০৬ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

মেসির বিদায় ও ইয়ামালের উত্থান: বৈশ্বিক তাৎপর্য

খেলা কি আসলেই রাজনীতি-বহির্ভূত? অ্যারিস্টোটলের ‘রাজনৈতিক প্রাণী’রা যখন মাঠে নামে, তখন বিশ্বকাপও আর ‘নির্দোষ’ খেলা থাকে না। ট্রাম্পের তথাকথিত ‘ফিফা পিস প্রাইজ’ থেকে শুরু করে লিওনেল মেসির ইসরায়েলপ্রীতি—সব ছাপিয়ে কীভাবে তরুণ ফুটবল তারকা লামিন ইয়ামাল হয়ে উঠলেন বৈশ্বিক প্রতিরোধের প্রতীক?

মেসির বিদায় ও ইয়ামালের উত্থান: বৈশ্বিক তাৎপর্য
গাজা শহরের আল শাতি শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একটি দেয়ালে ফিলিস্তিনি শিল্পীদের আঁকা দেয়ালচিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে ফুটবল তারকা লামিন ইয়ামালকে, যিনি বার্সেলোনার লা লিগা জয় উদযাপনের শোভাযাত্রায় ফিলিস্তিনের পতাকা উড়িয়েছিলেন। রয়টার্স

আলমগীর খান আলমগীর খান

Published : 21 Jul 2026, 09:43 AM

Updated : 11 Sep 2026, 03:42 PM

খেলাকে খেলা হিসেবেই দেখা উচিত; তারপরও মানুষ যেহেতু অ্যারিস্টোটলের মতে রাজনৈতিক প্রাণী, খেলাও রাজনীতি-বহির্ভূত নয়। বিশেষ করে যেগুলো জনপ্রিয় খেলা, তা নানা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। সবসময় ক্ষমতাসীন, একনায়ক ও স্বৈরাচারী শক্তি ফুটবলসহ বিভিন্ন খেলাকে নিজ প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে। এবারকার ফুটবল বিশ্বকাপ ফুটবলও তাই হয়েছে। বিশ্বকাপ এবার  প্রথম থেকেই সরাসরি রাজনৈতিক রূপ ধারণ করেছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও তার দোসররা ফুটবলের বিশ্বকাপকে তাদের পকেটের জিনিস বানিয়ে ফেলেছিলেন। ট্রাম্প তার কাঙ্ক্ষিত নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার পর ফিফা তার জন্য একটা শান্তি পুরস্কার তৈরি করে। ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো নিজে ট্রাম্পের হাতে ‘ফিফা পিস প্রাইজ’টি তুলে দিয়েছিলেন। এই কাজটির মধ্য দিয়ে তিনি ট্রাম্পের যাবতীয় অনৈতিক ও স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডে ফিফার সমর্থন নিশ্চিত করেন এবং ফুটবল বিশ্বকাপকে তার অধীনস্থ করে তোলেন। এই বিশ্বকাপ তাই পরিণত হয় ‘ট্রাম্প বিশ্বকাপে’। বিশ্বকাপ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের নানারকম জাতিবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ সমগ্র খেলাটাকেই বিতর্কিত করে তুলেছে।

তবু বিশ্বকাপ ফুটবল এগিয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী মানুষের আবেগকে নাড়া দিয়ে। প্রিয় দল ও প্রিয় তারকা কখনও জিতেছে, কখনও হেরেছে। এবার তারকাদের মধ্যে সেরা ছিলেন লিওনেল মেসি আর সে কারণে তার দেশ আর্জেন্টিনাও অনেকের প্রিয় দলে পরিণত হয়। বাংলাদেশে অবশ্য মেসি জমানার আগে থাকতেই আর্জেন্টিনা জনপ্রিয়, আর্জেন্টিনা রয়েছে অগণিত ভক্ত।

ফাইনালে হারের পর লিওনেল মেসি। ছবি: রয়টার্স

ফাইনালে হারের পর লিওনেল মেসি

লিওনেল মেসি বলতে অজ্ঞান পৃথিবীর বহু ফুটবলপ্রেমী। কিন্তু শেষমেশ সেই মেসি ও তার দল আর্জেন্টিনা হেরে গেল স্পেনের কাছে। আর্জেন্টিনার পরাজয়ে যেমন অগণিত ভক্তের বুক ভেঙেছে, তেমনি আর্জেন্টিনা হেরে যাওয়ায় এবং স্পেন চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় উচ্ছ্বসিত মানুষের সংখ্যাও অগণিত। স্পেন বিশ্বকাপ জেতায় সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছে স্পেনের জনগণ, তারপরই রয়েছে অধিকৃত ফিলিস্তিনের নিপীড়িত মানুষ ও বিশ্বব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ গণহত্যার বিরোধীরা। মেসিকে ছাড়িয়ে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে যাচ্ছেন স্পেনের উনিশ বছরের ফুটবল তারকা লামিন ইয়ামাল। কারণ কী? কারণ মেসির ইসরায়েল-প্রীতি ও ইয়ামালের ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন।

