Published : 12 Jul 2026, 05:37 PM
কাজের মাঝে হুট করে শরীর ছেড়ে দেওয়া, কোনো কারণ ছাড়াই প্রচণ্ড ক্লান্তিবোধ করা কিংবা ভরদুপুরে চোখজুড়ে রাজ্যের অলসতা নেমে আসা— নাগরিক জীবনে অনেকেরই এটা চেনা সমস্যা।
অনেকেই ভাবেন, রাতের ঘুম কম হওয়া বা কাজের অতিরিক্ত চাপের কারণে এমনটা হচ্ছে। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সারাদিনের এই একটানা ক্লান্তির পেছনে একটি বড় কারণ হতে পারে, রক্তে শর্করার আধিক্য বা ‘হাই ব্লাড সুগার’।
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট হেলথলাইন ডটকম-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে গেলে মানুষের শরীরে শক্তি কমে যায় এবং ক্লান্তি ভর করে।
ডায়াবেটিস ছাড়াও কি রক্তে শর্করা বাড়তে পারে?
সাধারণত রক্তে উচ্চ শর্করার মাত্রা বা ‘হাইপারগ্লাইসেমিয়া’-কে ডায়াবেটিসের প্রধান লক্ষণ মনে করা হয়।
তবে হেল্থলাইন ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে মার্কিন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. কেলি উডের বলেন, “ডায়াবেটিস ছাড়াও একজন সুস্থ মানুষের রক্তে সাময়িকভাবে শর্করা মাত্রাতিরিক্ত বাড়তে পারে।”
এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
খাবারের প্রভাব: অতিরিক্ত চিনি বা প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেইট (যেমন: সাদা ভাত, ময়দা, ফাস্টফুড) যুক্ত ভারী খাবার খাওয়ার পর রক্তে হঠাৎ শর্করার জোয়ার আসে, একে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ‘অ্যাকিউট হাইপারগ্লাইসেমিয়া’ বলে।
মানসিক চাপ ও অসুস্থতা: তীব্র মানসিক দুশ্চিন্তা, কাজের স্ট্রেস কিংবা শরীরে কোনো সংক্রমণ বা রোগ হলে কর্টিসল ও অন্যান্য হরমোনের কারণে রক্তের শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়।
চিনি বাড়লে শরীর ক্লান্ত হয় কেন?
মস্তিষ্ক ও শরীরের সমস্ত কোষের শক্তির প্রধান জ্বালানি হল গ্লুকোজ। যখন রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকে, তখন সেই গ্লুকোজগুলো রক্তনালীতেই জমা হতে থাকে, শরীরের কোষগুলো তা গ্রহণ করে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে না।
সহজ কথায়, জ্বালানি বা এনার্জি থাকা সত্ত্বেও শরীর তা ব্যবহার করতে ব্যর্থ হয়।
ডা. কেলি উড জানান, রক্তে এই বাড়তি শর্করার কারণে শরীরে ইনফ্লেমেইশন বা প্রদাহ তৈরি হয়, শরীর ডিহাইড্রেইটেড বা পানিশূন্য হয়ে পড়ে এবং হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
এসব কারণ, সম্মিলিতভাবে শরীরকে চরম ক্লান্ত ও নিস্তেজ করে তোলে।
প্রি-ডায়াবেটিস: ক্লান্তি যখন নীরব সতর্কবার্তা
অনেক সময় মানুষ বুঝতেও পারে না যে, সে ডায়াবেটিসের আগের ধাপে বা ‘প্রি-ডায়াবেটিস’-এ ভুগছে। এই অবস্থায় রক্তে শর্করার মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে, তবে সেটা পুরোপুরি ডায়াবেটিস নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসা কেন্দ্র মেয়ো ক্লিনিক-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রি-ডায়াবেটিসের লক্ষণগুলো খুবই সূক্ষ্ম হওয়ায় সহজে ধরা পড়ে না।
