০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: কঠোর সম্পাদকের আড়ালে স্নেহশীল অভিভাবক

“বাংলাদেশের গল্প বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার সাহস তিনিই দিয়েছিলেন”—বিডিনিউজের প্রধান আলোকচিত্রী মুস্তাফিজ মামুন তার ফ্রেমে ও জীবনের অর্জনে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অবদানের স্মৃতিচারণ করেছেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: কঠোর সম্পাদকের আড়ালে স্নেহশীল অভিভাবক

তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

মুস্তাফিজ মামুন মুস্তাফিজ মামুন

Published : 05 Oct 2026, 03:57 PM

Updated : 05 Oct 2026, 04:06 PM

তৌফিক ভাই আর নেই—আমার জন্য এই বিদায় কেবল একজন সম্পাদকের প্রয়াণ নয়; এ এক পরম স্বজন হারানোর গভীর বেদনা ও অবর্ণনীয় কষ্টের। কারণ, তৌফিক ইমরোজ খালিদী আমার কাছে কেবল কর্মস্থলের অভিভাবকই ছিলেন না; তিনি ছিলেন কঠোর সম্পাদকের আড়ালে এক অকৃত্রিম অভিভাবক, আলোর দিশারী পথপ্রদর্শক এবং আমার দীর্ঘ পেশাগত যাত্রার অন্যতম প্রধান অনুপ্রেরণা।

তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার কাজের সূত্রে যুক্ত হওয়ার মুহূর্তটি ছিল একদম অন্য রকম, রোমাঞ্চকর এক মোড় বদলের।

সময়টা ২০০৬ সালের অক্টোবর মাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি আমি তখন দৈনিক ইত্তেফাকের ফিচার বিভাগে কাজ করি। একদিন বন্ধু কামরুজ্জামান প্রস্তাব দিল, নতুন একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে কাজ করব কি না। তখন ‘অনলাইন সাংবাদিকতা’ আমাদের কাছে অনেকটাই অপরিচিত ধারণা। তাই প্রথমে প্রস্তাবটি এককথায় নাকচ করে দিয়েছিলাম।

কয়েক দিন পর সে আবার বলল, “তুই চাইলে বিডিনিউজে যোগ দিতে পারিস, আমি তোর পোর্টফোলিও তৌফিক ভাইকে দেখাতে পারি।”

‘তৌফিক ভাই’ মানে তৌফিক ইমরোজ খালিদী। নামটি শুনেই আমি একবাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। কারণ, বিবিসি বাংলা রেডিওতে তার ভরাট ও দরাজ কণ্ঠের সংবাদ পাঠের সুবাদে তিনি আগে থেকেই আমার অত্যন্ত পরিচিত ও প্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন।

কামরুজ্জামান আমার পোর্টফোলিও তাকে দেখালে তিনি বিশ্বদীপ দার সঙ্গে কথা বলতে বললেন। তিনি তাকে কী বলেছিলেন, সেটা কখনো জানা হয়নি। তবে এরপর দাদার সঙ্গে দেখা। চা খেতে খেতে তিনি একটি কথাই জানতে চাইলেন, কবে যোগ দিতে পারবেন?

কয়েক দিন সময় নিয়ে ২০০৬ সালের ২১ ডিসেম্বর আমি বিডিনিউজে যোগ দিলাম। আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়োগপত্র হাতে পেলাম ২০০৭ সালের ১ জানুয়ারি। এভাবেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রায় সূচনালগ্ন থেকে তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে আমার পথচলা শুরু। ফলে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল, কীভাবে একজন দূরদর্শী মানুষের জাদুকরি নেতৃত্বে বাংলাদেশে সম্পূর্ণ নতুন ধারার একটি সংবাদমাধ্যম গড়ে উঠছিল।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী এমন এক সময়ে ডিজিটাল সাংবাদিকতার পথে হেঁটেছিলেন, যখন বাংলাদেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম বলতে কেবল ছাপা কাগজ আর টেলিভিশনকেই বোঝাত। ২০০৬ সালে নতুন রূপে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের যাত্রা শুরু এবং ২৪ ঘণ্টার সংবাদ প্রকাশের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তিনি এ দেশের সাংবাদিকতাকে ডিজিটাল যুগে প্রবেশের একটি মজবুত ভিত্তি তৈরি করে দেন।

Image

ছবি: মাহমুদ জামান অভি

তার কৃতিত্ব শুধু প্রযুক্তিনির্ভর একটি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠায় সীমাবদ্ধ ছিল না। সংবাদে নির্ভুলতা, তথ্যের সূত্র উল্লেখ, বস্তুনিষ্ঠতা এবং পেশাগত শৃঙ্খলাকে তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। বিডিনিউজের নিউজরুমে এসব বিষয়কে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতির অংশ করে তোলার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অনন্য।

