Published : 13 Jul 2026, 08:28 PM
"বর্তমান যুগে জাতি গঠিত হয় ভূখণ্ডের ভিত্তিতে, ধর্মের ভিত্তিতে নয়।" মাওলানা হুসেইন আহমদ মাদানি, ১৯৩৭ সালে দিল্লির এক রাজনৈতিক সভায় (সূত্র: উর্দু পত্রিকা আল-আমান ও এহসান, ডিসেম্বর ১৯৩৭)
"একটি ইসলামি রাষ্ট্র মুসলিম রাষ্ট্র বটে, কিন্তু একটি মুসলিম রাষ্ট্র ইসলামি রাষ্ট্র নাও হতে পারে — যতক্ষণ না তার সংবিধান কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়।" সৈয়দ আবুল আলা মওদুদি, ইসলামি রিয়াসত (Islamic Law and Constitution)
ব্রিটিশ ভারত বিভাজনের প্রশ্নে মুসলিম রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃত্বের মাঝে সার্বজনীন ঐক্যমত্য ছিল না। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আগের দশকগুলোতে এই বিতর্ক তীব্রতম রূপ নেয়। সেই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন দুজন প্রভাবশালী চিন্তাবিদ: মাওলানা হুসেইন আহমদ মাদানি ও সৈয়দ আবুল আলা মওদুদি। দুজনেই মুসলিম লিগের পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধী ছিলেন—কিন্তু তাদের বিরোধিতার ভিত্তি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা, এমনকি পরস্পরবিরোধী। এই পার্থক্য বোঝা শুধু ইতিহাসের প্রশ্ন নয়—আজকের দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামবাদের রাজনীতির স্বরূপ উপলব্ধির জন্যও অপরিহার্য।
মাদানির চিন্তার শিকড় দেওবন্দি ঐতিহ্যে— শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভি ও শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দির উত্তরাধিকার তিনি বহন করেছেন। অন্যদিকে মওদুদির চিন্তায় জামালউদ্দিন আফগানি ও মুহাম্মদ আবদুহুর ইসলামি সংস্কার আন্দোলনের প্রভাব স্পষ্ট —পাশাপাশি আল্লামা ইকবালের ইসলামি রাষ্ট্রচিন্তাও তাকে প্রভাবিত করেছে, যদিও ইকবালের সঙ্গেও তার মতভেদ ছিল। এই ভিন্ন উৎস থেকেই জন্ম নিয়েছে দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক দর্শন—যার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন: মুসলমানদের পরিচয়ের ভিত্তি কি জাতিসত্তায়, না ইসলামি আদর্শে?
মুত্তাহিদা কওমিয়্যত: মাদানির যৌথ জাতীয়তার স্বপ্ন
মাদানির রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল 'মুত্তাহিদা কওমিয়্যত'—যৌথ বা মিশ্র জাতীয়তার ধারণা। তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'মুত্তাহিদা কওমিয়্যত অউর ইসলাম' (Composite Nationalism and Islam)-এ তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে ভারতের হিন্দু ও মুসলমান ধর্মীয় পরিচয়ে আলাদা হলেও ভূমি, ইতিহাস ও সংস্কৃতিগত অভিজ্ঞতায় একটি যৌথ জাতিসত্তার অংশ। তার মতে, আধুনিক রাজনৈতিক জীবনের মূল প্রতিষ্ঠান হলো জাতিরাষ্ট্র—এবং ভারত তেমনই একটি রাষ্ট্র, যেখানে ধর্মনির্বিশেষে সকলে মিলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়তে হবে।
