০৮ নভেম্বর ২০২৬, ২৪ কার্তিক ১৪৩৩

‘বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি’ বিচার বিভাগের বেশি ক্ষতি করেছে: আইনমন্ত্রী

“আজকে বুদ্ধিজীবীদের একাংশ চুপচাপ বসে আছেন, চব্বিশে এতগুলো মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করল, তাদের বিষয়ে কোনো কথা বলছেন না।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 08 Nov 2026, 11:36 AM

Updated : 08 Nov 2026, 11:36 AM

আর্থিক দুর্নীতির চেয়ে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি’ বাংলাদেশের বিচার বিভাগের অনেক বেশি ক্ষতি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।

রোববার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে হোটেল হলিডে ইনে ‘বিচারিক কার্যক্রমে শুদ্ধাচার’ বিষয়ক এক প্রশিক্ষণ কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবি এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি-ইউএনডিপি যৌথভাবে অধস্তন আদালতের ২৫ জন বিচারকের অংশগ্রহণে তিন দিনের এ কর্মশালা আয়োজন করেছে।

কেবল অর্থনৈতিক অনিয়মকেই দুর্নীতি মনে করার ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে টিআইবির প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, “জুডিশিয়ারিতে ফাইনান্সিয়াল করাপশন যতটা না ক্ষতি করেছে, তার থেকে অনেক বেশি বাংলাদেশকে ক্ষতি করেছে ইন্টেলেকচুয়াল করাপশন। ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায় ফাইনান্সিয়াল করাপশনের বাই-প্রোডাক্ট ছিল তা আমি বলব না; এটি ছিল ইন্টেলেকচুয়াল করাপশনের বাই-প্রোডাক্ট।”

সুপ্রিম কোর্টের বিগত বছরগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট সাংবিধানিকভাবে সবচেয়ে স্বাধীন। একবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হিসেবে স্থায়ী হয়ে গেলে সরকারের তাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ নেই।

“কিন্তু বিগত বছরগুলোতে সংকটকালীন সময়ে এই সুপ্রিম কোর্ট কতটা মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে? ইন্টেলেকচুয়ালি যারা বায়াসড, যারা করাপ্ট, যারা আমার সুপ্রিম কোর্টকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে— তাদেরকে আপনারা শনাক্ত করেন, তাদের বিরুদ্ধে কথা বলেন।”

বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয় ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে স্বচ্ছতা আনার প্রতিশ্রুতি দেন আইনমন্ত্রী।

তবে বিচারিক পর্যালোচনার নামে ক্ষমতার অতিরিক্ত ব্যবহারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “মাঝে মাঝে বিচার বিভাগে যে অ্যানার্কিজমগুলো তৈরি হয়, জুডিশিয়াল রিভিউয়ের নামে অ্যাকসেস পাওয়ার এক্সারসাইজ করা হচ্ছে; ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়, যার একটি ক্লাসিক এক্সাম্পল।

“আমরা যখন সংবিধান সংশোধন কমিটি নিয়ে কনসালটেশনে বসেছিলাম, তখন আইনজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকে দাবি এসেছে—জুডিশিয়াল রিভিউয়ের পাওয়ারটা পুনর্বিবেচনা করা উচিত।”

উচ্চ আদালত অতীতে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে মন্তব্য করে আসাদুজ্জামান বলেন, সালাহউদ্দিন আহমদ গুম হওয়ার পর কিংবা রক্ষীবাহিনীর হাতে মির্জা সুলতান রাজা গুমের ঘটনায় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের (হেবিয়াস কর্পাস) অধীনে বিচারিক পর্যালোচনায় গিয়েও আদালতের কাছ থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়নি। এমনকি বিচারপতি দেবেশ ভট্টাচার্য এক মামলায় তৎকালীন সরকারকে কোর্টে ব্যক্তি হাজির করার প্রশ্ন করলে সরকার নির্বিকারভাবে বলেছিল, ‘তাকে এমন জায়গায় পাঠানো হয়েছে, সেখান থেকে আর ফেরানোর পথ নাই’; সেখানেও বিচার বিভাগ কিছু করতে পারেনি।

সমাজকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে বিভক্ত করা হয়েছে মন্তব্য করে আইনমন্ত্রী বলেন, “১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা ও গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে এবং ৯০-এর সংগ্রামে জাফর, জয়নাল, দিপালী সাহা, কাঞ্চন, রাউফুন বসুনিয়া, জিহাদ, ডা. মিলনের খুনিদের বিরুদ্ধে যেমন কথা বলব; একই সাথে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে আবু সাঈদ, মুগ্ধ, আনাসসহ ১৪০০-এর ওপর মানুষকে যারা হত্যা করেছে এবং ৩০ হাজারের মতো মানুষকে পঙ্গু করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও কথা বলাকে উৎসাহিত করব।