বাইরের জগতের মানুষ তাকে চিনতেন একজন রাশভারী, কঠোর, স্পষ্টভাষী ও আপসহীন সম্পাদক হিসেবে। কিন্তু তার কাছাকাছি থেকে কাজ করার সুযোগ যারা পেয়েছেন, তারা জানেন সেই কঠোর আবরণের আড়ালে লুকিয়ে ছিল গভীর মমতা এবং মানুষের সম্ভাবনার প্রতি অসাধারণ আস্থা। আমি সৌভাগ্যবান যে, সেই মমতার পরশ আমি পেয়েছিলাম।

আজকের এই আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত ‘মুস্তাফিজ মামুন’ হয়ে ওঠার পেছনে তৌফিক ভাইয়ের অবদান ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। আলোকচিত্রের প্রতি আমার ঝোঁক ও আবেগ অনুরাগকে তিনি শুধু পেশাগত দায়িত্ব হিসেবে দেখেননি। আমার কাজের সম্ভাবনা তিনি জহুরির চোখে চিনেছিলেন এবং আমাকে বারবার গণ্ডি পেরিয়ে আরও বড় স্বপ্ন দেখতে উৎসাহ দিয়েছেন। আমার নতুন কোনো আলোকচিত্র প্রকল্প, প্রদর্শনী কিংবা গল্পের পরিকল্পনা নিয়ে গেলে তিনি মন দিয়ে শুনতেন, পরামর্শ দিতেন এবং সবচেয়ে বড় কথা—আমার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতেন।

নিজের কোনো অর্জনের খবর বা পুরস্কার জেতার সংবাদ নিজের কর্মস্থলে প্রকাশ করতে আমি বরাবরই একটু সংকোচ বোধ করতাম। কিন্তু তৌফিক ভাই ছিলেন ঠিক উল্টো। আমার কোনো পুরস্কারের খবর জানতে পারলে নিউজরুমে সগর্বে নির্দেশ দিতেন সেটি বড় করে প্রকাশ করতে।

২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের ‘সিজিএপি’ ফটো প্রতিযোগিতায় গ্র্যান্ড প্রাইজ জয়ের ঘটনাটি তেমনই এক উজ্জ্বল স্মৃতি। আমি তখন জার্মানির বন শহরে বিডিনিউজ থেকে ডয়চে ভেলেতে কাজ করার জন্য অবস্থান করছি। গভীর রাতে হঠাৎ ফোন বেজে উঠল। ওপাশে তৌফিক ভাই। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে খবরটি দেখেই তিনি আমাকে ফোন করেছেন। সেই পরিচিত ভরাট কণ্ঠে বললেন, “অভিনন্দন মামুন।” পরে দেখি, বিডিনিউজের বাংলা ও ইংরেজি উভয় সংস্করণেই আমার পুরস্কার জেতার খবর অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে। সেই মুহূর্তে পুরস্কারের আনন্দের সঙ্গে মিশে গিয়েছিল একজন অভিভাবকের স্বীকৃতি ও ভালোবাসা পাওয়ার পরম তৃপ্তি।

জার্মানিতে থাকাকালীন তৌফিক ভাই প্রায়ই রাতের বেলা আমাকে ফোন করতেন। তার সবসময় একটিই কথা ছিল—“শুধু কাজ নিয়ে পড়ে থেকো না, ঘুরে ঘুরে ইউরোপ দেখো।” ইউরোপের কোন দেশে কোন জাদুঘর আছে, কোথায় কীভাবে সহজে যাতায়াত করা যায়—এসব ছিল তার নখদর্পণে। সে সময় নানা মামলার চাপে পড়ে তৌফিক ভাই নিজে মারাত্মক অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার মধ্যেও তিনি আমাকে বলতেন, টাকা-পয়সার প্রয়োজন হলে যেন তাকে জানাই। তার সেই চরম সংকটের দিনেও এমন বিশাল উদারতায় আমি গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছিলাম। মূলত তার সেই নিরন্তর উৎসাহেই সে সময় ইউরোপের অনেকগুলো দেশ ঘোরার সুযোগ হয়েছিল আমার।

আরেকটি ঘটনা খুব মনে পড়ে। সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে আমি ও তৌফিক ভাই একসঙ্গে সিঙ্গাপুরে। দেশে তখন পরিবেশবিষয়ক একটি প্রতিযোগিতায় আমি প্রথম পুরস্কার পেয়েছি। আমি দেশে না থাকায় আমার স্ত্রী পুরস্কারটি গ্রহণ করেন। সারা দিন তৌফিক ভাইয়ের সঙ্গে থাকলেও লজ্জায় তাকে বিষয়টি বলিনি। কিন্তু তিনি পত্রিকায় খবরটি দেখে ঠিকই আমাকে অভিনন্দন জানালেন। স্বভাবসুলভ রসিকতায় হেসে বললেন, “তোমাকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে আসায় ভালোই হলো, তোমার স্ত্রী নিজ হাতে পুরস্কারটি নেওয়ার সুযোগ পেল। তোমার এত সব পুরস্কারের পেছনে তো ওর অবদানও কম নয়।” সেদিন তিনি আমার সেই অর্জনকে বিশেষ নৈশভোজের মাধ্যমে উদযাপন করেছিলেন। একজন সম্পাদকের কাছ থেকে এমন ব্যক্তিগত আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার অভিজ্ঞতা আমার জন্য আজীবন অমূল্য স্মৃতি হয়ে থাকবে।