তারকারা রোবট নন। তাদের মানবিকতা, নৈতিকতা, আদর্শ, নিপীড়িত জনতার সঙ্গে একাত্মতা এবং অত্যাচারী শাসককে রুখে দাঁড়ানো অতি জরুরি। এজন্যই মানুষ মনে রাখে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল তারকা সক্রেটিসকে। এ বছর ১৯ ফেব্রুয়ারি ‘জ্যাকোবিন’ সাময়িকীতে হামজা শেহরিয়ার তার সম্পর্কে লিখেছেন, “তিনি ফাইনালে পৌঁছান নাই, ফুটবলের সবচেয়ে গৌরবময় ট্রফি শূন্যে তুলে ধরেন নাই, ফুটবলের গতানুগতিক গল্পে অমরত্ব লাভ করেন নাই; তারপরও দশকের পর দশক ব্রাজিলের এই ফুটবল তারকা বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নায়কদের একজন।

“শত শত খেলোয়াড় টুর্নামেন্ট জেতে, সক্রেটিস কিন্তু একজনই। তার কথা টিকে থাকে তার পুরস্কারের জন্য নয় কিংবা মাঠে তার বিপুল সক্ষমতার জন্য নয়; টিকে থাকে কারণ তিনি তাই বুঝতেন যা ফুটবল প্রতিষ্ঠানগুলো ভুলে যেতে অভ্যস্ত: খেলা নিজেই একটা রাজনীতি। খেলোয়াড়রা চান কি না চান, বিরাট সামাজিক ক্ষমতাসম্পন্ন মঞ্চে তারা আসীন থাকেন।”

সক্রেটিস ১৯৮৬ সালে মেক্সিকো বিশ্বকাপে তার মাথার ফিতায় লিখে রেখেছিলেন—সুবিচারের জন্য, লিবিয়ায় আমেরিকান বোমাবর্ষণের বিরুদ্ধে সম্প্রীতির জন্য স্লোগান। বিশ্বব্যাপী মানুষ মারাদোনাকে ভালোবাসে তার প্রতিবাদী লড়াকু আদর্শের জন্য। কিন্তু বিশ্বের সেরা ফুটবল খেলোয়াড় বলে পরিচিত মেসি তাদের সম্পূর্ণ বিপরীত। মেসি বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানবতাবিরোধী ইসরায়েল রাষ্ট্রের এক অতি আপনজন। কাকতালীয় হলেও লক্ষণীয় যে, তিনি শৈশবে বড় হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার যে এলাকায়, তার নাম ‘এস্টাডো ডে ইসরায়েল’ বা ‘স্টেট অব ইসরায়েল স্ট্রিট’। আরও লক্ষণীয় যে, ইসরায়েলিদের সবচেয়ে প্রিয় ফুটবল দল আর্জেন্টিনা।

এত বড় একজন ফুটবল তারকা, যিনি এত দেশ-বিদেশ ঘুরেছেন এবং যার ভক্তকূল সারা বিশ্বজুড়ে, সেই তিনি একাধিকবার ইসরায়েল ভ্রমণ করেছেন; অথচ ফিলিস্তিনি জনগণের স্বাধীনতা দূরে থাক, বর্তমানে গাজা ভূখণ্ডে ইসরায়েল কর্তৃক পরিচালিত গণহত্যার বিরুদ্ধে একটি শব্দ উচ্চারণ করেননি কখনও। ২০১৭ সালে তেল আবিবের কোম্পানি ‘সিরিন ল্যাবস’ তাকে গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিয়োগ দেয়। ২০২০ সালে মেসি ইসরায়েলি কোম্পানি ‘অরক্যাম’-এর সঙ্গে তিন বছরের চুক্তিতে আবদ্ধ হন তাদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে কাজের জন্য। লাভের সম্পর্কটা খুবই স্পষ্ট।

