Published : 20 Jul 2026, 03:21 PM
হয়তো অব্যক্ত আক্ষেপ নিয়েই জাতীয় সংসদে বাজেট অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেছেন, “যত্রতত্র ময়লা ফেলবেন না।” তিনি বলেন, বিষয়টি খুব ছোট হলেও জাতীয় জীবনে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
কী দুর্ভাগ্য আমাদের, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও আমরা শিখলাম না ময়লা-আবর্জনা কীভাবে ফেলতে হয়। পুনরায় সেই বিষয়ে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে কথা বলতে হয় প্রধানমন্ত্রীকে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন সময় কথাটি বললেন, যখন রাজধানী ঢাকা, বন্দরনগরী চট্টগ্রামসহ দেশের বিশাল অংশ জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত হয়ে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছিল। এই জলাবদ্ধতার কারণেই এইচএসসি পরীক্ষা বাতিলসহ সাম্প্রতিক সময়ে ছাত্র আন্দোলন হয়ে গেল, যা সরকারের জন্য ছিল বিব্রতকর।
এত বিষয় থাকতে প্রধানমন্ত্রী কেন ছোট এই বিষয়টা নিয়ে সংসদে কথা বললেন। জাতীয় জীবনে এর গুরুত্ব সত্যিই কি অপরিসীম? হ্যাঁ, বিষয়টি তাই। একটু আলোকপাত করলে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হবে।
রাজধানী ঢাকার রাস্তাঘাটের বিভিন্ন স্থানে ডাস্টবিন (বর্জ্যদানি) রাখা আছে; কিন্তু সেগুলো থাকে ফাঁকা। আর তার পাশেই পড়ে থাকে বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা। এই সকল ময়লা-আবর্জনার মধ্যে বিপুল অংশ একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন, বিভিন্ন প্রকার পুনরায় অব্যবহারযোগ্য প্যাকেট, পানি ও জুসের খালি বোতলসহ অন্যান্য ধরনের পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বস্তু। অনেক স্থানে বর্জ্যদানি মাদকাসক্তরা খুলে নিয়ে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করে ইয়াবা, হেরোইন অথবা গাঁজা সেবন করেছে।
এই সেদিন, গেল ১৩ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুস সালাম আবারও মনে করিয়ে দিলেন ঢাকার জলাবদ্ধতার অন্যতম প্রধান কারণ পলিথিন। পানি নির্গমন পথের মুখে সেগুলো আটকে যায়; ফলে পানি ড্রেনেজ সিস্টেমকে অকার্যকর করে দেয়। আব্দুস সালাম বলেন, পরিচ্ছন্নকর্মীরা নির্গমনমুখ থেকে প্রচুর পরিমাণে পলিথিন সরিয়েছে, যা আমরা ময়লার ঝুড়িতে অথবা সরাসরি রাস্তায়, আশেপাশে ফেলে দিয়ে আসি। শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশের চিত্র মোটামুটি একই রকম।
বর্জ্য নিয়ে গবেষণার জন্য বৈশ্বিকভাবে খ্যাত প্রতিষ্ঠান ওয়েস্ট কনসার্নের তথ্যমতে, ১৯৯১ সালে প্রতিদিন বাংলাদেশের নগরগুলোতে গড়ে ৬,৪৯৩ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য উৎপাদিত হতো। ২০০৫ এবং ২০১৪ সালে সেই পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ১৩,৩৩০ মেট্রিক টন ও ২৩,৬৮৮ মেট্রিক টনে। ২০২১ সালে এই পরিমাণ পুনরায় বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৩৩,৫৭৪ টনে এবং ২০৩০ সালে এই পরিমাণ হবে ৬৮,৫১৭ মেট্রিক টন।
