Published : 17 Jun 2026, 04:44 PM
‘স্ট্রেস’ বা মানসিক চাপ শুনলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বড় কোনো ঘটনা— অফিসের ডেডলাইন, পরীক্ষার আগের রাত, কিংবা পরিবারে কোনো বড় সমস্যা। এই ধরনের চাপের জন্য মানুষ প্রস্তুতি নেয়, আগে থেকে পরিকল্পনা করে।
তবে আসল সমস্যাটা থাকে অন্য জায়গায়।
প্রতিদিনের জীবনে এমন কিছু ছোট ছোট ঘটনা ঘটে, যেগুলো এতই সাধারণ মনে হয় যে, নজরই দেওয়া হয় না। অথচ এই ছোট ছোট চাপই অবচেতনে জমতে থাকে, আর একদিন সেটাই হয়ে ওঠে পাহাড়ের মতো ভারী।
ঘুম থেকে উঠেই ফোনে চোখ
সকালটা কীভাবে শুরু হয়, তার ওপর সারা দিনের মানসিক অবস্থা অনেকটাই নির্ভর করে। অনেকের দিন শুরু হয় বালিশের পাশে রাখা ফোনে চোখ রাখার মধ্য দিয়ে। মস্তিষ্ক ঠিকমতো জেগেই ওঠেনি, তখনই তার ওপর এসে পড়ে রাতভর জমে থাকা নোটিফিকেইশন, মেসেজ আর খবরের স্তূপ।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি –র স্কুল অব মেডিসিনের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঘুম থেকে উঠেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ইমেইল দেখলে, মস্তিষ্কে হঠাৎ করে ‘স্ট্রেইন’ বা চাপ তৈরি হয়।
এটি মানুষের মনোযোগের ক্ষমতা বা ‘অ্যাটেনশন স্প্যান’ নষ্ট করে দেয়।
এছাড়া, চিকিৎসা বিজ্ঞান সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত এক আচরণগত গবেষণায় দেখা গেছে, সকালের এই প্রথম মুহূর্তেই এক ঝাঁক তথ্যের চাপ গ্রহণ করলে মস্তিষ্কে কর্টিসল নামের ‘স্ট্রেস হরমোন’ বা মানসিক চাপের হরমোন নিঃসরণ এক ধাক্কায় অনেক বেড়ে যায়।
ফলে মস্তিষ্ক শান্তভাবে দিন শুরু করার সুযোগটাই পায় না, যা থেকে বের হওয়া দিনের বাকি সময়েও কঠিন হয়ে পড়ে।
রাতেও স্ক্রিনের সঙ্গেই শেষ হয় দিন
সকালের গল্পটা যেমন, রাতেরটাও একই রকম। দিনের শেষেও অনেকের চোখ থাকে ফোনের স্ক্রিনে, ঘুমের ঠিক আগের মুহূর্ত পর্যন্ত। মস্তিষ্কের একটা সময় দরকার হয় নিজেকে শান্ত করার জন্য, দিনের ক্লান্তি ঝেড়ে ফেলার জন্য।
স্ক্রিনের সামনে থাকলে সেই সময়টা পাওয়া যায় না।
যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি-র ‘স্লিপ অ্যান্ড সারকাডিয়ান নিউরোসায়েন্স ইনস্টিটিউটে’র এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্ক্রিনের এই নীল আলো মানুষের মস্তিষ্কে মেলাটোনিন নামক ঘুমের হরমোন তৈরিতে বাধা দেয়। ফলে দিনের চাপ ঘুমের মধ্যেও বয়ে যায় এবং পরদিন সকালেও থেকে যায়।
অনেকেই বুঝতে পারেন না, কেন সকালে উঠেও মন সতেজ লাগে না। আসল কারণ লুকিয়ে থাকে আগের রাতের স্ক্রিন টাইমে।
বিশ্রামকে পুরস্কার ভাবার ভুল
একটা সাধারণ ভুল ধারণা অনেকের মধ্যেই আছে। মনে করা হয়, কাজ শেষ করলে তখনই বিশ্রামের অধিকার জন্মায়। যেন বিশ্রাম একটা পুরস্কার, কাজ শেষ করার বিনিময়।
তবে বাস্তবে বিশ্রাম পুরস্কার নয়, এটি শরীরের একটি মৌলিক প্রয়োজন। শরীর আর মনকে শান্ত হওয়ার সুযোগ না দিলে, ক্লান্তি দূর হওয়ার সময় না পেলে, মস্তিষ্কে চাপ জমতেই থাকে।
জার্মানির লাইপজিগ ইউনিভার্সিটি-র এক মনস্তাত্ত্বিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বিশ্রামকে পুরস্কার ভাবেন, তারা প্রায়শই ‘ক্রনিক ফ্যাটিগ সিন্ড্রোম’ বা দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তিতে ভোগেন।
কারণ কাজের শেষ আর আসে না, আর বিশ্রামও হয় না। চিকিৎসকেরা বলছেন, তেল ছাড়া যেমন গাড়ি চলে না, তেমনি বিশ্রাম ছাড়া মস্তিষ্ক সচল রাখা অসম্ভব।
মনে 'না', মুখে 'হ্যাঁ' বলার অভ্যাস
