Published : 13 Jul 2026, 09:45 PM
গণভোটের রায় উপেক্ষা করে সংবিধান সংশোধন কমিটি গঠন করার অভিযোগ তুলে জাতীয় সংসদের অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
তারা বলেছেন, কমিটির ধারণাগত ভিত্তিই তারা গ্রহণ করেন না; তাই এতে সদস্য দেওয়ারও প্রশ্ন আসে না।
সোমবার জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই লক্ষ্যেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল, জোট ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত একটি বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চিফ হুইপ জানান, ১৭ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এতে বিএনপির সাতজন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির একজন, গণসংহতি আন্দোলনের একজন, গণঅধিকার পরিষদের একজন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন, স্বতন্ত্র একজন এবং বিরোধী দলের পাঁচজন সদস্য রাখার পরিকল্পনা ছিল।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের সদস্যদের নাম চেয়ে কয়েক দফা যোগাযোগ করা হলেও তারা এখন পর্যন্ত কোনো নাম দেননি। তাই বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি পদ শূন্য রেখে আপাতত ১২ সদস্যের কমিটি গঠনের প্রস্তাব করা হচ্ছে। পরে বিরোধী দল সদস্যদের নাম দিলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
এরপর বিরোধী দলীয় নেতা শফিকুর রহমান দাঁড়িয়ে বলেন, তারা কখনও কমিটিতে সদস্য দেওয়ার আশ্বাস দেননি।
"আমরা আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করেছি। আমরা কখনো বলি নাই যে আমরা নাম দেব। আমরা কনসেপচুয়ালি এটাকে একসেপ্ট করি নাই।"
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো গণভোটের ফল বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই অঙ্গীকার থেকেই তারা সংসদ সদস্য হিসেবে এবং সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
"ওইটাকে যদি বাইপাস করার জন্য এই কমিটি গঠন করা হয়, তাহলে আমরা এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছি।"
তিনি বলেন, “গণতন্ত্রের দাবি হচ্ছে জনগণের মতামতকে সম্মান করা। প্রায় ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ যে মতামত দিয়েছেন, সেটি এভাবে উপেক্ষা করা হলে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হবে।
"জনগণের এই অভিপ্রায়কে কোনোভাবেই অপমান করা উচিত হবে না। এজন্য তাদের প্রতি সম্মান রেখেই আমরা শুধু এই কমিটিতে অংশগ্রহণ করব না, জনগণের রায়কে সম্মান করা হচ্ছে না—এর প্রতিবাদে আমরা ওয়াকআউট করছি।"
বক্তব্য শেষ করে রাত ৯টা ২৫ মিনিটে বিরোধী দলের সদস্যরা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করেন।
ওয়াকআউটের পর বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের অবস্থান তাদের রাজনৈতিক বিবেচনা হতে পারে। তবে বর্তমান সংবিধানের আওতায় থেকেই প্রয়োজনীয় সংশোধন আনতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হয়েছে, জাতীয় সংসদ গঠিত হয়েছে, রাষ্ট্রপতির ভাষণ হয়েছে এবং সেই ভাষণের ওপর সরকার ও বিরোধী দল উভয়ই আলোচনা করেছে।
তিনি বলেন, "সংবিধান সংশোধন কমিটি করা ছাড়া, সংবিধান সংশোধন করা ছাড়া এই জাতিকে জনগণের নতুন প্রত্যাশা অনুযায়ী এগিয়ে নিতে পারব না।"
বিরোধী দলের দুই ধরনের শপথের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই।
মন্ত্রী বলেন, আগে সংবিধান সংশোধন হতে হবে। পরে যদি রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানে সংস্কার পরিষদের বিধান যুক্ত হয়, তখন সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
তিনি বলেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হলেও সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন। সেই আলোচনার উপযুক্ত জায়গা হচ্ছে সংসদের বিশেষ কমিটি।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, কমিটি বিচার বিভাগ, আইনজীবী, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী, সংবাদপত্রের সম্পাদক, বিভিন্ন অংশীজন এবং জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরকারী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সুপারিশ প্রণয়ন করবে।
বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ইমোশনাল রাজনীতি না করে. একটি শক্তিশালী সংবিধান সংশোধনী আনতে সহযোগিতা করা উচিত।
পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল কণ্ঠভোটে প্রস্তাবটি অনুমোদনের জন্য দিলে তা গৃহীত হয়। এর মধ্য দিয়ে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ শূন্য রেখে ১২ সদস্যের সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠিত হয়।
বিশেষ কমিটিতে কারা
সংসদ নেতা তারেক রহমানের পক্ষে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। এতে সভাপতি করা হয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে।
কমিটির সদস্যরা হলেন— সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল উদ্দিন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন, বিএনপির সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন, শাকিলা ফারজানা, মাহমুদুল হক রুবেল, গণসংহতি আন্দোলনের সংসদ সদস্য জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, বিজেপির সংসদ সদস্য আন্দালিভ রহমান পার্থ, গণঅধিকার পরিষদের সংসদ সদস্য নুরুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সংসদ সদস্য মো. অলি উল্লাহ।
বিরোধী দলের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি পদ আপাতত শূন্য রাখা হয়েছে। পরে বিরোধী দল সদস্যদের নাম দিলে তাদের অন্তর্ভুক্ত করে কমিটি পুনর্গঠন করা হবে।
চাকরিতে কোটা নিয়ে জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার। অবসান ঘটে শেখ হাসিনার সরকারের টানা দেড় দশকের শাসনের।
দেশের হাল ধরার পর সংবিধান, বিচার বিভাগ, পুলিশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), নির্বাচন ব্যবস্থা ও জনপ্রশাসন সংস্কারের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। পরে সংস্কারের আওতা বাড়িয়ে গঠন করা হয় আরো পাঁচটি কমিশন।
এসব কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা, সংলাপ, বিতর্ক পেরিয়ে গেল বছরের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের উপস্থিতিতে জুলাই জাতীয় সনদ গৃহীত হয়।
এরপর নভেম্বরে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন, যে আদেশ অনুসারে গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয়।
গেল ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে গণভোট হয়, তাতে প্রায় ৬৯ শতাংশ ভোট পড়ে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে।
রাষ্ট্রপতির ওই আদেশ অনুসারে, সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে ২০৯ আসনে জয় পাওয়া বিএনপির প্রার্থীরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি, তারা শুধু সংসদ সদস্য হিসেবেই শপথ নেন।
অন্যদিকে আলাদা করে উভয় শপথই নেন জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের ৭৭ জন সদস্য।
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দলগুলোর মধ্যে চলে আসা মতবিরোধের ফারাক সেদিনই অনেকটা স্পষ্ট হয়ে যায়।