তিনি কেবল আমার পেশাগত খোঁজই নিতেন না, আমার পরিবারের ব্যাপারেও সবসময় খোঁজখবর রাখতেন। যখনই দেখা হতো, পরম মমতায় স্ত্রী-কন্যার খোঁজ নিতেন। বিশেষ করে আমার কন্যার ভবিষ্যৎ ও ভালো পড়াশোনার বিষয়ে চমৎকার সব পরামর্শ দিতেন তিনি।

আজ আমার ঝুলিতে যে আন্তর্জাতিক পুরস্কার, সম্মাননা এবং দেশে-বিদেশে বিভিন্ন প্রদর্শনীর স্বীকৃতি রয়েছে, সেসব অর্জনের পেছনে আমার নিজের শ্রমের পাশাপাশি অনেক মানুষের অবদান আছে। তবে তাদের মধ্যে তৌফিক ভাইয়ের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। কারণ, তিনি শুধু আমার কাজের মূল্যায়নই করেননি, আমার সম্ভাবনার ওপর অগাধ বিশ্বাস রেখেছিলেন।

আমার কাজের ক্ষেত্রে তার একটি শিক্ষা আজও গভীরভাবে রেখাপাত করে। তিনি বলতেন, বাংলাদেশের গল্প বাংলাদেশের মাটিতেই ছড়িয়ে আছে। দেশের মানুষ, প্রকৃতি, সংস্কৃতি, পরিবেশ, জীবিকা ও সংগ্রামের গল্পগুলোকে নতুন চোখে দেখতে হবে এবং সেই গল্প সগৌরবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে হবে। এই বিশ্বাস আমার আলোকচিত্রের পথচলায় সবসময় আলোকবর্তিকা হয়ে কাজ করেছে।

বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের ব্যস্ত জীবন, নদী, বন, উপকূল, কৃষি, শ্রমজীবী মানুষ বা পরিবেশের নানা গল্প ক্যামেরায় ধারণ করার ক্ষেত্রে এই ভাবনাই আমাকে বারবার অনুপ্রাণিত করেছে। তৌফিক ভাই হয়তো সরাসরি আমার প্রতিটি ছবির পেছনে ছিলেন না, কিন্তু আমার কাজকে বড় পরিসরে দেখার যে সাহস, তার একটি বড় অংশই তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন।

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো কেবল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নয়, বরং তার হাতে গড়ে ওঠা একঝাঁক সাংবাদিক, আলোকচিত্রী ও মিডিয়াকর্মী। তিনি তরুণদের সম্ভাবনা চিনতে পারতেন। তাদের কাজের সুযোগ দিতেন, ভুল করার সুযোগ দিতেন, আবার প্রয়োজন হলে কঠোরভাবে শুধরেও দিতেন। তার নেতৃত্বে কাজ করা বহু মানুষ আজ দেশের সংবাদমাধ্যমের নিউজরুমে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন। তিনি শুধু বস্তুনিষ্ঠ সংবাদই তৈরি করেননি, তিনি ‘মানুষ’ তৈরি করেছেন। আর এখানেই একজন সম্পাদক হিসেবে তার উত্তরাধিকার সবচেয়ে গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।

মানুষের জীবনে এমন কিছু মানুষ আসেন, যাদের উপস্থিতি এতটাই স্বাভাবিক ও নির্ভরতার হয়ে ওঠে যে, তাদের অনুপস্থিতির কথা কল্পনাও করা যায় না। তৌফিক ইমরোজ খালিদী আমার জীবনে ঠিক তেমনই এক নির্ভরতার নাম ছিলেন।

আজ তিনি নেই। কিন্তু তার রেখে যাওয়া আদর্শ, তার নিজের হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান এবং আমাদের মতো কর্মীদের প্রতি তার সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা তাকে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখবে। আগামী দিনে আমার ক্যামেরার প্রতিটি নতুন ফ্রেমে, প্রতিটি নতুন গল্পে এবং জীবনের প্রতিটি অর্জনের মুহূর্তে তার দেওয়া সেই আস্থার কথা আমার বারবার মনে পড়বে।

হয়তো কোনো চমৎকার ছবি তোলার পর হঠাৎ আনমনেই মনে হবে, ছবিটি তৌফিক ভাইকে দেখালে তিনি খুব খুশি হতেন। কিন্তু ওপাশ থেকে সেই পরিচিত ভরাট কণ্ঠস্বর আর কোনো দিন ভেসে আসবে না। তবুও তিনি থাকবেন—আমার প্রতিটি কাজের অনুপ্রেরণায়, আমার স্মৃতির মণিকোঠায় এবং আমার প্রতিটি ফ্রেমের আড়ালে এক অদৃশ্য অভিভাবক হয়ে।

ওপারে ভালো থাকবেন, তৌফিক ভাই। আপনার স্মৃতির প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও অন্তহীন ভালোবাসা।

মুস্তাফিজ মামুন: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান আলোকচিত্রী।