Published : 11 Jun 2026, 08:07 PM
জাতীয় বাজেটের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো অনেক সময় বড় শিরোনামে আসে না। করপোরেট কর, ব্যাংকিং, রাজস্ব ঘাটতি, বড় প্রকল্পের খবরের ভিড়ে কিছু সিদ্ধান্ত নীরবে ঢুকে পড়ে, অথচ সেগুলোই নাগরিক জীবনের জন্য দীর্ঘমেয়াদে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাজেট-সংক্রান্ত সংবাদে দেখলাম, সাইকেল ও সাইকেলের যন্ত্রাংশের ওপর শুল্ক কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে, যার ফলে বাজারে সাইকেলের দাম বাড়তে পারে। উদ্দেশ্য হিসেবে দেশীয় শিল্প সুরক্ষার যুক্তি সামনে আনা হয়েছে। শিল্প সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এই সিদ্ধান্ত আমাকে অন্য একটি প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়েছে।
আমরা আসলে কোন ধরনের পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে চাই?
বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে নগরীর বাতাস দিন দিন দূষিত হচ্ছে, যানজট অর্থনীতির ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে, জ্বালানি আমদানিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন ক্রমশ আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান হওয়ার কথা ছিল এমন সব সমাধানের পক্ষে, যা একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব, সাশ্রয়ী এবং জনস্বাস্থ্যসম্মত।
সাইকেল সেই বিরল সমাধানগুলোর একটি।
সাইকেল কোনো জ্বালানি পোড়ায় না, কার্বন নিঃসরণ করে না, শব্দদূষণের কারণ হয় না। এর জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করতে হয় না, চার্জিং স্টেশন বসাতে হয় না, বিদেশ থেকে জ্বালানি আমদানি করতে হয় না। একটি সাইকেল রাস্তার ওপর যে পরিমাণ চাপ সৃষ্টি করে, তা মোটরচালিত যানবাহনের তুলনায় নগণ্য। একই সঙ্গে এটি মানুষের শরীরকে সক্রিয় রাখে, স্বাস্থ্যঝুঁকি কমায় এবং শহরকে আরও বাসযোগ্য করে তোলে।
জলবায়ু পরিবর্তন, নগর দূষণ এবং জনস্বাস্থ্য—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সাইকেল একটি প্রমাণিত সমাধান।
তবু আমরা এমন এক অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে সাইকেলকে আরও দামি করার আলোচনা হচ্ছে। এখানে একটি মৌলিক বৈপরীত্য রয়েছে।
আমরা একদিকে সবুজ অর্থনীতির কথা বলি, টেকসই উন্নয়নের কথা বলি, পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যতের কথা বলি; অন্যদিকে এমন একটি পরিবহন মাধ্যমকে ব্যয়বহুল করে তুলছি, যা কার্যত শূন্য-নিঃসরণ পরিবহন।
প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি সত্যিই আমাদের নীতিগত অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন আছে—এই সিদ্ধান্তের প্রভাব আসলে কার ওপর পড়বে?
