০৫ অক্টোবর ২০২৬, ২০ আশ্বিন ১৪৩৩

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: আমাদের কালের কাঙাল হরিনাথ

ঊনবিংশ শতাব্দীর কাঙাল হরিনাথের মতোই ক্ষমতার তোপের মুখে সত্য প্রকাশের লড়াই চালিয়ে যাওয়া তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে আনিসুর রহমানের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী: আমাদের কালের কাঙাল হরিনাথ

তৌফিক ইমরোজ খালিদী

আনিসুর রহমান আনিসুর রহমান

Published : 05 Oct 2026, 07:05 PM

Updated : 05 Oct 2026, 07:05 PM

ভূমিলগ্ন হয়েও কেমন যেন দূর আকাশের তারা হয়ে থাকতেন তিনি। অথচ নিজের চিন্তা, উদ্ভাবন, আনন্দ, বেদনা আর লড়াইকে সকলেরও করেছেন। সকলের তরে নিজেকে উৎসর্গ করে বিপদের ঘোরতর মুহূর্তে একা ও নীরবে লড়ে গেছেন সমগ্রের জন্য। কী এক অভিমান নিয়ে তিনি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন শেষটায়, কাউকে বুঝতে দিতে চাননি। কিন্তু সকলের তরে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার অগ্রযাত্রায় সাংবাদিকতার দায়বদ্ধতা থেকে পালিয়ে যাননি। তিনি আমাদের দেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় সত্য উন্মোচনের লড়াইয়ে পেশাদারত্ব জিইয়ে রাখার শেষতক এক আলোকোজ্জ্বল নক্ষত্র। সেই নক্ষত্রের নাম—তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

তিনি একদিকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক, অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা একই অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের সতীর্থ। বয়সে তিনি আমার প্রায় এক যুগের জ্যেষ্ঠ। অ্যালামনাই সূত্রে গণমাধ্যমের পেশাদারি গণ্ডির বাইরেও তার সঙ্গে আলাপচারিতার দারুণ সুযোগ ছিল; তবুও কী অদ্ভুত কারণে তার মুখোমুখি হওয়ার সেই সম্ভাবনাটুকু আমি ইচ্ছে করেই এড়িয়ে গিয়েছি। এমনকি অ্যালামনাই পুনর্মিলনীতেও সেই সুযোগটা বারবার হাতছাড়া করেছি।

সতীর্থ হওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘদিন তার উদ্ভাবিত ও সম্পাদিত বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে নিয়মিত ও অকাতরে লিখেছি। তবে আমার এসব লেখার কারণে সময়ে সময়ে তার ওপর যে বাড়তি চাপ এসেছে, তা তাকেই সামাল দিতে হয়েছে। ক্ষমতা ও নিরাপত্তা বলয়ের প্রাণকেন্দ্র থেকে শুরু করে সংস্কৃতি অঙ্গনের মোড়লরাও আমার লেখার প্রতিক্রিয়ায় পত্রিকাটির ওপর বিরাগভাজন হয়েছেন। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন উপাচার্য আমার কয়েকটি লেখার সূত্র ধরে পত্রিকাটির সঙ্গে ঝামেলা করেছেন, লেখা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দিয়েছেন, আবার কখনো মামলার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছেন।

এতসব প্রতিকূলতার পরও তৌফিক ভাই বিডিনিউজে আমার লেখালেখির সুযোগ সবসময় অবারিত রেখেছেন।

এমন সাহসী সম্পাদকের চোখ এড়িয়ে আমি যেমন নিজেকে লুকিয়ে রেখেছিলাম, ঠিক তেমনই ইচ্ছে করেই আড়ালে থেকে গেছি আরও কয়েকজন আলোকসঞ্চারী প্রতিভাবান মানুষের চোখ থেকে। তাদের মধ্যে আহমদ শরীফ, আহমদ ছফা ও হুমায়ুন আজাদের কথা বিশেষভাবে বলা যায়।

