Published : 13 Jul 2026, 12:10 PM
একটি ফেরি মাঝনদী থেকে ফিরে এসেছে। ঘটনাটি শুনে প্রথমে মনে হতে পারে, হয়তো বৈরী আবহাওয়া ছিল। হয়তো ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দিয়েছিল। হয়তো কোনো যাত্রীর হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। অথবা নদীতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ওসবের কিছুই না। ফেরি ফিরে এসেছে একজন এমপিকে তোলার জন্য।
এটাই খবর। আর এই খবরের সবচেয়ে ভয়ংকর অংশটি, ফেরির ফিরে আসা নয়। ভয়ংকর অংশটি হলো, এমন খবর পড়ে আমরা খুব বেশি অবাকও হই না। কারণ আমরা এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, যেখানে রাষ্ট্রকে অনেকেই নিজের ব্যক্তিগত সম্পত্তি আর জনগণকে ব্যক্তিগত কর্মচারী বলে মনে করেন। হাতে কুড়াল পেলেই সবাই কাঠুরে হয় না, কিন্তু কেউ কেউ ক্ষমতা পেলেই সম্রাট হয়ে বসেন!
আমরা ছোটবেলায় শুনতাম, নদীর স্রোত কারও জন্য অপেক্ষা করে না। এখন বুঝলাম, নদী অপেক্ষা না করলেও ফেরি অপেক্ষা করে। আর প্রয়োজন হলে মাঝনদী থেকে ফিরেও আসে। অবশ্যই সবার জন্য নয়। আপনি যদি স্কুলশিক্ষক হন, একজন কৃষক হন, একজন গর্ভবতী নারী হন কিংবা জরুরি রোগী নিয়ে হাসপাতালে ছুটে চলা একজন বাবা হন, তাহলে ফেরি ফিরে আসবে না। কিন্তু আপনি যদি এমপি হন, তাহলে নদীর স্রোতও যেন একটু ভদ্র হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কী অপূর্ব দৃশ্য!
মনে হচ্ছে, আগামী দিনে প্রকৃতির নিয়মও সরকারি গেজেট অনুযায়ী চলবে। সূর্যকে বলা হবে, ‘একটু দাঁড়ান, মাননীয় মন্ত্রী এখনও ঘুম থেকে ওঠেননি।’ বর্ষাকে বলা হবে, ‘দয়া করে বৃষ্টি বন্ধ রাখুন, ভিআইপি কনভয় যাচ্ছে।’ মেঘনাকে বলা হবে, ‘এই যে নদী, একটু ইউ-টার্ন নাও।’ আর নদী নিশ্চয়ই বলবে, ‘জ্বি স্যার।’
এমন একটি দেশে বাস করছি, যেখানে ট্রাফিক আইন কখনও কখনও লালবাতি নয়, লালবাতির গাড়ি দেখে চলে। এই ঘটনায় সবচেয়ে মজার যুক্তিটি দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি। তিনি বলেছেন, তিনি সরকারি কাজে যাচ্ছিলেন। তাই তাকে ফেরিতে যেতেই হয়েছে। এবং ফেরি নাকি খুব বেশি দূরও যায়নি।
চমৎকার। এই যুক্তি শুনে মনে হলো, এখন থেকে আদালতে নতুন ধরনের আত্মপক্ষ সমর্থন শুরু হতে পারে। ‘স্যার, আমি ব্যাংক ডাকাতি করেছি ঠিকই, কিন্তু খুব বেশি টাকা তো নিইনি।’ ‘আমি ট্রাফিক আইন ভেঙেছি, কিন্তু খুব বেশি স্পিডে তো চালাইনি।’ ‘আমি পরীক্ষায় নকল করেছি, কিন্তু পুরো বই তো দেখিনি।’ অন্যায়ের পরিমাণ দিয়ে অন্যায়কে বৈধ করার এই দর্শনটি সত্যিই অভিনব। প্রশ্ন হলো, ফেরি যদি মাত্র এক মিনিট দূরে ছিল, তাহলে তাকে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনই বা কেন? আর যদি সত্যিই বিশ মিনিট দূরে গিয়ে থাকে, তাহলে ‘এক মিনিট’ কথাটি কি নদীর নতুন সময় গণনা পদ্ধতি? সম্ভবত রাজনৈতিক ঘড়িতে সময় একটু অন্যভাবে চলে। সাধারণ মানুষের এক ঘণ্টা সেখানে ভিআইপির এক মিনিট। এটাই হয়তো আধুনিক আপেক্ষিকতার নতুন সূত্র।
ঘটনাটির সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক অন্য জায়গায়। একজন এমপি জানেন, ফেরিতে শত শত মানুষ আছেন। কেউ অসুস্থ মাকে নিয়ে যাচ্ছেন, কেউ ব্যবসার কাজে, কেউ পরীক্ষার জন্য, কেউ হয়তো দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফিরছেন। বৈরী আবহাওয়ায় নদী পার হওয়ার মানসিক চাপ তো আছেই। ওই মানুষগুলোর সময়, উদ্বেগ, নিরাপত্তা, সবকিছুর চেয়ে নিজের যাত্রাটিকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে হওয়া কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি মানসিকতার পরিচয়।
