
ব্যথার বিস্তৃতি: এই ব্যথা কি কোমর বা ‘হিপ জয়েন্ট’ থেকে নিচের দিকে বা পায়ের পাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে?
আরাম ও অস্বস্তির সময়: সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার সময় কি ব্যথা বাড়ে? নাকি দীর্ঘক্ষণ চেয়ারে বা গাড়িতে বসে থাকার পর উঠে দাঁড়ানোর সময় তীব্র টান লাগে? এমনকি রাতে ঘুমানোর সময় বা বিশ্রামের অবস্থাতেও কি হাঁটুতে ব্যথা থাকে?
শারীরিক পরীক্ষায় চিকিৎসকেরা যা দেখেন
প্রশ্নোত্তর পর্বের পর চিকিৎসকেরা একটি নিবিড় শারীরিক পরীক্ষা পরিচালনা করেন।
ডা. উইলক জানান, প্রথমে হাঁটুর ভেতরে ও চারপাশে কোনও ধরনের ফোলাভাব আছে কি-না, সেটা দেখা হয়।
এরপর রোগী হাঁটুটি পুরোপুরি সোজা এবং সম্পূর্ণ ভাঁজ করতে পারছেন কি-না বা তার স্বাভাবিক গতিশীলতা অক্ষুণ্ণ আছে কি-না, পরীক্ষা করা হয়।
পা বিভিন্ন কোণে নাড়াচাড়া করার মাধ্যমে হাঁটুর লিগামেন্টগুলো আলগা বা ঢিলে হয়ে গেছে কি-না এবং হাঁটুর চারপাশে আলতো চাপ দিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও অংশে স্পর্শকাতরতা বা ‘টেন্ডারনেস’ আছে কি-না, যাচাই করা হয়।
এক্স-রে এবং এমআরআই কখন প্রয়োজন?
প্রাথমিক পরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা সাধারণত একটি ‘এক্স-রে’ করানোর পরামর্শ দেন। এর মাধ্যমে উরুর হাড় এবং পায়ের নিচের হাড়ের মধ্যবর্তী ফাঁকা স্থানটি দেখা হয়।
যদি এই ফাঁকা স্থানটি স্বাভাবিকের চেয়ে সরু বা সংকীর্ণ দেখায়, তবে বুঝতে হবে ভেতরের তরুণাস্থি বা ‘কার্টিলেজ’টি ক্ষয় হয়ে গেছে, যা অস্টিওআর্থ্রাইটিসের স্পষ্ট লক্ষণ।
যেহেতু এক্স-রেতে লিগামেন্ট, টেন্ডন বা মেনিসকাসের মতো নরম টিস্যুগুলো দেখা যায় না, তাই এগুলো পরীক্ষার জন্য ‘ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং’ বা ‘এমআরআই’ প্রয়োজন হয়।
তবে চিকিৎসকেরা শুরুতেই এমআরআই করানোর পরামর্শ দেন না। সাধারণত অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা টেন্ডিনাইটিসের প্রাথমিক চিকিৎসায় রোগীকে নির্দিষ্ট ব্যায়াম, ফিজিওথেরাপি এবং প্রদাহনাশক ওষুধ (যেমন- আইবুপ্রোফেন বা ন্যাপ্রোক্সেন) দেওয়া হয়।
যদি কয়েক সপ্তাহের এই প্রাথমিক চিকিৎসায় ব্যথার কোনও উন্নতি না হয়, তখনই কেবল নরম টিস্যুর গভীর সমস্যা নিশ্চিত করতে এমআরআই-এর সাহায্য নেওয়া হয়।
কোমড়ের জোড়-এর সমস্যা থেকে হাঁটুর ব্যথা
ডা. রিচার্ড উইলক বলেন, “অনেক সময় রোগীরা তীব্র হাঁটুর ব্যথা নিয়ে এলেও পরীক্ষায় দেখা যায় তাদের হাঁটু সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু যখন তাদের কোমর বা হিপ জয়েন্টটি নাড়াচাড়া করা হয়, তখন তারা হাঁটু চেপে ধরে ব্যথায় চিৎকার করে ওঠেন।”
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘রেফার্ড পেইন’ বা স্থানান্তরিত ব্যথা বলা হয়।
কোমরের বা হিপ জয়েন্টের অস্টিওআর্থ্রাইটিস বা হাড়ের গঠনে কোনও ত্রুটি থাকলে সেই ব্যথার অনুভূতি স্নায়ুর মাধ্যমে সরাসরি হাঁটুতে এসে পৌঁছায়।
“এই কারণে হার্ভার্ডের চিকিৎসকেরা হাঁটুর ব্যথার সঠিক রোগ নির্ণয়ে সবসময় হাঁটুর ওপরের কোমর এবং নিচের গোড়ালির জয়েন্ট দুটিও আবশ্যিকভাবে পরীক্ষা করে থাকেন”, বলেন এই চিকিৎসক।
হাঁটুর ব্যথার ৪টি সাধারণ কারণ
অস্টিওআর্থ্রাইটিস: হাড়ের জোড়ে মসৃণ ‘কার্টিলেজ’ বা তরুণাস্থি ক্ষয় হয়ে যাওয়ার ফলে হাড়ের ঘর্ষণে এই জেদি ব্যথা ও হাড়ের সংযোগস্থল শক্ত হয়ে যাওয়ার সমস্যা তৈরি হয়।
মেনিসকাস ইনজুরি: হাঁটু অতিরিক্ত মুচড়ে গেলে বা ওঠ-বস মানে ‘স্কোয়াট’ করার সময় ‘শক-অ্যাবজরবার’ হিসেবে কাজ করা ‘সি’-আকৃতির তরুণাস্থি বা ‘মেনিসকাস’ ছিঁড়ে যেতে পারে। ফলে হাঁটু ‘লক’ বা আটকে হয়ে যায়।
টেন্ডিনোপ্যাথি: অতিরিক্ত পরিশ্রম বা ‘স্পোর্টস ইনজুরি’র কারণে হাঁটুর পেশির সংযোগকারী টেন্ডনগুলোতে প্রদাহ বা আংশিক ফাটল দেখা দিলে এই ব্যথা হয়।
লিগামেন্ট ইনজুরি: হাঁটুর হাড়গুলোকে একসঙ্গে ধরে রাখা শক্তিশালী লিগামেন্টগুলো যদি স্বাভাবিক সীমার বাইরে প্রসারিত হয়, তবে ‘স্প্রেইন’ বা গুরুতর আঘাত প্রাপ্ত হতে পারে।