আহমদ শরীফকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনেকবার দেখেছি, কিন্তু কাছে যাওয়ার সাহস করিনি। আহমদ ছফার ক্ষেত্রেও ঠিক একই ঘটনা ঘটেছে। তাকে বহুবার দূর থেকে দেখেছি; এমনকি আড্ডায় মত্ত আহমদ ছফাকে বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে লক্ষও করেছি। তবুও কোনো দিন সামনে গিয়ে দাঁড়াইনি। এক অজানা টানে যেমন তাদের দিকে আকৃষ্ট হয়েছি, তেমনই কী এক অদ্ভুত কারণে বারবার নিজেকে লুকিয়ে রেখেছি। হুমায়ুন আজাদের বেলাতেও ছবিটা একই রকম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে, কলাভবনের করিডোরে, ফুলার রোডে ও বইমেলায়—অগণিতবার তাকে দেখেছি; কিন্তু প্রতিবারই তার নজর এড়িয়ে চলেছি। এই যে কাছে না যাওয়া—এর সবটাই ছিল গভীর শ্রদ্ধাবোধ, অপরিসীম সমীহ আর প্রচ্ছন্ন সম্মোহন থেকে।

এবার তৌফিক ভাই প্রসঙ্গে আসি। তাকে নিয়েও আমার মনের ভেতরে কী এক অজানা শঙ্কা কাজ করত। লেখায় না জানি কোন ভুল বা অসঙ্গতি তার চোখে ধরা পড়ে আছে—এই ভয়েই হয়তো তার মুখোমুখি হওয়া এড়িয়ে চলতাম। অবচেতনে তাকে সাংবাদিকতার ‘হেড স্যার’ মনে হতো আমার; তাই বিডিনিউজে দেদারসে লিখলেও এই ‘হেড স্যার’ থেকে পালিয়ে থেকেছি।

বিডিনিউজে আমার লেখালেখির শুরুটা কবি মুহাম্মদ নূরুল হুদার উৎসাহে। তিনি তখন সেখানকার বয়োজ্যেষ্ঠ একজন সম্পাদক, আর্টস বিভাগটি তার তত্ত্বাবধানে ছিল। কাকতালীয়ভাবে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তৌফিক ভাই ও আমার সতীর্থ। হুদা ভাই একদিন ফোনে নিয়মিত লেখার পরামর্শ দিয়ে তার মেইলে লেখা পাঠাতে বললেন। এরপর অনেকটা হাত খুলে লিখেছি অনেকদিন, যদিও তখন মতামত বিভাগে লেখা শুরু করিনি। সেই শুরুর দিনগুলোতে বিডিনিউজের সঙ্গে আমার যোগাযোগ মূলত হুদা ভাই ও আর্টস বিভাগের সম্পাদক কবি রাজু আলাউদ্দিনের মাধ্যমেই আবর্তিত হতো।

২০১৮ সালের দিকে পেশাদারি ভূমিকার আড়ালে বাংলাদেশের আলোচিত-সমালোচিত ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একজন আলোকচিত্রীর প্রশ্নবিদ্ধ কিছু তৎপরতা নিয়ে একটা লেখা তৈরি করেছিলাম। সেই সময়ে বিষয়টি নিয়ে এদিক-সেদিক কিছু লেখা প্রকাশ হলেও পাঠক হিসেবে সেগুলো আমার কাছে একপেশে মনে হয়েছিল। মনে যেসব প্রশ্ন জেগেছিল, মূলত সেগুলোর অবতারণা করার চেষ্টা করেছিলাম লেখাটিতে। তবে লেখার সময় কোথায় প্রকাশ করব, তা ভাবা হয়নি। পরে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের মতামত বিভাগের ই-মেইল ঠিকানা সংগ্রহ করে লেখাটি পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেলে ভেবেছিলাম লেখাটি হয়তো প্রকাশ হবে না। তবু তাদের সিদ্ধান্ত জানতে আবারও ফোন করে জানতে পারলাম, এই বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন হাবিব ইমরান, যিনি লেখক হিসেবে তন্ময় ইমরান নামে পরিচিত। দেশ-বিদেশে বহু তরুণের সান্নিধ্যে এসেছি, একসঙ্গে কাজ করেছি, পড়াশোনা করেছি; কিন্তু হাবিব ভাইয়ের মতো এমন ক্ষুরধার মেধা, সততা, পেশাদারি প্রজ্ঞা ও উদ্ভাবনী ভাবনার তরুণ আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি।

