Published : 12 Jun 2026, 04:27 PM
প্রাচীনকালের এক রাজার গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কোথাও কোথাও শুরু হলেও দেশ পরিচালিত হতো রাজার নামে। তো এক রাজা একবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিস সফরে গেলেন। শহরটা তখনই বেশ উন্নত—রাতে চারপাশে হরেক রকম আলো, রঙিন ঝলক, রাস্তা জুড়ে এমন এক সৌন্দর্য যে মনে হয় শহরটা নিজেই উৎসব করছে।
রাজা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্যারিসের রাত দেখলেন। আলো, রং, জীবন—সব মিলিয়ে তিনি এতটাই মুগ্ধ হলেন যে মনে মনে ঠিক করলেন. “আমার দেশের রাজধানীও এমন আলোয় ভরে তুলব।”
দেশে ফিরে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ডাকলেন।
গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, “আমি চাই আমার রাজধানী আলোয় ঝলমল করুক। রাজধানীকে আলোকিত করতে আমার তহবিল থেকে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলো।”
প্রধানমন্ত্রী মাথা নেড়ে বললেন, “মহারাজের ইচ্ছা বাস্তবায়নে কোনো ত্রুটি হবে না।”
তিনি ডাকলেন অর্থমন্ত্রীকে। বললেন, “রাজা রাজধানী আলোকিত করতে বলেছেন। এজন্য ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন। ব্যবস্থা করুন।”
অর্থমন্ত্রী বললেন, কোনো চিন্তা করবেন না মাননীয় প্রধানমন্ত্রী। আমি শহরে আলোর বন্যা বইয়ে দিব।”
তিনি এরপর ডাকলেন পরিকল্পনা মন্ত্রীকে। বললেন, “রাজধানী আলোকিত করতে রাজা ৫ কোটি টাকা দিয়েছেন। অবিলম্বে কাজ শুরু করুন।”
পরিকল্পনা মন্ত্রী বললেন, “অবশ্যই। আমি আজই ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
পরিকল্পনা মন্ত্রী গেলেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর কাছে। বললেন, “রাজা ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন, রাজধানী আলোকিত করতে। ব্যবস্থা নিন।”
মন্ত্রী বললেন, “ঠিক আছে। এক মাসের মধ্যে রাজধানী আলোকিত হয়ে যাবে।”
এরপর স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মেয়রকে ডাকলেন। বললেন, “রাজা রাজধানী আলোকিত দেখতে চান। তার জন্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন।”
মেয়র বললেন, “রাজার ইচ্ছা বাস্তবায়নে আমি জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
এরপর মেয়র ওয়ার্ড কমিশনারদের ডেকে বলেলেন, “রাজার নির্দেশ, শহর আলোকিত করতে হবে। এ জন্য ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়েছে।”
কমিশনাররা মাথা চুলকে বললেন, ‘‘বরাদ্দটা একটু কম হয়ে গেল। তারপরও দেখি কী করা যায়।”
এরপর কমিশনাররা সিদ্ধান্ত নিলেন, তারা এ ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মানুষের সহায়তা নেবেন।
তারা ভাগ হয়ে সরাসরি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বললেন, “আমাদের মহামান্য রাজা শহর আলোকিত দেখতে চান। আপনারা সবাই নিজ নিজ পকেটের টাকা দিয়ে বাতি কিনে আজ রাতেই রাস্তা ও বাড়ির সামনে জ্বালান। তা না হলে প্রত্যেককে শূলে চড়ানোর নির্দেশ জারি করেছেন রাজা মশাই।”
মানুষেরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে ভাবল, রাজার আদেশ পালন করা নাগরিক কর্তব্য। তা ছাড়া এটা না করলে জানেরও ভয় আছে। কত টাকাই তো কতভাবে অপচয় হয়। লাইট লাগানোতে আর কয় টাকা যাবে!
