Published : 11 Jun 2026, 04:29 PM
ঘুম শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে কখনও কখনও ঘুমের কিছু অভিজ্ঞতা উদ্বিগ্ন করে তোলে।
ঘুমের মধ্যে কান্না করা বা কান্না করতে করতে জেগে ওঠা তেমনই একটি বিষয়।
একে অস্বাভাবিক মনে হলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি সবসময় গুরুতর কোনো সমস্যার লক্ষণ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি মস্তিষ্কের আবেগ প্রক্রিয়াজাত করার একটি স্বাভাবিক উপায় হতে পারে।
মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. ক্রিস মওসুনিক মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘কাম ডটকম’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “ঘুমের মধ্যে কান্না করা প্রায়ই অমীমাংসিত আবেগ, মানসিক চাপ কিংবা উদ্বেগের সঙ্গে সম্পর্কিত। কখনও এটি স্বপ্নের সঙ্গেও যুক্ত থাকে, আবার কখনও কোনো স্বপ্ন মনে না থাকলেও এমন ঘটনা ঘটতে পারে।”
ঘুমের মধ্যে কান্না আসলে কী নির্দেশ করে?
ঘুমের সময় শরীর বিশ্রামে থাকলেও মস্তিষ্ক পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় থাকে না। আবেগ, স্মৃতি এবং অনুভূতির সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রক্রিয়া তখনও চলতে থাকে। এ কারণেই মানুষ স্বপ্ন দেখে, ভয় পায়, হাসে কিংবা কান্নাও করতে পারে।
ডা. মওসুনিকের মতে, “ঘুমের মধ্যে কান্না প্রায়ই মানুষের ভেতরে জমে থাকা আবেগের প্রতিফলন। দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, দুঃখ, উদ্বেগ, হতাশা কিংবা কোনো কষ্টকর অভিজ্ঞতা ঘুমের সময় প্রকাশ পেতে পারে।”
কখনও কখনও মানুষ এমন স্বপ্ন দেখে, যা গভীরভাবে আবেগপ্রবণ করে তোলে। সেই আবেগ এতটাই তীব্র হতে পারে যে, ঘুমের মধ্যেই কান্না শুরু হয় বা কান্না করতে করতে ঘুম ভেঙে যায়।
মানসিক চাপ ও উদ্বেগের প্রভাব
ব্যস্ততা ও অনিশ্চয়তা মানসিক চাপের বড় উৎস। কর্মক্ষেত্রের চাপ, পারিবারিক সমস্যা, আর্থিক অনিশ্চয়তা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।
“দিনের বেলায় চেপে রাখা উদ্বেগ অনেক সময় রাতে ঘুমের মধ্যে প্রকাশ পায়। মস্তিষ্ক যখন বিশ্রামের সময় দিনের অভিজ্ঞতাগুলোকে সাজিয়ে নেয়, তখন জমে থাকা আবেগও সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে ঘুমের মধ্যে কান্না দেখা দিতে পারে”, বলেন এই মনোচিকিৎসক।
অমীমাংসিত শোক ও মানসিক আঘাত
প্রিয়জন হারানো, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো কষ্টদায়ক ঘটনা মনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ ফেলে। অনেক সময় মানুষ সচেতনভাবে সেই স্মৃতিগুলো ভুলে থাকার চেষ্টা করে। তবে মস্তিষ্ক সবসময় সেই অভিজ্ঞতাগুলোকে পুরোপুরি ভুলে যায় না।
ডা. মওসুনিক ব্যাখ্যা করেন, “অমীমাংসিত শোক বা মানসিক আঘাত ঘুমের মধ্যে কান্নার কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যারা নিজেদের আবেগ প্রকাশ করতে পারেন না, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।”