মাঝে মাঝে লেখা পাঠাতে একটু দেরি হলে তিনি নিজেই ফোন করে তাগাদা দিতেন—“ভাই, লেখা পাঠাচ্ছেন না যে?”

আমি “কী নিয়ে লিখব ভাবছি” বললে, তিনিই চমৎকার সব বিষয় ধরিয়ে দিতেন। তিনি চাইতেন দেশ-বিদেশের সাহিত্য, গণমাধ্যম, সংস্কৃতি ও শিক্ষা নিয়ে যেন আমি নিয়মিত লিখে যাই।

ওই সময় বিডিনিউজের এমন অবস্থা ছিল যে, অনেক পদধারী ক্ষমতার কেন্দ্রের মানুষজন নজরে পড়তে পত্রিকাটিতে লেখা ছাপানোর জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়তেন। কিন্তু সেই ভিড়ে পেশাদার লেখকের কণ্ঠ ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছিল। বেশিরভাগ লেখায় তখন আত্মতুষ্টি বা ক্ষমতাকে তোয়াজ করার প্রবণতা প্রবল ছিল। শ্রদ্ধাভাজন বিভুরঞ্জন সরকারের মতো খুব অল্প কয়েকজন ছিলেন পেশাদারির পথে অনড়। এটা বিস্ময়কর যে, আর্থিক দৈন্যের মাঝেও বিডিনিউজ সকলের দৃষ্টিতে ছিল বিস্ময় জাগানিয়া আলোকসঞ্চারী সংবাদমাধ্যম।

টেলিফোনে হাবিব ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয়। তিনি বললেন, “লেখাটা একটু ভিন্ন ধাঁচের এবং এটি প্রকাশের আগে তৌফিক ইমরোজ ভাইয়ের মতামত দরকার। লেখাটি তৌফিক ভাইয়ের টেবিলে। তিনি সিদ্ধান্ত দিলে আমরা ছাপতে পারব।” এরপর আরও কিছুদিন চলে যায়। আমি ধরেই নিয়েছি এটি ছাপা হবে না। একদিন হাবিব ইমরান মেইলে লিঙ্ক পাঠিয়ে জানালেন, লেখাটি প্রকাশ হয়েছে। ওই সময়ে মতামত বা আর্টস বিভাগের প্রতিটি লেখার নিচে পাঠকের মতামত লিপিবদ্ধ করার সুযোগ ছিল। লেখা প্রকাশ হওয়ার পর টের পেয়েছি কত রকম যে টিপ্পনি, অম্লমধুর আক্রমণ। আরও কল্পনা করতে পেরেছি—খোদ সম্পাদককে তো এমন তোপের মুখে সর্বদাই থাকতে হয়।

