Published : 14 Jul 2026, 12:10 AM
টানা ভারি বর্ষণ আর জলাবদ্ধতার মধ্যে রাজধানীর সড়কগুলোতে পিচ-খোয়া উঠে ছোটবড় গর্ত থেকে শুরু করে কোথাও সড়কের অনেকাংশ ধসেও গেছে।
দীর্ঘ সময় সড়কে পানি আটকে থাকার ফলে নিচের মাটি আর সড়কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে এ অবস্থা তৈরির হওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে এখন যানবাহন চলাচলে ভোগান্তি থেকে শুরু পরে এসব খানাখন্দ দীর্ঘ সময়ের দুর্ভোগের কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা তাদের।
গত দুদিনের ভারি বৃষ্টিতে গুলশান লেকের পানি উপচে গুলশান-শাহজাদপুর সংযোগ সড়কের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পানির তোড়ে রোববার সকালের দিকে ওই সড়কের দক্ষিণ পাশের একটি অংশ ধসে পড়ে। সোমবারও পানির স্রোত থাকায় ভাঙনের পরিধিও বাড়তে দেখা যায়।
নিরাপত্তার স্বার্থে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে দিয়েছে।
পুরান ঢাকার ধোলাইখাল সংলগ্ন নারিন্দা মোড়ে ওয়াসার পুরনো পানির পাইপ ফেটে মাটি সরে যাওয়ায় সেখানেও সড়ক ধসে গেছে। ফলে ওই রুটে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
এছাড়া অন্যান্য সড়কের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় ভাঙনের পাশাপাশি সড়কে মাঝেও গর্ত তৈরি হয়েছে।

গুলশান-শাহজাদপুর সংযোগ সড়কের ধস নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা গণেশ চন্দ্র কর্মকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সড়কের নিচ দিয়ে দুটো পাইপ দিয়ে লেকের দুই অংশ যুক্ত। কয়েকদিন অতিরিক্ত বৃষ্টিতে আবর্জনা জমে পাইপ জ্যাম হয়ে যায়। পরে পানি রাস্তার উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়া শুরু হলে একপর্যায়ে রাস্তা ভেঙে যায়।”
স্থানীয় আরেক বাসিন্দা ব্যবসায়ী জব্বার হোসেনের মতে, পানি প্রবাহের জন্য দুটি পাইপ পর্যাপ্ত ছিল না।
স্থানীয় বাসিন্দাদের আরেকজন শায়লা বেগম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ছোট ছেলেমেয়েরা ভাঙা রাস্তার পানির ধারে খেলছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। প্রশাসনের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সোমবার বিকালে গুলশান খালের দুই পাশে জলাবদ্ধতার পরিস্থিতি দেখতে গিয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘বর্তমান জলাবদ্ধতার দায় কারো না, দায় সঠিক পরিকল্পনার।”
পুরান ঢাকার ধোলাইখাল সংলগ্ন নারিন্দা মোড়ে রাস্তা ধসের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা রজব আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রোববারের টানা বর্ষণের মাঝে বিকালের দিকে হঠাৎ করেই রাস্তাটি দেবে বিশাল গর্তের সৃষ্টি হয়। পরে আশপাশের অংশও ভেঙে পড়ে।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রশাসক আব্দুস সালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাস্তার নিচে থাকা ওয়াসার একটি বেশ পুরোনো পাইপ লিক করেছিল। সেখান থেকে পানি বেরিয়ে নিচের মাটি সরে যাওয়ার ফলেই সড়কটি ধসে পড়ে।

“আমরা কাজ শুরু করেছি, তবে পুরো মেরামত সম্পন্ন হতে সপ্তাহখানেক সময় লাগবে।”
সোমবারও রাজধানীর অনেক এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা গেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, বনানী, ধানমন্ডি লেকসংলগ্ন সড়ক, কাজলা, মগবাজারের আমবাগান, শান্তিনগর ও ধানমন্ডি-২৭ নম্বরে পানি জমে ছিল।
এ ছাড়া গুলশান, বারিধারা, মোহাম্মদপুরের একাংশ, মেরুল বাড্ডা, ডিআইটি প্রজেক্ট এলাকা, ইসিবি চত্বর, মালিবাগ, সায়েদাবাদ, আগারগাঁও, ফার্মগেট, তেজগাঁও, শনির আখড়া, পুরান ঢাকার বংশাল ও নাজিমউদ্দিন রোড, মিরপুর-১৩, কালশী, হাতিরঝিল ও কালাচাঁদপুরসহ বিভিন্ন সড়কেও জলাবদ্ধতা দেখা যায়।
বাড্ডা, রামপুরা, মতিঝিল, মৌচাক, মালিবাগ, শান্তিনগর, শান্তিবাগ ও কাকরাইল এলাকায় দেখা যায়, সড়কে নিচু অংশে দিনের পর দিন পানি জমে থাকায় ওপরের স্তর আলগা হয়ে কোথাও কোথাও উঠে গেছে। দুর্বল সড়ক কাঠামোয় ভারী যানবাহন চলায় ওপরের স্তর উঠে খোয়া ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন জায়গায় ছোট-বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
যোগাযোগ ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, টানা বৃষ্টিতে রাজধানীতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় সড়কের ক্ষয়ক্ষতির ঝুঁকি বেড়েছে। বিশেষ করে নিচুভূমি ভরাট করে গড়ে ওঠা এলাকায় এ ঝুঁকি আরো বেশি।
“ঢাকার অনেক এলাকায় নিচুভূমি ভরাট করে জনবসতি ও সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এসব জায়গার মাটির প্রকৌশলগত সক্ষমতা সবসময় সমান নয়। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে সড়কের নিচের মাটিতে কাঠামোগত দুর্বলতা তৈরি হয়, যা পরে সড়কে ক্ষয় ও ধসের কারণ হতে পারে।”
তিনি বলেন, “পিচের (বিটুমিনের) সবচেয়ে বড় শত্রু হল পানি। দীর্ঘ সময় পানির সংস্পর্শে থাকলে বিটুমিন আর পাথরকে ধরে রাখতে পারে না। ফলে বিটুমিন আলাদা হয়ে যায়, পাথর খুলে আসে এবং ধীরে ধীরে সড়ক ভেঙে পড়তে শুরু করে।
