Published : 27 Jul 2026, 08:19 AM
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নেয়া দুটি উদ্যোগ জনপরিসর নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটি হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ক্যাফেটেরিয়ায় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ঘেরাটোপ দিয়ে পৃথক ‘ফিমেল জোন’ চালু করা হয়েছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকের মতে, নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হলেও, এর ধরন ও প্রতীকী বার্তা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে একটি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে এ ধরনের পৃথকীকরণ সমতা, অন্তর্ভুক্তি এবং সহাবস্থানের ধারণার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—সে বিতর্ক সামনে এসেছে।
এই ফিমেল জোনের উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ। তবে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত বিশেষায়িত স্থানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পুরুষ নেতৃত্বের দৃশ্যমান উপস্থিতিও প্রশ্নের অবকাশ তৈরি করেছে। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য গৃহীত একটি উদ্যোগের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও উপস্থাপনায় নারী প্রতিনিধিদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ কি আরও বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল না? ফলে বিতর্কটি কেবল একটি পৃথক বসার স্থানকে ঘিরেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে লিঙ্গসমতা, প্রতিনিধিত্ব এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের বৃহত্তর প্রশ্নকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

অন্যটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘নামাজের জায়গা’ নাম দিয়ে রাজীব শাহ নামে এক ভবঘুরের মসজিদ নির্মাণের চেষ্টা, যা এরই মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়েছে। রোববার গণপূর্ত অধিদপ্তর, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সেখানে অভিযান চালিয়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে উচ্ছেদ করেছে সব অবৈধ স্থাপনা; যার মধ্যে রয়েছে ওই ভবঘুরের গড়ে তোলা অস্থায়ী ‘নামাজের জায়গা’ও।
আপাতত দৃষ্টিতে দুটি বিষয়ের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাফেটেরিয়ার বসার ব্যবস্থা, অন্যটি একটি জাতীয় ঐতিহাসিক উদ্যানে ধর্মীয় অবকাঠামো নির্মাণ। কিন্তু নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে উভয় বিতর্ক একই মৌলিক প্রশ্নের দিকে আমাদের নিয়ে যায়—আমরা আমাদের জনপরিসরকে কীভাবে কল্পনা করি?
আমরা কি এমন জনপরিসর চাই, যেখানে ভিন্ন পরিচয়, বিশ্বাস, লিঙ্গ ও জীবনধারার মানুষ একই পরিসরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তুলবে? নাকি এমন এক সমাজের দিকে এগোচ্ছি, যেখানে ভিন্ন ভিন্ন চাহিদা পূরণের নামে জনপরিসর ক্রমশ ছোট ছোট পৃথক অঞ্চল, আলাদা সুবিধা এবং স্বতন্ত্র কাঠামোয় বিভক্ত হয়ে যাবে?
এই প্রশ্ন কেবল দুটি প্রকল্পের নয়; বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নগর সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক চর্চা, সামাজিক সংহতি, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং নাগরিক সহাবস্থানের প্রশ্নও।
গণতান্ত্রিক সমাজে জনপরিসর কেবল একটি ভৌত স্থান নয়। এখানেই মানুষ ভিন্নতা নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করতে শেখে। পার্ক, বিশ্ববিদ্যালয়, ফুটপাত, গ্রন্থাগার, ক্যাফেটেরিয়া কিংবা গণপরিবহন—এসব স্থান নাগরিক সমতার প্রতিদিনের অনুশীলনের ক্ষেত্র। এখানে মানুষ কেবল চলাফেরা করে না; তারা পরস্পরকে চিনতে শেখে, মতের ভিন্নতাকে গ্রহণ করতে শেখে এবং নাগরিক আস্থা গড়ে তোলে। ফলে জনপরিসরের চরিত্রে পরিবর্তন আনা মানে কেবল অবকাঠামো পরিবর্তন নয়; সামাজিক সম্পর্কের ধরনও পরিবর্তন করা।