হাবিব ইমরান ভাই বা মতামত বিভাগ নিয়ে কথাগুলো বলার প্রাসঙ্গিক কারণ হচ্ছে, শুরুতেই বলেছিলাম—সকলে তরে নিজেকে বিলিয়ে তৌফিক ভাই দেশের গণমাধ্যমের ভিত্তি নির্মাণে দৃষ্টান্ত স্থাপনে সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন নানা প্রজন্মের একদল মেধাবী, প্রাজ্ঞ ও সৎ মানুষের। এরা সমবেত হয়েছিলেন রাজনীতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতার বিবিধ বলয় থেকে। এদেরকে একটি নিশানার দিকে পেশাদারি দক্ষতায় আর অভিজ্ঞতায় ধাবিত করেছিলেন তৌফিক ভাই তার তীক্ষ্ণ মেধা, বুদ্ধি আর সৎ পেশাদারি দায়বদ্ধতা দিয়ে। ইতিহাস সৃষ্টিকারী এই যাত্রায় তার সঙ্গে পেয়েছিলেন সুবীর ভৌমিক, বেবী মওদুদ, আমানুল্লাহ কবির, আফসান চৌধুরী, বিশ্বদীপ দাশ, জাহিদুল কবির, মনিরুল ইসলাম, মুহাম্মদ নূরুল হুদা আর গাজী নাসিরুদ্দিনের মতো মানুষকে। এখানে উল্লেখ করতে চাই, পত্রিকাটির জেলা পর্যায়ের কয়েকজন প্রতিবেদকের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কিছু কাজ করার সুযোগ আমার হয়েছিল। তখন বুঝতে পেরেছি তৌফিক ভাইয়ের নেতৃত্ব আর পেশাদারি ছোঁয়া মফস্বল পর্যন্ত দেশের প্রান্তিক সাংবাদিকতার ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলেছে এবং খোলনলচে পাল্টে দিয়েছে।

দেশে এত এত অনলাইন সংবাদমাধ্যম, এগুলোর প্রায় প্রত্যেকটাই বিডিনিউজকে মানদণ্ড ধরেই যাত্রা শুরু করে। একবার দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের একজন কর্ণধার কথোপকথনের এক ফাঁকে আক্ষেপ করে বললেন, "তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সঙ্গে কোনোভাবেই পেরে উঠছি না। কীভাবে যে সে এরকম একটি স্মার্ট সংবাদমাধ্যম গড়ে তুলল।"

এটা কেবল সংবাদমাধ্যমের একজন কর্ণধারের আক্ষেপ নয়, এটি ছিল সত্যের আকাশের আলো আর উত্তাপ বিলি করা এক সূর্যকে ঈর্ষা করা। এই ঈর্ষার নাম তৌফিক ইমরোজ খালিদী। ঈর্ষণীয় সংবাদমাধ্যমের এই কারিগর তৌফিক ভাই আমার কাছে ছিলেন শৈশবের স্মৃতিতে থাকা হেড স্যারের মতো। তখন শৈশবে আমরা শিশুরা বলাবলি করতাম হেড স্যার হচ্ছেন এমন স্যার যিনি সব বিষয় পারেন। আমরা বিষয়ভিত্তিক স্যারদের বিষয় ধরে সম্বোধন করতাম—যেমন অঙ্ক স্যার, ইংরেজি স্যার, বাংলা স্যার এভাবে। তাহলে হেড স্যার কোন বিষয়ের স্যার? আমরা ধরে নিতাম তিনি হচ্ছেন সব বিষয়ের স্যার—যিনি অঙ্ক পারেন, ইংরেজি পারেন, বাংলা পারেন, ধর্ম পারেন, সমাজ পারেন, ইতিহাস পারেন, বিজ্ঞান পারেন। আমার দৃষ্টিতে তৌফিক ভাই ছিলেন সাংবাদিকতার 'হেড স্যার'।

কর্মসূত্রে নানা দেশের নানা জনপদের বিবিধ ভাষার মানুষের বহুসংস্কৃতি আর রকমারি গণমাধ্যমের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ আমি পেয়েছি। যেখানেই গিয়েছি সেখানকার নানা ভাষার সংবাদমাধ্যমের সাইট এবং মুদ্রিত কাগজ সংগ্রহ করে আমাদের দেশের গণমাধ্যমের সঙ্গে তুলনামূলক চিত্র আঁকার চেষ্টা করেছি মনে মনে। তবে পৃথিবীর কোথাও বিডিনিউজের মতো সমৃদ্ধ এবং সামগ্রিক বিষয় ও পরিমণ্ডলকে একীভূত করে তুলে ধরার মতো ছাতাসম সংবাদমাধ্যম আমি পাইনি—আমি দায়িত্ব নিয়েই বলছি কথাটা।

