Published : 16 Jul 2026, 02:21 PM
একটা অসুন্দর ও নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপনের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হলো নতুন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন। ১৪ জুলাই, বুধবার বাজেট অধিবেশনের শেষ দিনে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ নামক বিল পাশের ঘটনাটি দেশের সংসদীয় ইতিহাসের পাতায় নিশ্চিতভাবেই কলঙ্কজনক এক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে, যার ঐতিহাসিক দায়ভার কোনোভাবেই এড়াতে পারবে না আজকের ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। অতীতে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদগুলোতেও এমন বিধি স্থগিত করে তড়িঘড়ি আইন পাশের অপকৌশল দেখা গেছে; তবে জনগণের ম্যান্ডেটবিহীন সেই সংসদগুলোর কাছে দেশের মানুষের ইতিবাচক কোনো প্রত্যাশাও ছিল না। কিন্তু গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত বর্তমান সংসদের কাছ থেকে এমন স্বৈরাচারী ও আমলাতান্ত্রিক আচরণ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ঘটনার শুরু অধিবেশনের শেষ কার্যদিবস, ১৪ জুলাইয়ে। দিনের সম্পূরক কার্যসূচি হিসেবে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ আইন, ২০২৬’ নামক একটি বিল সংসদে উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বিলটি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এর মাধ্যমে দেশের বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত চারটি প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত করা হবে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ এবং বাংলাদেশ পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ কর্তৃপক্ষ। সেই সঙ্গে রহিত করা হবে এই চারটি প্রতিষ্ঠান স্থাপনকারী চারটি আইন।
এই চারটি প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হয়ে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান—‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ’ গঠিত হবে, যা ওয়ানস্টপ সেন্টার হিসেবে বিনিয়োগকারীদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে কাজ করবে। তবে উপর্যুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানই একেবারে বাদ হয়ে যাবে না; প্রতিষ্ঠানগুলোকে একত্র করে এক ছাতার নিচে আসবে। গুরুত্বপূর্ণ এই বিলটি মন্ত্রিসভায় অনুমোদন হয় গত সপ্তাহে।
কিন্তু বিলটি তড়িঘড়ি করে ১৪ জুলাই অধিবেশনের শেষ দিনে সম্পূরক কর্মসূচি হিসেবে দিনের কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং সেটি মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে পাশ হয়ে যায়, যা একটি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের কাছে আশা করা যায় না।
প্রশ্ন আসতে পারে, ঠিক কী বাজে নজির স্থাপন করা হলো? এই উত্তরের জন্য বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে আইন পাশের প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা দরকার।
সরকার কোনো আইন পাশ করাতে চাইলে সেটি বিল আকারে সংসদ সচিবালয়ে প্রেরণ করতে হয়। বিলটি একটি নির্ধারিত দিনে দিনের কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং নির্ধারিত দিনে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা উপমন্ত্রী বিলটি উত্থাপন করেন। তবে সরকারের জরুরি প্রয়োজন হলে সংসদ অধিবেশন থাকাকালে যেকোনো সময় কোনো বিল আনার অভিপ্রায় ব্যক্ত করলে স্পিকার তা উপস্থাপনের অনুমতি প্রদান করেন।
তবে বিল পাশের ক্ষেত্রে কার্যপ্রণালি বিধিতে কিছু নিয়ম রয়েছে, যা রক্ষা করতে হয়। এই নিয়মগুলোর উদ্দেশ্য হলো সংসদ সদস্যদের সমালোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে সচিবালয় থেকে আমলাদের দ্বারা প্রস্তুতকৃত আইনগুলোর সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো জনবান্ধব আইনে পরিণত করা। সে কারণেই সংসদে আইন উত্থাপনের পর কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা হয়।
