Published : 12 Mar 2026, 01:42 PM
অফিসে কোনো কাজের শুরুটা হয় ধীরে বা দেরিতে; কিন্তু সময়সীমা কাছে এলেই হঠাৎ করে বেড়ে যায় কাজের গতি- প্রায় সবার সাথেই ঘটে এমন ঘটনা।
তখন মনোযোগ বাড়ে, কাজ দ্রুত এগোয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক কাজ শেষ হয়ে যায়।
বিষয়টি অনেকের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন- এর পেছনে মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কিছু মানসিক প্রক্রিয়া কাজ করে।
সব সময়েই মানুষ কাজ ফেলে রাখেন অলসতার কারণে নয়, বরং অতিরিক্ত চাপ বা উদ্বেগের কারণেও।
মার্কিন মনোবিজ্ঞানী সাবরিনা রোমানোফ রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “সময়সীমা ঘনিয়ে এলে মস্তিষ্কের ভেতরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে যা দ্রুত কাজ শেষ করতে উৎসাহিত করে।"
নিখুঁত হওয়ার ভয় কাটিয়ে ওঠা
অনেকে কাজ শুরু করতে দেরি করেন, কারণ তারা কাজটি নিখুঁতভাবে করতে চান। কিন্তু সেই নিখুঁত হওয়ার চাপই কখনও কখনও কাজের শুরুতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
কেউ কেউ মনে করেন যদি কাজটি পুরোপুরি ভালোভাবে করতে না পারেন তাহলে শুরু করাই বৃথা। এই মানসিকতা থেকেই কাজ ফেলে রাখার প্রবণতা তৈরি হয়।
তবে সময়সীমা যখন কাছাকাছি চলে আসে, তখন পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন নিখুঁত হওয়ার ভয়কে ছাড়িয়ে যায় সময়সীমা লঙ্ঘন করার ভয়। ফলে বাধ্য হয়ে কাজ শুরু করেন এবং দ্রুত এগোতে থাকেন।
এই পরিবর্তনই অনেক সময় মানুষকে অল্প সময়ের মধ্যে অত্যন্ত মনোযোগী ও কার্যকর করে তোলে।
সময়সীমা কাছে এলে কাজ বাস্তব মনে হয়
কোনো কাজের সময়সীমা যদি অনেক দূরে থাকে, তখন অনেকের কাছে সেটি বাস্তব মনে হয় না। বিষয়টি যেন ভবিষ্যতের একটি অস্পষ্ট ঘটনা বলে মনে হয়।
মানুষের মস্তিষ্ক দূরের সময়সীমাকে জরুরি বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে না। ফলে কাজটি শুরু করার তাগিদও কম থাকে।
তবে সময় যতই কাছে আসে, ততই কাজটি বাস্তব ও জরুরি মনে হতে শুরু করে। তখন মানুষ দ্রুত অগ্রাধিকার ঠিক করে নেয় এবং কাজের ধাপগুলো সহজ করে ফেলে।
এই পরিবর্তনের ফলে অনেকেই শেষ মুহূর্তে এসে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন এবং কাজ শেষ করে ফেলেন।
সঠিক মাত্রার উদ্দীপনা তৈরি হয়
মানুষের কর্মক্ষমতার সঙ্গে মানসিক উত্তেজনার একটি সম্পর্ক রয়েছে। খুব কম উত্তেজনা থাকলে মানুষ কাজের প্রতি আগ্রহ হারায়, আবার অতিরিক্ত চাপও কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মনোবিজ্ঞানি ডা. ড্যারিল অ্যাপলটন একই প্রতিবেদনে বলেন, “একটি মনোবৈজ্ঞানিক ধারণা অনুযায়ী মাঝামাঝি মাত্রার মানসিক উত্তেজনা কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে দেয়।”
যখন সময়সীমা অনেক দূরে থাকে তখন মস্তিষ্কে সেই প্রয়োজনীয় উদ্দীপনা তৈরি হয় না। তবে সময়সীমা কাছে এলেই চাপ বাড়তে থাকে এবং সেই চাপই মানুষকে কাজ শুরু করতে ও শেষ করতে সাহায্য করে।
ফলে অনেকেই শেষ সময়ের চাপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন।
মস্তিষ্কের সতর্ক সংকেত সক্রিয় হয়ে ওঠে
