Published : 19 Apr 2026, 03:37 PM
ঘুম মানেই বিশ্রাম। তবে সেই ঘুমের ভেতরে যে আরেকটি জগৎ তৈরি হয়, যার নাম স্বপ্ন। আর ভালো ঘুমের জন্য সেটির ভূমিকাও রয়েছে।
স্বপ্নকে অপ্রয়োজনীয় বা এলোমেলো কল্পনা বলে মনে হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, স্বপ্নই হতে পারে ভালো ঘুমের এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বিশেষ করে জীবন্ত, অনুভূতিপূর্ণ স্বপ্ন ঘুমকে আরও গভীর ও আরামদায়ক করে তোলে।
স্বপ্ন কি শুধু কল্পনা, নাকি প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া?
ইতালির লুক্কা শহরে অবস্থিত ‘আইএমটি স্কুল ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজ’য়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্বপ্ন আসলে মস্তিষ্কের একটি সক্রিয় প্রক্রিয়া।
এই গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ঘুমের সময় তাদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং মাঝেমধ্যে জাগিয়ে তাদের অনুভূতি জানতে চাওয়া হয়।
দেখা গেছে যারা জীবন্ত ও গভীর স্বপ্ন দেখেছেন, তারা ঘুমকে বেশি প্রশান্ত ও গভীর বলে অনুভব করেছেন।
গবেষণার প্রধান লেখক, স্নায়ুবিজ্ঞানী জুলিও বেরনার্দি রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “স্বপ্ন শুধু ঘুমের একটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়, বরং এটি মস্তিষ্ককে পুনর্গঠন ও ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে।”
তার মতে, স্বপ্নের মাধ্যমে মস্তিষ্ক দিনের অভিজ্ঞতা, আবেগ ও স্মৃতিগুলোকে সাজিয়ে নেয়।
গভীর ঘুমে স্বপ্নের ভূমিকা
অনেকের ধারণা গভীর ঘুম মানেই মস্তিষ্ক প্রায় নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়া। তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়।
ঘুমের একটি পর্যায় রয়েছে যেখানে চোখ দ্রুত নড়ে, আর মস্তিষ্ক আংশিক সক্রিয় থাকে— এই সময়েই দেখা যায় স্বপ্ন। এই পর্যায়টি ঘুমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মার্কিন ঘুম বিশেষজ্ঞ ডা. সাইমা তাহিরের মতে, “স্বপ্ন আসলে মস্তিষ্কের একটি সংগঠিত কাজ। এটি আবেগ, স্মৃতি এবং মানসিক ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করে।”
একই প্রতিবেদনে তিনি আরও বলেন, “জীবন্ত স্বপ্ন মস্তিষ্ককে এমনভাবে ব্যস্ত রাখে, যাতে বাইরের কোনো বিঘ্ন সহজে ঘুমকে নষ্ট করতে না পারে। ফলে ঘুমকে আরও গভীর ও তৃপ্তিকর বলে অনুভব হয়।
কেন কিছু স্বপ্ন ভালো লাগে?
সব স্বপ্ন একরকম নয়। কিছু স্বপ্ন ভয় পাইয়ে দেয়, আবার কিছু স্বপ্ন শান্তি দেয়।
গবেষণা বলছে, যে স্বপ্নগুলোতে আবেগের সমাধান থাকে, অর্থাৎ যেখানে কোনো সমস্যা মিটিয়ে ফেলা যায় বা কোনো প্রিয় স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত হওয়া যায়, সেগুলো মানসিকভাবে হালকা করে।
যেমন, কোনো প্রিয় মানুষের সঙ্গে দেখা হওয়া, কোনো কাঙ্ক্ষিত জায়গায় ভ্রমণ করা, কিংবা কোনো অর্জনের অনুভূতি— এই ধরনের স্বপ্ন ঘুমের পর মানসিক সতেজতা এনে দেয়।
এসব স্বপ্নে থাকে রং, শব্দ, অনুভূতির স্পষ্ট উপস্থিতি, যা মস্তিষ্ককে আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করতে সাহায্য করে।
ঘুম ভালো হলেও যে কারণে খারাপ লাগে
অনেক সময় আমরা যথেষ্ট সময় ঘুমালেও সকালে উঠে ক্লান্ত অনুভব হয়। এর পেছনে একটি কারণ হতে পারে স্বপ্নের অভাব বা স্বপ্নের গুণগত মান।
জুলিও বেরনার্দি বলেন, “যদি স্বপ্নের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন ঘটে, তাহলে ভালো ঘুমিয়েও খারাপ লাগতে পারে।”
মানে হল, শুধু কতক্ষণ ঘুমালাম তা নয়, ঘুমের ভেতরে কী ঘটছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
যেভাবে স্বপ্নকে ঘুমের জন্য কাজে লাগানো যায়
স্বপ্ন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হলেও, কিছু অভ্যাস মেনে চললে এমন পরিবেশ তৈরি করা যায় যেখানে ভালো স্বপ্ন দেখার সম্ভাবনা বাড়ে। এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল নিয়মিত ঘুমের সময় বজায় রাখা।
প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে গেলে মস্তিষ্ক একটি নির্দিষ্ট ছন্দে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে, যা স্বপ্নের পর্যায়কে স্বাভাবিকভাবে উন্নত করে।
নিয়মিত সময়ের গুরুত্ব
ঘুমের শেষ ভাগে স্বপ্ন বেশি দেখা যায়। তাই যদি ঘুম কমিয়ে দেওয়া হয় বা মাঝপথে জেগে ওঠা হয়, তাহলে সেই গুরুত্বপূর্ণ অংশটি নষ্ট হয়ে যায়।
ডা. তাহিরের মতে, “প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমানো এবং পর্যাপ্ত সময় ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি।”
পরিবেশ ও অভ্যাসের প্রভাব
ঘুমের পরিবেশও স্বপ্নের ওপর প্রভাব ফেলে। খুব বেশি আলো, শব্দ বা অস্বস্তিকর তাপমাত্রা ঘুমের ধারাবাহিকতা ভেঙে দেয়। ফলে স্বপ্নের ধারাও বিঘ্নিত হয়।
তাই ঘুমানোর ঘর ঠাণ্ডা, অন্ধকার ও শান্ত রাখা উচিত।
এছাড়া ঘুমানোর আগে শরীর ও মনকে শান্ত করার একটি নিয়মিত অভ্যাস তৈরি করা প্রয়োজন। কেউ বই পড়তে পারেন, কেউ ধ্যান করতে পারেন, কেউ আবার হালকা গরম পানিতে গোসল করতে পারেন।
এই ধরনের অভ্যাস মস্তিষ্ককে জানিয়ে দেয় যে ঘুমের সময় এসেছে।
আরও পড়ুন
ঘুমের জন্য শোবার ঘরের আদর্শ তাপমাত্রা