সবাই নিজেদের টাকা খরচ করে হরেক রকম লাইট কিনল। রাত নামতেই পুরো শহর রঙিন আলোয় ঝলমল করে উঠল—রাস্তা, গলি, বাড়ির ছাদ, দোকান—সব যেন এক জীবন্ত উৎসব।
রাজা দাঁড়িয়ে বললেন, “অসাধারণ! দারুণ কাজ হয়েছে!”
তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ দিলেন।
প্রধানমন্ত্রী অর্থমন্ত্রীকে।
অর্থমন্ত্রী পরিকল্পনা মন্ত্রীকে।
পরিকল্পনা মন্ত্রী স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মেয়রকে।
মেয়র কাউন্সিলরদের।
আর যারা কাজটা করল তাদের কেউ ধন্যবাদ দিল না!
তারপরও সবাই খুশি। শহর আলোকিত।
বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট দেখে সেই গল্পটাই বারবার মনে পড়ে।
সরকার বলছে, এটি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন, বিনিয়োগ ও কল্যাণের বাজেট। শুনতে সত্যিই ভালো লাগে। সংখ্যাটা এত বড় যে সাধারণ মানুষের পক্ষে কল্পনা করাও কঠিন। এক লাখ সেকেন্ড প্রায় একদিন, এক মিলিয়ন সেকেন্ড প্রায় ১১ দিন, আর ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা—এটা কল্পনা করতে গেলে হয়তো ক্যালকুলেটরও কয়েকবার রিস্টার্ট নিতে চাইবে।
বাজেটের ভাষায় এটিকে বলা হচ্ছে প্রবৃদ্ধির বাজেট। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে বাজেটের সংজ্ঞা খুবই সহজ। বাজারে গিয়ে এক কেজি পেঁয়াজ কিনতে কত টাকা লাগছে, ডিমের দাম কত, বাসাভাড়া কত বাড়ল, সন্তানের স্কুল ফি কত হলো—এসবের মধ্যেই তারা বাজেটের সাফল্য বা ব্যর্থতা খুঁজে নেয়।
এই বাজেটে সরকারের ব্যয়ের পরিকল্পনা ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই টাকা আসবে কোথা থেকে?
সরকার বলছে, রাজস্ব আদায় হবে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকা। অর্থাৎ রাষ্ট্র এবারও জনগণের দরজায় কড়া নাড়বে। ভ্যাটের মাধ্যমে, আয়করের মাধ্যমে, আমদানি শুল্কের মাধ্যমে, মোবাইল রিচার্জের মাধ্যমে, এমনকি অনেক সময় অজান্তেই বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে বাড়ি ফেরার সময়ও মানুষ কর দিয়ে আসবে। সোজা কথায় বাজেটের আলো জ্বালাতে গিয়ে আমাদের মতো আমজনতার পকেটে ঘটতে যাচ্ছে লোডশেডিং।
আমাদের করব্যবস্থার সবচেয়ে মজার দিক হলো, আপনি হয়তো কখনও আয়কর দেন না, কিন্তু ভ্যাট দেন প্রায় প্রতিদিন। চা খেতে গিয়ে, সাবান কিনতে গিয়ে, মোবাইল রিচার্জ করতে গিয়ে—রাষ্ট্র আপনার পাশে থাকে। এতটাই পাশে থাকে যে কখনও কখনও মনে হয়, আপনার পরিবারের সদস্যদের চেয়েও রাষ্ট্র আপনার খরচের খোঁজ বেশি রাখে।
এই বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় সম্ভবত ঋণের সুদ পরিশোধ। সরকারকে আগামী অর্থবছরে শুধু সুদ পরিশোধ করতেই ব্যয় করতে হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেটের ১৩.৬ শতাংশ এবং মোট রাজস্বের প্রায় ১৮ শতাংশ। সহজ ভাষায় বললে, সরকার যে প্রতি ১০০ টাকা রাজস্ব আদায় করবে, তার প্রায় ১৮ টাকা চলে যাবে পুরোনো ঋণের সুদ পরিশোধে।
একসময় গ্রামের মানুষ বলত, “ঋণ করে ঘি খাও।” এখন মনে হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সংস্করণটি হলো, “ঋণ করে উন্নয়ন করো, পরে সুদ দিয়ে জীবন কাটাও।”
অবশ্য বাজেটে ইতিবাচক দিকও আছে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়া হয়েছে। কৃষক, দরিদ্র পরিবার, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী—অনেকের জন্যই কিছু না কিছু সুবিধার ঘোষণা আছে।
কিন্তু এখানে আবার সেই রাজার গল্প ফিরে আসে।
বাজেটে যে বরাদ্দ ঘোষণা করা হয়, তার কতটা বাস্তবে মানুষের জীবনে পৌঁছায়? কাগজে লেখা সংখ্যাগুলো মাঠপর্যায়ে গিয়ে কতটা আলো হয়ে জ্বলে ওঠে? আর সেই আলো জ্বললে তার বিল কে দেয়?
