Published : 21 Jul 2026, 02:53 PM
মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের জের ধরে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে মিছিল যখন দিল্লির রফি মার্গে অবস্থিত সংসদ ভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, ততক্ষণে সেই মিছিলে যোগ দিয়েছে বিশ হাজারেরও বেশি তরুণ। নিজেদের তারা পরিচয় দিচ্ছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে। এটি গত মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতির শ্লেষাত্মক মন্তব্যের প্রতিবাদে গড়ে ওঠা সেই প্ল্যাটফর্ম, যেটি খুব অল্প সময়ে ভার্চুয়াল গণ্ডি পেরিয়ে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।
২০২১ সালে বিতর্কিত কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে আয়োজিত বিক্ষোভে হাজার হাজার ট্রাক্টর নিয়ে যোগ দেওয়া লাখো কৃষকের মিছিলের পর এটি দিল্লিতে আয়োজিত দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত। যেখানে ককরোচদের সঙ্গে যুক্ত বাম সংগঠনগুলোও।
এই বিশাল মিছিল যখন সংসদ ভবনের দিকে যাচ্ছিল, তখন সংসদের ভেতরে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের শীর্ষ নেতারা। সংবাদমাধ্যমের দাবি, এই খবর পেয়ে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত সংসদ ত্যাগ করেছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং বিজেপি সভাপতি জে. পি. নাড্ডা টানা চার ঘণ্টা রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। আন্দোলনকারীদের জমায়েত ঠেকাতে দিল্লি পুলিশ ১৬৩ ধারা, যা পুরনো ১৪৪ ধারাটি বদলে করা হয়েছে, জারি করে, ১৬৩ ধারা অনুযায়ী, একসঙ্গে ৫ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড বসিয়ে তল্লাশি জোরদার করেছে; কিছু মেট্রো স্টেশনের প্রবেশপথ বন্ধ করে যাতায়াত ঠেকানোর চেষ্টা করেছে। সব চেষ্টা যখন ব্যর্থ হয়েছে, তখন শেষ পর্যন্ত লাঠিচার্জ করে তারা এই আন্দোলনকে ভণ্ডুল করতে চেয়েছে।
স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার বাতাসে এই প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে যে, এতদিন ধরে কার্যত উপেক্ষা করে আসা আন্দোলন দমাতে সরকার কেন হঠাৎ তৎপর হয়ে উঠল? সরকার কি এমন কিছু আঁচ করতে পেরেছে, যার সঙ্গে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ কিংবা নেপালের আন্দোলনের যোগসূত্র আছে? ওদিকে স্বাধীনতার দাবিতে বেলুচিস্তানের গণআন্দোলন ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠছে। অভ্যুত্থানের পর বছর না ঘুরতেই নেপালের তরুণেরা আবার রাস্তায় নেমে এসেছে। সবকিছু মিলিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার হাওয়া কি কিছু বলতে চাইছে?
শুরুতে ভারতের তরুণদের দাবি ছিল দুটো। গত ৩ মে অনুষ্ঠিত মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের পর চরম মানসিক অবসাদ, আর্থিক ক্ষতি এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে অন্তত ১১ থেকে ১৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তরুণদের দাবি, শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে এবং আত্মহত্যা করা তরুণদের পরিবারকে ১ কোটি টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
গত ২০ জুন কয়েকশ শিক্ষার্থী যন্তরমন্তরে ধর্নায় বসেন। কিন্তু লাদাখের সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনশনে যোগ দিলে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। হাজার হাজার তরুণ আন্দোলনে যোগ দিতে থাকে।

মূলধারার সংবাদমাধ্যম বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও আন্দোলনের খবর সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ওয়াংচুকের অনশনের দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমায়েতও বড় হতে থাকে। ক্ষমতাসীন সরকারের অনুগত মিডিয়া ওয়াংচুককে ‘গাদ্দার’ বলে অভিহিত করতে শুরু করে; জনপ্রিয় ব্লগারদের চ্যানেলে শুরু হয় ষড়যন্ত্রতত্ত্বের চুলচেরা বিশ্লেষণ।
কথিত আছে, ‘থ্রি ইডিয়টস’ সিনেমার ‘র্যাঞ্চো’ চরিত্রটি মূলত সোনম ওয়াংচুকের জীবন থেকে অনুপ্রাণিত। দিন তিনেক আগে আমির খান প্রকাশ্যে বলে বসেন, থ্রি ইডিয়টস মোটেও সোনম ওয়াংচুকের জীবনিনির্ভর নয়। তার এই মন্তব্যের সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, এ কথা এখনই কেন বলতে হলো?