এই প্রেক্ষাপটে টিএসসি ক্যাফেটেরিয়ার ফিমেল জোন বিতর্কটি গুরুত্বপূর্ণ। সমর্থকদের যুক্তি হলো, এটি কোনো বাধ্যতামূলক পৃথকীকরণ নয়; নারী শিক্ষার্থীদের একটি অংশের বাস্তব চাহিদার প্রতি সংবেদনশীল উদ্যোগ। হিজাব বা নিকাব পরিহিত শিক্ষার্থী, শিশুসন্তান নিয়ে আসা মা কিংবা অপেক্ষাকৃত ব্যক্তিগত পরিবেশে বসতে আগ্রহী নারী শিক্ষার্থীদের জন্য এমন একটি বিকল্প ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তিরই প্রকাশ।
একটি বহুত্ববাদী সমাজে ভিন্ন চাহিদাকে স্বীকৃতি দেওয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জননীতির প্রশ্ন এখানেই শেষ হয় না। কোনো ব্যবস্থা আইনগতভাবে ঐচ্ছিক হলেও সামাজিক বাস্তবতায় তা সব সময় স্বেচ্ছাভিত্তিক থাকে না। পরিবার, ধর্মীয় প্রত্যাশা, সহপাঠী বা সামাজিক রীতিনীতির অদৃশ্য চাপের কারণে এ জাতীয় বিকল্প ধীরে ধীরে প্রত্যাশিত আচরণে রূপ নিতে পারে। জননীতি তাই কেবল ঘোষিত উদ্দেশ্য নয়, সম্ভাব্য সামাজিক প্রভাবও বিবেচনা করে।
আরও একটি প্রশ্ন হলো প্রতীকী বার্তার। একটি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাফেটেরিয়ায় স্থায়ীভাবে লিঙ্গভিত্তিক পৃথক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ভবিষ্যতের জন্য কী ধরনের নীতিগত নজির তৈরি করবে? আজ ক্যাফেটেরিয়া, কাল কি পাঠাগার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিক্ষার্থী লাউঞ্জ, নিয়মিত ক্লাস রুম বা অন্য কোনো জনপরিসরেও একই ধরনের বিভাজনের দাবি উঠবে? জনপরিসরে গৃহীত প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের নীতিনির্ধারণে একটি মানদণ্ড তৈরি করে।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নতুন মসজিদ নির্মাণের বিতর্কেও একই ধরনের নীতিগত প্রশ্ন উপস্থিত। এখানে বিষয়টি ধর্মীয় স্বাধীনতার বিরোধিতা নয়। বাংলাদেশের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করেছে। দর্শনার্থীদের ইবাদতের সুযোগ থাকা স্বাভাবিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একই সঙ্গে রাষ্ট্রের আরেকটি সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব হলো ঐতিহাসিক জনপরিসর, উন্মুক্ত সবুজ এলাকা এবং জাতীয় স্মৃতিকে সংরক্ষণ করা।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কেবল একটি নগর উদ্যান নয়; বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক স্মৃতিস্থান। ৭-ই মার্চের ভাষণ, মুক্তিযুদ্ধকালীন জনসমাবেশ এবং ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্মৃতি এই স্থানকে একটি জাতীয় প্রতীকে পরিণত করেছে। ফলে এখানে নতুন স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণের প্রশ্ন কেবল ধর্মীয় অবকাঠামোর নয়; ঐতিহাসিক ল্যান্ডস্কেপের চরিত্র রক্ষারও।
মসজিদ নির্মাণের সমর্থকরা যুক্তি দিতে পারেন যে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ উদ্যানে আসেন এবং তাদের ধর্মীয় প্রয়োজন পূরণের সুযোগ থাকা উচিত। এই যুক্তি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। তবে একই সঙ্গে জননীতির আরেকটি মৌলিক প্রশ্নও প্রাসঙ্গিক—এই প্রয়োজন পূরণের জন্য নতুন স্থায়ী নির্মাণই কি একমাত্র বা সর্বোত্তম সমাধান? উদ্যানে এবং আশপাশে বেশ কিছু মসজিদ তো বিদ্যমান রয়েছে। আশপাশে বিদ্যমান অবকাঠামো, বিকল্প ব্যবস্থা কিংবা কম হস্তক্ষেপমূলক সমাধান কি যথেষ্ট হয় না? একই প্রশ্ন টিএসসির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক উপায় কি নেই, যা জনপরিসরের অভিন্ন চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখবে?