এই অবস্থানের পেছনে ছিল মাদানির গভীর ঐতিহাসিক বিশ্বাস—ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদই মুসলমানদের সবচেয়ে বড় শত্রু, এবং বিভাজন এই শত্রুকেই সাহায্য করে। তিনি পাকিস্তানের দাবিকে দেখেছিলেন ব্রিটিশদের ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির একটি হাতিয়ার হিসেবে। ভেনকাট ধুলিপালার (Venkat Dhulipala) 'ক্রিয়েটিং আ নিউ মদিনা: স্টেট পাওয়ার, ইসলাম, অ্যান্ড দ্য কোয়েস্ট ফর পাকিস্তান ইন লেট কলোনিয়াল নর্থ ইন্ডিয়া' (Creating a New Medina: State Power, Islam, and the Quest for Pakistan in Late Colonial North India) গ্রন্থে উদ্ধৃত মাদানির বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি মনে করতেন পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হলে ভারতে রয়ে যাওয়া মুসলমানরা আরো বিপদে পড়বে—সংখ্যালঘু হিসেবে তাদের অবস্থান আরো দুর্বল হবে।
মাদানির এই ভাবনাকে সাংগঠনিক শক্তি দিয়েছিল জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ—১৯১৯ সালে প্রতিষ্ঠিত দেওবন্দি আলেমদের রাজনৈতিক সংগঠন। এই সংগঠন শুধু পাকিস্তানের বিরোধিতা করেনি, ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছে—খিলাফত আন্দোলনে অংশগ্রহণ, ১৯৩০-এর দশকে কংগ্রেসের আইন অমান্য আন্দোলনে সমর্থন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ সৈন্য নিয়োগের বিরোধিতা তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এর বিপরীতে মুসলিম লিগ তখন জনমানসে পরিচিত ছিল খান বাহাদুর, জায়গিরদার ও উপাধিধারী এলিটদের দল হিসেবে—ব্রিটিশ-ঘেঁষা রাজনীতির প্রতীক। এই সামন্ত শ্রেণিই ছিল লিগের প্রধান সমর্থক—যারা ব্রিটিশ শাসনে নিজেদের স্বার্থ দেখতেন। তাই মাদানি ও অন্যরা মুসলিম লিগকে সাধারণ মুসলমানের দল নয়, বরং এলিট শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী দল হিসেবে সমালোচনা করতেন।
মাদানি কংগ্রেসের সঙ্গে কাজ করেছেন, কিন্তু কংগ্রেসের অনুগত ছিলেন না। ১৯২৮ সালে মতিলাল নেহরু কমিটির রিপোর্টে মুসলমানদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা না থাকায় জমিয়ত কংগ্রেস থেকে সরে আসে, আবার ১৯২৯ সালে কংগ্রেস পূর্ণ স্বাধীনতার লক্ষ্য গ্রহণ করলে ফিরে আসে। এই স্বাধীন অবস্থান থেকেই মাদানি মুসলিম লিগের সমালোচনা করেছেন—তাদের নেতৃত্বকে ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থের পরিবর্তে বিত্তশালীদের স্বার্থের রক্ষক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
ইসলামি রাষ্ট্র না মুসলিম রাষ্ট্র: মওদুদির পাকিস্তান-বিরোধিতার যুক্তি
মওদুদিও পাকিস্তানের বিরোধিতা করেছিলেন—কিন্তু মাদানির মতো একই অবস্থান থেকে নয়। মাদানি যেখানে যৌথ জাতীয়তার স্বপ্ন দেখেছেন, মওদুদি সেখানে যেকোনো ধরনের জাতীয়তাবাদকেই অনৈসলামিক মনে করতেন। তার 'মাসালা-এ-কওমিয়াত' (The Problem of Nationalism) গ্রন্থে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে কোরআন জাতি বা রাষ্ট্রের ধারণাকে স্বীকৃতি দেয় না — স্বীকৃতি দেয় কেবল 'হিজব' বা আদর্শিক দলের। সৈয়দ ওয়ালি রেজা নাসর (Seyyed Vali Reza Nasr) তার 'মওদুদী অ্যান্ড দ্য মেকিং অব ইসলামিক রিভাইভালিজম' (Maududi and the Making of Islamic Revivalism) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে মওদুদির কাছে ইসলাম কোনো সম্প্রদায়ের পরিচয়চিহ্ন নয়, বরং একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থা।