মোট পরিমাণের মধ্যে কাগজ বর্জ্যের পরিমাণ ক্রমেই কমছে, বাড়ছে পলিথিন ও প্লাস্টিকের পরিমাণ। যেমন—২০০৫ সালে সকল নগরে কাগজ বর্জ্যের গড় পরিমাণ ছিল প্রায় সাড়ে নয় ভাগ এবং প্লাস্টিকের পরিমাণ ৪.৭৫ ভাগ। ২০১৪ সালে কাগজের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় ৪.৮৪ ভাগ এবং প্লাস্টিক ৭.৩৫ ভাগ। ২০২১ সালে সকল নগরে কাগজ বর্জ্যের পরিমাণ কমে ২.২৮ ভাগ এবং প্লাস্টিক বর্জ্য বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে শতকরা ৭.৮৯ ভাগে।
আমরা হরহামেশা যা দেখি—বাস, ট্রেন, গাড়ি, রিকশা, লঞ্চ, ফেরি, ট্রাকসহ বিভিন্ন চলন্ত যানবাহন থেকে বিভিন্ন প্যাকেট, বোতল, পলিথিন ব্যাগ ছুঁড়ে দেওয়া হয়। এগুলো রাস্তায় পড়ার পর উড়ে বিভিন্ন জায়গায় পড়ে থাকে। যদিও ছিন্নমূল মানুষগুলো পুনশ্চক্রায়নযোগ্য প্লাস্টিকের বোতল-কৌটা কুড়িয়ে নিয়ে যায়; কিন্তু তারা বিভিন্ন প্যাকেট ও একবার ব্যবহারযোগ্য পলিথিন নেয় না। বৃষ্টির পানির তোড়ে সেগুলো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। এই সব পলিথিন-আবর্জনা রাস্তাঘাটের পানি নির্গমনের পথে আটকে যায়; ফলে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। সেগুলো সরিয়ে দিতে বাড়তি শ্রম দিতে হয় ওয়াসাসহ সকল প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন ব্যক্তিকে।
নর্দমার মাধ্যমে সেগুলো নদী, খাল-বিল কিংবা অন্যান্য জলাশয়ে চলে যায়। কেবল ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তলদেশেই কয়েক মিটার পলিথিনের আস্তরণ জমে রয়েছে। ফলে সেখানে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আপনি সেন্ট মার্টিন দ্বীপ থেকে শুরু করে সুন্দরবন পর্যন্ত আমাদের পুরো উপকূলীয় অঞ্চলে দেখবেন প্লাস্টিকের বর্জ্য, যার মধ্যে রয়েছে পাতলা পলিথিন, বিভিন্ন চিপস, আচার, পানীয় ও পানির খালি বোতলসহ বিভিন্ন কৌটা ও বোতল। নদী থেকে সেগুলো সর্বশেষ বঙ্গোপসাগরে পতিত হচ্ছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণায় দেখা গেছে, বঙ্গোপসাগরে প্লাস্টিক দূষণ চরম পর্যায়ে। সাগরে এখন হাঙ্গর-তিমি থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রাণীর শরীরে প্লাস্টিক দূষণ পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে, স্থলভাগে যদি এই দূষণ বন্ধ করা না যায়, তাহলে খুব অচিরেই বঙ্গোপসাগরের পানি প্লাস্টিকের স্যুপে পরিণত হবে।
যত্রতত্র ময়লা ফেলার বিপজ্জনক ঘটনার বিবরণ উল্লেখ করি। কিছুদিন আগে আমি শেরেবাংলা নগরে মোটরসাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলাম। সামনে ছিল বেশ দামি একটি সরকারি গাড়ি। হঠাৎ সেই গাড়ি থেকে প্লাস্টিকের খালি বোতল ছুঁড়ে ফেলা হলো। বোতলটি রাস্তায় পড়ার পর সেটি গড়িয়ে আমার একটু সামনে থাকা বাইকের সামনের চাকার কাছে চলে এল। বাইকটি বেশ গতিতে চলছিল। বোতলের ওপর চাকা পড়লে নির্ঘাৎ মারাত্মক রকমের দুর্ঘটনায় পড়তেন ওই বাইক চালক। আমিও গিয়ে পড়তে পারতাম তার ওপরে। খুব বিপজ্জনকভাবে ব্রেক করে সেই যাত্রা রক্ষা পেলেন ওই ভদ্রলোক এবং সঙ্গে আমি। রাস্তায় পড়ে গেলে পেছন থেকে আসা গাড়ির নিচে পড়বার আশঙ্কা ছিল। যিনি ফেলেছিলেন, তিনি কি একবার ভেবে দেখেছেন পেছনে কী করে গেছেন?
