০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: এই ‘যাওয়া তো নয় যাওয়া’

‘সাংবাদিকতার প্রযুক্তিতে তফাত থাকলেও বিবেকের প্রশ্ন একই’—অকুতোভয় সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর আকস্মিক প্রয়াণে তৌহীদ রেজা নূরের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: এই ‘যাওয়া তো নয় যাওয়া’

তৌফিক ইমরোজ খালিদী

তৌহীদ রেজা নূর তৌহীদ রেজা নূর

Published : 05 Oct 2026, 12:37 PM

Updated : 05 Oct 2026, 01:43 PM

তৌফিক ভাইয়ের চলে যাওয়ার খবরটি যখন প্রথম শুনলাম, বিশ্বাস করতে পারিনি। মনে হয়েছিল—অসত্য খবর, হতেই পারে না। পরে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে নিশ্চিত হলাম, সত্যিই তিনি আর নেই। লন্ডনে আকস্মিক অসুস্থতার পর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, তিনি ১ অক্টোবর রাতে হোটেলে অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে তাকে সেন্ট বার্থোলোমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কথা জানান।

বয়স হয়েছিল মাত্র ৫৯। তার সামনে আরও অনেক পথ বাকি ছিল। দেশের জন্য, সাংবাদিকতার জন্য, তরুণদের জন্য—আরও অনেক কিছু করার কথা ছিল তার। তাই তার অকালপ্রয়াণে নিদারুণভাবে মর্মাহত বোধ করেছি, যা বিসর্পিত হয়েছে এক গভীর শূন্যতায়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের বাইরেও সাংবাদিকতা, গণমাধ্যম, আন্তর্জাতিক সম্প্রচার ও নানা পেশাগত-সামাজিক উদ্যোগে তার সক্রিয় সম্পৃক্ততা ছিল। বহুমাত্রিক সেই কর্মযাত্রাই তাকে কেবল একজন প্রধান সম্পাদক নয়, একজন বহুমুখী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

তিনি ছিলেন অত্যন্ত স্পষ্টবাদী, সাহসী, আধুনিক চিন্তার মানুষ এবং গভীর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ একজন সাংবাদিক। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা তার কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক স্লোগান ছিল না; সেটি ছিল তার চিন্তা ও সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।

আর তরুণদের প্রতি তার বিশ্বাস ছিল অসাধারণ। নতুন চিন্তাকে জায়গা দিতেন, প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে ভয় পেতেন না। সাংবাদিকতাকে কেবল পেশা হিসেবে নয়, সমাজের প্রতি দায়িত্ব হিসেবেও দেখতেন।

তার কাছে লেখা নিয়ে গেলে তিনি শুধু লেখা পড়তে চাইতেন না; আগে শুনতে চাইতেন—কেন লিখছি, কী বলতে চাইছি, বিষয়টির পেছনের তথ্য কী, লেখাটির তাৎপর্য কোথায়। খুব মন দিয়ে শুনতেন। তারপর নিজের কষ্টিপাথরে দ্রুত যাচাই করতেন। লেখা অর্থবহ মনে হলে সিদ্ধান্ত নিতেও তার বেশি সময় লাগত না—প্রকাশের ব্যবস্থা করে ফেলতেন।

এই দ্রুততা ছিল না তাড়াহুড়োর দ্রুততা; ছিল বিচার-বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দ্রুততা, যা একজন চৌকশ সাংবাদিকের বৈশিষ্ট্য। তিনি জানতেন সময়ের মূল্য কত, বিশেষ করে সাংবাদিকতায়।

একজন ভিশনারি সাংবাদিক

তৌফিক ভাই শুধু বর্তমান দেখতেন না—অনেক দূর পর্যন্ত দেখতে পারতেন। এবং শুধু দেখেই থেমে থাকতেন না; সেই ভবিষ্যৎকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতেন।

