Published : 12 Jul 2026, 10:21 PM
বর্ষণমুখর বিকেলেও তার শেষযাত্রায় ছিল অসংখ্য মানুষ। দীর্ঘদিনের প্রিয় সংসদ ভবনে তিনি এসেছিলেন সতীর্থদের কাঁধে চড়ে। এখানেই হয় তার শেষ জানাজা ও চিরবিদায়। এই সংসদ ভবনকেই তিনি মানতেন গণতন্ত্রের স্কুল হিসেবে। বলতেন, গণতন্ত্রের জন্য সংসদ এবং নির্বাচনই হলো প্রধান অনুষঙ্গ। সেই গণতন্ত্রের স্কুলেই শেষ বিদায় নিলেন পঞ্চগড় থেকে বারবার নির্বাচিত হয়ে আসা স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার।
রোববার ভোরে তিনি চলে যান না-ফেরার দেশে। রোববার সকালে প্রবল বর্ষণের সময়ই আসে সেই দুঃসংবাদ—সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার আর নেই।
কিছুক্ষণ টিভি বন্ধ করে তার বর্ণাঢ্য জীবনের কথাই ভাবছিলাম। কত স্মৃতি এই বিশাল ব্যক্তিত্বের মানুষটার সঙ্গে। বিশেষত ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত লম্বা সময় স্পিকারের দায়িত্বে থাকাকালে কতই-না সুযোগ হয়েছে তার কাছে যাবার।
২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠনের পর অনেকেই তাকে মন্ত্রী না বানানোয় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু মন্ত্রিসভা গঠনের কয়েকদিন পরই জানা যায়, ওই সময়ের সংসদনেতা বেগম খালেদা জিয়া তাকে স্পিকার হিসেবে চান। ফলে বিএনপি সরকার গঠনের কয়েকদিন পরই তিনি সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন। ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর বিদায়ী স্পিকার আবদুল হামিদের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পিকারের দায়িত্ব বুঝে নেন তিনি।
সেই সময় আমি ‘প্রথম আলো’র রিপোর্টার হিসেবে সংসদে কাজ করি। সংসদ ভবনের ৫ম তলায় স্পিকারের কক্ষে বিদায়ী স্পিকারের কাছ থেকে নতুন স্পিকারের দায়িত্ব নেওয়ার ঘটনাটা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। এরপর টানা ৯ বছর তার স্পিকারের দায়িত্ব পালনকালে সংসদে তাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল। রিপোর্টিংয়ের কাজের বাইরে বাংলাদেশ পার্লামেন্ট জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকদের নানা পেশাগত ইস্যুতে তার ভোট ও সমর্থন পেয়েছি।
সাংবাদিকদের পেশাগত অসংখ্য ট্রেনিংয়ের আয়োজন ওই সময়েই করা সম্ভব হয়েছিল। এসব অনেক আয়োজনেই তিনি নিজে উপস্থিত থেকে সাংবাদিকদের উৎসাহ দিতেন। বলতেন, সাংবাদিকদের পড়াশোনা করতে হবে সারাজীবন। সংসদে ওই সময় থেকেই আমরা সংসদ লাইব্রেরিতে কাজ করার অবারিত সুযোগ পাই। সংসদ লাইব্রেরির অফুরন্ত বইয়ের ভাণ্ডার ছিল আমাদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। ওই সময় সংসদ লাইব্রেরির প্রধান আবু দাউদ ভাইও আমাদের উৎসাহ দিতেন।
শুধু বাংলাদেশের সংসদ নয়, পৃথিবীর নানা দেশের সংসদ কার্যপ্রণালি দেখার সুযোগ হয়েছে। পেশাগত সম্পর্ক ছাড়িয়ে তার সঙ্গে সাংবাদিকদের সম্পর্ক চলে গিয়েছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ে। তার একটা কথা আজ খুব মনে পড়ছে—ঘৃণা ছড়িয়ে নয়, ভালোবাসা ছড়িয়েই কেবল দেশের জন্য কাজ করা যায়। মানুষকে ভালোবাসার এক দারুণ শক্তি ছিল তার। আর তাই তো রাষ্ট্রের প্রয়োজনে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকালে বঙ্গভবনে গিয়েও সংসদে কর্মরত সাংবাদিকদের ভুলেননি; ডেকেছেন বঙ্গভবনেও।
বঙ্গভবনের সাময়িক দায়িত্ব শেষে আবারও ফিরে আসেন সংসদেই। সংসদ না থাকলেও ওয়ান-ইলেভেনের পুরো সময়টা তিনি শক্ত করে সংসদের হাল ধরে রেখেছিলেন। সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ওই সময় এমপি হোস্টেল তাদের দখলে নেওয়ার চেষ্টা করলেও স্পিকার শক্ত হাতে তা আটকে দেন।
২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন জমির উদ্দিন সরকার। তিনি জিয়াউর রহমানের সময় গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী, আবদুস সাত্তারের মন্ত্রিসভায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং খালেদা জিয়ার সরকারে ভূমি প্রতিমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। নিয়ম অনুসারে ওই অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার। সেখানে নির্বাচিত হন সংসদের নতুন স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ। নতুন স্পিকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে বিদায় নেন তিনি। বিদায় নেওয়ার আগে দুই স্পিকার অনেকক্ষণ একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। ভালোবাসায় আপ্লুত হওয়ার ওই ছবি পরদিন অনেক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল।
ওইদিন স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার বলেছিলেন, দেশের সব সমস্যার সমাধান করতে হবে নির্বাচনের মাধ্যমে। বলেছিলেন, নির্বাচিত সংসদ হলো মানুষের ভালোবাসার জায়গা। সংসদে সব বিতর্ক হবে মানুষের কল্যাণে। বিদ্বেষ আর ঘৃণা নয়, সংসদ ছড়াবে ভালোবাসার সুবাতাস। কিন্তু সেই কথা আমরা রাখতে পারিনি। বড় ভালোবাসাহীন এক সময় পার করছি আমরা। এই সময়ে ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকারের মতো মানুষের বড় প্রয়োজন ছিল।
আশিস সৈকত সাংবাদিক ও কলাম লেখক। ই-মেইল: [email protected]