Published : 14 Jul 2026, 11:40 AM
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
এ লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ আইনের প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতার ধারায় সংশোধনের প্রস্তাব করবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।
আইন সংশোধন হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পদে চাকরিতে থেকে কেউ স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। প্রার্থী হওয়ার আগে চাকরি ছাড়তে হবে।
তবে ইসির এ উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে 'এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোট'।
সংগঠনটির দাবি, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের সরকারি কর্মচারীর মর্যাদা না দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার সীমিত করা হলে শিক্ষক সমাজে ‘অসন্তোষ’ তৈরি হবে।
বর্তমানে দেশে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা সাড়ে ৭ লাখের বেশি। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় প্রায় ৫ লাখ ৪৩ হাজার; মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের আওতায় ২২ হাজারের বেশি শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন।
এ বছরের অক্টোবর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রস্তুতির মধ্যে আইন ও বিধিমালা সংস্কারের কাজ করছে নির্বাচন কমিশন। এর অংশ হিসেবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার বিধানেও পরিবর্তন আনার চিন্তাভাবনা চলছে।
জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, “আমরা জানলাম, শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন যে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় নির্বাচনে দাঁড়াতে পারবেন না। কিন্তু ১৯৪৮ সালের ডিএলআর-এ আপিল বিভাগ বলছে, বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে।
“আমরা মনে করছি, তারা যাতে নির্বাচন করতে না পারে, সে বিধানটি স্থানীয় সরকার আইনে যুক্ত করে দেব। এ ধরনের প্রস্তাব আমরা করতে পারি।”
তিনি বলেন, “বেসরকারি শিক্ষকরা ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। পদে থেকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরাও নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন এখন। উনারা যেহেতু ফুলটাইম চাকরি করেন, তাদের চেয়ারম্যান-মেয়র না হওয়াই ভালো।”
ইসির এ উদ্যোগের সমালোচনা করেছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্যসচিব দেলাওয়ার হোসেন আজীজী।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বর্তমানে বহু স্থানে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি হিসাবে আছেন। জাতীয় সংসদেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব আছে। দীর্ঘদিনের রেওয়াজে এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
“এখন সরকার যদি আমাদের দাবি মেনে নিয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি করে, আমাদের চাকরিও সরকারি করে, তাহলে সরকারি কর্মচারী হিসাবে আমরা নির্বাচনে অংশ নেব না। সেটা সরকার করতেই পারে। কিন্তু তা না করে যদি সরকার শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত করে, তাহলে তা শিক্ষক সমাজে অসন্তোষ সৃষ্টি করবে। আমরা শিক্ষকরা এ উদ্যোগের প্রতিবাদ জানাই।”
ইসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ আইনের প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা-অযোগ্যতা সংক্রান্ত ধারাগুলো সংশোধনের কথা ভাবা হচ্ছে।
সংশোধনীতে বর্তমান বিধানের সঙ্গে ‘কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো পদে সার্বক্ষণিক অধিষ্ঠিত থাকেন’—এ ধরনের বাক্য যুক্ত করার প্রস্তাব করা হবে।
সংসদে আইন পাস হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা চাকরিতে বহাল থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না।
আরও যেসব পরিবর্তনের চিন্তা
স্থানীয় সরকার নির্বাচনসংক্রান্ত আইনে আরও কয়েকটি সংশোধনী আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ।
তার ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংজ্ঞায় ‘সশস্ত্র বাহিনী’ অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হবে, যাতে প্রয়োজন হলে সেনাবাহিনী মোতায়েনের আইনি ভিত্তি স্পষ্ট থাকে।
“তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাধারণত সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন হয় না। আমরা সংজ্ঞায় যুক্ত করে রাখছি। প্রয়োজন হলে পরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।"
এ ছাড়া যেসব সংশোধনের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
• ফেরারি আসামি ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্রভুক্ত ব্যক্তিদের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা।
• ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের অংশীদার ও পরিচালকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ সীমিত করা;
• বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনাল গঠন।
• ঋণগ্রহীতার সংজ্ঞায় গ্যারান্টারকেও অন্তর্ভুক্ত করা।
নির্বাচন পরিচালনা বিধি ও আচরণবিধিতেও পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীর জন্য এক শতাংশ ভোটারের সমর্থনসূচক স্বাক্ষরের বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়া এবং জামানতের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে ইসির।
আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, এ সপ্তাহে সংশোধনী প্রস্তাব নিয়ে কমিশনের বৈঠক হবে। মতামত পর্যালোচনা করে গ্রহণযোগ্য প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত করা হবে।
“নির্বাচন কমিশনের প্রস্তাব দিলেই আইন পরিবর্তন হবে না। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে সরকার চাইলে তা সংসদে উত্থাপন করবে। সংসদে আলোচনা ও অনুমোদনের পরই সংশোধন কার্যকর হবে।”
পুরনো খবর
স্থানীয় নির্বাচন প্রভাবমুক্ত রাখতে ভোটের সময় এমপিদের ‘পরিদর্শন কক্ষ’ নিষ্ক্রিয় রাখতে চায় ইসি
স্থানীয় নির্বাচন: হালনাগাদ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ ৩১ অগাস্ট
স্থানীয় সরকার নির্বাচন: ওয়ার্ড ও সীমানা বিন্যাস দ্রুত শেষ করার তাগিদ ইসির
সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে পাঁচ স্থানীয় সরকার নির্বাচন: প্রতিমন্ত্রী