রাজনীতি আর পত্রিকাটির অর্থনৈতিক নিষ্পেষণ থেকে রেহাই পেলে বিডিনিউজ হতে পারত কেবল দক্ষিণ এশিয়া নয়, গোটা এশিয়ার খবরাখবরের নির্ভরযোগ্য প্রধান ঠিকানা। একই খবর শত জায়গায় ছাপা হয়, ছাপা হবে; কিন্তু পেশাদারি উপস্থাপনা, ভাষাগত শুদ্ধাচার, তথ্যগত সত্যতা, সূত্রগত নির্ভরযোগ্যতা আর মানুষের কল্যাণকামী দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমাদের দেশে বিডিনিউজ অগ্রগণ্য। কোনো খবর অন্য যেকোনো জায়গায় দেখার পর, বিডিনিউজে ছাপা হয়েছে কিনা সেটা পাঠক হিসেবে প্রথমে খতিয়ে দেখার পরেই খবরটির ওপর আস্থা রাখি।

ভুয়া খবরের রমরমা যুগে বিডিনিউজের গুরুত্ব দিন দিন বেড়েছে। তাই বিদেশি কূটনীতিক থেকে শুরু করে মন্ত্রী, আমলা, পাইক-পেয়াদা, মাস্টার, গবেষক, শিক্ষার্থী, শ্রমিক, কৃষক সকলের পত্রিকা হয়ে উঠেছিল বিডিনিউজ তৌফিক ভাইয়ের সম্পাদনায়। বিডিনিউজ যেন বাংলাদেশের মুখ, দুনিয়ার দরজা। এর পেছনের প্রধান কারিগর তৌফিক ভাই।

তখনও তৌফিক ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলার হয়রানি শুরু হয়নি। তিনি নিজেও মতামত বিভাগে লিখতেন। তার লেখা পড়ার জন্য একজন পাঠক হিসেবে যেমন, তেমনি সংবাদমাধ্যমের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে অপেক্ষায় থাকতাম। তার বলন, চলন, পঠন ও লিখন থেকে সংবাদমাধ্যমের একজন কর্মী আর শিক্ষার্থী হিসেবে প্রতিনিয়ত শেখার ছিল আমার জন্য। গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে নির্ধারিত প্রতিবেদকের পাশাপাশি তিনিও উপস্থিত হতেন কোনো কোনো সময়।

নানা উপলক্ষে তিনি আমন্ত্রিত বক্তা হিসেবে উপস্থিত হতেন। পরে তার সে বক্তব্য বিডিনিউজের মতামত বিভাগে ছাপা হতো; তাতেও থাকত সুদূরপ্রসারী কথামালা। এরকম একটি বক্তব্যের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবপ্রতিষ্ঠিত অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের আমন্ত্রণে একটি বক্তব্য তিনি দিয়েছিলেন। এই বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হবার আগে অপরাধ বিষয়ে পড়াশোনা আর গবেষণা এতটা জনগণের বোধগম্যতার কাছাকাছি পৌঁছায়নি আমাদের দেশে। অপরাধবিজ্ঞান বিষয়ে তৌফিক ভাইয়ের লেখাটি আজও আমার মনের ভেতরে দাগ কেটে আছে।