“রাজধানীর অধিকাংশ সড়কই নমনীয়। সব সড়ক কংক্রিট বা ‘রিজিড পেভমেন্টে’ রূপান্তর করা সম্ভব নয়। কারণ এতে প্রাথমিক ব্যয় অনেক বেশি। তাই কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থাই এ ধরনের সড়ক রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।”
অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও খাল-বিল হারিয়ে যাওয়ায় ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন হাদিউজ্জামান।
তার কথায়, “আদর্শভাবে প্রতিটি এলাকার ড্রেন স্থানীয় খালের সঙ্গে, আর খাল নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা। কিন্তু সেই সমন্বিত নেটওয়ার্ক এখন আর কার্যকর নেই। একইসঙ্গে শহরে পর্যাপ্ত আউটলেট ও পাম্পিং স্টেশনেরও অভাব রয়েছে।
“শুধু কোথাও কোথাও ড্রেন বা পাইপ বড় করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। পুরো ড্রেনেজ নেটওয়ার্ককে একটি সমন্বিত মাস্টার প্ল্যানের আওতায় এনে উন্নয়ন করতে হবে।”
রাজধানীতে দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকলে সড়ক আরো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি।
“কারণ পানির কারণে শুধু সড়কের ওপরের বিটুমিন স্তর নয়, নিচের সাবগ্রেড বা ভিত্তি মাটিও দুর্বল হয়ে পড়ে। ঝুঁকি শুধু সড়কের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিচু ভূমি ভরাট করে নির্মিত অনেক ভবনও দীর্ঘসময় জলাবদ্ধতায় থাকলে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় কাদামাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে, সেখানে এ ঝুঁকি বেশি।”
নগর কর্তৃপক্ষ কী বলছে?
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সৃষ্ট জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সারাদিন মাঠে ছিলেন। তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধ এলাকাগুলো থেকে দ্রুত পানি নামিয়ে আনার দিকেই তাদের প্রধান নজর ছিল।
ওই কর্মকর্তা বলেন, “ডিএনসিসির প্রধান সড়কগুলোর অধিকাংশ স্থান থেকেই পানি নেমে গেছে। তবে কিছু এলাকায় এবং কয়েকটি লোকাল সড়কে এখনো পানি রয়েছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে কোথায় কতটুকু সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা মূল্যায়ন করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় দ্রুত মেরামতের কাজ শুরু করা হবে।”
গুলশান-শাহজাদপুর সংযোগ সড়কের অংশ ধসে পড়া নিয়ে এ কর্মকর্তা বলেন, “লেকের দুই অংশের মধ্যে পানি চলাচলের জন্য থাকা সীমিত পাইপের পরিবর্তে ভবিষ্যতে পুরো অংশটি উন্মুক্ত রেখে ওপর দিয়ে সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে লেকের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে।
“রাজউককে সেখানে রাস্তার পরিবর্তে একটি সেতু নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হবে, যাতে লেকের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়। প্রশাসক আনুষ্ঠানিকভাবেও বিষয়টি জানাবেন।”
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “স্বাভাবিক বৃষ্টি হলে অধিকাংশ এলাকা থেকে ২-৩ ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যায়। তবে বকশিবাজার, নিউ মার্কেট, গাউছিয়া ও মালিবাগসহ কয়েকটি এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা এখনো পর্যাপ্ত নয়।
“এসব এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে পৃথক প্রকল্প নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে পরিকল্পনা কমিশন পৃথক পরিকল্পনার পরিবর্তে সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প (ডিপিপি) আকারে প্রস্তাব দিতে বলায় বিষয়টি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে যায়। এখন আবার নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই জলাবদ্ধতা দূর করতে হলে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা ছাড়া বিকল্প নেই।”
ড্রেন পরিষ্কার থাকলেও পলিথিন ও বর্জ্যের কারণে মুখ বন্ধ হয়ে সাময়িক সমস্যা হওয়ার কথা বলেন তিনি।
সড়কে ভাঙন নিয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন, ভারি বৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও পানির তীব্র স্রোতে মাটির নিচের স্তর দুর্বল হয়ে ভাঙনের ঘটনা ঘটতে পারে। এ ছাড়া যেসব সড়ক দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকে, সেগুলোর বিটুমিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় খানাখন্দ ও ক্ষতি তৈরি হয়।
“যেসব সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলো মেরামতের প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। তবে বৃষ্টি না থামলে এবং রাস্তা শুকানোর সুযোগ না হলে মেরামতের কাজ শুরু করা সম্ভব নয়।”
আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, রাজধানীতে রোববার সকাল ৬টা থেকে সোমবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৭ ঘণ্টায় ঢাকায় ১১০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার ৬টা পর্যন্ত তার আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৪১ মিলিমিটার।
আগামী ১৫ জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের তীব্রতা খানিকটা কমে আসার কথা তুলে ধরে আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলছেন, পরবর্তীতে পুনরায় বৃষ্টিপাত বাড়তে পারে।