দৌড়ালে কি হাঁটুর ক্ষতি হয়?
পায়ে ও হাঁটুতে চাপ পরলেও দৌড়ানো উপকারী। তবে জানতে হবে সঠিক কৌশল।
অনেকের মধ্যেই প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, নিয়মিত দৌড়ালে বা ‘রানিং’ করলে হাঁটুর ক্ষতি হয় এবং দ্রুত বাতের (আর্থ্রাইটিস) ঝুঁকি বাড়ে। এ কারণে অনেকেই ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দৌড় থেকে বিরত থাকেন।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। সাধারণ বা অপেশাদার দৌড়বিদদের জন্য ‘রানিং’ কেবল একটি সক্রিয় জীবনধারার অংশই নয়, বরং এটি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের গতিশীলতা বজায় রাখতে এবং হাঁটুকে সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে।
দৌড়ানোর সময় হাঁটুতে কেমন চাপ পড়ে?
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেল্থ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের ওহিও অঙ্গরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান 'ওহিওহেলথ'-এর রানার্স ক্লিনিকের প্রধান এবং অ্যাথলেটিক প্রশিক্ষক অ্যামি হ্যারিসন জানান, দৌড়ানোর সময় প্রতিটি পদক্ষেপে একজন মানুষের হাঁটু তার শরীরের ওজনের প্রায় ৩ থেকে ৫ গুণ পর্যন্ত চাপ সহ্য করে।।
তার কথায়, “তবে এই পুরো চাপটি হাঁটু একাই বহন করে না।”
যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোভিত্তিক প্রতিষ্ঠান 'নর্থওয়েস্টার্ন মেডিসিন'-এর অর্থোপেডিক স্পোর্টস মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও মার্কিন শল্যচিকিৎসক ডা. ভেনিয়া ক্রিস্টিন তজং বলেন, “হাঁটু এই চাপটিকে চারপাশের তরুণাস্থি, লিগামেন্ট এবং পেশির মধ্যে সুন্দরভাবে বণ্টন করে দেয়।”
প্রাথমিকভাবে এটিকে হাঁটুর জন্য ক্ষতিকর মনে হলেও, দীর্ঘমেয়াদে তা হাঁটুর সুরক্ষায় কাজ করে।
অ্যামি হ্যারিসন বলেন, “দৌড়ানো মূলত পেশির শক্তি বাড়িয়ে, শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে এবং তরুণাস্থিকে আরও পুরু ও মজবুত করে হাঁটুকে রক্ষা করে। আমাদের শরীর দৌড়ানোর এই চাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পেশি গঠন করে, তরুণাস্থির গুণগত মান বাড়ায় এবং হাড়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে।”
যা বলছে চিকিৎসা বিজ্ঞান ও গবেষণা
দৌড়ানো যে হাঁটুর জন্য ক্ষতিকর নয়, তা বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত।
‘জার্নাল অব অর্থোপেডিক অ্যান্ড স্পোর্টস ফিজিক্যাল থেরাপি’-তে প্রকাশিত এক নিয়মতান্ত্রিক পর্যালোচনা ও মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, যারা অলস জীবনযাপন করেন বা একেবারেই দৌড়াদৌড়ি করেন না, তাদের তুলনায় অপেশাদার বা নিয়মিত দৌড়বিদদের হাঁটুতে আর্থ্রাইটিস বা বাতের হার অনেক কম।
ডা. ভেনিয়া ক্রিস্টিন তজং নিজে 'নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ফিনবার্গ স্কুল অব মেডিসিন'-এর গবেষক হিসেবে ম্যারাথন দৌড়বিদদের ওপর একটি গবেষণা পরিচালনা করেন।
দেখা গেছে, কতক্ষণ দৌড়ানো হচ্ছে, দৌড়ানোর গতি কেমন বা অতীতে কতবার ম্যারাথনে অংশ নেওয়া হয়েছে— তার সঙ্গে হাঁটু বা ‘হিপ জয়েন্ট’-এর বাতের কোনও সম্পর্ক নেই।
বরং বাতের ঝুঁকি মূলত নির্ভর করে পারিবারিক ইতিহাস (জিনগত কারণ), অতীতে হওয়া কোনও বড় ইনজুরি বা অস্ত্রোপচার এবং অতিরিক্ত ওজনের ওপর।
যাদের সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত
এর অর্থ এই নয় যে দৌড়ানোতে কোনও আঘাতের ভয় নেই। যেকোনো ব্যায়ামেই কিছুটা ঝুঁকি থাকে এবং গবেষণায় দেখা গেছে, দৌড়বিদদের ক্ষেত্রে হাঁটুতেই বেশি আঘাতের ঘটনা ঘটে।
মার্কিন বিশেষজ্ঞ অ্যামি হ্যারিসনের মতে, “যাদের অতীতে হাঁটুতে আঘাত পাওয়ার ইতিহাস আছে, গোড়ালি মচকে যাওয়ার সমস্যা রয়েছে, যারা বাতের ব্যথায় ভুগছেন কিংবা যাদের ওজন অতিরিক্ত বেশি, তাদের দৌড়ানোর গতি ও তীব্রতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।”
তাদের উচিত খুব ধীরে ধীরে শরীরকে এই চাপের সঙ্গে অভ্যস্ত করা।
হাঁটু সুরক্ষিত রাখতে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
ডা. তজং নতুন দৌড়বিদদের ক্ষেত্রে ‘ইনজুরি’ বা আঘাত এড়াতে শুরুতেই একজন ‘রানিং স্পেশালিস্ট’ বা ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেছেন।
এছাড়া হাঁটুর সুরক্ষায় নিচে উল্লেখিত নির্দেশিকাগুলো মেনে চলার পরামর্শ দেন তিনি।
স্ট্রেংথ ট্রেনিং: ডাম্বেল বা শরীরের ওজন ব্যবহার করে স্কোয়াট, লাঞ্জেস বা প্ল্যাঙ্কের মতো ব্যায়াম পেশি ও লিগামেন্ট শক্ত করে।
সঠিক জুতো নির্বাচন: ভালো কুশনযুক্ত রানিং জুতা ব্যবহার করতে হবে। আর প্রতি ৩৫০ থেকে ৪০০ মাইল (প্রায় ৫৬০-৬৪০ কিমি) দৌড়ানোর পর জুতো বদলে ফেলা উচিত।
ধীরে ধীরে লক্ষ্য বাড়ানো: প্রতি সপ্তাহে দৌড়ানোর দূরত্ব বা মাইলেজ ১০ শতাংশের বেশি বাড়ানো উচিত নয়।
উপযুক্ত সারফেস: কংক্রিটের শক্ত রাস্তার চেয়ে ঘাস, ট্র্যাক বা অ্যাসফল্টের রাস্তা হাঁটুর জন্য বেশি আরামদায়ক ও নিরাপদ।
আসল বিষয় হল, নিজের শরীরের ভাষা বুঝতে হবে। দৌড়ানোর সময় হাঁটুতে তীব্র ব্যথা হলে সঙ্গে সঙ্গে বিরতি নিতে হবে। আর প্রয়োজনে হাঁটার অভ্যাস দিয়ে শরীরকে সচল রাখার উপকারী হবে।