তিনি কেবল অনলাইন সংবাদমাধ্যমের একজন পথিকৃৎ নন, কেবল একজন সাহসী সাংবাদিক বা সম্পাদক নন; তিনি ছিলেন তার সময়ের বাঙালির রুচিরও কারিগর, দৃষ্টান্ত স্থাপনেরও কারিগর। সংবাদমাধ্যমের পরিমণ্ডলে পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আর পহেলা বৈশাখ আয়োজন আমাদের রুচি নির্মাণে উল্লেখযোগ্য একটি সংযোজন। মাল্টিমিডিয়া বা বহুমাধ্যম সাংবাদিকতারও তিনি পথিকৃৎ। অনলাইনে সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি অডিও বা ভিডিও মাধ্যমে সংবাদ উপস্থাপন তিনিই শুরু করেছেন। তার দেখাদেখি পরবর্তীতে অন্যরা শুরু করেছেন অনেক কিছু। তার সময়ে গত দুই দশকে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস পর্যালোচনা করতে গেলে তৌফিক ভাই ইতিহাসের বড় একটা অধ্যায় হয়ে থাকবেন।

আমাদের দেশে ভবিষ্যতের সংবাদ ও গণমাধ্যম শিক্ষা ও গবেষণায় তৌফিক ইমরোজ খালিদীর উদ্ভাবন ও কাজ অবশ্যম্ভাবী অংশ হিসেবে জায়গা পাবে। তার নাম নানা আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক উপলক্ষে প্রাতিষ্ঠানিক এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক নানা পর্যায়ে বারবার উচ্চারিত হবে। তার চেয়ে বড় কথা, তিনি তার যাপিত সময়ে এবং ফেলে যাওয়া সময়ের গোটা প্রজন্মের মানুষের অন্তরে বেজে উঠবেন ও মুখে মুখে উচ্চারিত হবেন।

কেবল কি সাংবাদিকতা করেই এটা সম্ভব হয়েছিল? আমি বলব 'না'। তিনি সাংবাদিকতার আড়ালে করেছেন অন্যকিছু, দেখেছেন আরও আরও বেশি। তিনি স্বপ্ন দেখেছেন দেশ নিয়ে, জাতি নিয়ে, প্রজন্মের তরুণদের নিয়ে। সেই স্বপ্নের ডালপালা মেলেছেন, বাস্তবায়ন করেছেন বিডিনিউজের নানা উদ্যোগ আর পাতায় পাতায়। তিনি চেতনে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দ্বাররক্ষক, এক অকৃত্রিম দেশপ্রেমিক মানুষ। দেশের এবং দেশের মানুষের বিপক্ষে যায়—এমন যেকোনো তৎপরতা আর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন সজাগ। এর জন্য হাতিয়ার ছিল তার কথা, কাজ, লেখনি আর তার প্রতিষ্ঠিত সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ। আদতে বিডিনিউজ, তৌফিক ইমরোজ খালিদী এবং অনলাইন সংবাদমাধ্যম—এ তিনটি একই বিষয়ের প্রতিশব্দ হয়ে উঠেছিল।

তিনি সংবাদমাধ্যমের ওপর ভূতের খপ্পর আঁচ করতে পেরেই এডিটরস গিল্ড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শেষতক মামলার হয়রানি আর অর্থনৈতিক নিষ্পেষণে বোধকরি অনেকটা বিরক্ত হয়েই সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলেন। লেখাও আর লিখছিলেন না। একবার মামলা ঘিরে সব প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে একটি লেখায় তিনি লিখেছিলেন, 'কেবল সাংবাদিকতাই করতে চেয়েছিলাম'। কিন্তু ভূতের খপ্পরে পড়ে স্বস্তি খুইয়ে বসেছিলেন। এসব নিয়ে আমার নিজেরও আক্ষেপ ছিল নিরন্তর। আমি একটি লেখা লিখেছিলাম ‘ভূতের খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসবেই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম’ শিরোনামে। সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিডিনিউজ ভূতের খপ্পর থেকে বের হতে পারল কিনা জানি না; তবে তৌফিক ভাই তার চলে যাওয়ার মাধ্যমে দেশের ভেতরের ও বাইরের সকল ভূতকে নিশানা করে শেষ হাসিটা হেসেছেন। পথিকৃৎ একজন সাংবাদিকের কৃতিত্ব ও পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি হিসেবে সকলের শ্রদ্ধাই তিনি পেয়েছেন।

গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস বলে গেছেন—সাংবাদিকতা দুনিয়ার সেরা পেশা। কিন্তু আর একটি সত্য এই গল্পের জাদুকর বলে যাননি বা তার কল্পনার রাডারে ধরা দেয়নি: দেশে দেশে তোপ দাগানো বহুবিধ পোশাকধারী, পদধারী, পদবিহীন আর পদলেহনকারী নানা পদের ভূতেরা তৌফিক ভাইদের মতো সাহসী আর উদ্যমী সৎ সাংবাদিক ও সম্পাদকদের তোপের মুখে রাখেন। এভাবে ভূতেরা ধীরে ধীরে তৌফিক ভাইদের আয়ু ক্ষয় করে, অকালে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। এই আক্ষেপ আর কারও থাকুক বা না থাকুক, আমার থাকবেই। তৌফিক ভাইকে ধীরে ধীরে নিভৃতির দিকে আর অকাল মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো জামানার কথা বলতে চাই না; কোনো জামানাতেই তৌফিক ইমরোজ খালিদীর মতো সৎ ও পেশাদারি সম্পাদকের ভারবাহী ভূমিকা হজম করার মতো সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনযন্ত্র তৈরি হয়নি আমাদের দেশে।

এদেশের গ্রামবাংলার সাংবাদিকতার জনক হরিনাথ মজুমদার, যিনি কাঙাল হরিনাথ (১৮ ৩৩ - ১৮৯৬) নামে পরিচিত। কাঙাল হরিনাথের প্রসঙ্গ টেনে তৌফিক ভাইকে নিয়ে আমার লেখাটি শেষ করতে চাই। কাঙাল হরিনাথ ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা লোকসংস্কৃতির অন্যতম ধারক ও বাহক, গ্রামবাংলার সাংবাদিকতার প্রবর্তক এবং ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা।

কাঙাল হরিনাথকে নিয়ে অনেক কথা বলা যায়—যেমনটা বলা যায় তৌফিক ইমরোজ খালিদীকে নিয়ে। কাঙাল হরিনাথের জীবনের একটি প্রসঙ্গ কেবল এখানে টানছি। কাঙাল হরিনাথের পত্রিকায় গ্রামবাংলার কৃষকের দুর্দশা আর জমিদারদের প্রজা নিষ্পেষণের খবর প্রকাশিত হতো। এতে কুষ্টিয়ার ঠাকুর কুঠিবাড়ির জমিদারগণ নাখোশ হয়েছিলেন। ঠাকুর জমিদারগণ কাঙাল হরিনাথকে শায়েস্তা করার জন্য পাঞ্জাব থেকে গুন্ডা ভাড়া করে এনেছিলেন। এই খবর পেয়ে লালন ফকির দলবল নিয়ে কাঙাল হরিনাথের কাছে ছুটে গিয়েছিলেন। গুন্ডাদের পাকড়াও করে কাঙাল হরিনাথকে, তার পত্রিকা ও মুদ্রণযন্ত্রকে রক্ষা করেছিলেন।

আমাদের সময়ে এই ভূভাগে একজন শেষ কাঙাল হরিনাথ ছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। দুর্ভাগ্য, আমাদের মধ্যে এমন একজন লালন ফকির ছিলেন না, যিনি তৌফিক ভাইকে রক্ষায় ছুটে যেতে পারতেন। তবে আমাদের ভূমির আর জাতির অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে এই সময়ে আর অনাগত সময়ে কাঙাল হরিনাথ, লালন ফকির আর তৌফিক ইমরোজ খালিদীর দেখানো পথেই আমাদের এগোতে হবে।

আনিসুর রহমান: লেখক, নাট্যকার ও কলামনিস্ট।