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে কিছু শিক্ষা দেয়। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় নারী শিক্ষার্থীদের জন্য ল্যাকটেশন রুম, ওয়েলনেস স্পেস, প্রেয়ার রুম, নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা এবং জেন্ডার-সেনসিটিভ নীতিমালা চালু করেছে। একইভাবে ঐতিহাসিক নগর উদ্যানগুলোতে নতুন স্থায়ী নির্মাণের পরিবর্তে বিদ্যমান জনপরিসরের চরিত্র সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। অবশ্যই বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন এবং কোনো আন্তর্জাতিক মডেল হুবহু অনুসরণের প্রশ্ন নেই। তবে একটি নীতি সর্বত্রই গুরুত্বপূর্ণ—জনপরিসরে স্থায়ী পরিবর্তন আনার আগে তার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব মূল্যায়ন করা।
এই দুই বিতর্ক আমাদের আরও একটি মৌলিক বিষয় স্মরণ করিয়ে দেয়। সমতা, ন্যায্যতা এবং অন্তর্ভুক্তি—এই তিনটি ধারণা এক নয়। সমতা সবার জন্য একই সুযোগ নিশ্চিত করে; ন্যায্যতা ভিন্ন চাহিদার ভিত্তিতে সহায়তা দেয়; আর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে, যেন কেউ জনজীবনের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়। একটি নীতি যদি বিশেষ প্রয়োজন পূরণ করতে গিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে সামাজিক দূরত্ব, প্রতীকী বিভাজন বা সমান্তরাল জনপরিসরের জন্ম দেয়, তবে সেই নীতিকে পুনর্বিবেচনা করা গণতান্ত্রিক দায়িত্ব।
তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত ফিমেল জোন বা মসজিদ নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো—জনপরিসর সম্পর্কে আমাদের রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে? আমরা কি প্রতিটি নতুন চাহিদার উত্তর হিসেবে নতুন বিভাজন সৃষ্টি করব, নাকি এমন সৃজনশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাধান খুঁজব, যা বিশেষ প্রয়োজন পূরণ করার পাশাপাশি জনপরিসরের উন্মুক্ততা, বৈচিত্র্য এবং সহাবস্থানের চরিত্রও সংরক্ষণ করবে?
এই দুই বিতর্ক শেষ পর্যন্ত আমাদের একটি বৃহত্তর নীতিগত প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বিষয়টি ফিমেল জোন বা মসজিদ—কোনোটির পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার নয়; বরং প্রশ্ন হলো জনপরিসর সম্পর্কে রাষ্ট্র, বিশ্ববিদ্যালয় ও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে। ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা ধর্মীয় চাহিদার প্রতি সংবেদনশীল হওয়া অবশ্যই জরুরি। তবে সেই চাহিদা পূরণের উপায় এমন হওয়া উচিত, যা একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক, প্রয়োজনভিত্তিক এবং জনপরিসরের উন্মুক্ত চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কারণ গণতান্ত্রিক সমাজে জনপরিসরের অন্যতম উদ্দেশ্যই হলো ভিন্ন পরিচয়ের মানুষকে একই পরিসরে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের পরিবেশে যুক্ত রাখা।
জনপরিসরের চরিত্র একবার পরিবর্তিত হলে শুধু একটি স্থানের ভৌত রূপ বদলায় না; পরিবর্তিত হয় নাগরিক সম্পর্ক, সামাজিক আস্থা এবং গণতান্ত্রিক সহাবস্থানের সংস্কৃতিও। তাই জনপরিসরের সম্প্রসারণ, পুনর্বিন্যাস কিংবা নতুন সুবিধা সংযোজন—যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, তা যেন কোনো সাময়িক প্রবণতা, প্রতীকী প্রতিযোগিতা বা স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে সাংবিধানিক মূল্যবোধ, জনস্বার্থ এবং প্রমাণনির্ভর নীতিনির্ধারণের ভিত্তিতে হয়। কারণ একটি পরিণত গণতন্ত্রের শক্তি শুধু তার প্রতিষ্ঠানেই নয়; বরং তার উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং সবার জন্য সমানভাবে ব্যবহারযোগ্য জনপরিসরেও প্রতিফলিত হয়।
শুভ কিবরিয়া সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: [email protected]