Published : 13 Jul 2026, 06:19 PM
আষাঢ়-শ্রাবণের অবিরত বর্ষণ একদিকে যেমন প্রকৃতিতে স্বস্তি আনে, অন্যদিকে নাগরিক জীবনে কাকভেজা হয়ে বাড়ি ফেরার ধকলও বাড়ায়।
অনেকেই ভাবেন, আকাশের মেঘমুক্ত পানি বুঝি ত্বক বা চুলের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে আধুনিক চর্মরোগবিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা।
বর্তমান সময়ে বায়ুদূষণের কারণে বৃষ্টির পানির সঙ্গে নানান ধরনের ময়লা, ধুলোবালি ও ব্যাকটেরিয়া মিশে থাকে। ফলে বৃষ্টিতে ভিপানিতে চুল রুক্ষ হওয়া এবং ত্বকে ফাঙ্গাসের সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
বৃষ্টিতে ভেজা চুলের যত্ন
বৃষ্টির পানি প্রাকৃতিকভাবে কিছুটা অ্যাসিডিক প্রকৃতির হয়। এই পানি যখন চুলে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকে, তখন লের স্বাভাবিক পিএইচ ভারসাম্য নষ্ট করে এবং কিউটিকলকে দুর্বল করে দেয়।
দ্রুত শ্যাম্পু ও কন্ডিশনিং করা: আমেরিকার ওহিও রাজ্যের চিকিৎসা কেন্দ্র ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের-এর বোর্ড-প্রত্যয়িত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেলিসা পিলিয়াং, প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে বলেন, “বৃষ্টির পানি মাথার ত্বকে শুষ্কতা তৈরি করে এবং চুলের ফলিকলকে বা গোড়া ভঙ্গুর করে তোলে।”
তার মতে, “বৃষ্টিতে চুল ভেজার পর ঘরে ফিরে যত দ্রুত সম্ভব একটি ‘মাইল্ড’ বা সালফেট-মুক্ত শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলা উচিত। এরপর চুলের আর্দ্রতা ধরে রাখতে ভালো মানের কন্ডিশনার ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক, যা চুলকে জট লেগে ভেঙে যাওয়া থেকে রক্ষা করবে।”
মাথার ত্বক শুষ্ক রাখা ও ফাঙ্গাসের সংক্রমণ রোধ: যুক্তরাজ্যের ট্রাইকোলজিস্ট (চুল ও মাথার ত্বক বিশেষজ্ঞ) এবং ফিলিপ কিংসলে ক্লিনিক, লন্ডনের প্রধান রূপবিশেষজ্ঞ অ্যানাবেল কিংসলে, তার প্রকাশিত কলামে সতর্ক করে বলেন, “বর্ষাকালের অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং বৃষ্টির নোংরা পানি মাথার ত্বকে ব্যাকটেরিয়া ও ‘ম্যালাসেসিয়া’ নামক ফাঙ্গাসের জন্ম দেয়, যা তীব্র খুশকি ও চুলকানির প্রধান কারণ।”
“বৃষ্টিতে ভেজার পর চুল প্রাকৃতিক বাতাসে বা ‘ড্রায়ারের কোল্ড-এয়ার সেটিং’য়ে পুরোপুরি শুকিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ভেজা চুলে কখনই শক্ত করে খোঁপা বা ঝুঁটি বাঁধা যাবে না, এতে চুল গোড়া থেকে আলগা হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
বৃষ্টির নোংরা পানিতে ত্বকের যত্ন
রাস্তার জমে থাকা কাদা-পানি মাড়িয়ে বাড়ি ফেরার পর ত্বকে নানান ধরনের অ্যালার্জি বা সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।
ফেইসওয়াশ ও ডাবল ক্লিনজিং: আমেরিকান একাডেমি অব ডার্মাটোলজি (এএডি)-এর সদস্য এবং ক্যালিফোর্নিয়ার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. জেনি লিউ, তার নিজস্ব স্বাস্থ্য ব্লগে উল্লেখ করেন, “বৃষ্টির পানিতে থাকা বায়ুমণ্ডলীয় দূষক, ত্বকের লোমকূপ আটকে দিয়ে ব্রণ ও ব্ল্যাকহেডস বাড়িয়ে দেয়।”
তাই বৃষ্টিতে বাড়ি ফিরে অবশ্যই স্যালিসিলিক অ্যাসিড বা গ্লাইকোলিক অ্যাসিডযুক্ত ফেইসওয়াশ দিয়ে মুখ ধুয়ে নিতে হবে।
টোনার ও ময়েশ্চারাইজারের ম্যাজিক: ভারতের মুম্বাইয়ের ফোর্টিস হসপিটালের চর্মরোগ বিভাগের প্রধান ডা. স্মৃতি নাসওয়া সিং বর্ষাকালীন ত্বকের যত্নের বিষয়ে বলেন, “অনেকে ভাবেন বর্ষায় বাতাস আর্দ্র থাকে বলে ময়েশ্চারাইজার দরকার নেই, যা একটি মারাত্মক ভুল ধারণা।”
তিনি ফোর্টিসের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে পরামর্শ দেন যে, “বৃষ্টির পানি ত্বকের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে ফেলে ত্বককে ভেতর থেকে শুষ্ক করে দেয়। তাই মুখ ধোয়ার পর একটি অ্যালকোহল-মুক্ত টোনার ব্যবহার করে ত্বকের পিএইচ ঠিক করতে হবে এবং হালকা ও জেল-সমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার লাগাতে হবে।
‘অ্যাথলেটস ফুট’ ও পায়ের যত্ন: ডা. জেনি লিউর বলেন, “বর্ষায় বেশি ক্ষতি হয় পায়ের। নোংরা পানি জমে পায়ের আঙুলের ফাঁকে ফাঙ্গাসের সংক্রমণ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। যাকে বলে ‘অ্যাথলেটস ফুট’। তাই পা সাবান দিয়ে ধুয়ে শুকনা করে মোছার পর সামান্য ‘অ্যান্টিফাঙ্গাল ডাস্টিং পাউডার’ ব্যবহার করা উচিত।”

অন্যান্য পরামর্শ
বৃষ্টি যেমন উপভোগ্য, তেমনই নিজের বাহ্যিক সুস্থতা বজায় রাখাও নিজের দায়িত্ব। বর্ষার এই দিনগুলোতে চুলে অতিরিক্ত রাসায়নিক বা হিট স্টাইলিং এড়িয়ে চলতে হবে। বাইরে বের হওয়ার সময় ব্যাগে ছোট একটি তোয়ালে ও ছাতা রাখা যেতে পারে।
বৃষ্টিতে ভিজে গেলে অলসতা না করে দ্রুত এই ঘরোয়া যত্নের নিয়মগুলো মেনে চললে চুলে সিল্কি ভাব আর ত্বকে সতেজ উজ্জ্বলতা বজায় রাখা সম্ভব হয় বর্ষাজুড়ে।
আরও পড়ুন
বৃষ্টি ভেজা দিনে হাত, পা ও ত্বকের যত্ন