অনশনের বিশ দিনের মাথায়, গত পরশু যখন সোনম ওয়াংচুককে হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলে পুলিশ তুলে নিয়ে গেল, আন্দোলন তখন নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। সোনমের জায়গায় বসে পড়েন ককরোচ পার্টির প্রধান অভিজিৎ দীপকে। আন্দোলনকারীরা দাবি করেন যে, পুলিশ মূলত ওয়াংচুককে গ্রেপ্তার করেছে; ফলে আগের দাবির সঙ্গে এখন সোনম ওয়াংচুকের মুক্তির দাবিও যোগ হয়।
শুধু যুবারা নন; অভিনেতা থেকে শুরু করে দেশের বহু পরিচিত মুখ এই আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাতে শুরু করেন। সোনাক্ষী সিনহা, বিশাল দাদলানিরা সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও বার্তা দেন। শাবানা আজমি, দক্ষিণ ভারতের প্রভাবশালী অভিনেতা প্রকাশ রাজরা এসে আন্দোলনের মঞ্চে বসে পড়েন। যন্তর মন্তরে তখন বিশ হাজারেরও বেশি তরুণ—কারও হাতে ভারতের সংবিধান, কারও হাতে পতাকা।
আন্দোলন তখন নিছক ককরোচ জনতা পার্টি বা ব্যক্তি সোনম ওয়াংচুককে ছাড়িয়ে বহুদূর বিস্তৃত হয়ে গেছে। হাজার হাজার তরুণ যখন লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের মুখোমুখি হচ্ছেন, তখন পুলিশ আন্দোলনের মঞ্চ গুঁড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু সন্ধ্যায় তরুণেরা আরও বহুগুণ হয়ে যন্তর মন্তরে ফিরে এসেছেন। তাদের দাবি, দাবি পূরণের আগে তারা রাজপথ ছাড়বেন না। যতই ষড়যন্ত্রতত্ত্ব খোঁজা হোক, তারা কোনো ‘ত্রাতা’র ডাকে রাজপথে নামেননি; নেমেছেন নিজেদের যন্ত্রণা, ক্ষোভ আর অনিশ্চয়তা থেকে।
এ কারণেই প্রশ্নটা এসেছে যে, ক্ষোভের ভাষায় কি পরিবর্তনের হাওয়া শোনা যাচ্ছে? এমন আপাত ছোট ইস্যু থেকেই বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়। অভিন্ন সংকটে মানুষ শ্রেণিস্বার্থ খুঁজে পায়। ক্ষমতাসীনরা সংবাদমাধ্যমকে দুর্বল বা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে একপাক্ষিক প্রচার চালালেও বিরোধী মত তৈরির প্রক্রিয়া থেমে থাকে না। বরং প্রতিবাদের পথ যত রুদ্ধ হয়, নীরবে ক্ষোভও তত বেশি জমতে থাকে।
ভারতের ইতিহাসেই তার উদাহরণ রয়েছে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে জনরোষের ভেতর থেকে ‘জনতা পার্টি’র উত্থান ঘটেছিল। জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সেই আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল ইন্দিরা গান্ধীর কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান।
আশির দশকের শুরুতে কংগ্রেসের তথাকথিত মুসলিম তোষণনীতির বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের মধ্য দিয়ে পরে ভারতীয় জনতা পার্টি নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে। পরে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশকে ঘিরে জাতপাতভিত্তিক রাজনীতির বিস্তার নতুন নতুন আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তির জন্ম দেয়। বিহার ও উত্তর প্রদেশে লালু প্রসাদ যাদব, মুলায়ম সিং যাদব, নীতীশ কুমার কিংবা মায়াবতীর মতো নেতাদের উত্থানও সেই সামাজিক-রাজনৈতিক পরিবর্তনেরই ফল।
আবার দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ভেতর থেকেই যন্তর মন্তরে জন্ম নিয়েছিল আম আদমি পার্টি। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের জন্মও কিন্তু মমতা বন্দোপাধ্যায়ের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ থেকেই।