তাই শরীর অলস লাগার পাশাপাশি যদি নিচের ৪টি লক্ষণ দেখা যায়, তাহলে দ্রুত সতর্ক হতে হবে:
১. ঘন ঘন তৃষ্ণা পাওয়া এবং গলা শুকিয়ে যাওয়া।
২. বিশেষ করে রাতের বেলা ঘন ঘন প্রস্রাবের বেগ হওয়া।
৩. চোখের দৃষ্টি হুট করে কিছুটা ঝাপসা বা ঘোলাটে মনে হওয়া।
৪. শরীরের কোথাও কেটে গেলে বা ক্ষত হলে তা সহজে না শুকানো।
ক্লান্তি রোধে ও শর্করা নিয়ন্ত্রণে যা করতে হবে
রক্তে শর্করার হঠাৎ ওঠা-নামা বন্ধ করতে এবং সারা দিন শরীরকে প্রাণবন্ত ও শক্তি ধরে রাখতে কিছু সহজ অভ্যাসের কথা উল্লেখ করা হয়, হেল্থলাইনের প্রতিবেদনে।
খাবারে কার্বোহাইড্রেইটের লাগাম টানা: প্রতিদিনের খাবার থেকে ‘রিফাইনড কার্ব’ বা প্রক্রিয়াজাত চিনি পুরোপুরি কমিয়ে দিতে হবে। সাদা ভাতের বদলে লাল চালের ভাত, ময়দার বদলে আটার রুটি এবং মিষ্টি ও কোমল পানীয় বর্জন করা প্রথম কাজ।
আঁশ ও পানির মেলবন্ধন: খাদ্যতালিকায় প্রচুর পরিমাণে ফাইবার বা আঁশযুক্ত খাবার (যেমন: সবুজ শাকসবজি, ডাল, ফলমূল) রাখতে হবে। আঁশ রক্তে গ্লুকোজ শোষণের গতি ধীর করে দেয়, ফলে হঠাৎ ‘সুগার স্পাইক’ হয় না। সেই সঙ্গে সারাদিনে পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে।
নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম: প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি ধরনের ব্যায়াম বা দ্রুত হাঁটার অভ্যাস মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়া ঠিক রাখে এবং ইনসুলিনের কার্যকারিতা বাড়ায়।
মানসিক চাপ ও ঘুমের ব্যবস্থাপনা: মানসিক চাপ কমাতে ধ্যান, প্রাণায়াম বা পছন্দের কাজ করা উপকারী। কারণ চাপ সরাসরি রক্তের শর্করা বাড়ায়। এছাড়া প্রতি রাতে ৭-৮ ঘণ্টার ভালো মানের ঘুম শরীরের হরমোন নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: ডা. কেলি উড পরামর্শ দেন, “যদি পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়ার পরেও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি দূর না হয়, তবে ঘরে বসে না থেকে একজন চিকিৎসকের পরামর্শে ‘ফাস্টিং ব্লাড সুগার’ পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া উচিত।
মনে রাখতে হবে
ক্লান্তি কেবল মাত্র অলসতা নয়, এটি শরীরের ভেতরের কোনো অসঙ্গতির বাহ্যিক সংকেত। তাই প্রতিদিনের খাবারে সচেতনতা এবং নিয়মতান্ত্রিক জীবনযাত্রাই পারে রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রেখে শরীরকে সারাদিন সতেজ ও প্রাণবন্ত রাখতে।
সচেতনতা
এই প্রতিবেদনে সাধারণ সচেতনতামূলক তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। ব্যক্তিগত যেকোনো শারীরিক জটিলতা, রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার জন্য সর্বদা একজন পেশাদার রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
আরও পড়ুন
ডায়াবেটিকদের জন্য চিনাবাদাম খাওয়ার উপকারিতা
বেশি মাংস খেলে ডায়াবেটিস হতে পারে