“অথচ আজকে বুদ্ধিজীবীদের একাংশ চুপচাপ বসে আছেন, চব্বিশে এতগুলো মানুষ পঙ্গুত্ববরণ করল, তাদের বিষয়ে কোনো কথা বলছেন না।”

অধস্তন আদালতের বিচারকদের সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তার ঘাটতির কথা তুলে ধরে আসাদুজ্জামান বলেন, “সবচেয়ে মেধাবীদের একাংশ জুডিশিয়ারিতে যাচ্ছে। মফস্বল এলাকায় একজন বিচারক সরকারি বাসা নিলে ৪০ শতাংশ ভাড়া কাটে। টাকা বাঁচানোর জন্য তিনি ২০ শতাংশ ভাড়ায় বাসা নিয়ে রিকশায় করে কোর্টে যাচ্ছেন, সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারিদের সাজা দিয়ে আবার রিকশায় ফিরে যাচ্ছেন।

“তার জীবনটা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ একবার চিন্তা করেন। বিচারকদের এই সততার নিদর্শন এবং তাদের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও সামাজিক মর্যাদা রক্ষার বিষয়গুলো হাইলাইট করা হলে বিচার বিভাগে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।”

কর্মশালায় উপস্থিত বিচারকদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, “আপনি চাকরিতে গেছেন, আপনার প্রতিযোগিতা সচিবদের সাথে না। প্রজাতন্ত্রের অন্যান্য কর্মচারীদের সাথে নিজেদের মেলানোর চেষ্টা করবেন না। তাহলে ঐতিহাসিক মাসদার হোসেন মামলার রায় এবং ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সের ব্যত্যয় হবে।

“মনে রাখবেন, আপনারা প্রজাতন্ত্রের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। মানুষ বিপদে পড়লে প্রথমে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকে, তারপরেই ন্যায়বিচারের আশায় বিচার বিভাগের কাছে যায়। নিজের ও ডিপার্টমেন্টের ইজ্জত রক্ষা করার মৌলিক ও নৈতিক দায়িত্ব আপনাদের ওপর বর্তায়।”

সংবিধান সংশোধনে টিআইবির যেকোনো জনকল্যাণমুখী প্রস্তাবকে স্বাগত জানানো হবে জানিয়ে আগামী ১০ দিনের মধ্যে লিখিত সুপারিশ দেওয়ার আহ্বান জানান আসাদুজ্জামান।

অনুষ্ঠানে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “টিআইবি কেবল আর্থিক ক্ষমতার অপব্যবহারকেই দুর্নীতি হিসেবে বিবেচনা করে না; বুদ্ধিবৃত্তিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক ক্ষমতাও যখন ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থে অপব্যবহার করা হয়, সেটিকেও আমরা দুর্নীতি হিসেবে দেখি।

“বিচার ব্যবস্থায় অনিয়মের বিষয়গুলোও কেবল আর্থিক বা অবৈধ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল নয়।”

স্থানীয় পর্যায়ে বিচারকদের আবাসন সংকট, অবকাঠামোগত প্রতিকূলতা, বেতন-ভাতা ও নিরাপত্তাহীনতার বিষয়গুলো টিআইবির গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরে উঠে আসছে জানিয়ে তিনি বলেন, বিচার বিভাগে সত্যিকারের শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে জনবল, অবকাঠামো ও সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলোকে অবমূল্যায়ন করার সুযোগ নেই।

আগামী দুয়েক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে টিআইবি নতুন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করবে এবং মন্ত্রীর বেঁধে দেওয়া ১০ দিনের মধ্যেই তা মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হবে বলে জানান তিনি।

এছাড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশনসহ বিভিন্ন আইনের ক্ষেত্রে টিআইবির অনেক সুপারিশ বিবেচনায় নেওয়ায় আইন মন্ত্রণালয়কে ধন্যবাদ জানান ইফতেখারুজ্জামান।

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ইউএনডিপি বাংলাদেশের আইনের শাসন, বিচার ও মানবাধিকারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা রোমানা শোয়াইগার, টিআইবির আউটরিচ ও কমিউনিকেশন পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম এবং গবেষণা ও নীতিবিষয়ক পরিচালক মোহাম্মদ বদিউজ্জামান।