০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

পুরুষদেরও পিরিয়ড হয়

নারীদের মতো রক্তস্রাব না হলেও, পুরুষদের শরীরেও হরমোনের এক ধরনের নিয়মিত চক্রাকার ওঠানামা চলে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 04 Nov 2026, 05:10 PM

Updated : 04 Nov 2026, 05:10 PM

নারীদের মাসিক বা পিরিয়ড স্বাভাবিক এবং জৈবিক প্রক্রিয়া। তবে সমাজ ও ইন্টারনেটের পাতায় ইদানীং একটি প্রশ্ন বেশ আলোচনা তৈরি করছে— ‘পুরুষদেরও কি পিরিয়ড হয়?’

অনেক সময় দেখা যায়, কোনও কারণ ছাড়াই পুরুষেরা তীব্র মেজাজ পরিবর্তন, খিটখিটে ভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন, যা নারীদের পিরিয়ডের আগের লক্ষণ বা ‘পিএমএস’-এর সঙ্গে অনেকটাই মিলে যায়।

চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, নারীদের মতো রক্তস্রাব না হলেও, পুরুষদের শরীরেও হরমোনের এক ধরনের নিয়মিত চক্রাকার ওঠানামা চলে, যা তাদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

স্বাস্থ্যবিষয়ক বিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথলাইন’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হরমোন ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞরা পুরুষদের এই বিশেষ হরমোন চক্র এবং এর নেপথ্যের সত্যটা উন্মোচন করেছেন।

‘আইএমএস’ বা পুরুষদের খিটখিটে ভাব কী?

যুক্তরাষ্ট্রের মনোচিকিৎসক ও লেখক ড. জেড ডায়মন্ড, তার একটি গবেষণামূলক বইয়ে প্রথম ‘ইরিটেবল মেল সিন্ড্রোম’ বা সংক্ষেপে ‘আইএমএস’ পরিভাষাটি ব্যবহার করেন।

ভেড়ার ওপর করা একটি জৈবিক পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে তিনি দাবি করেন, “নারীদের মতো পুরুষদের শরীরেও হরমোনের এমন কিছু চক্র কাজ করে, যা তাদের আচরণে আকস্মিক পরিবর্তন আনে।”

এই অবস্থাকেই চলতি ভাষায় অনেকে ‘ম্যান-স্ট্রুয়েশন’ বা পুরুষদের পিরিয়ড বলে থাকেন।

তবে মার্কিন সেক্স থেরাপিস্ট ও নিবন্ধিত সমাজকর্মী ড. জ্যানেট ব্রিটো স্পষ্ট করে বলেন, “চিকিৎসাবিজ্ঞানের কঠোর সংজ্ঞায় পুরুষদের পিরিয়ড হওয়া অসম্ভব। নারীদের পিরিয়ড হয় গর্ভধারণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ডিম্বাণু উৎপাদন এবং তা সফল না হলে জরায়ুর আস্তরণ ছিঁড়ে রক্ত আকারে বের হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। পুরুষদের শরীরে জরায়ু বা ডিম্বাণু তৈরির কোনও ব্যবস্থা নেই, তাই রক্তপাতের কোনও সুযোগও নেই।”

“তবে পুরুষদের শরীরে প্রধান সেক্স বা যৌন হরমোন ‘টেস্টোস্টেরন’-এর মাত্রা অনবরত পরিবর্তিত হয়, যা তাদের মেজাজকে ‘পিএমএস’-এর মতো খিটখিটে করে তুলতে পারে”, মন্তব্য করেন তিনি।

টেস্টোস্টেরন হরমোনের দৈনিক ও মাসিক চক্র

এই চিকিৎসকের মতে, একজন সুস্থ পুরুষের টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই ওঠানামা করে।

সাধারণত প্রতিদিন সকালের দিকে পুরুষের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা থাকে উচ্চে এবং সন্ধ্যার দিকে তা প্রাকৃতিকভাবেই সর্বনিম্ন স্তরে নেমে আসে।

দিন এবং রাতের এই হরমোন পরিবর্তনের ফলে অনেক সময় পুরুষদের মেজাজ বা শক্তির তারতম্য ঘটে।

আইএমএস বা হরমোন জনিত অস্থিরতার লক্ষণ

নারীদের পিরিয়ডের মতো পুরুষদের এই ‘আইএমএস’ বা হরমোনের তারতম্যের কোনও নির্দিষ্ট মাসিক ক্যালেন্ডার বা চক্র নেই। তবে হরমোন কমে গেলে পুরুষদের শরীরে নিচে উল্লেখিত সাধারণ লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে।

