Published : 10 Jun 2026, 07:21 PM
সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি কিন্তু শুধু ভালোবাসা নয়, বরং আবেগগত নিরাপত্তাও। এটি এমন এক পরিবেশ, যেখানে একজন নির্দ্বিধায় নিজের অনুভূতি, ভয়, স্বপ্ন কিংবা দুর্বলতার কথা বলতে পারেন।
তবে অনেক সম্পর্কেই দেখা যায়, মানুষ নিজের কথা বলতে ভয় পায়। ভুল বোঝাবুঝির আশঙ্কায় চুপ থাকে কিংবা সবসময় সঙ্গীর প্রতিক্রিয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভোগে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো আবেগগত অনিরাপত্তার লক্ষণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও পারিবারিক থেরাপিস্ট ইয়ান কার্নার সিএনএন ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “যদি কেউ সবসময় সাবধানে কথা বলতে বাধ্য হন, নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখেন কিংবা সঙ্গীর প্রতিক্রিয়ার ভয়ে নীরব থাকেন, তাহলে সম্পর্কের আবেগগত নিরাপত্তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।”
আবেগগত নিরাপত্তা আসলে কী?
মার্কিন থেরাপিস্ট মার্টি ব্যাবিটসের মতে, “আবেগগত নিরাপত্তা হল এমন অনুভূতি, যেখানে একজন জানেন যে তিনি যেমন, ঠিক তেমনভাবেই গ্রহণযোগ্য। নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করলেও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় থাকে না।”
একটি সম্পর্কে যখন কেউ নিজের কষ্ট, হতাশা বা ভিন্ন মতামত প্রকাশ করতে পারেন এবং তার সঙ্গী সেটা মনোযোগ দিয়ে শোনেন, তখন সেই সম্পর্ক নিরাপদ অনুভূত হয়।
বিপরীতে, যদি একজন মনে করেন তার অনুভূতির কোনো মূল্য নেই বা কথা বললে ঝগড়া হবে, তাহলে সেখানে আবেগগত নিরাপত্তার অভাব রয়েছে।
আবেগগত নিরাপত্তা এমন এক স্বস্তির অনুভূতি, যেখানে নিজের প্রকৃত সত্তা নিয়ে থাকা যায়। এই নিরাপত্তা মানুষকে আরও সৃজনশীল, আন্তরিক করে।
যে কারণে গুরুত্বপূর্ণ
মানুষের স্নায়ুতন্ত্র স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা খোঁজে। যখন সম্পর্কের মধ্যে নিরাপত্তা থাকে না, তখন সাধারণ মতবিরোধও বড় হুমকির মতো মনে হতে পারে। ফলে দুইজনের মধ্যে প্রতিরক্ষামূলক আচরণ শুরু হয়।
নিজের জটিল অনুভূতি তখনই প্রকাশ করা যায়, যখন বিশ্বাস হয় যে সঙ্গী সহানুভূতি ও যত্নের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া জানাবেন। যদি সেই বিশ্বাস না থাকে, তাহলে নিজের অনেক দিক গোপন রাখা শুরু হয়।
দীর্ঘমেয়াদে এই গোপনীয়তা সম্পর্ককে দুর্বল করে। একসময় দুইজন মানুষ একই ছাদের নিচে থেকেও মানসিকভাবে দূরে সরে যেতে পারেন।
যে লক্ষণগুলো বলছে সম্পর্ক নিরাপদ নয়
অনেক সময় সম্পর্কের সমস্যাগুলো ধীরে ধীরে তৈরি হয়। শুরুতে বিষয়গুলো গুরুত্ব না দিলেও, পরে তা বড় সংকটে পরিণত হতে পারে।
নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক সেক্স থেরাপিস্ট রেবেকা স্কোল বলেন, “আবেগগতভাবে অনিরাপদ সম্পর্কে সাধারণত প্রতিটি আলাপের ফল নিয়ে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা হয়। তারা ধরে নেয়, নিজের কথা বললে ঝগড়া হবে বা সঙ্গী কষ্ট পাবেন।”
এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই নিজের অনুভূতি চেপে রাখেন। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় আলোচনা এড়িয়ে চলেন। আবার কেউ নিজের প্রকৃত মতামত প্রকাশ না করে কৌশলী বা ঘুরিয়ে কথা বলেন।
আর যখন একজন নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়, তখন সম্পর্কের মধ্যে অসততা প্রবেশ করে। ধীরে ধীরে ক্ষোভ, অভিমান ও হতাশা জমতে থাকে।
কঠিন আলোচনা এড়িয়ে যাওয়া কি সমাধান?
