Published : 14 Jul 2026, 10:29 AM
শাসন করতে গিয়ে বাবার কাঠের ফালির আঘাতে মেয়ের মৃত্যুর ঘটনাটি কোনো সাধারণ খুনের ঘটনা নয়। সম্প্রতি খুলনায় ঘটে যাওয়া ওই ঘটনা আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর এক চরম রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের সূত্রে আমরা জানতে পারি, অষ্টম শ্রেণিতে পড়াকালীন আরফানা হোসেন নির্জনা নামের সেই কিশোরী এক ব্যক্তির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ায়। সেই সম্পর্ক থেকে মেয়েকে জোরপূর্বক ফিরিয়ে আনতে মা-বাবা কোনো আলাপ-আলোচনা বা মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিংয়ের ধার ধারেননি; উল্টো তাড়াহুড়ো করে ওকে অন্যত্র বিয়ে দেন।
কিন্তু নির্জনা সেই চাপিয়ে দেওয়া বিয়ে অস্বীকার করে নিজের পছন্দের সম্পর্কের দিকেই ফিরে যেতে চাইলে পরিবারের সঙ্গে তার তীব্র বিরোধের সৃষ্টি হয়। আমাদের সমাজ যাকে ‘শাসন’ বলে বৈধতা দিতে চায়, সেই অন্ধ আক্রোশের প্রকাশ ঘটে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে। মা-বাবার যৌথ মারধর এবং বাবার করা মাথায় আঘাতের অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে নির্জনার জীবনের নির্মম সমাপ্তি ঘটে।
এই ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, পরিবারগুলোতে আজও সন্তানদের মানুষ হিসেবে সম্মান করার এবং তাদের আবেগ-অনুভূতিকে বোঝার কত বড় অভাব রয়েছে। সন্তানের ভুল বা জেদকে শোধরানোর উপায় কি তবে তাকে পিটিয়ে মেরে ফেলা? পারিবারিক সম্মান রক্ষার নামে বা শাসনের অজুহাতে নিজের সন্তানকে এভাবে হত্যা করার মধ্য দিয়ে আমরা আসলে কেমন সমাজ গড়ে তুলছি, আজ সেই প্রশ্নটি তোলার সময় এসেছে।
কোনো মা-বাবা কি স্বেচ্ছায় তার নিজের সন্তানকে পিটিয়ে মেরে ফেলতে পারেন? উত্তরটা না হলেও, সন্তানের অবাধ্যতা, জেদ আর উভয় পক্ষের তীব্র ক্ষোভের সেই চরম মুহূর্তে ক্রোধ যখন মানুষের অন্ধ আবেগকে গ্রাস করে, তখন এমন ভয়াবহ ট্র্যাজেডির জন্ম হয়। এই ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি আজকের বাংলাদেশের ঘরে ঘরে চলতে থাকা ‘প্যারেন্টস বনাম টিনএজার’ মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের চরম ও নৃশংস বহিঃপ্রকাশ। আজ সময় এসেছে গভীরভাবে খতিয়ে দেখার—মূল গলদটা আসলে কোথায়? কেন আমাদের পারিবারিক সম্পর্কগুলোই এখন সবচেয়ে বড় মনস্তাত্ত্বিক ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে?