এই মানসিকতার নাম ক্ষমতার দম্ভ। ক্ষমতা যখন দায়িত্বের জায়গা থেকে সরে গিয়ে সুবিধাভোগের লাইসেন্সে পরিণত হয়, তখন এমন ঘটনাই ঘটে। জনপ্রতিনিধি শব্দটির মধ্যে ‘জন’ আগে, ‘প্রতিনিধি’ পরে। কিন্তু আমাদের রাজনীতিতে অনেক সময় মনে হয় অভিধানটা উল্টো ছাপা হয়েছে। সেখানে ‘আমি’ আগে, ‘জনগণ’ পরে। এই ঘটনাটি আরও একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।
রাজনীতি কি সত্যিই বদলাচ্ছে? বিগত কয়েক বছরে দেশের মানুষ নতুন রাজনীতির কথা শুনেছে। নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা শুনেছে। বলা হয়েছে, পুরোনো দম্ভ, পুরোনো ভিআইপি সংস্কৃতি, ক্ষমতার অপব্যবহার; এসবের অবসান হবে। মানুষ বিশ্বাসও করতে চেয়েছিল। কারণ মানুষ পরিবর্তন চায়। কিন্তু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো নিজের পুরোনো অভ্যাস।
মানুষের ভালোবাসা অর্জন করতে বছরের পর বছর লাগে। আর ওই ভালোবাসা হারাতে কখনও কখনও একটি ফেরিই যথেষ্ট। রাজনীতির ইতিহাসে বড় বড় দল অস্ত্রের কাছে হারেনি, নির্বাচনের কাছেও হারেনি; তারা হেরেছে মানুষের মনে। কারণ মানুষ সবকিছু ভুলে যায়, কিন্তু অপমান ভুলে না। আপনি যদি একজন সাধারণ যাত্রী হন এবং হঠাৎ দেখেন মাঝনদী থেকে ফেরি ফিরে যাচ্ছে, আপনার প্রথম অনুভূতি কী হবে? নিশ্চয়ই আতঙ্ক। নদীতে কোনো দুর্ঘটনা? ইঞ্জিন নষ্ট? ঘূর্ণিঝড়? কিন্তু পরে জানতে পারলেন, না। ফেরি ফিরেছে একজন ভিআইপিকে তুলতে। তখন আপনার মনে রাষ্ট্র সম্পর্কে কী ধারণা তৈরি হবে?
আপনি বুঝে যাবেন, এই রাষ্ট্রে আপনার ভাড়া আর ভিআইপির ফোনকলের ওজন সমান নয়। এই কারণেই রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষয়ে যায়। ক্ষমতার অপব্যবহার সব সময় কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি দিয়ে শুরু হয় না। অনেক সময় শুরু হয় একটি সাইরেন দিয়ে। একটি লালবাতি দিয়ে। একটি লাইনের বাইরে গিয়ে দাঁড়ানো দিয়ে। অথবা মাঝনদী থেকে একটি ফেরি ফিরিয়ে আনা দিয়ে।
সমস্যা শুধু ফেরি নয়। সমস্যা হলো ওই চিন্তার, যেখানে একজন জনপ্রতিনিধি মনে করেন, জনগণের সময়ের চেয়ে তার সময় বেশি মূল্যবান। এই চিন্তা একদিন অফিসে যায়। আদালতে যায়। হাসপাতালে যায়। প্রশাসনে যায়। তারপর একসময় পুরো রাষ্ট্রটাই দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এক ভাগ ভিআইপি। অন্য ভাগ অপেক্ষমাণ।
ঘটনাটিকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সোরগোলের মাঝেই বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো রসিকতা করেছেন সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য মানসুরা আক্তার, যিনি মানসুরা আলম নামেই পরিচিত। এক ফেইসবুক স্ট্যাটাসে আলোচ্য বিষয়টি নিয়ে একটি দৈনিকের সংবাদ শেয়ার করে মানসুরা লিখেছেন, “কয়েকদিন আগে ভাড়া গাড়ি পাই নাই, উবারও পাচ্ছিলাম না। এইদিকে সময় হয়ে গেসে অধিবেশনের।
তো রিকশায় উঠলাম। এখন মানিক মিয়াতে ঢুকতে দেবেনা রিকশা, রিকশাওলা কয় মামা কই যাইবেন। বললাম, একটু ভেতরে যাওয়া দরকার। পরে কয়, কি আর করবেন, হাঁইটা যান গা। দেখসুইন ই তো যাইতে দেয় না।