এবার দেখি ইসরায়েলের পৃথিবীবিখ্যাত প্রগতিশীল চিন্তার দৈনিক ‘হারেৎজ’ পত্রিকা এ বিষয়ে কী লিখেছে। প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিজে মেসির ও আর্জেন্টিনার ভক্ত; দোষের কিছু নয়। তবে কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট জেভিয়ার মিলেই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। যে মিলেই নিজের পরিচয় দেন ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জায়নবাদী প্রেসিডেন্ট’ বলে, আরব ভূখণ্ডে ইসরায়েল কর্তৃক সংঘটিত সকল হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সমর্থক তিনি। নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমাদের এর চেয়ে বড় ও ভালো বন্ধু আর নেই।’ ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইতামার বেন-গাভির এক্সে পোস্ট করেন: ’আমাকে কি ব্যাখ্যা করে বলতে হবে কেন আমি আমার সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে চাই আর্জেন্টিনা ফাইনালে যাক ও বিশ্বকাপ জিতুক?’

‘হারেৎজ’-এর লেখক ইয়োতাম কোরেন ঠিক ১৯ জুলাই তার ‘বিটুইন মেসি অ্যান্ড মিলেই: হাউ আর্জেন্টিনা বিকেইম ইসরায়েল’স টিম অ্যাট দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’ শীর্ষক লেখাটিতে আরও লিখেছেন: “এটা বলা কঠিন যে কেবল সম্পর্কের উষ্ণতার কারণেই ইসরায়েলিরা লিওনেল স্কালোনির দলকে সমর্থন করে। কিন্তু অনেক ভক্ত মনে করেন, আর্জেন্টিনা কর্তৃক ইসরায়েলকে মুক্তভাবে আলিঙ্গনের ঘটনা সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করে দেয় যে কার পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে—বিশেষভাবে যখন  স্পেনের মুখোমুখি আর্জেন্টিনা। যে স্পেন ইসরায়েলের খেলোয়াড়দের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে এবং যার সবচেয়ে বড় তারকা লামিন ইয়ামাল গত মে মাসে বার্সেলোনার শিরোপা জয়ের প্যারেডে ফিলিস্তিনের পতাকা তুলে ধরেছেন।”

এজন্য ইয়ামালের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগকে পাত্তাই দেয়নি তার দেশ স্পেন। যে দেশটি ইরান আক্রমণে যুক্তরাষ্ট্রকে তার ভূখণ্ড ও আকাশসীমা ছেড়ে দিতে অস্বীকার করেছে। প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে বলেছেন, “এভাবেই মানবতার বড় বড় বিপর্যয় শুরু হয়। … যুদ্ধ ও বোমা দিয়ে পৃথিবী তার সমস্যার সমাধান করতে পারবে না।”

এসব কারণে স্পেনকে ট্রাম্প ‘টেরিবল’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আরও বলেছেন, “আমরা স্পেনের সঙ্গে সকল বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন করতে যাচ্ছি। আমরা স্পেনের সঙ্গে কিছুই করতে চাই না।”

সেই লামিন ইয়ামালের দিকে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করতে হলো, গলায় পদক পরিয়ে দিতে হলো ডনাল্ড ট্রাম্পকে।

সেই লামিন ইয়ামালের দিকে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করতে হলো, গলায় পদক পরিয়ে দিতে হলো ডনাল্ড ট্রাম্পকে।

আহা! সেই স্পেনের বিশ্বকাপ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দিতে হলো বেচারা ট্রাম্পকে। হ্যান্ডশেকের জন্য হাত বাড়িয়ে দিতে হলো সেই অনিচ্ছুক তরুণ লামিন ইয়ামালের দিকে, গলায় পরিয়ে দিতে হলো পদক। হ্যাঁ, এই কিশোর লামিন ইয়ামাল ছিলেন এবার বিশ্বকাপে চোখধাঁধানো আরেক তারকা— দৃঢ়তা, আদর্শ ও আপসহীনতা ইত্যাদি গুণ দিয়ে; যা নেই বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর ফুটবল তারকা লিওনেল মেসির। আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে স্পেনের এই জয় তাই উদযাপন করছে অধিকৃত ফিলিস্তিন থেকে আমেরিকা হয়ে বিশ্বের মানবতাবাদী ও নিপীড়িত মানুষ।

অন্তত ফুটবলের মাঠে হেরে গেছেন ফিফা শান্তি পুরস্কারজয়ী যুদ্ধবাজ ডনাল্ড ট্রাম্প ও তার দোসররা।

আলমগীর খান কবি ও সমাজকর্মী। ই-মেইল: alamgirhkhan@gmail.com