প্রথমেই যে সত্যটি আমাদের মেনে নিতে হবে তা হলো—অল্প বয়সে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ, নিজের স্বাধীনতা ঘোষণা করা, প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা চাওয়া এবং মা-বাবার সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হওয়া—এগুলো টিনএজ বা কৈশোরকালীন মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের অত্যন্ত স্বাভাবিক ধাপ।
এছাড়াও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এবং মনোবিজ্ঞান বলছে, এই বয়সে অল্পবয়সীদের শরীরের ভেতরে হরমোনের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে এবং একই সঙ্গে মস্তিষ্কের ‘প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স’—যা মানুষের আবেগ, যুক্তি ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে—তা পুরোপুরি বিকশিত হতে ২৫ বছর বয়স পর্যন্ত সময় নেয়। ব্রেইন এবং শরীরের মধ্যে নানা পরিবর্তনের ফলে কিশোর-কিশোরীরা সাধারণত সাংঘতিক আবেগপ্রবণ ও বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এরা সহজেই মা-বাবার সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হয় এবং কোন কথা শুনতে চায় না। তারা যে সবসময় ইচ্ছা করে বা সচেতনভাবে এরকম করে, তা কিন্তু নয়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ব্রেইন ওদের ভুল পথে পরিচালিত করে। এই বয়সে এরা অনেক বেশি ‘রিয়েক্টিভ’ (Reactive) থাকে। আবেগতাড়িত হয়ে সাংঘাতিক কিছু একটা করার পর ওদের মাথায় ভাবনাটা আসে যে ‘কী করলাম’।
অথচ বেশির ভাগ বাঙালি মা-বাবারা কিছুতেই সন্তানের আচরণের এইসব রূপান্তর মেনে নিতে পারেন না। তাদের সারাক্ষণ মনে হতে থাকে, গত বছরও তো ভালই ছিল। হঠাৎ করে সন্তানের কি এমন ঘটল যে যে রকম করছে! তারা তাদের সনাতনী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান করতে চান। বেশিরভাগ পরিবারেই মা-বাবা তাদের সিদ্ধান্ত বা মতামত সন্তানের ওপর জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। যেমন—নির্জনা যখন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল, তখন মা-বাবা ভেবেছিলেন বিয়ে দিলেই হয়তো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে। কিন্তু জোর খাটানোর এই আদিম দাওয়াই হিতে বিপরীত ডেকে এনেছে।
যুগে যুগে সন্তান ও মা-বাবার মধ্যে মতের অমিল ছিল, তবে আজকের জেনারেশন আলফা (Alpha) বা জেনারেশন জেড (Gen Z) বড় হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তির এক অবাধ গোলকধাঁধায়। নব্বইয়ের দশক বা তার আগের চেনা শৈশব-কিশোরের সঙ্গে আজকের দিনলিপির কোনো মিলই নেই। তখনকার দিনে মা-বাবার চোখ রাঙানি কিংবা শারীরিক শাস্তির শাসনই ছিল শৃঙ্খলার শেষ কথা।
আজ বদলে গেছে সন্তানদের যোগাযোগের ভাষা, প্রতিদিনের চিন্তা-ভাবনা এবং শব্দচয়ন। আজকের বাঙালি কিশোর-কিশোরীরা বড় হচ্ছে বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে। একদিকে তারা যেমন ২০ বছর আগের রক্ষণশীল প্যারেন্টিং মডেলকে মানদণ্ড হিসেবে দেখছে না, অন্যদিকে ইন্টারনেট, নেটফ্লিক্স আর সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে প্রতিনিয়ত দেখছে উন্নত বিশ্বের ‘প্রোগ্রেসিভ প্যারেন্টিং’, স্বাধীন জীবনধারা।
আজকের দিনে অল্পবয়সীদের বাস্তব জীবনের ‘অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান’ (Experiential Knowledge) হয়তো অনেক কম, কিন্তু তাদের আঙুলের ডগায় রয়েছে প্রচুর ‘বৈশ্বিক ইনফরমেশন’। এই তথ্যের প্রাচুর্য তাদের মনে এক ধরণের ছদ্ম-পরিপক্বতা বা 'ফেক ম্যাচিউরিটি' (Fake Maturity) তৈরি করছে। ওদের দৃষ্টিভঙ্গিটা এখন এমন যে, তারা মা-বাবার চেয়ে অনেক বেশি জানে এবং বোঝে।
