Published : 12 Jul 2026, 08:24 PM
ছুটির দিনে ভোরে অ্যালার্ম বাজলে বিছানা ছেড়ে উঠতে কারই বা ভালো লাগে? কিংবা সারা দিন অফিসের কাজের পর ভাবলেন একটু ‘ফ্রি-হ্যান্ড এক্সারসাইজ’ বা ডায়েরি লিখবেন, কিন্তু মন বলল, ‘আজ থাক, কাল করা যাবে!’
কোনো প্রয়োজনীয় বা নিজের জন্য উপকারী কাজ হাত দেওয়ার আগে এমন টালবাহানা বা আলসেমি যেন জীবনের নিত্যদিনের গল্প।
অনেকে একে সাধারণ অলসতা বলে নিজেকে দোষারোপ করেন। তবে সেল্ফ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এটি মানুষের মস্তিষ্কের একটি খুব স্বাভাবিক সুরক্ষামূলক আচরণ।
বিজ্ঞানবিষয়ক মার্কিন লেখক জুলিয়া রিস ওয়েক্সলারের লেখা ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কীভাবে অবচেতন মনকে কিছুটা ‘বোকা বানিয়ে’, যেকোনো কঠিন বা এড়িয়ে চলা কাজে, সহজে মন ফিরিয়ে আনা যায়।
মানুষ যে কারণে প্রয়োজনীয় কাজ এড়িয়ে চলে
যুক্তরাষ্ট্রের রিচমন্ড ইউনিভার্সিটির লাইসেন্সপ্রাপ্ত ক্লিনিক্যাল মনোবিদ ও সহকারী অধ্যাপক ডা. জ্যানেল এস পাইফার ওই প্রতিবেদনে বলেন, “মানব মস্তিষ্ক স্বভাবগতভাবেই যেকোনো কাজ করার ক্ষেত্রে শক্তির অপচয় কমাতে চায়। মস্তিষ্ক এমন শর্টকাট বা অভ্যাস খোঁজে যা আমাদের প্রতিদিনের মানসিক, শারীরিক ও আবেগীয় চাপকে কমিয়ে রাখে।”
“কোনো কাজে যদি সামান্য অনিশ্চয়তা, অতিরিক্ত খাটুনি বা আত্মসম্মানের ওপর আঘাত আসার ভয় থাকে, তবে মস্তিষ্ক স্বয়ংক্রিয়ভাবে আমাদের সেই কাজ থেকে দূরে রাখার অজুহাত তৈরি করে”, ব্যাখ্যা করেন তিনি।
মনকে কাজে ফেরানোর ৫টি কৌশল
কাগজে কলমে কাজ করা কঠিন মনে হলেও বিশেষজ্ঞরা মস্তিষ্ককে ফাঁকি দেওয়ার কিছু মনস্তাত্ত্বিক উপায় বাতলে দিয়েছেন।
নিজের আবেগকে মেনে নাও, নিজেকে দোষ দিও না
যখন কোনো কাজ ঠিক সময়ে করতে পারি না, তখন নিজেদের ওপর প্রচণ্ড রেগে যাই বা অপরাধবোধে ভুগি।
ডা. পাইফারের মতে, “এই নেতিবাচক অনুভূতি ও অপরাধবোধ মানুষকে আরও বেশি অলস করে তোলে এবং দীর্ঘসূত্রিতা বাড়িয়ে দেয়। তাই কাজ করতে ইচ্ছা না করলে জোর করে নিজেকে দুর্বল না ভেবে মনের এই দ্বিধাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করতে হবে।”
যখন নিজের প্রতি সদয় থাকবে, তখন কাজের প্রতি মানসিক প্রতিরোধ নিজে থেকেই কমে যাবে।
বিশাল কাজকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা
অনেকে শুরুতেই খুব বড় বা অবাস্তব লক্ষ্য নির্ধারণ করে ফেলেন। যেমন— একটানা ১ ঘণ্টা শরীরচর্চা করা বা পুরো সপ্তাহের জন্য একসঙ্গে ৫ পদের রান্না করা।
ডা. পাইফার একে ‘বোকার স্বর্গ’ বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, “হঠাৎ শূন্য থেকে ১০০-তে পৌঁছানোর চেষ্টা ব্যর্থ হওয়াই স্বাভাবিক।”