‘ককরোচ’ কি ও রকম এক নতুন রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে? এখনই এটি বলা শক্ত হলেও সম্ভাবনার উপাদানকে ঠিক উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তীব্র বেকারত্ব, সরকারি চাকরির সুযোগ কমে আসা, বেসরকারি খাতে অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, বিজেপির সাম্প্রদায়িক ও বুলডোজার রাজনীতি, সংখ্যালঘুদের উদ্বেগ, কৃষকদের ক্ষোভ—এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো অভিযোগ। তার মানে ক্ষোভের আগুনে ঢালার মতো ঘি প্রচুর পরিমাণে মজুত আছে।
দিল্লি ছাড়িয়ে আন্দোলন অন্য শহরেও দানা বাঁধছে। গতকাল কলকাতার মিছিলে হাজার হাজার মানুষ যোগ দিয়েছে। বাম রাজনৈতিক দলগুলো এতে সমর্থন জানাচ্ছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা যোগ দিচ্ছে আন্দোলনে। পথচলতি মানুষ থেমে সংহতি জানাচ্ছে। মনে রাখা দরকার, কোনো আন্দোলন যখন তার নিজস্ব পরিসর ছাড়িয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটি আর কেবল একটি সংগঠনের থাকে না; তা একটি বৃহৎ সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়।
গত তিন বছরে দক্ষিণ এশিয়া একের পর এক রাজনৈতিক অস্থিরতার সাক্ষী হয়েছে, যার প্রত্যেকটির সূচনা মোটামুটি একই ধরনের। শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান এবং সরকারের পতন, নেপালে বিক্ষোভ ও জেন-জির সরকার গঠন; এখন আবার সেই নেপালেই জেন-জির একটি অংশ নিজেদের সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে।

স্বাধীনতার দাবিতে বেলুচিস্তানের সংঘাত ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ মানুষের হতাহতের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। দেশ ছাড়িয়ে পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে সে খবর। পাকিস্তানের অভিযোগ, বেলুচিস্তান ও আজাদ কাশ্মীরের ঘটনায় ভারতের ভূমিকা রয়েছে। আবার ভারতের কিছু সংবাদমাধ্যম দাবি করছে, ককরোচ আন্দোলনের পেছনে পাকিস্তান ও চীনের প্রভাব রয়েছে। কিন্তু এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্য ও নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমাণ সামনে আসেনি। তবে দিল্লির মসনদে যে ডঙ্কা বাজতে শুরু করেছে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ নেই।
গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পরেও বাংলাদেশ স্থিতিশীল হতে পারেনি। রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে, ডান ও মধ্যপন্থার টানাটানি থিতু হয়নি। অনেকেই দাবি করছে, বাংলাদেশ তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ঘুড়ির নাটাই মূলত বহিরাগত শক্তির হাতে।
যন্তর মন্তরে এক তরুণের হাতে উঁচু করে ধরে রাখা একটা প্ল্যাকার্ডে লেখা, “কে বলেছে কোনো কিছুতেই কিছু যায় আসে না? তুমি জেগে উঠলেই সব বদলে যাবে।” বছরের পর বছর হয়তো মাথা নিচু করে কেটে যায়; কিন্তু এরপর হঠাৎ করে আসা কয়েকটি দিন বদলে দেয় সব হিসাব। মুখ গুঁজে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ দাউদাউ করে জ্বলে ওঠে। সেখান থেকে শুরু হয় নতুন ইতিহাস। দক্ষিণ এশিয়ায় এবার কার পালা?
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে সোমালিয়া সরকারের অর্থমন্ত্রণালয়ের সিনিয়র অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত। যোগাযোগ: [email protected]