Published : 14 Jul 2026, 04:14 PM
বিশ্বকাপ ফুটবলের ২৩তম আসর, ২০২৬ বিশ্বকাপ, আফ্রিকার জন্য শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়; একটি ঐতিহাসিক বাঁকবদল। কোয়ার্টার ফাইনালে এসে আফ্রিকার যাত্রা শেষ হয়েছে, কিন্তু এই মহাদেশের ফুটবলের অগ্রযাত্রা নয়। বরং এবারের বিশ্বকাপ এমন কিছু ইঙ্গিত রেখে গেছে, যা আগামী এক দশকে বিশ্ব ফুটবলের শক্তির ভারসাম্যকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে একটি অলিখিত ধারণা প্রচলিত ছিল। ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকাই শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র কেন্দ্র, আর আফ্রিকা প্রতিভার অফুরন্ত ভাণ্ডার হলেও শিরোপার প্রকৃত দাবিদার নয়। ২০২৬ বিশ্বকাপ ওই ধারণাকে আরও দুর্বল করেছে। গত দুই বিশ্বকাপকে পাশাপাশি রেখে দেখলে বোঝা যায়, আফ্রিকার উত্থান কোনো আকস্মিক বিস্ময় নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের ফল।
এই পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। মরক্কোর সেমিফাইনালে ওঠা শুধু একটি দেশের সাফল্য ছিল না; সেটি ছিল আফ্রিকান ফুটবলের সক্ষমতার এক ঐতিহাসিক ঘোষণা। প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের শেষ চারে পৌঁছে তারা দেখিয়েছিল, আধুনিক ফুটবলে সাফল্য শুধু প্রতিভা বা শারীরিক সামর্থ্যের ওপর নির্ভর করে না; কৌশলগত শৃঙ্খলা, মানসিক দৃঢ়তা এবং সংগঠিত দলগত ফুটবলও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রুপ পর্বে বেলজিয়াম ও ক্রোয়েশিয়াকে পেছনে ফেলে শীর্ষস্থান অর্জন, শেষ ষোলোতে স্পেনকে টাইব্রেকারে হারানো এবং কোয়ার্টার ফাইনালে পর্তুগালকে বিদায় করা ছিল ওই অভিযাত্রার স্মরণীয় অধ্যায়। তবে মরক্কোর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল ফলাফলের বাইরের একটি পরিবর্তন। তারা বিশ্ব ফুটবলকে বুঝিয়ে দিয়েছিল, আফ্রিকান দল মানেই আর শুধুই গতি, শক্তি কিংবা ব্যক্তিগত নৈপুণ্য নয়; তারা ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কৌশল বদলাতে পারে, প্রতিপক্ষের দুর্বলতা কাজে লাগাতে পারে এবং বড় মঞ্চের চাপও সামলাতে পারে।
মরক্কো পথ দেখিয়েছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপ দেখাল, ওই পথ ধরে হাঁটার মতো দল আফ্রিকায় এখন একটির বেশি।
৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটে বিশ্বকাপের দরজা আরও বিস্তৃত হয়েছে। এর ফলে আফ্রিকার সরাসরি অংশগ্রহণ বেড়ে হয়েছে ১০টি। এটি বিশ্বকাপ সম্প্রসারণের একটি কাঠামোগত ফল হলেও, একই সঙ্গে আফ্রিকান ফুটবলের সাম্প্রতিক অগ্রগতি এই সম্প্রসারণকে অর্থবহ করে তুলেছে। সুযোগ তখনই মূল্যবান হয়, যখন সেটিকে কাজে লাগানোর সামর্থ্য থাকে। এবারের বিশ্বকাপে আফ্রিকার দলগুলো দেখিয়েছে, ওই সামর্থ্য তাদের রয়েছে।
মরক্কো, মিশর, কেপ ভার্দে, দক্ষিণ আফ্রিকা, সেনেগাল, ঘানা, আলজেরিয়া, আইভরি কোস্ট, ডিআর কঙ্গো এবং তিউনিসিয়া; এই দশটি দেশের অংশগ্রহণ শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধি ছিল না; এটি ছিল আফ্রিকান ফুটবলের ভৌগোলিক বিস্তারেরও প্রতিফলন। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে আফ্রিকার দলগুলো আর রক্ষণাত্মক মানসিকতা নিয়ে মাঠে নামেনি। তারা ম্যাচ জিততে নেমেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই ওই বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা গেছে মাঠের খেলায়।
স্পেন, পর্তুগাল কিংবা উরুগুয়ের মতো দলের বিপক্ষে পয়েন্ট অর্জন, আবার নেদারল্যান্ডসের মতো শক্তিশালী দলকে বিদায় করা; এসব ফলাফলকে আর বিচ্ছিন্ন অঘটন বলা কঠিন। এক সময় আফ্রিকার কোনো দল ইউরোপের বড় শক্তিকে হারালে সেটিকে ‘আপসেট’ হিসেবে দেখা হতো। এখন ওই ভাষা বদলাতে শুরু করেছে। কারণ আফ্রিকার সাফল্য আর একক কোনো বিস্ময়ের গল্প নয়; এটি ধারাবাহিক উন্নয়নের প্রকাশ।