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রায়ই দেখা যায়, উন্নয়ন প্রকল্পের ফিতা কাটার ছবি সংবাদপত্রে আসে, কিন্তু প্রকল্পের ব্যয়ভার বহন করে সাধারণ মানুষ—কখনও করের মাধ্যমে, কখনও মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে, কখনও ব্যাংক ঋণের সুদের মাধ্যমে।
এবারের বাজেটও কিছুটা সেই রকম এক প্রতিশ্রুতির ক্যানভাস। এখানে প্রবৃদ্ধি আছে, উন্নয়ন আছে, সামাজিক সুরক্ষার কথা আছে, তরুণদের জন্য স্টার্টআপ তহবিল আছে, জলবায়ু তহবিল আছে। সবই আছে। শুধু প্রশ্ন একটাই—এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে?
তবে বাজেটের অন্তরালে আরেকটি বড় বাস্তবতা লুকিয়ে আছে। সরকারি মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য সরকারের দেওয়া সার্বভৌম গ্যারান্টির পরিমাণ ১ লাখ ৩ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা। এসব প্রতিষ্ঠানের কেউ ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে শেষ পর্যন্ত দায়ভার রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে। অর্থাৎ এটি দৃশ্যমান বাজেটের বাইরে থাকা এক ধরনের সম্ভাব্য আর্থিক ঝুঁকি। এমনিতেই বরাদ্দ ব্যয় নিচ পর্যন্ত ঠিক মতো পৌঁছে না। তার ওপর শুভঙ্করের ফাঁকি থাকলে তো বাজেট দিয়ে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আর বাড়বে বৈ কমবে না।
বাজেটের সাফল্য সংসদে টেবিল চাপড়ে মাপা যায় না। মাপা যায় বাজারে। মাপা যায় হাসপাতালের লাইনে। মাপা যায় চাকরিপ্রার্থীদের অপেক্ষার সারিতে। মাপা যায় কৃষকের ধান বিক্রির দামে।
রাজা যেমন শেষ পর্যন্ত আলোকিত শহর দেখে খুশি হয়েছিলেন, আমাদের নীতিনির্ধারকেরাও হয়তো আগামী বছর উন্নয়ন সূচকের কিছু সুন্দর সংখ্যা দেখিয়ে সন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ তখনও হিসাব করবে, লোড শেডিংয়ের পরিমাণ কত, বিদ্যুৎ-পানি-গ্যাসের বিল কত, চালের দাম কত, ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার খরচ কত।
তাই ২০২৬-২৭ সালের বাজেটকে আপাতত বলা যায়—“আলোর বাজেট”। এখানে আলো জ্বালানোর পরিকল্পনা আছে, আলোকসজ্জার নকশাও আছে। এখন দেখার বিষয়, আলোটা সত্যিই মানুষের ঘরে পৌঁছায়, নাকি শেষ পর্যন্ত আবারও জনগণকেই নিজের পকেটের টাকা খরচ করে বাতি কিনতে হয়, আর উপরে বসে সবাই একে অপরকে ধন্যবাদ দিতে ব্যস্ত থাকে!
চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: [email protected]