মওদুদি মুসলিম লিগকে 'জামায়াতে জাহেলিয়্যাত' বলে অভিহিত করেছিলেন। লাহোর প্রস্তাব পাসের চার মাস আগেও তিনি লিখেছিলেন যে মুসলিম লিগের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কারো চিন্তাই ইসলামি ধারায় নয়। তার যুক্তি ছিল স্পষ্ট—শরিয়াহ ছাড়া মুসলমানদের জন্য একটি রাষ্ট্র গঠন করা কেবল রাজনৈতিক ভুল নয়, এটি একটি ধর্মীয় প্রতারণা। এমন একটি রাষ্ট্র ইসলামের নাম ব্যবহার করবে ঠিকই, কিন্তু পশ্চিমা শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করবে—মওদুদির ভাষায় এটি 'মুসলিম রাষ্ট্র', 'ইসলামি রাষ্ট্র' নয়। এই পার্থক্যটাই ছিল তার বিরোধিতার মূল ভিত্তি।
মওদুদি ১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামি প্রতিষ্ঠা করেন—যে রাজনৈতিক দলটি কংগ্রেসের যৌথ জাতীয়তাবাদ এবং মুসলিম লিগের মুসলিম জাতীয়তাবাদ—উভয়কেই একসঙ্গে প্রত্যাখ্যান করেছিল। তার লক্ষ্য ছিল একটি 'ইসলামি বিপ্লব' —যেখানে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে সম্পূর্ণ ইসলামি আইনের ভিত্তিতে। গণতন্ত্র সম্পর্কেও তার আপত্তি ছিল—তিনি মনে করতেন গণতন্ত্র সৃষ্টিকর্তার সার্বভৌমত্বের ওপরে মানুষের সার্বভৌমত্ব স্থাপন করে। তার বিকল্প ধারণা ছিল 'থিওডেমোক্রেসি'—যেখানে সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায় আল্লাহর বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবে।
এখানে মাদানি ও মওদুদির বিরোধিতার মিল ও পার্থক্য স্পষ্ট হয়। মিল একটাই—উভয়েই মুসলিম লিগের নেতৃত্বকে অযোগ্য মনে করেছেন এবং পাকিস্তান প্রকল্পের বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু পার্থক্য মৌলিক—মাদানি চেয়েছিলেন একটি যৌথ ভারতীয় জাতিরাষ্ট্র যেখানে মুসলমানরা অন্যদের সঙ্গে সমান অধিকারে থাকবে; মওদুদি চেয়েছিলেন একটি বিশুদ্ধ ইসলামি রাষ্ট্র— ভারত বা পাকিস্তান যেখানেই হোক। মাদানির কাছে প্রশ্নটি ভূরাজনৈতিক ও কৌশলগত; মওদুদির কাছে প্রশ্নটি আদর্শিক ও ধর্মতাত্ত্বিক।
এই দুই অবস্থানের পাশাপাশি আরেকটি ঘটনা সেই সময়কার রাজনৈতিক জটিলতাকে আরো স্পষ্ট করে তোলে। কংগ্রেস-ঘেঁষা সংগঠন মজলিস-ই-আহরার জিন্নাহর 'কায়েদ-ই-আজম' উপাধিকে বিদ্রূপ করে তাকে 'কাফির-ই-আজম' এবং পাকিস্তানকে 'পালিদস্তান' বা 'নাপাকিস্তান' বলে অভিহিত করত—'পালিদ' আরবি-ফারসি শব্দ, অর্থ অপবিত্র। অথচ ১৯৪৭ সালের পরই এই সংগঠনের নেতৃত্ব নবগঠিত পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করে। আদর্শের রাজনীতি কতটা দ্রুত স্বার্থের রাজনীতিতে রূপান্তরিত হতে পারে—এই ঘটনা তারই দৃষ্টান্ত।
মওদুদির রাজনৈতিক জীবনও এই বৈপরীত্য থেকে মুক্ত ছিল না। ১৯৪৭ সালের ১৪ অগাস্টের পর তিনি লাহোরে চলে যান এবং জামায়াত পুনর্গঠন করেন। তার নতুন যুক্তি ছিল—পাকিস্তান যদিও ইসলামি রাষ্ট্র হিসেবে জন্ম নেয়নি, তবু এই মাটিই সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত ক্ষেত্র। রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করা নয়, বরং ভেতর থেকে ইসলামীকরণ—এটাই ছিল তার নতুন কৌশল। অতীতের মুসলিম লিগ-বিরোধিতা ধীরে ধীরে চাপা পড়ে যায়। যিনি জিন্নাহর নেতৃত্বকে অযোগ্য বলেছিলেন, তিনিই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর সেই নেতৃত্বের তৈরি রাষ্ট্রে নিজের আদর্শিক প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে নামেন।
এভাবেই আদর্শ ও বাস্তবতার দ্বন্দ্বে মাদানি ও মওদুদি—দুজনেই ইতিহাসের কাছে পরাজিত হন, কিন্তু তারা যে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তার রেশ বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে আজও গভীরভাবে রয়ে গেছে।