সময়সীমা কাছে এলে মানুষের মস্তিষ্ক সেটিকে এক ধরনের সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করে।
ড্যারিল অ্যাপলটন বলেন, “যখন কোনো কাজের সময়সীমা খুব কাছাকাছি চলে আসে তখন মস্তিষ্ক সেটিকে সম্ভাব্য বিপদের মতো অনুভব করতে পারে। এর ফলে শরীরে বিভিন্ন হরমোন সক্রিয় হয়ে ওঠে, যা মানুষকে দ্রুত কাজ করতে উৎসাহিত করে।”
অন্যদিকে সাবরিনা রোমানোফ বলেন, “সময়সীমা ঘনিয়ে এলে শরীরে যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে তা মনোযোগ বাড়াতে সাহায্য করে। এতে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং কাজের দিকে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে।”
এই প্রক্রিয়ার কারণেই অনেক মানুষ শেষ মুহূর্তে এসে অত্যন্ত কার্যকরভাবে কাজ করতে সক্ষম হন।
পরিকল্পনা করে কাজ করা কেন সবার জন্য সহজ নয়
কিছু মানুষ সময়সীমার অনেক আগেই কাজ শেষ করে ফেলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আবার অন্যরা শেষ সময়ের চাপেই সবচেয়ে ভালো কাজ করেন।
যারা ভবিষ্যৎমুখী চিন্তাভাবনায় অভ্যস্ত তারা সাধারণত আগেভাগেই পরিকল্পনা করে কাজ শেষ করতে চান। এতে তারা মানসিক স্বস্তি অনুভব করেন।
অন্যদিকে কিছু মানুষের মস্তিষ্ক চাপের মুহূর্তে বেশি উদ্দীপনা পায়। তারা তখনই সবচেয়ে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন যখন সময়সীমা খুব কাছাকাছি চলে আসে।
এই দুই ধরনের মানুষের কাজের ধরন আলাদা হলেও, দুই পদ্ধতিই কার্যকর হতে পারে, যদি তা ব্যক্তির জন্য উপযোগী হয়।
শেষ মুহূর্তের গতি কখন উপকারী
শেষ মুহূর্তে দ্রুত কাজ করার অভ্যাস সব সময় খারাপ নয়। বিশেষ করে সহজ ও স্বল্পমেয়াদি কাজের ক্ষেত্রে এটি অনেক সময় কার্যকর হতে পারে।
ছোট বা তুলনামূলক সহজ কাজ দ্রুত শেষ করতে এই ধরনের চাপ অনেক সময় সহায়ক হয়। তবে জটিল বা সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপ সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারণ অতিরিক্ত চাপের মধ্যে মানুষের চিন্তাভাবনা সংকীর্ণ হয়ে যেতে পারে এবং নতুন ধারণা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে বড় ও সৃজনশীল কাজের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সময় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সময়সীমা পার হলে যা করা উচিত
যদি কেউ নিয়মিত সময়সীমা অতিক্রম করতে শুরু করেন, তাহলে সেটি একটি সতর্ক সংকেত হতে পারে।
সাবরিনা রোমানোফ বলেন, “যদি কেউ ঘুম কমিয়ে, খাবার এড়িয়ে বা ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষতি করে কাজ শেষ করতে বাধ্য হন, তাহলে সেই পদ্ধতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।”
এক্ষেত্রে ছোট ছোট ধাপে কাজ ভাগ করে নেওয়া একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। এতে কাজের চাপ কমে এবং ধীরে ধীরে কাজ এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
বড় সময়সীমার ভেতরে ছোট ছোট সময়সীমা নির্ধারণ করলে মানুষ চাপের শেষ মুহূর্তের অপেক্ষা না করেই কাজ শুরু করতে পারে।
আরও পড়ুন
কর্মস্থলে যাওয়ার সময়টা যেভাবে চাপমুক্ত করা যায়