Published : 14 Jul 2026, 05:05 PM
সমাজে এমন ধারণা আছে যে, নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে বিয়ে না করলে মানুষ অপূর্ণ থেকে যায়। একা থাকা যেন বাধ্য হয়ে বেছে নেওয়া একটি জীবন।
তবে সময়ের সঙ্গে এই ধারণা বদলাচ্ছে। তাই এখন অনেকেই ইচ্ছাকৃতভাবে একা থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এটি কোনো ব্যর্থতা নয়, বরং নিজের জীবনকে নিজের মতো করে গড়ে তোলার সচেতন সিদ্ধান্ত।
যে কারণে বাড়ছে একা থাকার প্রবণতা
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ক্যারোলিনা অ্যাট গ্রিনসবোরো’-এর পরামর্শবিধ্যা বিভাগে অধ্যাপক ড. ক্রিশ্চিয়ান চ্যান রিয়েলসিম্পল ডটকমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “মানুষের চিন্তাধারা বদলে যাওয়াই এই পরিবর্তনের কারণ।”
তার মতে, “এখন অনেকেই মনে করেন, সুখী ও পরিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রেম বা দাম্পত্য সম্পর্কই একমাত্র পথ নয়। নিজের মানসিক সুস্থতা, অর্থনৈতিক স্থিতি, কর্মজীবনের উন্নতি এবং অর্থবহ সামাজিক সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ।”
তিনি আরও বলেন, “ভালো থাকা শুধু বৈবাহিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে না। একজন অবিবাহিত মানুষও সুস্থ, সুখী এবং পরিপূর্ণ জীবন যাপন করতে পারেন।”
একা থাকাকে আর সমস্যা হিসেবে দেখছেন না অনেকেই
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পারিবারিক কর্মসূচি ‘অল ইন সলিউশনস’-এর পরিচালক আলেকজান্দ্রা ফগলিয়া একই প্রতিবেদনে বলেন, “একা থাকাকে এমন একটি অবস্থা হিসেবে দেখা হত, যেন যেখান থেকে যত দ্রুত সম্ভব বেরিয়ে আসতেই হবে।”
বরং একা থাকাকে আত্মোন্নয়নের সুযোগ হিসেবে দেখছেন, তিনি।
তার কথায়, “নিজের দক্ষতা বাড়ানো, নতুন কিছু শেখা, ব্যক্তিগত লক্ষ্য পূরণ এবং নিজের মানসিক বিকাশের জন্য এই সময়কে কাজে লাগানো সম্ভব। তাছাড়া বিভিন্ন গবেষণাও উঠে এসেছে যে, সামগ্রিক সুস্থতার ক্ষেত্রে সম্পর্কের সংখ্যা নয়, সম্পর্কের মানই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
নিজের জন্য সময় পাওয়ার সুযোগ
আলেকজান্দ্রা ফগলিয়া বলেন, “সম্পর্কে থাকলে অনেক সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্য একজনের পছন্দ-অপছন্দ, পরিকল্পনা বা প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হয়। তবে একা থাকলে নিজের চাহিদা, লক্ষ্য এবং ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ থাকে।”
তিনি ব্যাখ্যা করেন, “ইচ্ছাকৃতভাবে একা থাকার সিদ্ধান্ত নিজের আর্থিক পরিকল্পনা, মানসিক স্বাস্থ্য এবং পেশাগত উন্নয়নে সময় ও মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ করে দেয়।”
এক্ষেত্রে নতুন দক্ষতা অর্জন, উচ্চশিক্ষা, ভ্রমণ কিংবা নিজের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করা সম্ভব হয়। এতে আত্মবিশ্বাসও বাড়ে।
মানসিক চাপ কমে
সম্পর্কের মতবিরোধ, দ্বন্দ্ব কিংবা অনিশ্চয়তা থেকে মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে প্রভাব পড়ে মানসিক স্বাস্থ্যে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘ক্রোমা ওয়েলনেস সেন্টার’-এর মনোবিদ ডা. রবার্ট ডিন ডেভিস একই প্রতিবেদনে বলেন, “শান্তিপূর্ণভাবে একা থাকা, মানসিক চাপ কমানোর কার্যকর উপায় হতে পারে।”
“সচেতনভাবে একা থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে সমাজ বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া নয়। বরং এমন জীবন বাছাই করা যেখানে মানসিক ভারসাম্য, স্থিতি এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। অপ্রয়োজনীয় দ্বন্দ্ব থেকে দূরে থাকায় জীবনও তুলনামূলকভাবে শান্ত থাকে”, বলেন তিনি।
নিজের ওপর আস্থা বাড়ে
সুবিধা হল, নিজের ওপর বিশ্বাস বৃদ্ধি পেতে থাকে। প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হয় বলে ধীরে ধীরে নিজের বিচারবোধের ওপর আস্থা তৈরি হয়।
ডা. ডেভিস বলেন, “একা থাকলে বোঝা সম্ভব হয় আসলে কী চাই, কোন বিষয়কে মূল্য দেওয়া দরকার এবং জীবনে কী ধরনের সীমারেখা টানা উচিত। নিজের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা তৈরি হয়।”
আর পরে যদি সম্পর্কে জড়ানোর বিষয় আসে, তখন নিজের সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকায় সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর
একা থাকা মানে নিঃসঙ্গতা নয়, বরং অনেক অবিবাহিত ব্যক্তি বাবা-মা ও বন্ধুদের সঙ্গে বেশি যোগাযোগ রাখতে পারেন। এসব সম্পর্ক থেকে তারা মানসিক সমর্থন এবং সামাজিক সংযোগ পান।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘পিউ রিসার্চ সেন্টার’-এর দুই গবেষক রিচার্ড ফ্রাই এবং কিম পার্কার পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণায় দেখিয়েছেন, বিবাহিত বা সম্পর্কে আবদ্ধ থাকা মানুষের চাইতে একা থাকা মানুষ, নিজেদের চারপাশের লোকজনের (যেমন: বাবা-মা, ভাই-বোন, প্রতিবেশী এবং বন্ধুবান্ধব) সঙ্গে বেশি যোগাযোগ বা আন্তরিক সম্পর্ক বজায় রাখেন।
ফলে তাদের সামাজিক জীবন সক্রিয় থাকে এবং প্রয়োজনে পাশে থাকার মতো মানুষেরও অভাব হয় না।

স্বাধীনতার এক দারুণ অনুভূতি
যারা নিজের ইচ্ছায় একা বা ‘সিঙ্গেল’ থাকেন, তাদের দৈনন্দিন জীবন এবং যেকোনো সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অনেক বেশি স্বাধীনতা অনুভব করেন।
মনোবিজ্ঞানী ফগলিয়া বলেন, "নিজের ইচ্ছায় সিঙ্গেল বা একা থাকা মানুষকে নিজের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বা স্বায়ত্তশাসন দেয়। অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যারা স্বেচ্ছায় একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাদের থাকার জায়গা, অবসর সময় কাটানো এবং জীবনের লক্ষ্য পূরণের মতো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তগুলো নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।”
আরও পড়ুন
ছোট পরিকল্পনাও বাড়াতে পারে সুখ