  • তীব্র ক্লান্তি ও অবসাদ।

  • মানসিক বিভ্রান্তি বা মস্তিস্কের কুয়াশাচ্ছন্ন ভাব।

  • হঠাৎ রাগ, খিটখিটে মেজাজ বা অনাকাঙ্ক্ষিত বিষণ্নতা।

  • আত্মবিশ্বাসের অভাব।

  • শারীরিক সম্পর্কের প্রতি অনীহা বা ‘লিবিডো’ কমে যাওয়া।

  • অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা বা হঠাৎ কেঁদে ফেলার প্রবণতা।

হরমোনের এই ওঠানামার পেছনের কারণ কী?

যদিও ‘আইএমএস’ কোনও স্বীকৃত প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক রোগ বা ‘ডায়াগনোসিস’ নয়, তবে পুরুষদের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোন বেশি মাত্রায় কমে যাওয়ার পেছনে কিছু বাস্তব কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

বয়স ও ‘অ্যান্ডোপজ’: পুরুষদের বয়স ৩০ বছর পার হওয়ার পর থেকেই প্রতি বছর প্রাকৃতিকভাবে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমতে শুরু করে। মধ্যবয়সী পুরুষদের ক্ষেত্রে এই হরমোন অতিরিক্ত কমে গেলে তাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘অ্যান্ডোপজ’ বা পুরুষদের মেনোপজ বলা হয়।

তীব্র মানসিক চাপ ও ঘুমহীনতা: অতিরিক্ত ‘স্ট্রেস’ মানে মানসিক চাপ বা কর্টিসল হরমোন, টেস্টোস্টেরন উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এছাড়া রাতে পর্যাপ্ত ঘুম না হলে হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

ওজন বৃদ্ধি ও ত্রুটিপূর্ণ ডায়েট: অতিরিক্ত ওজন বা ‘ইটিং ডিসঅর্ডার’-এর কারণেও হরমোনের তারতম্য ঘটে।

জরুরি সতর্কতা

ড. জ্যানেট ব্রিটো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পুরুষদের সতর্ক করে বলেন, “অনেক সময় পুরুষেরা তাদের প্রস্রাব বা মলের সঙ্গে রক্ত দেখতে পেলে সেটিকে অবহেলা করে ‘মেল পিরিয়ড’ বলে কৌতুক করেন। তবে পুরুষের গোপনাঙ্গ দিয়ে যেকোনও ধরণের রক্তপাত বিপজ্জনক এবং এটি কোনও পিরিয়ড নয়।”

তিনি ব্যাখ্যা করেন, “এটি মূলত শরীরে বাসা বাঁধা কোনও ক্ষতিকর পরজীবী, প্রোস্টেটের সমস্যা বা মূত্রনালীর মারাত্মক ইনফেকশন বা সংক্রমণের লক্ষণ।”

এই ধরনের রক্তপাত দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে দ্রুত ‘ইউরোলজিস্ট’ বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে।

জীবনধারা পরিবর্তন ও সমাধান

যদি হরমোনের সাধারণ ওঠানামার কারণে মেজাজ খিটখিটে হয় তবে নিয়মিত ব্যায়াম করা, সুষম খাবার খাওয়া, ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন করা এবং মানসিক চাপ কমানোর মাধ্যমে শরীর শান্ত রাখা সম্ভব।

তবে হরমোন অতিরিক্ত কমে যাওয়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্নতা বা ‘ডিপ্রেশন’ ও ‍দুশ্চিন্তা বা ‘অ্যাংজাইটি’ দেখা দেয়, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রক্তের হরমোন পরীক্ষা করিয়ে প্রয়োজনে ‘টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি (টিআরটি) নেওয়া যেতে পারে।

পুরনো খবর:

অজান্তেই হয়ত বাড়াচ্ছেন মানসিক চাপ: এই ছোট অভ্যাসগুলো চিনে নিন
মন খারাপ, নাকি অনুভূতিহীনতা? আনন্দ হারানোর কারণ হতে পারে `অ্যানহেডোনিয়া'
অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করা কি শুধুই রোগ, নাকি অন্য কোনও বিপদের সংকেত?
ব্যায়াম ছাড়াই সুখের হরমোন বাড়ানোর উপায়
বয়সের ভারে টেস্টোস্টেরন কমা প্রতিরোধ করতে