সংসদে কোনো মন্ত্রী আইন উত্থাপনের জন্য অনুমতি প্রার্থনা করার পর—সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রী ব্যতীত অন্য যেকোনো সংসদ সদস্য সেটি উত্থাপনের ব্যাপারে বিরোধিতা করতে পারেন। এমনকি তিনি কেন বিরোধিতা করছেন, সে ব্যাপারে তাকে বক্তব্য রাখতে দেওয়া হয়। এর জবাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকেও সেই বিরোধিতার জবাব দেওয়ার জন্য বক্তব্য রাখার সুযোগ দেওয়া হয়। এরপর সংসদে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় সেটি উত্থাপিত হবে কি না। প্রক্রিয়া অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই বিলটি উপস্থাপনের অনুমতি পেয়ে যান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী এবং এরপর তিনি বিলটি উত্থাপন করেন।
উত্থাপনের পর বিলটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা ধরে সংসদ সদস্যরা বিলটির ওপর বিস্তারিত আলোচনা করেন। প্রয়োজনে এই আলোচনা কয়েক দফা ধরে চলে। স্থায়ী কমিটিতে সব সদস্যের মতামতের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো বিলটিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়। সংসদের অধিবেশনকালে স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনসহ বিলটি পুনরায় উত্থাপন করেন স্থায়ী কমিটির সভাপতি। কোনো সদস্য ভিন্নমত পোষণ করলে সেটি ‘নোট অব ডিসেন্ট’ হিসেবে স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে লেখা থাকে।
পরবর্তী ধাপে, সংসদ অধিবেশন চলাকালে স্পিকার নির্ধারিত কোনো এক দিনে বিলটি বিবেচনার জন্য কার্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করেন। এই পর্যায়ে সংসদ সদস্যরা বিলটিতে পুনরায় সংশোধনী প্রস্তাব দিতে পারেন কিংবা বিলটি জনমত যাচাই এবং বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব করতে পারেন। এই সব প্রস্তাবের বিপরীতে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে নির্দিষ্ট সময় বক্তব্য রাখতে দেওয়া হয়। তারা পুনরায় বিলটি নিয়ে সরকারের সমালোচনা করতে পারেন। সেই সংশোধনীগুলো অনেক ক্ষেত্রে গ্রহণ করেন মন্ত্রী; তবে অধিকাংশ সময়ই তা গৃহীত হয় না।
পরবর্তী ধাপে কণ্ঠভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়, সংসদ সদস্যদের প্রস্তাবগুলো গৃহীত হবে কি না। এখানেও ক্ষমতাসীন দলের সদস্য সংখ্যা বেশি হওয়ায় মন্ত্রীর অবস্থানই চূড়ান্ত থাকে এবং অধিকাংশ প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। সর্বশেষ পর্যায়ে, বিলটি পাশের জন্য উত্থাপন করা হলে তা পুনরায় কণ্ঠভোটের মাধ্যমে পাশ হয়। তবে এই পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একটি ভালো আইন প্রণয়ন করার সম্ভাবনা তৈরি হয় এবং জনগণ আইনটি সম্পর্কে জানতে পারেন।
ফিরে আসা যাক ১৪ জুলাইয়ের ঘটনায়। দিনের কার্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত নির্ধারিত জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর তিনটি নোটিশ আলোচনার পর, ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ’ আইনটি বিল আকারে উত্থাপনের জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে আহ্বান জানান সংসদে সভাপতিত্বকারী ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।
কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী বিলটি উত্থাপনের ব্যাপারে আপত্তি তোলেন প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান। তিনি বলেন, বিলটি তড়িঘড়ি করে আনা হয়েছে। এই বিলটি পাশের মাধ্যমে চারটি আইন এবং প্রতিষ্ঠান রহিত করা হবে। কিন্তু যে সব আইন বাতিল করা হবে, সেই আইনগুলোর সঙ্গে উত্থাপিত আইনের কোনো তুলনামূলক আলোচনা বিলে নেই। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে এতগুলো বিধান পড়ে সংশোধনী দেওয়া সম্ভব নয়। তা ছাড়া বিলটি স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হচ্ছে না, এমনকি সংশোধনী দেওয়া এবং জনমত যাচাই-বাছাইয়ের ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। তাই তিনি বিলটি উত্থাপন না করতে আহ্বান জানান। নাজিবুর রহমান বলেন, তারা আইনপ্রণেতা; তাদের সেই সুযোগ না দিলে সংসদ সদস্যদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হবে।
বিধি অনুযায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদকে ফ্লোর দেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। বিরোধীদলীয় সদস্যের উত্থাপিত বিষয়টি সঠিক হিসেবে বর্ণনা করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, এই বিলটির মাধ্যমে পূর্বের চারটি আইনকে একত্র একটি করা হচ্ছে; কাজেই এটি নতুন কিছু নয়। তিনি আরও বলেন, বিরোধীদলীয় সদস্যরা যে সংশোধনী দেবেন, সেটি তিনি সম্ভব হলে গ্রহণ করবেন।
এরপর কণ্ঠভোটের মাধ্যমে অনুমতি মিললে বিলটি উত্থাপন করেন মন্ত্রী। এই পর্যায়ে কার্যপ্রণালি বিধির সংশ্লিষ্ট বিধির কার্যকারিতা স্থগিত করেন ডেপুটি স্পিকার এবং বিলটি স্থায়ী কমিটিতে পাঠানোর পরিবর্তে অপরিবর্তিত আকারে সংসদে বিবেচনার জন্য গ্রহণ করার প্রস্তাব করেন। এরপর পুনরায় আপত্তি জানান নাজিবুর রহমানসহ জামায়াতের কয়েকজন সংসদ সদস্য।
বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে বলেন, বিলটি তাড়াতাড়ি পাশ করতে গিয়ে সংসদ সদস্যরা তাদের ওপর জনগণের অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। তিনি আরও বলেন, “আমরা অধিকার ছেড়ে দিতে পারি, কিন্তু দায়িত্ব তো ছেড়ে দিতে পারি না; এর একটি ঐতিহাসিক দায় রয়েছে।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধীদলীয় সদস্যদের মতামতকে সম্মান জানিয়েই বলেন, এই বিলটি এখনই পাশ করা দরকার, কারণ বিভিন্ন বিনিয়োগকারী এর জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি অনুরোধ করেন, আজকে বিলটি পাশ করা হোক এবং প্রয়োজন হলে বিরোধীদলীয় সদস্যদের সংশোধনীগুলো পরবর্তী অধিবেশনে বিলটি সংশোধন করে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এমতাবস্থায়, বিরোধী দলের মতামত উপেক্ষা করেই সংখ্যাধিক্যের জোরে বিলটি পাশ হয়ে যায়।
সরকারের হয়তো জরুরি প্রয়োজনে বিলটি পাশ করার দরকার ছিল, কিন্তু সে ক্ষেত্রে সংসদের শেষ দিনের শেষ মুহূর্তে কেন সম্পূরক কর্মসূচি হিসেবে বিলটি আনার প্রয়োজন হলো? কেন আগে থেকে পরিকল্পনা করা হলো না?
জরুরিভিত্তিতে সরকারের আইন প্রণয়নের প্রয়োজন মেটাতে সংবিধানে ব্যবস্থা রাখা আছে। যেমন—রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে অধ্যাদেশ আকারে আইন করা যায় এবং সেটি সংসদের পরবর্তী অধিবেশনে উত্থাপন করলেই আর কোনো সমস্যা থাকে না।
১৫ জুলাইয়ের পরিবর্তে পরদিন ১৬ জুলাই অধ্যাদেশের মাধ্যমে আইনটি প্রণয়ন করা হলে সংসদকে খাটো করা হতো না; বরং এর ফলে ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতো বহু কষ্টের বিনিময়ে অর্জিত নির্বাচিত এই সংসদের।
একতরফাভাবে বিলটি পাশের মাধ্যমে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদের সাংবিধানিক ও বিধিগত ক্ষমতাকে অসম্মান করা হয়েছে; পাশাপাশি সংসদ সদস্যদের আইন প্রণয়ন করার বৈধ ও স্বীকৃত অধিকার ক্ষুণ্ণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অপমানিত করা হয়েছে জনপ্রতিনিধিদের, স্থাপিত হয়েছে একটি বাজে নজির এবং শেষ পর্যন্ত জয় হলো আমলাতন্ত্রের। আমলাতন্ত্র প্রমাণ করল যে, তারা ইচ্ছা করলে নির্বাচিত সংসদকে রাবার স্ট্যাম্প প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে পারে। কিন্তু এর সব দায়-দায়িত্ব নিতে হবে বিএনপিকে।
কামরান রেজা চৌধুরী পেশায় সাংবাদিক–সংসদীয় রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করছেন দুই দশকেরও বেশি। ই-মেইল: [email protected]