একই প্রতিবেদনে মার্কিন রিলেশনশিপ থেরাপিস্ট এবং ‘সাইকোথেরাপি ফর ইয়ং উইমেন’-এর ক্লিনিক্যাল পরিচালক ক্লডিয়া জিওলিট্টি-রাইট পরামর্শ দেন, “পুরো বড় কাজের কথা চিন্তা না করে কেবল শুরুর ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোর ওপর নজর দিতে হবে। যেমন— ব্যায়াম করার বড় চিন্তার বদলে, শুধু পোশাক পরা ও জুতা জোড়া পায়ে গলানোর দিকে মন দিতে হবে। কাজটিকে যতটা সম্ভব ছোট ও বাস্তবসম্মত করে তুললে মস্তিষ্ক তা সহজে গ্রহণ করে।”
ফলাফলের চেয়ে প্রক্রিয়ার আনন্দ উপভোগ করা
যেকোনো কাজকে যখন স্রেফ ‘করতেই হবে’ এমন বাধ্যতামূলক দায়িত্ব বা ‘টু-ডু লিস্ট’ হিসেবে দেখা হয়, তখন সেটা একঘেয়ে ও ভীতিজনক হয়ে ওঠে।
ক্লডিয়া জিওলিট্টি-রাইটের মতে, “ফলাফলের দিকে না তাকিয়ে কাজটির ভেতরের ছোট ছোট আনন্দগুলোকে খোঁজার চেষ্টা কর। যেমন, ব্যায়ামের কষ্টের কথা না ভেবে ব্যায়াম করার সময় চমৎকার কোনো গান শোনা বা নতুন কোনো ‘মুডশেইপিং’ অভিজ্ঞতার কথা ভাবলে কাজটি করা অনেক সহজ হয়।”
একজন ‘অ্যাকাউন্টেবিলিটি বাডি’ বা সঙ্গী খুঁজে নেওয়া
নিজের অলসতা কাটাতে কোনো বন্ধু বা বিশ্বস্ত কাউকে সঙ্গী করে নেওয়া একটি দারুণ কৌশল।
ডা. পাইফার বলেন, “আমরা অনেক সময় একা একা কোনো কাজ শুরু করতে অনীহা প্রকাশ করি, তবে যখন কেউ আমাদের খোঁজ নেয় বা সঙ্গে থাকে, তখন কাজের প্রতি দায়িত্ববোধ বহুগুণ বেড়ে যায়।”
গবেষণাতেও দেখা গেছে, কারও সঙ্গে যৌথভাবে বা দলগতভাবে কিছু করলে, কাজের গতি ও অনুপ্রেরণা দুই-ই বজায় থাকে।
শরীর ও মনের সংকেত বোঝো এবং প্রয়োজনে বিরতি নাও
কখনও কখনও কাজ এড়িয়ে চলার পেছনে শরীরের ক্লান্তি, ঘুমহীনতা বা অসুস্থতা দায়ী হতে পারে। যদি সত্যিই শরীর সায় না দেয়, তবে জোর করে কাজ না করে নিজেকে কিছুটা সময় দিতে হবে।
তবে ক্লডিয়ার মতে, “এই বিরতি নেওয়ার সময় নিজের ওপর কোনো চারিত্রিক আক্রমণ করা যাবে না। নিজেকে বল— ‘আমি আজ ক্লান্ত, তাই একটু জিরিয়ে নিয়ে আগামী কাল নতুন উদ্যমে শুরু করব।’
যা মনে রাখতে হবে
অলসতা কাটানো মানেই নিজের ওপর অত্যাচার করা নয়। নিজের অবচেতনের খেলাটিকে বুঝতে পারাই এর প্রধান সমাধান।
মনস্তাত্ত্বিক এই ছোট ছোট কৌশলগুলো খাটিয়ে নিজের চারপাশের কাজগুলোকে সহজ করে তোলো এবং প্রতিটি ছোট অর্জনের পর নিজেকে বাহবা দিতে ভোলা যাবে না।
আরও পড়ুন
কর্মস্থলে যাওয়ার সময়টা যেভাবে চাপমুক্ত করা যায়
নির্দিষ্ট সময়সীমার কাছাকাছি আসলেই কেন বাড়ে কাজের গতি?
বৃষ্টিতে ভিজে ফেরা: ঝটপট ৫ কাজ না করলে ধরতে পারে সর্দি-জ্বরে!