বাংলাদেশে ডিজিটাল সাংবাদিকতার যে নতুন যুগের সূচনা হয়েছিল, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম তার অন্যতম প্রধান বাহন। ২০০৬ সালে তার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ ২৪ ঘণ্টার অনলাইন সংবাদসেবায় রূপ নেয়। আজ ডিজিটাল সংবাদ আমাদের কাছে স্বাভাবিক বাস্তবতা; কিন্তু সেই সময় এটি ছিল সাহসী ও দূরদর্শী একটি উদ্যোগ।

এই কারণেই তাকে শুধু একজন সম্পাদক বা সংবাদমাধ্যমের উদ্যোক্তা হিসেবে দেখলে তার ভূমিকার পুরোটা ধরা যায় না। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী সাংবাদিক—যিনি আগামী দিনের সাংবাদিকতার চেহারা কল্পনা করতে পারতেন এবং সেই ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য কাজ করতেন।

বাংলাদেশের নানা সংকটময় মুহূর্তে তার দৃঢ় অবস্থানও কখনও বিস্মৃত হবে না এদেশবাসীর কাছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রকাশিত বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন ও সংবাদ তার সাংবাদিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সাম্প্রতিক সময়ে তার সম্পাদনায় ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’ গ্রন্থমালা প্রকাশ করার বিষয়টি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ও অমূল্য একটি উদ্যোগ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস যখন নানা দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং তা অস্বীকার বা আড়াল করার চেষ্টা চলছে, তখন মুক্তিযুদ্ধের বহুস্তরীয় অভিজ্ঞতা ও মানুষের স্মৃতিকে সংরক্ষণ করে এমন একটি গ্রন্থমালা প্রকাশ করা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

তৌফিক ভাইয়ের সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি এখানেই—তিনি শুধু সংবাদ পরিবেশন করতে চাননি; সময় ও ইতিহাসকে নথিভুক্ত করতে চেয়েছেন।

সাংবাদিকতার উত্তরাধিকার

তৌফিক ভাই আমার বাবা শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন। একাধিকবার তিনি আমাকে বলেছেন, আমার বাবা যেভাবে অকুতোভয়ে বাঙালি জাতিকে সচেতন ও জাগ্রত করার কাজে সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করেছিলেন, তা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে।

বাবার আপসহীন সাংবাদিকতা তাকে আকৃষ্ট করত। তিনি নিজেই আমাকে বলেছেন—সেই সাংবাদিকতার চর্চা তিনি তার নিজের পেশাগত জীবনে করার চেষ্টা করেছেন।

আমার বাবা যে সময়ের সাংবাদিক ছিলেন, সেই সময় সংবাদপত্র ছিল মানুষের রাজনৈতিক চেতনা ও জাতীয় জাগরণের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। তিনি এমন এক সময়ে লিখেছেন, যখন বাঙালির অধিকার, আত্মপরিচয় ও স্বাধীনতার প্রশ্ন ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল। তৌফিক ভাই অন্য এক সময়ে সাংবাদিকতা করেছেন। তার হাতে ছিল নতুন প্রযুক্তি, নতুন মাধ্যম, নতুন প্রজন্মের পাঠক। কিন্তু তার সঙ্গে আমার বাবার যে যোগসূত্রটি আমি অনুভব করি, সেটি প্রযুক্তির নয়—সাংবাদিকতার নৈতিক সাহসের।

আমার বাবার কাছ থেকে যে উত্তরাধিকার তৌফিক ভাই অনুভব করেছিলেন, তা কোনো পদ বা প্রতিষ্ঠানের উত্তরাধিকার নয়; সেটি ছিল সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতার উত্তরাধিকার।

সাংবাদিকতার চিরন্তন প্রশ্ন

শেষ পর্যন্ত সাংবাদিকতার মৌলিক প্রশ্নগুলো তো একই থাকে— কী সত্য? কীভাবে সত্যটি যাচাই করা হবে? কীভাবে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে? এবং যখন সত্য প্রকাশের পথে চাপ, ভয় বা ঝুঁকি থাকে—তখন সাংবাদিকের অবস্থান কী হবে?