হুমায়ূন আহমেদের 'বহুব্রীহি' নাটকে আফজাল হোসেনের অভিনয় করা ডাক্তার চরিত্রটির কথা মনে আছে? কখনও 'না' বলতে পারতেন না তিনি। নাটকে হাসির খোরাক হলেও বাস্তবে এমন মানুষ আমাদের আশেপাশে অনেকেই আছেন। সত্যিকারের ইচ্ছা বা সামর্থ্য না থাকলেও কাউকে খুশি করতে গিয়ে অনেকেই মুখে 'হ্যাঁ' বলে দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটি, বার্কলে-র এক গবেষণায় দেখা গেছে, যাদের এই ‘পিপল-প্লিজার’ বা সবাইকে খুশি করার প্রবণতা থাকে এবং যারা প্রয়োজনে ‘না’ বলতে পারেন না, তাদের মধ্যে তীব্র বিষণ্ণতা বা ডিপ্রেশনের ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি।
ফলাফলে শুধু বাড়তি কাজের চাপ আসে না, মনের ভেতরে একটা সূক্ষ্ম অস্বস্তিও জমে থাকে।
কাজটা করার সময় মন বলতে থাকে, ‘আমি তো আসলে এটি করতে চাইনি।’ এই দ্বিধা আর অস্বস্তিই দিনের পর দিন জমে বড় মানসিক চাপের আকার নেয়।
সমাধান ছাড়া শুধু সমস্যার আলোচনা
সমস্যা নিয়ে কথা বলা ভালো, এটি মন হালকা করার একটি উপায়। তবে সমস্যাটা যদি শুধু আলোচনাতেই থেকে যায়, সমাধানের দিকে কোনো পথ না খোঁজা হয়, তাহলে সেই আলোচনার কোনো মূল্যই থাকে না।
আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাময়িকী ‘জার্নাল অব পারসোনালিটি অ্যান্ড সোশ্যাল সাইকোলজি’-তে প্রকাশিত, যুক্তরাষ্ট্রের মিজুরি ইউনিভার্সিটি’র মনস্তত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও মনোবিজ্ঞানী ডা. আমান্ডা জে. রোজ-এর গবেষণায় একে বলা হয়েছে, ‘কো-রুমিনেইশন’ বা একই নেতিবাচক চিন্তা বারবার করা।
গবেষণায় দেখা গেছে, একই সমস্যা নিয়ে বারবার কথা বলা বা একই বৃত্তে ঘুরপাক খাওয়া মানুষের মানসিক অস্থিরতা ও বিষণ্নতাকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
ছোট ছোট অমীমাংসিত বিষয়গুলো মস্তিষ্কে স্থায়ী জায়গা করে নেয়, একটার পর একটা যুক্ত হতে থাকে। সমাধানের দিকে একটা ছোট পদক্ষেপ নেওয়াই এই চক্র থেকে বের হওয়ার একমাত্র উপায়।
সময়মতো না খাওয়ার ফল
মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা সাময়িক অবসাদের একটি বড় অথচ অবহেলিত কারণ হল- সময়মতো না খাওয়া।
যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডন-এর পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের এক ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, দীর্ঘক্ষণ খালি পেটে থাকলে বা তাড়াহুড়া করে খেলে রক্তে শর্করার বা গ্লুকোজের মাত্রা হুটহাট ওঠানামা করতে শুরু করে।
রক্তে গ্লুকোজের এই আকস্মিক পতন, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে এবং মস্তিষ্কে কর্টিসল ও অ্যাড্রেনালিনের মতো স্ট্রেস হরমোন বাড়িয়ে দেয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘হ্যাঙ্গরি’ বা ‘ক্ষুধা থেকে তৈরি রাগ’ বলা হয়।
অনেকেই কাজের চাপে দুপুরের খাবার পিছিয়ে দেন, ভাবেন একটু পরে খাবো। তবে এই ‘একটু পরে’ যখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পিছিয়ে যায়, তখন শরীর মেজাজ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে, আর তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করে।
সমাধানের সহজ পথ
এই অভ্যাসগুলোর কোনোটিই বড় কোনো ঘটনা নয়। ঠিক এই কারণেই প্রতিদিন এগুলো আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।
তবে সমস্যাটা ছোট হলেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোটেও ছোট নয়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, সকালে উঠে কয়েক মিনিট ফোন না ছোঁয়া, রাতে ঘুমানোর আগে স্ক্রিন বন্ধ রাখা, প্রয়োজনে বুক ফুলিয়ে 'না' বলতে শেখা, সমস্যার পেছনে না ছুটে সমাধান খোঁজা আর ঠিক সময়মতো খাওয়া— এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই দিনের পর দিন জমতে থাকা মানসিক চাপকে একদম কমিয়ে আনতে পারে।
বড় সমস্যার বড় সমাধান খুঁজতে গিয়ে, প্রায়ই রোজকার ছোট অভ্যাসগুলোকে অবহেলা করা হয়। আসলে এই ছোট অভ্যাসগুলো ঠিক করাই মানসিক চাপমুক্ত জীবনের সহজ এবং কার্যকর পথ হতে পারে।
আরও পড়ুন
যে ধরনের শব্দ শান্তির ঘুম পাড়াতে পারে