আফ্রিকার এই সাফল্যের সবচেয়ে বড় কারণ খুঁজতে গেলে শুধু ম্যাচের ফলাফলের দিকে তাকালে চলবে না। পরিবর্তনটি ঘটেছে খেলার ভেতরে। গত এক দশকে আফ্রিকান ফুটবলের সবচেয়ে বড় অর্জন প্রতিভা নয়, কৌশলগত পরিপক্বতা।
দীর্ঘদিন ধরে আফ্রিকান দলগুলোর বিরুদ্ধে একটি পরিচিত অভিযোগ ছিল। তারা অসাধারণ প্রতিভাবান, শারীরিকভাবে শক্তিশালী এবং গতিময়; কিন্তু ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে কৌশলগত শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারে না। ২০২৬ বিশ্বকাপে ওই ধারণা আর আগের মতো সত্য বলে মনে হয়নি।
মরক্কো, মিশর কিংবা কেইপ ভার্দের মতো দলগুলো দেখিয়েছে, আধুনিক ফুটবলে সাফল্য শুধু দ্রুত দৌড়ানো বা নিখুঁত ড্রিবলিংয়ের ওপর নির্ভর করে না। কখন রক্ষণ নিচে নামাতে হবে, কখন প্রতিপক্ষকে উঁচুতে চাপ দিতে হবে, কখন খেলার গতি কমিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে হবে; ওই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতাই এখন বড় পার্থক্য গড়ে দেয়। কেপ ভার্দের সংগঠিত রক্ষণভাগ ও দ্রুত পাল্টা আক্রমণ, কিংবা মরক্কোর মাঝমাঠনির্ভর প্রেসিং ফুটবল এই পরিবর্তনেরই উদাহরণ।
এই রূপান্তরের পেছনে রয়েছে একাধিক কাঠামোগত কারণ। ইউরোপের শীর্ষ লিগগুলোতে আফ্রিকান ফুটবলারদের উপস্থিতি আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। ফলে তারা শুধু উন্নত প্রশিক্ষণই পাচ্ছেন না, আধুনিক ফুটবলের কৌশলগত দর্শনের মধ্যেও বেড়ে উঠছেন। একই সঙ্গে আফ্রিকার বিভিন্ন ফুটবল ফেডারেশন বিদেশি কোচের ওপর একচ্ছত্র নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের কোচদের ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেছে। এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া আফ্রিকার ১০টি দলের মধ্যে ৬টির দায়িত্বে ছিলেন স্থানীয় কোচ। এটি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি আত্মবিশ্বাসেরও একটি সূচক। কারণ দীর্ঘদিন ধরে যে ধারণা প্রচলিত ছিল, বড় সাফল্য পেতে হলে ইউরোপীয় কোচই অপরিহার্য, ওই ধারণাও এখন প্রশ্নের মুখে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি প্রভাব পড়েছে আন্তর্জাতিক ফুটবলের খেলোয়াড় বাজারে। এক সময় ইউরোপীয় ক্লাবগুলো আফ্রিকায় মূলত দ্রুতগতির স্ট্রাইকার বা উইঙ্গার খুঁজতে আসত। এখন তাদের নজর ডিফেন্ডার, মিডফিল্ডার, এমনকি গোলরক্ষকদের প্রতিও। কারণ আফ্রিকান ফুটবলারদের আর শুধু শারীরিক সামর্থ্যের জন্য নয়; কৌশলগত বোধ, অবস্থান নির্বাচন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার জন্যও মূল্যায়ন করা হচ্ছে। অর্থাৎ আফ্রিকা আর শুধু প্রতিভা রপ্তানিকারক নয়; তারা এখন পরিণত ফুটবলারও তৈরি করছে।

এই বিশ্বকাপে আফ্রিকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি ছিল ডায়াসপোরা ফুটবলারদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি। ইউরোপে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আফ্রিকান বংশোদ্ভূত অনেক খেলোয়াড় এখন তাদের পূর্বপুরুষের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। ব্রাহিম দিয়াজের মরক্কোকে বেছে নেওয়া তার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ। এর ফলে আফ্রিকার জাতীয় দলগুলো শুধু দক্ষ খেলোয়াড়ই পাচ্ছে না; ইউরোপীয় একাডেমির ট্যাকটিক্যাল শিক্ষা, পেশাদার মানসিকতা এবং উচ্চ পর্যায়ের প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতাও জাতীয় দলে যুক্ত হচ্ছে।