শুধু রাস্তাঘাটে নয়, খাবার দোকান, রেস্তোরাঁ, কফিশপে আমরা কেমন অসচেতন ও অবিবেচক আচরণ করি! আপনি বসার সময়ই দেখবেন সেই টেবিলে কাঁচের ওপর অথবা কাঁচ না থাকলে টেবিলের ওপরই মাছের কাঁটা, মাংসের হাড্ডি, তেজপাতাসহ বিভিন্ন উচ্ছিষ্ট মসলা, ঝোল, ভাত ইত্যাদি পড়ে আছে। সঙ্গে থাকবে বেশ কিছু ব্যবহৃত টিস্যু পেপার, অপরিচ্ছন্নভাবে রেখে দেওয়া থালা, বাটি, চামচ ইত্যাদি। কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত বোনপ্লেটগুলো থাকে ফাঁকা। আপনি খেতে বসার আগেই আপনার রুচির ব্যাঘাত ঘটতে বাধ্য।
খদ্দের আসলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়েটার এসে নোংরা, ভেজা কাপড় দিয়ে সেই টেবিল মুছে ফেলেন। এই মোছাটি এমন হয় যে, টেবিলের একাংশের ঝোল-ময়লা এক কোণা থেকে পুরো টেবিলে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর আমরা গিয়ে সেখানে হাত দিয়ে বসে খাচ্ছি। টেবিলের সঙ্গে সংযুক্ত হাতের অংশ দিয়ে সেই জীবাণু আমাদের শরীরে, সেখান থেকে কাপড়ে, আমাদের ঘরে এবং এর মাধ্যমে পুরো পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।
আমরা যারা নিজেদের ভদ্রলোক হিসেবে বিবেচনা করি, তারা কেবল রেস্তোরাঁর মালিকদের দোষ দেখি; বলি—ওরা পরিষ্কার রাখে না। কিন্তু এই সমস্যা আমরাই সৃষ্টি করছি, সেটি একবারও ভেবে দেখি না। আমরা যদি খাবারগুলোর হাড়, কাঁটা ও অন্যান্য উচ্ছিষ্টগুলো সরাসরি টেবিলে না ফেলে বোনপ্লেটে ফেলি, অথবা বোনপ্লেট না থাকলে নিজে প্লেটের একপাশে রেখে খাওয়া শেষ হলে সেগুলো প্লেটের মাঝখানে রেখে যাই, তাহলে তো আর সমস্যা থাকে না। তরকারির ঝোল টেবিলে পড়ে না, টেবিল পরিষ্কার থাকে এবং আমরা অনেক বড় বড় রোগবালাই থেকে বেঁচে যাই।
এ প্রসঙ্গে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে চাই। আমি নিয়মিত বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) ক্যান্টিনে দুপুরের খাবার খাই। একদিন বিকেল তিনটার দিকে রেস্তোরাঁয় গিয়ে দেখি, কোনো টেবিলে বসার অবস্থা নেই। টেবিলের ওপর খাবারের বিভিন্ন উচ্ছিষ্ট পড়ে আছে। আর একমাত্র ওয়েটার সাদেক ঘর্মাক্ত অবস্থায় প্রতিটি টেবিলে গিয়ে পরিষ্কার করছে। খালি টেবিল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই টেবিলে কারা খাবার খেয়েছে?’ তিনি বললেন, ‘স্যার, এখানে গবেষকরা স্যাররা খেয়েছেন।’ বুঝলাম, ভদ্রলোকরা খেয়ে চলে গেছেন; বাকি দায়িত্ব এই গরিব সাদেকের। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘মোছার পরও টেবিলে ময়লা থাকে না?’ বললেন, ‘স্যার, একবার মুছলাম; এরপর আবার ভিম লিকুইড দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। না হলে আঠা-আঠা ভাব থাকে। অনেক ভিম লাগে, কষ্ট হয়।’
চিন্তা করে দেখুন, কেবলমাত্র একটু সচেতন হলেই কত উপকার হয় দেশের। টেবিল পরিষ্কার করতে যে বাড়তি শ্রম যাচ্ছে, সেটি মূলত জাতীয় ক্ষতি। পাশাপাশি ডিটারজেন্ট এবং বিভিন্ন ওয়াশিং লিকুইড নর্দমা হয়ে আমাদের জলাশয় এবং মাটি দূষিত করছে; উপরন্তু এই দূষিত পানি ও মাটিতে উৎপাদিত মাছ ও কৃষিপণ্য আমরা খাচ্ছি।
যত্রতত্র ময়লা না ফেলার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী আমাদের ছোট অভ্যাস পরিবর্তনের অনুরোধ করেছেন। তিনি হয়তো বুঝেছেন, বিশৃঙ্খল এই জাতিকে পরিবর্তন করতে হলে ছোট ছোট পরিবর্তন দিয়েই শুরু করতে হবে। আমাদের উচিত তার এই অনুরোধ রক্ষা করা; তাতে দেশেরই মঙ্গল হবে, যা সবার কাম্য।
কামরান রেজা চৌধুরী পেশায় সাংবাদিক–সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছেন দুই দশকেরও বেশি। ই-মেইল: [email protected]