এখানে একটি সমকালীন উদাহরণ দেওয়া যায়। এক এইচএসসি পরীক্ষার্থী কিশোর কিছুতেই পরীক্ষা দেবে না। তার যুক্তি, সে অনলাইনে বিদেশি ক্লায়েন্টদের সঙ্গে ব্যবসা করে মাসে লাখ টাকা আয় করছে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার কোনো মূল্য তার কাছে নেই। সে তার সনাতন ভাবনার মা-বাবা, সমাজ ও আত্মীয়দের ওপর তীব্র ক্ষুব্ধ। কথায় কথায় সে মা-বাবাকে বলছে, ‘Fuck off!’ সে সারাদিন স্ক্রিনে থাকে, মানসিক চাপ অনুভব করলে নিজেই টাকা দিয়ে বিদেশি সাইকিয়াট্রিস্ট দেখায়, অনলাইন ডায়েটেশিয়ানের চার্ট মেনে খাবার অর্ডার করে। সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাচারী ও আত্মকেন্দ্রিক এই কিশোরের সঙ্গে তার মা-বাবা কোনো যুক্তি দিয়েই কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। নিয়ন্ত্রণ হারানোর এই চরম অসহায়ত্ব থেকেই অনেক সময় মা-বাবাদের ভেতর জন্ম নেয় আদিম হিংস্রতা—যার শেষ পরিণতি শারীরিক আঘাত।
আমাদের সমাজে এখনো একটা প্রচলিত ও বিপজ্জনক ধারণা আছে, ‘মাইরের ওপর ওষুধ নাই’। অনেক শিক্ষক এবং অভিভাবক এখনো মনে করেন, যেদিন থেকে তারা শারীরিক শাস্তি দেওয়া বন্ধ করেছেন, সেদিন থেকেই ছেলে-মেয়েগুলো আরও বেয়াদব হয়ে গেছে। কিন্তু আধুনিক মনস্তত্ত্ব এবং খুলনার মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে—শারীরিক শাস্তি কোনো সমাধান তো নয়ই, এটি সমস্যার তীব্রতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
যখন একজন বাবা বা মা কিশোর সন্তানের ওপর হাত তোলেন, তখন সন্তানের মনে শ্রদ্ধার বদলে তীব্র ক্ষোভ, ঘৃণা এবং প্রতিশোধপরায়ণতার জন্ম হয়। শারীরিক নির্যাতন কিশোর-কিশোরীদের আরও বেশি অন্তর্মুখী, জেদি এবং অপরাধপ্রবণ করে তোলে। অতিরিক্ত ক্রোধ এবং জেদ যখন দুই পক্ষ থেকেই চরমে পৌঁছায়, তখন মুহূর্তের অসতর্কতায় ঘটে যায় খুলনার মতো নির্মম হত্যাকাণ্ড।
পুরনো লাঠি দিয়ে নতুন যুগের সন্তান শাসন করা সম্ভব নয়। এই ডিজিটাল যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে বাঙালি প্যারেন্টিংয়ের ধরনে আমূল পরিবর্তন আনা জরুরি। তবে অতিরিক্ত শাসন যেমন সন্তানের ক্ষতি করে, তেমনি অতিরিক্ত বা অন্ধ আদরও সন্তানকে স্বেচ্ছাচারী করে তুলতে পারে। আজ আমাদের ‘অথোরেটেরিয়ান’ (স্বৈরাচারী) বা ‘পারমিসিভ’ (অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া) প্যারেন্টিংয়ের বাইরে এসে ‘অথোরেটেটিভ’ বা গণতান্ত্রিক প্যারেন্টিং চর্চা করতে হবে, যেখানে শাসন ও ভালোবাসার চমৎকার ভারসাম্য থাকবে।
সন্তানের সঙ্গে ভয়ের সম্পর্ক না রেখে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যাতে যেকোনো বিপদে বা ভুল সম্পর্কে জড়ালে সে সবার আগে মা-বাবার কাছে এসে নির্দ্বিধায় বলতে পারে।
টিনএজাররা শারীরিক শাস্তির চেয়ে যুক্তিতে বেশি প্রভাবিত হয়। কেন একটি কাজ ভুল, তা ধমক দিয়ে নয়, শান্ত মাথায় যুক্তিসহকারে বোঝাতে হবে।
সন্তানকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে মা-বাবাদেরও ইন্টারনেট ব্যবহারে দক্ষ হতে হবে এবং সন্তান অনলাইনে কী ধরনের বিষয় পছন্দ করছে, সেদিকেও আগ্রহ দেখাতে হবে। বর্তমান যুগে সন্তানকে শুধু এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোর্স করালেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; প্রতিটি পরিবারেরই সন্তানকে ইআই (EI) বা আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেওয়া উচিত। সন্তানকে একজন মানবিক ও সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হলে পরিবারের ভেতর থেকেই এই আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার নিয়মিত চর্চা করা জরুরি।
খুলনার নির্জনার করুণ মৃত্যু আমাদের সমাজকে এক বিরাট কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এটি কেবল একটি পরিবারের ধ্বংসের গল্প নয়, আমাদের সামগ্রিক প্যারেন্টিং ব্যবস্থার ব্যর্থতার দলিল। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সন্তানেরা যেমন বদলাবে, মা-বাবাকেও তেমনি তাদের মানসিকতার স্তর উন্নত করতে হবে। সন্তান এবং মা-বাবার অতিরিক্ত রাগ ও জেদ যেন আর কোনো তাজা প্রাণ কেড়ে না নেয়, আর কোনো পরিবারকে নরকে পরিণত না করে।
আসুন, শাসনের লাঠি ভেঙে আমরা ভালোবাসা, ধৈর্য এবং বোঝাপড়ার সেতু তৈরি করি। মা-বাবায়ের ধৈর্য, সহিষ্ণুতা, বুদ্ধিমত্তা ও সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারার মানসিকতার মাধ্যমেই আমাদের সন্তানেরা খুঁজে পাক এক সুস্থ, সুন্দর ও মানবিক ভবিষ্যৎ।
ফজিলাতুন নেসা শাপলা কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: [email protected]