Published : 10 Jun 2026, 05:34 PM
ঘুম থেকে ওঠার পর প্রথম এক ঘণ্টা কীভাবে কাটাচ্ছেন, সেটার ওপর নির্ভর করে সারাদিন শরীর কেমন থাকবে।
হয়ত সবসময় টের পাওয়া যায় না, তবে শরীরের ভেতরে চলতে থাকা দীর্ঘমেয়াদি মৃদু প্রদাহ বা ‘ক্রনিক ইনফ্লামেইশন’ নিঃশব্দে আমাদের এনার্জি বা শক্তি কমিয়ে দেয়, জয়েন্ট বা হাড়ের জোড়ে ব্যথা বাড়ায়।
এমনকি এটি পরবর্তী সময়ে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং ‘অটোইমিউন’ (রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ত্রুটি) রোগের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির পথ তৈরি করে।
অবশ্য ইনফ্লামেইশন বা প্রদাহ পুরোপুরি খারাপ নয়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে এবং ক্ষত বা সংক্রমণ সারাতে এটি দরকার। তবে এই প্রদাহ যখন কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে শরীরে স্থায়ী রূপ নেয়, তখনই সেটা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও জীবনধারা-বিষয়ক ওয়েবসাইট সেলফডটকম’য়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, মার্কিন পুষ্টিবিদ লরেন মানাকার বলেন, “এই প্রদাহ কমাতে কোনো দামি ‘ডিটক্স’ বা লাইফস্টাইল পুরোপুরি বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। সকালের অভ্যাসে সাধারণ কিছু পরিবর্তন এনেই শরীরকে সুস্থ রাখা সম্ভব।”
শুরুটা হোক অন্ত্র-বান্ধব পানীয় দিয়ে
আমাদের অন্ত্র বা ‘গাট’ শুধু খাবার হজমই করে না, এটি রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত। শরীরের প্রায় ৭০ শতাংশ রোগ প্রতিরোধক কোষ, অন্ত্রে থাকে। তাই সকালে কফি বা চা পানের আগে প্রোবায়োটিকসমৃদ্ধ অন্ত্র-বান্ধব পানীয়, যেমন— চিনি ছাড়া টকদইয়ের স্মুদি বা ঘোল খাওয়া উচিত। এটি অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়াকে পুষ্টি জোগায়, যা শরীরের প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে দারুণ ভূমিকা রাখে।
সকালের নাস্তায় আনুন পুষ্টিকর বদল
সকালের নাস্তাটি এমন হওয়া উচিত যা শরীরে দীর্ঘ সময় শক্তি জোগাবে এবং প্রদাহ কমাবে। এর জন্য নাস্তায় দুটি জিনিস রাখা জরুরি: পলিফেনল এবং উচ্চমানের প্রোটিন।
পলিফেনল: এটি প্রাকৃতিক অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যা ওটমিল বা টকদইয়ের সাথে এক মুঠো ব্লুবেরি বা স্ট্রবেরি মিশিয়ে সহজে পাওয়া যায়। এছাড়া ডার্ক চকলেট এবং সকালের কালো কফিতেও (ব্ল্যাক কফি) প্রচুর পলিফেনল থাকে, যা কোষের ক্ষতি প্রতিরোধ করে।
প্রোটিন: সকালে অতিরিক্ত ‘রিফাইনড কার্বোহাইড্রেইট’ বা শর্করা খেলে রক্তে চিনির মাত্রা হঠাৎ বাড়ে ও কমে, যা প্রদাহ তৈরি করে। তাই নাস্তায় ২০ থেকে ৩০ গ্রাম প্রোটিন রাখা উচিত। যেমন— ডিম সেদ্ধ, টোফু বা বাদাম। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
পাঁচ মিনিটের হালকা ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং
সকালটা যতই ব্যস্ততার হোক না কেন, বিছানা ছাড়ার পর অন্তত ৫টি মিনিট শরীর চর্চায় মন দেওয়া উপকারী। মোবাইল ফোন হাতে নেওয়ার আগেই হালকা স্ট্রেচিং বা ইয়োগা (যোগব্যায়াম) করে নেওয়া যেতে পারে।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের কারণে শরীরে ‘কর্টিসল’ হরমোন বাড়ে, যা প্রদাহের অন্যতম কারণ। পাঁচ মিনিটের এই হালকা নড়াচড়া কর্টিসল হরমোনের ভারসাম্য ঠিক রাখে এবং মনকে শান্ত করে।
ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডসের ব্যবহার
আজকাল প্রক্রিয়াজাত বা ফাস্টফুডের কারণে শরীরে ওমেগা-সিক্স ফ্যাটি অ্যাসিডসের পরিমাণ বেড়ে যায়, যা প্রদাহের আগুনকে আরও উসকে দেয়।
এর বিপরীতে ওমেগা-থ্রিস শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এর জন্য সামুদ্রিক মাছ সেরা হলেও সকালের নাস্তায় উদ্ভিজ্জ উৎস যেমন— চিয়া বীজ, কাঠবাদাম বা তিসি বীজ, ওটমিল বা স্মুদির সঙ্গে মিশিয়ে সহজেই খাওয়া যায়।
সকালের মিষ্টি রোদ গায়ে লাগানো
সকালের প্রাকৃতিক আলো শুধু দিনকেই উজ্জ্বল করে না, এটি আমাদের শরীরের ভেতরের ঘড়ি বা ‘বায়োলজিক্যাল ক্লক’ ঠিক রাখতে সাহায্য করে। রোদ থেকে শরীর ভিটামিন ডি তৈরি করে, যা প্রদাহ কমানোর জন্য অত্যন্ত জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয়’তে অবস্থিত, ‘রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন ইউনিভার্সিটি অব মেডিসিন অ্যান্ড সায়েন্স, কলেজ অব ফার্মেসি’র করা গবেষণায় দেখা গেছে, সপ্তাহে অন্তত দুবার সকাল ১০টার পর সানস্ক্রিন ছাড়া হাত, মুখ বা পায়ে ৫ থেকে ৩০ মিনিট রোদ লাগালে শরীরে ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি পূরণ হয়।
রোদ কম থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শে ভিটামিন ডি সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে।
সতর্কতা
লরেন মানাকার বলেন, “এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো দীর্ঘমেয়াদে শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। তবে কোনো ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি রোগ থাকলে, খাদ্যতালিকায় বড় কোনো পরিবর্তনের আগে অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।”
আরও পড়ুন