স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্নের প্রভাব
ঘুমের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায় হল, দ্রুত চক্ষু নড়াচড়ার ঘুম। এই পর্যায়ে অধিকাংশ স্বপ্ন দেখা হয়। আবেগপূর্ণ বা ভয়াবহ স্বপ্ন অনুভূতিকে তীব্রভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
যদি কেউ দুঃস্বপ্ন দেখে, তাহলে সেই ভয় বা দুঃখ বাস্তবের মতো অনুভূত হতে পারে। অনেক সময় স্বপ্নের ঘটনাগুলো এতটাই আবেগময় হয় যে, মানুষ কান্না করতে করতে জেগে ওঠে।
“বারবার দুঃস্বপ্ন দেখা বা ঘুমের মধ্যে কান্না করা, মানসিক চাপের একটি ইঙ্গিত হতে পারে”, ব্যাখ্যা করেন ডা. মওসুনিক।
বিষণ্নতা ও অন্যান্য মানসিক সমস্যা
ঘুমের মধ্যে কান্না কখনও কখনও বিষণ্নতার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে। বিষণ্নতায় আক্রান্ত মানুষের আবেগ নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন দেখা যায়, যা স্বপ্ন এবং ঘুমের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে এই বিশেষজ্ঞ সতর্ক করে বলেন, “শুধু ঘুমের মধ্যে কান্না করলেই কাউকে বিষণ্নতায় আক্রান্ত বলা যায় না। এর সঙ্গে যদি দীর্ঘদিন মন খারাপ থাকা, আগ্রহ কমে যাওয়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি বা কাজের প্রতি অনীহা যুক্ত হয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।”
ওষুধ ও শারীরিক কারণও হতে পারে
কিছু ওষুধ ঘুমের ধরনে পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে মানসিক স্বাস্থ্য বা স্নায়ুতন্ত্র সম্পর্কিত কিছু ওষুধ স্বপ্নকে আরও জীবন্ত করে তুলতে পারে।
এছাড়া ঘুমজনিত সমস্যা, আতঙ্কজনিত আক্রমণ বা স্নায়বিক জটিলতার কারণেও ঘুমের মধ্যে কান্না দেখা দিতে পারে। যদি এই ঘটনা নিয়মিত ঘটে এবং ঘুমের মান নষ্ট করে, তাহলে চিকিৎসা নেওয়াই ভালো।
ঘুমের মধ্যে কান্না কমাতে যা করা যায়
ডা. মওসুনিক পরামর্শ দেন, “এই সমস্যা কমাতে প্রথমেই আবেগের প্রতি সচেতন হওয়া প্রয়োজন। দিনের বেলায় নিজের অনুভূতিগুলোকে স্বীকার করা এবং সেগুলো প্রকাশ করার সুযোগ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।”
ঘুমানোর আগে শরীর ও মনকে শান্ত করার অভ্যাস গড়ে তোলা উপকারী হতে পারে। ধীরে ধীরে শ্বাস নেওয়ার অনুশীলন, পেশি শিথিল করার কৌশল কিংবা ধ্যান মস্তিষ্ককে শান্ত করতে সাহায্য করে।
মনোযোগ চর্চাও কার্যকর একটি উপায়। এছাড়া বর্তমান মুহূর্তে মনোযোগ ধরে রাখার অভ্যাসও উদ্বেগ কমাতে বেশ ভালো কাজ করে এবং ঘুমের মানও উন্নত করতে পারে।
ঘুমানোর আগে শান্ত পরিবেশ তৈরি
ঘুমের আগে একটি নির্দিষ্ট রুটিন অনুসরণ করার পরামর্শ দেন, ডা. মওসুনিক।
উষ্ণ পানিতে গোসল, বই পড়া, হালকা ব্যায়াম বা শান্ত সুরের শব্দ শোনা মনকে প্রশান্ত করতে পারে।
ঘুমানোর আগে অতিরিক্ত উত্তেজনাপূর্ণ কিছু দেখা বা মানসিক চাপ বাড়ায় এমন আলোচনা করা কিংবা দীর্ঘ সময় ফোন বা টিভি দেখা এড়িয়ে চলা ভালো।
আরও পড়ুন
স্বপ্ন আর ভালো ঘুমের অদ্ভুত সম্পর্ক