অনেকেই মনে করেন, ঝগড়া এড়াতে কিছু বিষয় নিয়ে কথা না বলাই ভালো।
তবে এই বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সাময়িক শান্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
নিউ ইয়র্কের আরেক থেরাপিস্ট ডায়ানা মারিয়াম নিকাহ বলেন, “কঠিন আলোচনা এড়িয়ে গেলে সমস্যাগুলো হারিয়ে যায় না। বরং সেগুলো ভেতরে জমে থাকে এবং পরে আরও বড় আকারে ফিরে আসে।”
কোনো সম্পর্কেই মতবিরোধ অস্বাভাবিক নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, মতবিরোধের সময় দুজন কেমন আচরণ করছেন।
যদি তারা একে অপরকে দোষারোপ না করে সমাধানের চেষ্টা করেন, তাহলে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হতে পারে।
আবেগগত অনিরাপত্তার প্রভাব কোথায় পড়ে?
আবেগগত নিরাপত্তার অভাব শুধু সম্পর্কের মানসিক দিকেই প্রভাব ফেলে না, এটি শারীরিক ও ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সি ভিত্তিক সেক্স থেরাপিস্ট নানাহো সাওয়ানো বলেন, “দীর্ঘদিন অনিরাপদ সম্পর্কের মধ্যে থাকলে শরীরে মানসিক চাপের প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। এর ফলে ঘনিষ্ঠতার ইচ্ছাও কমে যেতে পারে।”
জর্জ ফ্যালার পারিবারিক থেরাপিস্ট হিসেবে কাজ করেন যুক্তরাষ্ট্রের। তিনি বলেন, “কিছু মানুষ সম্পর্কের দূরত্ব ও কষ্ট থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে ক্ষতিকর অভ্যাসের দিকেও ঝুঁকে পড়তে পারেন।”
এ কারণে আবেগগত নিরাপত্তার বিষয়টি শুধু সম্পর্ক নয়, সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গেও জড়িত।
নিরাপদ সম্পর্ক গড়ে তুলতে যা করা যায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবর্তনের প্রথম ধাপ হল সমস্যাকে স্বীকার করা। সম্পর্কের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা থাকলে, তা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করা প্রয়োজন।
তাই অবিশ্বাস বা অনিরাপত্তার অনুভূতির কথা প্রকাশ করাই নিরাপদ সম্পর্ক গড়ে তোলার শুরু। কারণ তখন দুইজন মানুষ একসঙ্গে সমাধানের পথে এগোতে পারেন।
যোগাযোগ মূলত একটি শেখার মতো দক্ষতা। যখন একজন অনুভব করেন যে তাকে সত্যিই শোনা হচ্ছে এবং বোঝা হচ্ছে, তখন সম্পর্ক আরও গভীর হয়।
ডায়ানা মারিয়াম নিকাহ মনে করেন, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ— এই দুই বিষয় সম্পর্কের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
রাগ, হতাশা বা কষ্টের মুহূর্তেও যদি নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে সম্মানজনকভাবে কথা বলা যায়, তাহলে নিরাপত্তা তৈরি হয়।
কখন পেশাদার সহায়তা প্রয়োজন?
সব সমস্যা একা সমাধান করা সম্ভব হয় না।
এই বিশেষজ্ঞদের মতে, দম্পতি কাউন্সেলিং বা থেরাপি এমন একটি জায়গা, যেখানে উভয় পক্ষ নিরাপদ পরিবেশে নিজেদের কথা বলতে পারেন। থেরাপিস্ট নিরপেক্ষভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন এবং যোগাযোগের নতুন কৌশল শেখাতে সাহায্য করেন।
যদি দুজন মিলে থেরাপিতে যেতে না চান, তাহলে ব্যক্তিগত পরামর্শ গ্রহণও উপকারী হতে পারে।
আরও পড়ুন
সম্পর্কের গভীরতায় ‘নীরবে পাশে থাকা’
সম্পর্কে স্ফুলিঙ্গ টিকিয়ে রাখতে