বাংলাদেশে সাইকেল সাধারণত দরিদ্রের বাহন। কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। শহরের কিছু মানুষ স্বাস্থ্যচর্চা বা বিনোদনের জন্য দামি সাইকেল ব্যবহার করেন, কিন্তু দেশের বৃহত্তর বাস্তবতা ভিন্ন।
সাইকেল হলো শিক্ষার্থীর বাহন, সাইকেল হলো কারখানার শ্রমিকের বাহন, সাইকেল হলো নিম্ন-মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীর বাহন, সাইকেল হলো অসংখ্য ডেলিভারি কর্মীর জীবিকার অংশ। সাইকেল হলো সেই মানুষের পরিবহন, যার ব্যক্তিগত গাড়ি কেনার সামর্থ্য নেই, আবার প্রতিদিনের অনিশ্চিত গণপরিবহনের ওপরও পুরোপুরি নির্ভর করতে চান না।
অর্থাৎ সাইকেলের দাম বাড়ানো মানে কেবল একটি পণ্যের দাম বাড়ানো নয়; বরং এমন একটি পরিবহন মাধ্যমকে আরও দূরে সরিয়ে দেওয়া, যা সমাজের অপেক্ষাকৃত কম আয়ের মানুষের নাগালের মধ্যে ছিল। এখানে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নও জড়িত।
রাষ্ট্র যখন একটি গাড়ির ওপর কর আরোপ করে, তখন সাধারণত তার যুক্তি হয় বিলাসী ভোগ কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করা বা পরিবেশগত ক্ষতি বিবেচনায় নেওয়া; কিন্তু একটি সাইকেলকে একই যুক্তিতে দেখা যায় না। কারণ সাইকেল কোনো বিলাসপণ্য নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রেই এটি অর্থনৈতিক স্বাধীনতার একটি মাধ্যম। বিশ্বের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।
ইউরোপের বহু শহর আজ সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহ দিতে নানা ধরনের আর্থিক প্রণোদনা দেয়। অনেক দেশে কর্মস্থলে সাইকেলে যাতায়াত করলে কর-সুবিধা পাওয়া যায়, কোথাও সাইকেল কেনার জন্য নগদ সহায়তা দেওয়া হয়, কোথাও পুরোনো গাড়ি ব্যবহার কমিয়ে সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়। কারণ নীতিনির্ধারকেরা বুঝেছেন, সাইকেল কেবল একটি যানবাহন নয়; এটি জনস্বাস্থ্য নীতি, পরিবেশ নীতি, জ্বালানি নীতি এবং নগর পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই যুক্তিগুলো আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
আমরা প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি আমদানি করি, যানজটের কারণে অসংখ্য কর্মঘণ্টা হারাই, নগর দূষণের কারণে স্বাস্থ্যব্যয় বাড়ছে এবং মানুষের দৈনন্দিন চলাচল ক্রমশ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। এই প্রেক্ষাপটে সাইকেলকে উৎসাহিত করা উচিত ছিল রাষ্ট্রের অন্যতম সহজ এবং কম ব্যয়বহুল নীতিগত সিদ্ধান্ত।
বরং পরিকল্পনা হওয়া উচিত ছিল—কীভাবে আরও বেশি মানুষকে সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত করা যায়? কীভাবে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের জন্য সাইকেল সহজলভ্য করা যায়? কীভাবে কর্মজীবী মানুষকে সাইকেল ব্যবহারে উৎসাহিত করা যায়? কীভাবে সাইকেলের জন্য নিরাপদ অবকাঠামো তৈরি করা যায়?
দুঃখজনকভাবে আমরা যেন উল্টো আলোচনায় ব্যস্ত।
গত দুই দশকে আমি সাইকেলে ১৪টি দেশে ঘুরেছি। উন্নত দেশ, উন্নয়নশীল দেশ, ছোট শহর, বড় শহর—বিভিন্ন জায়গায় মানুষের চলাচলের ধরন কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। কোথাও দেখিনি সাইকেলকে সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বরং শহরগুলো ভাবছে কীভাবে আরও বেশি মানুষকে ব্যক্তিগত গাড়ি থেকে সাইকেলে আনা যায়, কীভাবে শহরকে মানুষের জন্য ফিরিয়ে আনা যায়, কীভাবে দূষণ কমানো যায় এবং কীভাবে স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা যায়।
বাংলাদেশ সম্ভবত অন্য প্রশ্ন করছে—কীভাবে সাইকেলকে আরও ব্যয়বহুল করা যায়।
সরকার যদি সত্যিই দেশীয় সাইকেল শিল্পকে সুরক্ষা দিতে চায়, সেটি স্বাগত। স্থানীয় উৎপাদন বাড়ুক, কর্মসংস্থান তৈরি হোক, শিল্প বিকশিত হোক—এতে আপত্তির কিছু নেই; কিন্তু সেই নীতির চূড়ান্ত ফল যদি হয় সাধারণ মানুষের জন্য সাইকেল আরও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠা, তাহলে সেই নীতির সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্যও বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
মুনতাসির মামুন লেখক, গবেষক ও পরিবেশকর্মী। যোগাযোগ: [email protected]