০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: শিল্পানুরাগী এক অনন্য আতিথেয়তার মানুষ

‘বাসার দেয়ালে দেয়ালে শোভা পেত দেশের সেরা শিল্পীদের কাজ’—তৌফিক ইমরোজ খালিদীর গভীর শিল্পপ্রীতি, রুচিশীল নান্দনিক বোধ ও সজ্জন ব্যক্তিত্বের স্মৃতি তুলে ধরেছেন রফিকুন নবী।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: শিল্পানুরাগী এক অনন্য আতিথেয়তার মানুষ

তৌফিক ইমরোজ খালিদী

রফিকুন নবী রফিকুন নবী

Published : 05 Oct 2026, 11:03 AM

Updated : 05 Oct 2026, 11:03 AM

তৌফিক আমার অত্যন্ত প্রিয় মানুষ ছিলেন—একজন সজ্জন, বিশেষ বন্ধু। চমৎকার ব্যক্তিত্ব। এবং সবচেয়ে বড় কথা ছিল—তিনি অনেক ধরনের মানুষের সঙ্গে মিশতে পারতেন, যার মধ্যে শিল্পীদের অগ্রাধিকার ছিল। আমরা শিল্পীরা তার সান্নিধ্য উপভোগ করতাম, আর তিনিও আমাদের সঙ্গ উপভোগ করতেন এবং মিশতেন খুব আন্তরিকভাবে। এটা একটা বড় গুণ বলে মনে হতো আমার সবসময়।

অনেকবারই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়েছে। তিনি শিল্পীদের নিয়ে আলাদাভাবে বসতেন—এইটা আমার কাছে খুব ভালো লাগতো। বিশেষ বিশেষ শিল্পীদের সঙ্গে বসতেন এবং তাদের আপ্যায়নের ব্যাপারে কোনো কমতি ছিল না। অনেক সময় তিনি দূরদূরান্ত থেকে নানান রকম নদীর বা খালবিলের মাছ, একেবারে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা গরুর মাংস, বিভিন্ন জায়গার নানান ধরনের মিষ্টান্ন জোগাড় করতেন তার মেহমানদের জন্য। তার পছন্দের ও প্রিয় মানুষদের জন্য তিনি আপ্যায়নে কোনো কার্পণ্য করতেন না। মূলত আলাপচারিতাই ছিল সাক্ষাতের মূল উদ্দেশ্য। সেখানে শিল্পকলা সংক্রান্ত আলাপ, দেশি-বিদেশি শিল্পকলাই ছিল তার আলাপচারিতার প্রধান বিষয়। শিল্পকলা বিষয়ক তার যে চিন্তাভাবনা ছিল, তা তিনি চমৎকারভাবে ব্যক্ত করতেন। আড্ডায় তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত এক মানুষ। অত্যন্ত সদালাপী, রুচিশীল মানুষ ছিলেন। কথা বলতেন গুছিয়ে, কখনোই খেই হারিয়ে ফেলতেন না।

আমার কাজের প্রতি তার একটা পক্ষপাত ছিল, যদিও দুঃখজনকভাবে তার কাছে আমার চিত্রকর্ম খুব একটা ছিল না। আমি তাকে আমার শিল্পকর্ম দেব দেব করেও দেওয়া হয়নি; এটা একটা খামতি রয়ে গেল আমার। এই ব্যাপারটা মনে হলে এখন আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়—তাকে দেব দেব করে দিতে পারিনি।

তৌফিকের বাড়িতে যে আতিথেয়তা—এটা ছিল একেবারে ইতিনিক, অনন্য। এই ব্যাপারটা আমার খুব ভালো লাগতো। আমাদের সঙ্গে তিনি মিশতে পারতেন। তার বাড়িতে গেলে আদর-আপ্যায়নের প্রাচুর্যে ভেসে যাওয়ার মতো অবস্থা হতো। তিনি আপ্যায়নে আনন্দ পেতেন খুব। এটা তার বৈশিষ্ট্যের একটা বড় দিক।

আমি তার কালেকশন দেখেছি; তার বাসার দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে বাংলাদেশের সেরা শিল্পীদের কাজ। আমাদের প্রায় সব বড় শিল্পীর কাজই তার কাছে আছে—কামরুল হাসান, মুর্তজা বশীর, মনিরুল ইসলাম, শহীদ কবির, শেখ আফজাল হোসেনসহ অনেকের ছবি। আমারও ড্রয়িং রয়েছে দু-একটা; সেগুলো উল্লেখযোগ্য নয় বলেছিলাম তাকে, তাতে তিনি আবদার করেছিলেন আমার চিত্রকলা নেওয়ার—সেইটা আর হলো না। এই কারণে আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে আছে। তার এই অকালমৃত্যু আমার কাছে সহ্যের অতীত।

তার ছেলে আমার ছেলের বন্ধু। আমি তার মৃত্যুর প্রথম খবরটা পাই লন্ডন থেকে। আমার ছেলে বলল, তৌফিক সাহেবের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ভালো নয় মানে প্রায় ফিরে আসা কঠিন। আমি তখন থেকেই দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম। শেষ পর্যন্ত যেটা হওয়ার নয়, সেটাই হলো; যেটা কাম্য ছিল না, সেটাই ঘটে গেল। তার অকালমৃত্যুতে শুধু শোক নয়, তার আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

তার কর্মময় জীবন সম্বন্ধে সবারই জানা আছে—আমি আর নতুন করে কী বলব? তিনি যে কাজগুলো করে গেছেন, আমরা সেগুলো স্মরণ ও সংরক্ষণ করলে তার প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা দেখানো হবে। স্মরণ করা ছাড়া তো আমাদের আর করণীয় কিছু নেই।

বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা—এই বিষয়গুলোতে তাকে কখনো আপস করতে দেখিনি। এটা তার গুণাবলির একটি বিশেষ দিক। তার এই দৃষ্টিভঙ্গি এবং অবস্থান আমার ভালো লাগত। শুনেছি তিনি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিন খণ্ডে একটি বিরাট কাজ সম্পাদনা করেছেন। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো—তিনি সেটা কেবল সম্পাদনাই করেননি, সেই বইগুলো বেরিয়েছে ৫ অগাস্ট-পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সময়টিতে। এতে করে বোঝা যায় দেশ, মানুষ এবং পেশার প্রতি তার একটা অঙ্গীকার ছিল। শুধু অঙ্গীকারই নয়, তিনি সেই অঙ্গীকারকে নির্ভয়ে রক্ষা ও বাস্তবায়ন করতে পেরেছিলেন। তার ব্যক্তিত্বের এই দেশপ্রেম আমাদের জন্য গৌরবময় হয়ে থাকবে। আমি তার সব কাজেই মুগ্ধ ছিলাম। আমাদের দেশে ভালো কাজের লোকের খুব অভাব; তিনি এমন একসময়ে চলে গেলেন, যখন এই রকম মানুষের খুব বেশি দরকার ছিল।

রফিকুন নবী: চিত্রশিল্পী, কার্টুনিস্ট ও অধ্যাপক।