বিতর্কের উত্তরাধিকার: আজকের দক্ষিণ এশিয়ায় প্রাসঙ্গিকতা
পাকিস্তান গঠনের পর মওদুদি তার রাজনীতি ও চিন্তায় সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করেন। যিনি পাকিস্তান আন্দোলনকে অনৈসলামিক বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং জিন্নাহর নেতৃত্বকে 'জামায়াতে জাহেলিয়্যাত' বলেছিলেন—সেই মওদুদির জামায়াতে ইসলামিই পরবর্তীকালে পাকিস্তানে সবচেয়ে শক্তিশালী ইসলামি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। জেনারেল জিয়াউল হকের ইসলামীকরণ প্রক্রিয়ায় জামায়াত সবচেয়ে সক্রিয় অংশীদার হয়ে ওঠে—হাজার হাজার জামায়াত সমর্থক বিচারবিভাগ ও সিভিল সার্ভিসে নিয়োগ পান। যে রাষ্ট্রের জন্মকে মওদুদি 'ধর্মীয় প্রতারণা' বলেছিলেন, সেই রাষ্ট্রই তার আদর্শ বাস্তবায়নের ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।
মাদানির রাজনৈতিক পরিণতিও সরল ছিল না। তিনি যে যৌথ জাতীয়তার স্বপ্ন দেখেছিলেন, ১৯৪৭ সালের বিভাজন তা ধূলিসাৎ করে দেয়। বিভাজনের পর ভারতে রয়ে যাওয়া মুসলমানরা সংখ্যালঘু হিসেবে এমন এক অবস্থানে পড়েন যা মাদানি আশঙ্কা করেছিলেন। জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ ভারতে টিকে রইল ঠিকই, কিন্তু তার রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ে। বিভাজনের বাস্তবতা মাদানির সমস্ত হিসাব-নিকাশ উল্টে দেয়। বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত—তিনটি ভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত উপমহাদেশে মাদানির 'মুত্তাহিদা কওমিয়্যত'-এর স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।
তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই বিতর্কের গভীরতা ধরা পড়ে। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন (Benedict Anderson) তার যুগান্তকারী 'ইমাজিনড কমিউনিটিজ' (Imagined Communities) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে জাতি আসলে একটি 'কল্পিত সম্প্রদায়'—একটি আধুনিক নির্মাণ, যা ছাপাখানা ও পুঁজিবাদের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। আর আর্নেস্ট গেলনার যুক্তি দিয়েছেন যে জাতীয়তাবাদ আধুনিক শিল্পসমাজের একটি অনিবার্য পরিণতি। এই তত্ত্বের আলোকে দেখলে মাদানির যৌথ জাতীয়তার ধারণা ছিল আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেওয়া—আর মওদুদির ইসলামি রাষ্ট্রের ধারণা ছিল সেই আধুনিক কাঠামোকেই একটি ধর্মীয় আদর্শের ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ করার প্রকল্প। দুজনেই তাদের নিজস্ব উপায়ে আধুনিকতার মুখোমুখি হয়েছিলেন—প্রশ্ন ছিল কোন পথে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে এই দুই ধারার প্রতিফলন সুস্পষ্ট। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল মূলত একটি ভাষিক ও সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের বিজয়—যা মাদানির যৌথ জাতিসত্তার ধারণার কাছাকাছি, যদিও ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পরেও বাংলাদেশে মওদুদির আদর্শিক উত্তরাধিকার বহনকারী জামায়াতে ইসলামী রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থেকেছে। ১৯৭৫ সালের পট পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামবাদের রাজনীতির পুনরুত্থান ঘটে— এবং ধীরে ধীরে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা বাদ পড়ে, রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলাম যোগ হয়। এই পরিবর্তনগুলো মাদানি-মওদুদি বিতর্কের বাংলাদেশীয় অধ্যায়।
আজকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় জাতি ও ইসলামের এই দ্বন্দ্ব নতুন রূপে ফিরে এসেছে। ভারতে হিন্দু জাতীয়তাবাদের উত্থান মুসলিম সংখ্যালঘুদের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে—মাদানি যে ঐক্যের স্বপ্ন দেখেছিলেন তা আজ আরো দূরে সরে গেছে। পাকিস্তানে মওদুদির আদর্শের উত্তরাধিকার এখনো শক্তিশালী—কিন্তু সেই আদর্শ রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতা দিতে পারেনি, বরং সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও চরমপন্থার পথ উন্মুক্ত করেছে। আর বাংলাদেশে ধর্মীয় পরিচয় ও জাতিসত্তার টানাপোড়েন এখনো রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে আছে। সৈয়দ ওয়ালি রেজা নাসর তার গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মওদুদির চিন্তা শুধু পাকিস্তান নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বের ইসলামবাদী আন্দোলনকে প্রভাবিত করেছে—মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড থেকে শুরু করে বাংলাদেশের জামায়াত পর্যন্ত।
তাহলে কি এই বিতর্ক আজও অমীমাংসিত? উত্তর হলো—হ্যাঁ। মাদানির যৌথ জাতীয়তার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়নি, কিন্তু তার এই সতর্কবার্তা যে বিভাজন দুর্বলদের আরো দুর্বল করে—তা আজও প্রাসঙ্গিক। মওদুদির ইসলামি রাষ্ট্রের ধারণা বিশ্বজুড়ে ইসলামবাদী আন্দোলনকে অনুপ্রাণিত করেছে, কিন্তু সেই আদর্শের ব্যবহারিক প্রয়োগ বারবার সহিংসতা ও কর্তৃত্ববাদের দিকে ঝুঁকেছে। বারবারা মেটকাফ (Barbara Metcalf) তাঁর 'ইসলামিক রিভাইভাল ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া' (Islamic Revival in British India) গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে দেওবন্দি ঐতিহ্য—যার উত্তরাধিকারী মাদানি—মূলত একটি সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজের টিকে থাকার কৌশল হিসেবে গড়ে উঠেছিল। সেই কৌশলের প্রাসঙ্গিকতা আজও শেষ হয়নি।
মাদানি ও মওদুদির বিতর্ক শেষ পর্যন্ত একটিই প্রশ্নে এসে ঠেকে—মুসলমানদের রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তি কী হবে? ভূমি, ইতিহাস ও মানবিক ঐক্যের ভিত্তিতে গড়া জাতিসত্তা, নাকি একটি বিশুদ্ধ আদর্শিক রাষ্ট্র যেখানে ধর্মই হবে রাজনীতির একমাত্র মানদণ্ড? এই প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই—এবং দক্ষিণ এশিয়া এখনো সেই উত্তর খুঁজে চলেছে। মাদানি ও মওদুদি দুজনেই তাদের নিজস্ব সীমাবদ্ধতার মধ্যে এই প্রশ্নের উত্তর দিতে চেয়েছিলেন। তাদের বিতর্কের পুনর্পাঠ আমাদের শেখায়— ইতিহাসের জটিল প্রশ্নগুলো সরল উত্তরে মেলে না, এবং একটি যুগের অমীমাংসিত বিতর্ক পরের যুগে নতুন প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসে।
সাঈদ ইফতেখার আহমেদ শিক্ষক, স্কুল অব সিকিউরিটি অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিজ, আমেরিকান পাবলিক ইউনিভার্সিটি সিস্টেম। ই-মেইল: [email protected]