মামার পরামর্শমতো হেঁটেই গেলাম গা। আগামীতে ছোটভাই মাসুদের থেকে পরামর্শ নিতে হবে কিভাবে মানিক মিয়ায় রিকশা ঢোকানো যায়।”
বলাবাহুল্য, আমরা কথা বলছি, হাতিয়া থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য আবদুল হান্নান মাসউদের। জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আসা নতুন দল এনসিপির নেতা, অভ্যুত্থানের সময় যারা বাংলাদেশে বৈষম্য থাকবে না। একটি ফোনে মাঝনদী থেকে ফেরি ফিরিয়ে আনাকে হয়তো ছোট বৈষম্য বলবেন। ফেরি ঘুরিয়ে আনা হয়তো প্রশাসনিকভাবেও খুব ছোট একটি ঘটনা। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে এটি একটি বিশাল প্রতীক। এই প্রতীকটি বলে দেয়, সুযোগ পেলেই পুরোনো রোগ ফিরে আসে। দেশপ্রেম শুধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করা কিছু আবেগঘন শব্দ নয়। দেশপ্রেম মানে নিজের সুবিধার আগে মানুষের সুবিধাকে রাখা। জনগণের সময়কে নিজের সময়ের সমান মূল্য দেওয়া। ক্ষমতাকে ভোগ নয়, দায়িত্ব হিসেবে দেখা। যে মানুষ রাষ্ট্রীয় পদ পেয়ে প্রথমেই রাষ্ট্রকে নিজের ব্যক্তিগত সুবিধার যন্ত্র বানাতে চান, তিনি দেশপ্রেমের বক্তৃতা যত সুন্দরই দিন না কেন, মানুষ শেষ পর্যন্ত তার আচরণটাই মনে রাখে।
একজন জনপ্রতিনিধির সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত, তিনি মানুষের প্রতিনিধি। মানুষ তার প্রজা নয়। নদী তার ব্যক্তিগত সুইমিংপুল নয়। ফেরি তার পারিবারিক গাড়ি নয়। রাষ্ট্র তার ব্যক্তিগত সহকারীও নয়। আজ একটি ফেরি মাঝনদী থেকে ফিরে এসেছে। কাল যদি ট্রেন ফিরে আসে? পরশু যদি বিমান রানওয়ে থেকে ফিরে আসে? তারপর হয়তো একদিন আদালতের বিচারকও শুনানি স্থগিত করবেন, কারণ মাননীয় কেউ এখনও পৌঁছাননি।
যে রাষ্ট্রে জনগণকে অপেক্ষা করতে শেখানো হয়, আর ক্ষমতাবানকে অপেক্ষা করতে শেখানো হয় না, ওই রাষ্ট্রে গণতন্ত্র ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়। তাই এই ঘটনাটি নিয়ে সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত। কারণ বিষয়টি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রশ্ন। ক্ষমতার সঙ্গে যদি জবাবদিহিতা না থাকে, তাহলে ফেরি শুধু মাঝনদী থেকেই ফিরবে না, একদিন জনগণের আস্থাও মাঝপথ থেকে ফিরে যাবে। আর ইতিহাস সাক্ষী, জনগণের আস্থা একবার ঘাট ছেড়ে চলে গেলে, কোনো ফোনকলেই তাকে আর ফিরিয়ে আনা যায় না।
একজন নেতার প্রকৃত উচ্চতা তার গাড়ির সাইরেনে নয়, মানুষের অপেক্ষা কমিয়ে দেওয়ার মধ্যে; তার বহরের দৈর্ঘ্যে নয়, সাধারণ মানুষের সঙ্গে একই লাইনে দাঁড়ানোর মানসিকতায়। জনগণ তাকে ভোট দেয় পাঁচ বছরের জন্য, কিন্তু কেউ কেউ বোধহয় মনে করেন, ওই ভোটের সঙ্গে নদী, নালা, ফেরি, রাস্তা সবকিছুর মালিকানাও বুঝি তার হাতে চলে এসেছে। চাটুকারেরা হয়তো এমন নেতাকে বোঝাতে পারে, তিনি যখন ইচ্ছা ফেরি ঘুরিয়ে আনতে পারেন, একদিন ইতিহাসও ঘুরিয়ে আনবেন। কিন্তু ইতিহাসের একটা নির্মম অভ্যাস আছে; সে ক্ষমতাবানের নির্দেশ মানে না, মানুষের রায়ই মানে। যে নেতা জনগণের সময়কে সম্মান করতে শেখেন না, জনগণও একদিন তার রাজনৈতিক সময়কে আর সম্মান করে না। কারণ ফেরি ঘুরিয়ে আনা যত সহজ, জনমত ঘুরিয়ে আনা তত সহজ নয়।
চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: [email protected]