সিরাজুদ্দীন হোসেন তার সময়ে এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছিলেন। তৌফিক ইমরোজ খালিদীও তার সময়ের ভিন্ন বাস্তবতায় এসব প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন।

সময়ের ব্যবধান অনেক, প্রযুক্তির ব্যবধান আরও বেশি; কিন্তু সাংবাদিকতার বিবেকের প্রশ্নটি একই রয়ে গেছে।

এত তাড়াতাড়ি কেন?

প্রকাশিত সংবাদে তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কথা বলা হয়েছে এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত বিবরণও এসেছে। তবু তার মতো একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের এমন আকস্মিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে তার পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে মৃত্যুর চিকিৎসাগত ও ঘটনাগত বিষয়গুলো সম্পর্কে যতটা সম্ভব স্বচ্ছ ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য জানা স্বাভাবিকভাবেই কাম্য মনে করি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে আকস্মিকভাবে হোটেলকক্ষে মৃত্যুর ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে প্রশ্ন রেখে গেছে। ১৯৬৩ সালে বৈরুতে হোটেলকক্ষে গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যু এবং ১৯৬৯ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের এক হোটেলে দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার মৃত্যুকে ঘিরে সে সময় জনমনে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।

আমি তৌফিক ভাইয়ের মৃত্যুকে কোনোভাবেই সেসব ঘটনার সঙ্গে এক করে দেখছি না। এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্যও আমার কাছে নেই। কিন্তু তার মতো একজন মানুষের আকস্মিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুসন্ধান সম্পন্ন হওয়া জরুরি বলে মনে করি।

অপূরণীয় শূন্যতা

তৌফিক ভাই এমন এক সময়ে চলে গেলেন, যখন বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় তার মতো সাহসী, দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী মানুষের বড্ড প্রয়োজন। তার চলে যাওয়ায় তাই আমরা শুধু একজন মানুষ বা একজন সম্পাদক হারালাম না; হারালাম এমন একজন আলোকবর্তিকা, যিনি সামনে তাকিয়ে অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখাতে জানতেন।

মানবজীবন সম্পর্কে কবির সেই অমোঘ প্রশ্ন— “জন্মিলে মরিতে হবে— অমর কে, কোথা, কবে?”

হ্যাঁ, মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু কিছু মানুষ তাদের কাজের মধ্য দিয়ে মৃত্যুর সীমা অতিক্রম করে যান।

তৌফিক ভাইও তেমনই একজন।

সাংবাদিকতার ইতিহাসে তার নাম থাকবে। বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতার ইতিহাসে তার নাম থাকবে। ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ’-এর মতো উদ্যোগে তার অমূল্য ভূমিকা চিরদিন উচ্চারিত হবে। তার সহকর্মীদের স্মৃতিতে থাকবে তার স্পষ্ট কথা, দ্রুত সিদ্ধান্ত, নতুন প্রজন্মের প্রতি আস্থা। আর যাদের জীবনে তিনি কোনো না কোনোভাবে আলো জ্বালিয়েছেন, তাদের স্মৃতিতেও তিনি থেকে যাবেন।

তৌফিক ভাই, আপনি চলে গেছেন—কিন্তু তবু সত্য যে, এই ‘যাওয়া তো নয় যাওয়া...’

আপনার লেখা, আপনার গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান, আপনার সাহসী সাংবাদিকতা, তরুণদের প্রতি আপনার বিশ্বাস এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার স্বপ্ন—এসবের মধ্যেই আপনি থেকে যাবেন।

আর আমাদের মতো যারা আপনাকে কাছ থেকে দেখেছি, তাদের হৃদয়ে আপনার চলে যাওয়ার যে বেদনার ভার তৈরি হয়েছে—তা কখনোই পুরোপুরি লাঘব হওয়ার নয়।

তৌফিক ভাইয়ের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আপনার অনন্ত যাত্রা শান্তিময় হোক।

তৌহীদ রেজা নূর: লেখক ও গবেষক।