Published : 12 Jul 2026, 03:39 PM
বিশ্বকাপ বরাবরই জাতীয় পরিচয়ের এমন কিছু দিক সামনে আনে, যা তাকে বিশুদ্ধ ও সরল ভাবতে শেখায়। কিন্তু এবারের ফুটবল বিশ্বকাপ সম্ভবত অন্য যেকোনো বৈশ্বিক ঘটনার চেয়ে আরও স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে, আধুনিক জাতীয় পরিচয় আসলে এতটা সরল নয়, বরং অনেক বেশি জটিল ও বিতর্কিত।
মরক্কো ফুটবল দলের গঠন সেই বাস্তবতার চিত্রই ফুটিয়ে তোলে। ২৬ খেলোয়াড়ের মধ্যে ১৯ জনের জন্ম মরক্কোর বাইরে। কারও জন্ম স্পেনে, কারও ফ্রান্সে। একসময় এই দুই দেশই মরক্কোর উপনিবেশিক শাসক ছিল। ফলে দলটির এরকম গঠন দ্বৈত নাগরিকত্ব, জাতীয় পরিচয়ের প্রতি আনুগত্য, প্রবাসী জনগোষ্ঠী এবং উপনিবেশবাদের উত্তরাধিকার—এসব প্রশ্ন আবারও সামনে আনছে।
একই চিত্র দেখা যায় পুরো আসরজুড়ে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস ও অস্ট্রেলিয়ার মতো জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড়ই অভিবাসী পরিবারের সন্তান।
উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান ঘটছে। জাতীয় পরিচয় নিয়ে বিতর্কে বিভক্ত সেই দেশগুলোই আবার বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল মঞ্চে বহুসাংস্কৃতিক দল দিয়েই প্রতিনিধিত্ব করছে।
ইতিহাসের এই পরিহাস সহজে এড়িয়ে যাওয়ার নয়। ইউরোপের হয়ে খেলা অনেক ফুটবলারের শিকড় সেই সব ভূখণ্ডে, যেগুলো একসময় ইউরোপীয় শক্তিগুলোর উপনিবেশ ছিল। তাই দলগুলোর গঠনই বলে দেয়, উপনিবেশবাদ, সাম্রাজ্য এবং অভিবাসনের ইতিহাস থেকে আধুনিক জাতীয় পরিচয়ের জট খোলা খুব সহজ কাজ নয়।
আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বেশির ভাগ জাতীয় দলের অনেক খেলোয়াড়ই অভিবাসী ও বর্ণগত সংখ্যালঘু। অথচ তারা এমন সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেন, যেখানে শ্বেতাঙ্গরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে জাতীয় পরিচয় ও বর্ণগত পরিচয়ের টানাপোড়েন এখানেই আগে ধরা পড়ে।
গত ২৯ জুন ট্রাইবেকারে মরক্কোর কাছে নেদারল্যান্ডস বাদ পড়ার পর পেনাল্টি মিস করা তিন কৃষ্ণাঙ্গ ডাচ খেলোয়াড় সঙ্গে সঙ্গে অনলাইনে বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হন। আর সেটি আধুনিক জাতীয় পরিচয়ের এক বড় অসঙ্গতি সামনে আনে: সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ সফল হলে তারা জাতির গর্ব। কিন্তু ব্যর্থ হলেই তাদের বহিরাগত বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অসঙ্গতি
কানাডা ও মেক্সিকোর সঙ্গে যৌথ আয়োজক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বিশেষভাবে চোখে পড়ে। অন্তত আংশিকভাবে ডনাল্ড ট্রাম্পের রাজনীতি গড়ে উঠেছে শ্বেতাঙ্গ পরিচয়ের রাজনীতি এবং অভিবাসন বিরোধী অবস্থানের ওপর।
ট্রাম্প শ্বেতাঙ্গদের ‘ভুক্তভোগী’ হওয়ার কার্ড রাজনীতির মাঠে সর্বদাই ব্যবহার করেন। দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে তিনি এমন কিছু পদক্ষেপ নেন, যা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্বের ধারণাকে আরও জোরালো করে। এর মূল বার্তা ছিল—শ্বেতাঙ্গ পরিচয়ই প্রকৃত মার্কিন পরিচয়।
দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের শরণার্থী কর্মসূচি স্থগিত করেন। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ আফ্রিকানদের পুনর্বাসনকে অগ্রাধিকার দিয়ে এক নির্বাহী আদেশ জারি করেন। পরে সেই কর্মসূচির পরিধি আরও বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ দক্ষিণ আফ্রিকানদের জন্য অতিরিক্ত দশ হাজার শরণার্থী কোটা নির্ধারণ করা হয়। অথচ অ-শ্বেতাঙ্গ শরণার্থীরা এই সুযোগের বাইরে থেকে যান।
অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর দমন-পীড়নের প্রধান লক্ষ্য ছিল অ-শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীরা। ২০২৫ সালে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা প্রায় চার লাখ অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের বেশির ভাগকেই নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়। এখন সংস্থাটি আরও জোরালোভাবে অভিযান চালাচ্ছে। জুনের শেষ দিকে মাত্র ৫ দিনে তারা ১০ হাজার অভিবাসী গ্রেপ্তার করে।
এই কঠোর পদক্ষেপ এমন এক ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ ভক্ত-সমর্থকদের মিলনমেলার বদলে বর্জনের প্রতীক হয়ে ওঠে।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগের সপ্তাহগুলোতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, বর্ণবৈষম্য বিরোধী জাতীয় সংগঠন এবং আমেরিকান নাগরিক স্বাধীনতা ইউনিয়নসহ ১২০টির বেশি শীর্ষ মানবাধিকার সংগঠন যৌথভাবে বিশ্বকাপ উপলক্ষে ভ্রমণবিষয়ক একটি সতর্কবার্তা প্রকাশ করে।
সেই আশঙ্কা যে অন্তত কিছুটা সত্যি ছিল, তা পরে স্পষ্ট হয়। ট্রাম্প প্রশাসন সোমালিয়ার পুরস্কারজয়ী রেফারি ওমর আরতানকে যুক্তরাষ্ট্রে ঢোকার অনুমতি দেয়নি। ইরান দলের ওপর কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ইরাকের স্ট্রাইকার আইমেন হুইসেনকে সাত ঘণ্টা বিমানবন্দরে আটকে রাখা হয়। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও যুক্তরাষ্ট্র শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেয়। তবে শেষ পর্যন্ত বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিদায় নিতে হয়। দলের ছয়জন খেলোয়াড়ের জন্ম যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে। আর অর্ধেকের বেশি খেলোয়াড়ের রয়েছে দ্বৈত নাগরিকত্ব।
বস্টন, ডালাস, আটলান্টা, হিউস্টন, লস অ্যাঞ্জেলেস ও সিয়াটলসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরের স্টেডিয়াম ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। গ্যালারিতে ছিলেন হাজারো শ্বেতাঙ্গ মার্কিন সমর্থক। তাদের মধ্যে ট্রাম্প-সমর্থকের উপস্থিতিও নিশ্চিতভাবেই ছিল। অথচ তাদের রাজনীতি শ্বেতাঙ্গদের ক্ষোভকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে। সেই সমর্থকদের কণ্ঠে যখন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে স্লোগান ওঠে, তখন দৃশ্যটি এক অদ্ভুত বিদ্রূপ তৈরি করে। কারণ, যে জাতীয় দলকে ঘিরে তাদের এত উচ্ছ্বাস, সেই দলের জার্সি গায়ে খেলেন ফোলারাইন বালোগুন, আলেহান্দ্রো জেনদেহাস, হাজি রাইট এবং অভিবাসী পরিবার থেকে উঠে আসা আরও অনেক ফুটবলার।
আসরের প্রধান আয়োজক দেশেই এই বৈপরীত্য সবচেয়ে বেশি। সম্ভবত এর আগে কোনো বিশ্বকাপ আধুনিক জাতীয়তাবাদের ভঙ্গুরতা ও ভেতরের অসঙ্গতি এত বড় পরিসরে সামনে আনেনি। রাজনীতিতে জাতিকে প্রায়ই নৃগোষ্ঠী, বর্ণ বা সংস্কৃতির দিক থেকে সমরূপ ও স্থির এক সত্তা হিসেবে কল্পনা করা হয়। কিন্তু মাঠে নামা দলগুলো বলছে ভিন্ন কথা। বর্তমানের জাতীয় দল গড়ে উঠেছে অভিবাসন, প্রবাসী জনগোষ্ঠী, ঔপনিবেশিক ইতিহাস এবং ‘আমরা’ ও ‘তারা’—এই দীর্ঘদিনের বিতর্কিত বিভাজনের মধ্য দিয়ে।
তাই ২০২৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় শিক্ষা ফুটবল প্রতিভা, খেলার কৌশল বা কোচিং নয়। এই আসরের দীর্ঘস্থায়ী শিক্ষা সম্ভবত অন্য জায়গায়। জাতীয়তাবাদীরা যতই একরৈখিক পরিচয়ের স্বপ্ন দেখুক, জাতীয় পরিচয় কখনোই স্থির, সরল বা একমাত্রিক নয়।
লেখাটি ‘আল-জাজিরা’ থেকে অনূদিত; এর লেখক মোহাম্মদ এলমাসরি কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের মিডিয়া স্টাডিজ প্রোগ্রামের অধ্যাপক। তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র সন্ত্রাসবাদ এবং পশ্চিমা বিশ্বে মুসলমানদের উপস্থাপন।