Published : 15 Jul 2026, 03:40 PM
সম্প্রতি জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’ উদ্যোগকে বাংলাদেশের জন্য একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বাংলাদেশে নগর নিরাপত্তা জোরদারে পাকিস্তান প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহায়তা দিতে আগ্রহী। এমনকি বাংলাদেশি পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয়েও সহযোগিতার প্রস্তাব এসেছে। বিষয়টি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতি সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়।
সত্যি যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শহরগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিক করা জরুরি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট ক্যামেরা, স্বয়ংক্রিয় নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ, ফেসিয়াল রিকগনিশন এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টার—এসব প্রযুক্তি অপরাধ তদন্তে দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু যে কোনো প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন তার পেছনে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, দক্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকে। অন্যথায় এই ব্যয়বহুল অবকাঠামো কেবল প্রদর্শনের বস্তু হয়েই থাকবে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, পাকিস্তান কি সত্যিই এমন কোনো সফল মডেল তৈরি করতে পেরেছে, যা বাংলাদেশ অনুসরণ করতে পারে? প্রকল্পটি যদি এতটাই কার্যকর হতো, তবে পাকিস্তান কেন এখনো নিয়মিত সন্ত্রাসী হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ আর নগর অপরাধের সংকট মোকাবিলা করছে? যে প্রকল্প পাকিস্তানের নিজেরই নিরাপত্তা ব্যবস্থার আমূল কোনো পরিবর্তন করতে পারেনি, তা বাংলাদেশের জন্য আদর্শ হয় কী করে? নাকি বাংলাদেশ এমন এক ব্যয়বহুল মডেলের দিকে পা বাড়াচ্ছে, যার কার্যকারিতা নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবেই প্রশ্ন রয়েছে?
পাকিস্তানের ‘সেফ সিটি’: প্রযুক্তির চাকচিক্য বনাম বাস্তব চিত্র
পাকিস্তানের লাহোর, ইসলামাবাদ, করাচি ও মুলতানের মতো বড় শহরগুলোতে ‘সেফ সিটি’ প্রকল্প চালু করা হয়। হাজার হাজার সিসিটিভি ক্যামেরা, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, ফেসিয়াল রিকগনিশন, নম্বরপ্লেট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং ২৪ ঘণ্টার কমান্ড সেন্টার—সব মিলিয়ে একে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক নগর নিরাপত্তা প্রকল্প হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। সরকারের দাবি ছিল, এই উদ্যোগ অপরাধ ও সন্ত্রাস কমিয়ে নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত কয়েক বছর ধরে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে আত্মঘাতী হামলা, বোমা বিস্ফোরণ, ধর্মীয় উগ্রবাদী সহিংসতা, অপহরণ ও সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। বিশেষ করে বেলুচিস্তান ও খাইবার পাখতুনখোয়া অঞ্চলে নিরাপত্তা সংকট এখনো চরম। করাচির মতো বড় শহরেও সংগঠিত অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। অর্থাৎ, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।
এর কারণও খুব স্পষ্ট। কেবল ক্যামেরা বসিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না। গোয়েন্দা তথ্যের সঠিক বিশ্লেষণ, দক্ষ পুলিশিং, দ্রুত বিচার, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া কোনো প্রযুক্তিই স্থায়ী সুফল দিতে পারে না। ফলে পাকিস্তানের সেফ সিটি প্রকল্প প্রযুক্তিগতভাবে দেখতে আকর্ষণীয় হলেও, বাস্তব ফলাফলের দিক থেকে এখনো বিতর্কিত মডেল। তাই আমাদের নীতিনির্ধারকদের উচিত প্রযুক্তির বাহ্যিক চাকচিক্যে মুগ্ধ না হয়ে এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে মূল্যায়ন করা।
নিরাপত্তা ও অপরাধের পরিস্থিতি মূল্যায়নের জন্য গবেষকরা সাধারণত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দুটি সূচকের ওপর নির্ভর করেন; জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক সংস্থা ইউএনওডিসি’র ‘ইচ্ছাকৃত হত্যার হার’ এবং ‘নামবিও ক্রাইম ইনডেক্স’। নামবিও মূলত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাধারণ ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও ধারণার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। অন্যদিকে, ইউএনওডিসি সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে এই সূচক তৈরি করায় আন্তর্জাতিক গবেষণা ও নীতিনির্ধারণে বেশি নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
ইউএনওডিসি-এর মতে, সহিংস অপরাধ পরিমাপের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক মাপকাঠি হলো প্রতি এক লাখ মানুষে ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা। এই সূচকে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা প্রায় ২.৪ থেকে ২.৭টি, আর পাকিস্তানে এই হার ৩.৬ থেকে ৬.৩টি। অর্থাৎ, সহিংস অপরাধের দিক থেকে পাকিস্তানের পরিস্থিতি বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ। অন্যদিকে, নামবিও ২০২৬ সালের সেফটি ইনডেক্সে বাংলাদেশের স্কোর ৩৯.২৬ এবং পাকিস্তানের ৫৭.৮৯। এই জরিপ অনুযায়ী, ব্যবহারকারীদের ধারণা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বাংলাদেশে অপরাধের মাত্রা পাকিস্তানের চেয়ে বেশি প্রতীয়মান হয়। এছাড়া এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নামবিও’র তালিকায় বাংলাদেশ ৪র্থ এবং পাকিস্তান ১৮তম অবস্থানে রয়েছে।
বাংলাদেশ কি তবে ব্যর্থ অভিজ্ঞতা আমদানি করছে?
বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংকট পাকিস্তানের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানকার অপরাধের ধরন, সামাজিক কাঠামো, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং নগর ব্যবস্থাপনা আলাদা। তাই অন্য দেশের কোনো প্রকল্প হুবহু নকল করাই উন্নয়নের পথ হতে পারে না। বরং প্রতিটি দেশের উচিত নিজের বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে নিরাপত্তা নীতি তৈরি করা।
তবে সবচেয়ে বড় ভয়ের জায়গা হলো, এই ধরনের সেফ সিটি প্রকল্পের মাধ্যমে নাগরিকদের ওপর ব্যাপক নজরদারির সুযোগ তৈরি হয়। মানুষের চলাচল, ব্যক্তিগত তথ্য, এমনকি দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডও রাষ্ট্রের সার্বক্ষণিক নজরদারির আওতায় চলে আসতে পারে। যদি এর ওপর স্বাধীন তদারকি, শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা আইন এবং বিচারিক নিয়ন্ত্রণ না থাকে, তবে এই প্রযুক্তি অপরাধ দমনের চেয়ে রাজনৈতিক নজরদারি বা নাগরিক স্বাধীনতা সীমিত করার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
এই ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়নে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। প্রশ্ন হলো, ওই অর্থ যদি ফরেনসিক ল্যাবের উন্নয়ন, পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধি, সাইবার অপরাধ দমন, জরুরি সেবার আধুনিকায়ন কিংবা কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করার পেছনে ব্যয় করা হতো, তবে কি আরও ভালো ফল পাওয়া যেত না? একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থার সফলতা প্রযুক্তির দামের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে তা পরিচালনার সক্ষমতা ও জবাবদিহির ওপর।
যে দেশ এখনো নিজের দেশের নিরাপত্তা সমস্যারই সমাধান করতে পারেনি, তাদের মডেল অন্ধভাবে গ্রহণ করা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এক বিষয়, কিন্তু নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ফলাফলই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচনা।
বাংলাদেশের প্রয়োজন নিজস্ব বাস্তবতা উপযোগী নিরাপত্তা কৌশল
বাংলাদেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিক হওয়া দরকার, এ নিয়ে কারও কোনো দ্বিমত নেই। তবে আধুনিকায়নের অর্থ এই নয় যে, অন্য দেশের প্রকল্প অনুকরণ করতে হবে। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ স্মার্ট নজরদারি ব্যবস্থার পাশাপাশি শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা আইন, স্বাধীন নজরদারি কমিশন, সংসদীয় তদারকি এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করেছে। সেখানে প্রযুক্তি একটি সহায়ক উপাদান মাত্র, মূল ভিত্তি নয়।
বাংলাদেশেরও উচিত এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে প্রযুক্তির ব্যবহার হবে স্বচ্ছ এবং এর কার্যকারিতা নিয়মিত মূল্যায়ন করা হবে। পুলিশ সংস্কার, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়, বিচারিক দক্ষতা বৃদ্ধি, সাইবার নিরাপত্তা জোরদার এবং স্থানীয় সরকার ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে কেবল ক্যামেরা বসিয়ে নিরাপত্তা আনা সম্ভব নয়।
পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়ন, সীমান্ত সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট কিংবা মাদকবিরোধী কার্যক্রমে পারস্পরিক সহযোগিতা ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু একটি দেশের বিতর্কিত নিরাপত্তা মডেলকে গ্রহণ করার আগে তার বাস্তব সাফল্য, সীমাবদ্ধতা এবং ব্যর্থতার কারণগুলো নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি।
তাই বাংলাদেশের সামনে এখন মূল প্রশ্ন একটাই, আমরা কি বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেব, নাকি কেবল প্রযুক্তির ঝলকানি দেখে একটি প্রশ্নবিদ্ধ মডেল বেছে নেব? যে সেফ সিটি প্রকল্প খোদ পাকিস্তানের নিরাপত্তা সংকটের স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি, তাকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নীতির ভিত্তি বানানোর আগে জাতীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক ব্যয় এবং নাগরিক অধিকারের বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
সিয়াম সারোয়ার জামিল রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডি করছেন। ই-মেইল: [email protected]