তবে এটিকে কেবল খেলোয়াড় বাছাইয়ের বিষয় হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি পরিচয় ও শেকড়ের পুনর্নির্মাণেরও গল্প। বিশ্বায়নের যুগে জাতীয় পরিচয় আগের তুলনায় অনেক বেশি বহুমাত্রিক। ফ্রান্স, স্পেন কিংবা জার্মানিতে জন্ম নেওয়া একজন ফুটবলার একই সঙ্গে ইউরোপীয় নাগরিক এবং আফ্রিকান উত্তরাধিকারের ধারক হতে পারেন। আজ আফ্রিকার জাতীয় দলগুলো ওই বাস্তবতাকে দুর্বলতা নয়, শক্তিতে রূপান্তর করতে শিখছে। এক সময় যাদের ‘হারিয়ে যাওয়া প্রতিভা’ বলা হতো, তারাই এখন আফ্রিকার আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম ভিত্তি।
এই পরিবর্তন বিশ্ব ফুটবলের আরেকটি সত্যও সামনে নিয়ে এসেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল শুধু প্রতিভার প্রতিযোগিতা নয়; এটি ধারণা, প্রশিক্ষণ, অভিবাসন এবং পরিচয়েরও প্রতিযোগিতা। আফ্রিকার সাম্প্রতিক উত্থান তাই শুধু মাঠের সাফল্যের গল্প নয়, বিশ্বায়নের নতুন বাস্তবতারও প্রতিফলন।
আফ্রিকার এই বিশ্বকাপ অভিযাত্রার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অর্থনীতি। মাঠের সাফল্য শুধু সম্মানই এনে দেয়নি, ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগের সুযোগও তৈরি করেছে। প্রাইজমানি হিসেবে আফ্রিকার ১০টি দল মিলিয়ে পেয়েছে প্রায় ১৫৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। অনেক আফ্রিকান ফুটবল ফেডারেশনের বার্ষিক বাজেটের তুলনায় এই অঙ্ক বিশাল। তাই এই অর্থকে কেবল পুরস্কার হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ ফুটবল অবকাঠামো নির্মাণের প্রাথমিক মূলধন হিসেবেও দেখা যায়।
তবে অর্থ নিজে কখনো উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয় না। উন্নয়ন নির্ভর করে ওই অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তার ওপর। যদি তৃণমূল পর্যায়ের স্কাউটিং, বয়সভিত্তিক একাডেমি, নারী ফুটবল, কোচ উন্নয়ন এবং পেশাদার লিগের কাঠামো শক্তিশালী করতে এই অর্থ বিনিয়োগ করা যায়, তাহলে ২০৩০ কিংবা ২০৩৪ বিশ্বকাপে আরও পরিণত, আরও ধারাবাহিক একটি আফ্রিকাকে দেখা অস্বাভাবিক হবে না। কিন্তু যদি প্রশাসনিক দুর্বলতা, দুর্নীতি কিংবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এই সুযোগকে নষ্ট করে, তাহলে বর্তমান সাফল্যের বড় অংশই সাময়িক হয়ে যেতে পারে। ২০২৬ বিশ্বকাপ তাই আফ্রিকার সামনে শুধু সম্ভাবনা নয়, দায়িত্বও এনে দিয়েছে।
একসময় পেলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, ২০০০ সালের আগেই একটি আফ্রিকান দেশ বিশ্বকাপ জিতবে। ওই ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি হয়নি। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যদ্বাণীটি সময়ের হিসেবে ভুল হলেও তার অন্তর্নিহিত বিশ্বাসটি অমূলক ছিল না। আফ্রিকার ফুটবল এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বিশ্বকাপের শিরোপাকে আর কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তবে এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না; ধরা পড়ে দৃষ্টিভঙ্গিতে। এক সময় আফ্রিকার দলগুলোকে ‘ডার্ক হর্স’ বলা হতো। তারা ছিল বিস্ময়ের সম্ভাবনা, কিন্তু ধারাবাহিক সাফল্যের প্রত্যাশিত দাবিদার নয়। আজ ওই ভাষা পাল্টাচ্ছে। কারণ আফ্রিকার বিপক্ষে মাঠে নামা মানে এখন শুধু দ্রুতগতির বা শারীরিকভাবে শক্তিশালী একটি দলের মুখোমুখি হওয়া নয়; বরং সংগঠিত, কৌশলগতভাবে পরিণত এবং আত্মবিশ্বাসী এক ফুটবল সংস্কৃতির মুখোমুখি হওয়া।
বিশ্বকাপের ইতিহাস আসলে শুধু ট্রফির ইতিহাস নয়; এটি ক্ষমতার কেন্দ্র বদলে যাওয়ারও ইতিহাস। এক সময় এই ইতিহাসের ভাষা লিখেছে ইউরোপ, পরে লাতিন আমেরিকা। ২০২৬ বিশ্বকাপ ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী দিনের ইতিহাস হয়তো আর একক কোনো কেন্দ্রকে ঘিরে লেখা হবে না। বিশ্ব ফুটবল ধীরে ধীরে বহুকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, আর ওই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তিগুলোর একটি আজ আফ্রিকা।
জয় প্রকাশ সরকার লেখক ও সাংবাদিক। ই-মেইল: [email protected]