Published : 28 Jun 2026, 03:24 PM
কোন পোস্ট প্রকাশ হবে, কোনটা হবে না বা কোনো কিছু মুছে ফেলতে হবে- ফেইসবুকে কোনো পেইজের অ্যাডমিনদের এমনসব দায়িত্ব পালন করতে হয়।
একসঙ্গে করে রাখা ভবিষ্যত পরিকল্পনা থেকে নিজেকে সরানো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম্য থেকে ছবি মোছা, জিনিসপত্র বা ব্যাংক হিসাব আলাদা করা কিংবা কোনো পাসওয়ার্ড পরিবর্তন- সম্পর্কে বিচ্ছেদ ঘটলেও এমন ধরনের কাজ করা লাগে।
আর ডিজিটাল যুগে এই কাজের পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছে ‘ব্রেইকআপ অ্যাডামিন’ বা নিজেকে বিচ্ছেদ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করানো। এই ধরনের কাজ করতে গিয়ে মন ভাঙার চাইতেও, মানসিক চাপ কাজ করে বেশি।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিচ্ছেদের সবচেয়ে কঠিন অংশ অনেক সময় কান্না বা স্মৃতিচারণ নয়। বরং সম্পর্ক শেষ হওয়ার পর, যে অসংখ্য ছোট-বড় বাস্তব কাজ সামলাতে হয়, সেটিই অনেকের কাছে সবচেয়ে বেশি মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
একসঙ্গে ব্যবহৃত অর্থের হিসাব আলাদা করা, জরুরি যোগাযোগের তালিকা পরিবর্তন করা, যৌথ সেবা বন্ধ করা, বাড়ির জিনিসপত্র ভাগ করে নেওয়া কিংবা পরিচিত মানুষদের নতুন পরিস্থিতির কথা জানানো— এসব কাজ বাইরে থেকে সাধারণ মনে হলেও প্রতিটি কাজ ব্যক্তিকে বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, সম্পর্কটি সত্যিই শেষ হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেকে এই কাজগুলোকেই বিচ্ছেদের আসল মানসিক পরীক্ষা হিসেবে অনুভব করেন।
কেন এত কঠিন লাগে এই ছোট ছোট কাজ?
পারিবারিক ও দাম্পত্য সম্পর্ক বিষয়ক মার্কিন বিশেষজ্ঞ সুজান ওয়ালাচ রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “বিচ্ছেদের পর প্রতিটি প্রশাসনিক বা প্রতিদিনের কাজ শুধু একটি কাজ নয়, বরং সম্পর্ক শেষ হওয়ার বাস্তব প্রমাণ।”
তার মতে, “ব্যক্তি হয়তো মানসিকভাবে বুঝতে পারেন যে সম্পর্ক শেষ হয়েছে। তবে যখন তিনি একে একে যৌথ হিসাব বন্ধ করেন, জরুরি যোগাযোগের তালিকা থেকে সঙ্গীর নাম সরিয়ে দেন কিংবা একসঙ্গে গড়ে তোলা পরিকল্পনা বাতিল করেন, তখন সম্পর্কের সমাপ্তি আরও বাস্তব হয়ে ওঠে।”
তিনি বলেন, “এই কারণেই সাধারণ কাজগুলোও অনেক ভারী এবং আবেগপূর্ণ মনে হয়।”
বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার শুরু
সম্পর্কের সময় অনেক সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের কথা ভেবেই নেওয়া হয়। একসঙ্গে থাকার পরিকল্পনা, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা, পারিবারিক সম্পর্ক কিংবা সামাজিক পরিচয়ের অনেক অংশ ধীরে ধীরে ভাগাভাগি হয়ে যায়।
বিচ্ছেদের পর সেই প্রতিটি বিষয় নতুন করে গুছিয়ে নিতে হয়। ফলে শুধু প্রিয় মানুষকে হারানোর অনুভূতি নয়, বরং ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলোকেও নতুন করে সাজাতে হয়।
সুজান মন্তব্য করেন, “এই পর্যায় থেকেই শোকের অনুভূতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ তখন বুঝতে শুরু করেন, পরিবর্তনটি শুধু আবেগের নয়, বাস্তব জীবনেও গভীর প্রভাব ফেলছে।”
জরুরি কাজগুলো আগে শেষ
সুজান পরামর্শ দেন, “বিচ্ছেদের পর সব কাজ একদিনে শেষ করার চেষ্টা না করাই ভালো।”
তার কথায়, “প্রথমে অর্থনৈতিক, আইনগত এবং যৌথ হিসাব-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো গুছিয়ে নেওয়া উচিত। কারণ এসব কাজ দীর্ঘদিন ফেলে রাখলে পরে আরও জটিলতা তৈরি হতে পারে।”
অন্যদিকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- যেমন, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের পরিবর্তন কিংবা বিভিন্ন সেবার সদস্যপদ পরিবর্তন ধীরে ধীরে করা যেতে পারে।
তিনি মনে করেন, একসঙ্গে সব পরিবর্তন করার পরিবর্তে প্রতি সপ্তাহে একটি বা দুটি কাজ শেষ করলে মানসিক চাপ অনেকটাই কম থাকে।
প্রতিটি পরিবর্তনই নতুন মানিয়ে নেওয়ার ধাপ
বিচ্ছেদের পর অনেকেই চান যত দ্রুত সম্ভব সবকিছু বদলে ফেলতে। আবার কেউ কেউ কোনো পরিবর্তনই করতে চান না।
“এই দুই চরম অবস্থার কোনোটিই সব সময় উপকারী নয়। বরং ধীরে ধীরে পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর উপায়”, বলেন সুজান।
পুরানো স্মৃতি ফিরে আসা মানেই পিছিয়ে পড়া নয়
অনেক সময় হঠাৎ পুরানো ছবি, কোনো বিশেষ দিন, পরিচিত গান কিংবা কোনো জায়গা, বিচ্ছেদের স্মৃতি আবার মনে করিয়ে দিতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ভাবেন, তারা হয়ত এখনও বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারেননি।
তবে সুজান বলেন, “শোকের অনুভূতি কখনও সরলরেখায় এগোয় না। ভালো থাকার মাঝেও হঠাৎ দুঃখ ফিরে আসা খুবই স্বাভাবিক।”
আরও বলেন, “লক্ষ্য হওয়া উচিত আবেগকে অস্বীকার করা নয়, বরং সেই অনুভূতির মধ্য দিয়েও নিজেকে সামলে নেওয়া শেখা।”
সম্পর্ক শেষ হলেও জীবন থেমে থাকে না
বিচ্ছেদের পর অনেকেই নিজের পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্তিতে পড়েন। কারণ দীর্ঘদিনের সম্পর্ক মানুষের জীবন, অভ্যাস এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে যায়।
সুজান বলেন, “এই সময় নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগও তৈরি হয়।”
যে সময়টা আগে সম্পর্কের জন্য ব্যয় হত, সেটা এখন নিজের শখ, পরিবার, বন্ধু কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা শেখার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
এভাবে ধীরে ধীরে নতুন অভ্যাস তৈরি হলে আত্মবিশ্বাসও ফিরে আসে।
আরও পড়ুন