Published : 21 Jul 2026, 11:56 AM
দেশের ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ ধরা হয়েছে প্রায় ৭ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। এই একটি অঙ্কে দেশের কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার ব্যয়, গবেষণা, অবকাঠামো, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন—সবকিছু চলে। অথচ একই সময়ে সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদন বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পড়তে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় হয়েছে ৮৮ কোটি ১৭ লাখ ডলার, বাংলাদেশি টাকায় যা প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। সংখ্যাটা দেশের ৫৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বরাদ্দের চেয়েও প্রায় ৫৩ শতাংশ বেশি।
এই প্রশ্নগুলো তোলা জরুরি—কে এই অর্থ পাঠাচ্ছে, কীভাবে আয় করছে এবং কেন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বমানের করে তোলার আন্তরিক উদ্যোগ এখনো অনুপস্থিত। উত্তর না মিললে এই ব্যবধান প্রতিবছর আরও বাড়তেই থাকবে।
এই যে ছেলে-মেয়েরা দেশ ছেড়ে নিজ খরচে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে, সেই সংখ্যাটি বড়জোর ৫ বা ১০ হাজার হতে পারে। কিন্তু ভেবে দেখেন, বাংলাদেশে যে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তাদের সম্মিলিত শিক্ষাব্যয়ের চেয়ে বেশি টাকা খরচ হচ্ছে হাতে গোনা কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর পেছনে; যারা দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাচ্ছে। সংখ্যার হিসেবে তারা হাতে গোনা হলেও ব্যয়ের হিসেবে তারা দেশের সামগ্রিক উচ্চশিক্ষা বাজেটকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
যারা নিজেদের সন্তানদের বিদেশে পাঠাচ্ছেন, তাদের অনেকেই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসে আছেন। এদের মধ্যে কেউ আমলা, কেউ সেনাকর্তা, কেউ পুলিশ কর্মকর্তা, কেউ এমপি-মন্ত্রী বা স্থানীয় নেতা। এই তালিকায় ব্যবসায়ী ও ব্যাংকারও কম নেই। আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। বাস্তবতা হলো, এই শ্রেণির একটি বড় অংশের বৈধ আয়ের হিসাব কখনোই এত বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক শিক্ষাব্যয়ের সঙ্গে মেলে না। অথচ তারা প্রতি বছর নির্বিঘ্নে এই খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রশ্নটা তাই শুধু ‘কে কোথায় পড়াচ্ছেন’ তা নয়; প্রশ্নটা হলো—এই বিপুল অর্থের উৎস কী এবং কেন এই হিসাব নিয়ে কখনো জবাবদিহিতা তৈরি হয় না?
হ্যাঁ, সন্তানদের বিদেশে পড়ানোর সামর্থ্য থাকতে পারে অনেকেরই। এটা কিছুতেই দোষের কিছু নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈধ চ্যানেলে এই অর্থ যাচ্ছে—এর মানে সেই অর্থ পুরোপুরি বৈধ, এমনটা ভাবারও সুযোগ নেই। কারণ, যাদেরকে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টিউশন ফি দিতে হচ্ছে, তাদেরকে অবশ্যই এই বৈধ পথেই টাকা পাঠাতে হয়, এর বাইরে অন্য কোনো সুযোগ নেই। তবে এই কাজটি বাংলাদেশ ব্যাংক ইচ্ছে করলেই করতে পারে; তারা তথ্য বের করতে পারে যে, যেসব অভিভাবক বিদেশে ছেলে-মেয়েদের পড়াতে টাকা পাঠাচ্ছেন, তারা আসলে কারা? তাদের আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে এইসব অর্থের সংযোগ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে তারা হিসাব কষতে পারে।
তবে অনেকেই যে এই চ্যানেলে বিদেশে অর্থ পাচার করে, তার অভিযোগও কম নয়। এই যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় একটা অভিযোগ এসেছিল—কোনো এক ব্যক্তি তার সন্তানের বিদেশে পড়ানোর টিউশন ফি বাবদ ৬ শত কোটি টাকা পাঠিয়েছেন। যদিও পরে এই বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য আমরা পাইনি। তবে সন্তানদের ভালোর জন্য মা-বাবা চেষ্টা করবেন, এটাই স্বাভাবিক।
আবার এমনও ঘটনা আছে, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে টিউশন ফি খরচ হয়, সেই টাকায় কিংবা তার চেয়ে সামান্য একটু বেশি দিয়ে বিদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক করা সম্ভব হচ্ছে। সেশনজটহীন এইসব পড়াশোনার জন্য মফস্বলের মা-বাবাও তাদের সন্তানদের বিদেশে পড়াশোনার জন্য পাঠাচ্ছেন।
কিন্তু যাদের হাতে দেশটা পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া হয়েছে, যারা চাইলে এই দেশে উচ্চশিক্ষার উর্বরভূমি তৈরি করতে পারত—সেই মানুষগুলো যখন দেশীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে নিজেদের সন্তানদের বড় করছে এবং বিদেশি স্টাইলে দেশে শিক্ষা গ্রহণের ব্যবস্থা করেছে, সমস্যা সেই জায়গায় তৈরি হয়। এই দেশের বিবিধ শিক্ষাব্যবস্থার কারণে শিক্ষার মান নিয়ে শঙ্কা দীর্ঘদিনের ছিল। ফলশ্রুতিতে এই সমস্যা সমাধানে কেউ এগিয়ে আসেনি। যে কারণে নিজ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নামে মাত্র বেতনে পড়াশোনার সুযোগ থাকলেও, বিদেশের মাটিতে দেশীয় আয় পাঠিয়ে সন্তানদের পড়াশোনার সুযোগ করে দিচ্ছেন অভিভাবকরা।
আপনি একবার ভাবুন তো, আমরা যদি বিদেশে পাঠানো এই ১১ হাজার কোটি টাকার একটি বড় অংশ দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করতে পারতাম, তাহলে অন্তত চার-পাঁচটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা সম্ভব ছিল। শুধু গবেষণা খাতেই যদি বছরে ১১ হাজার কোটির বদলে মাত্র ১ হাজার কোটি টাকাও বিনিয়োগ করা হতো, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা-সক্ষমতায় আমূল পরিবর্তন আসত। বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিং, মানসম্পন্ন জার্নাল প্রকাশনা, উদ্ভাবনী গবেষণাগার—সবকিছুতেই এই বিনিয়োগের প্রভাব পড়ত।
কিন্তু বাস্তবে ঘটছে তার উল্টোটা। জেলায় জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু মানের দিকে নজর দেওয়া হয়নি। ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতির সুযোগ করে দিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশকে অস্থিতিশীল রাখা হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতার বদলে প্রভাব ও অর্থের বিনিময় প্রাধান্য পেয়েছে বলে বহু অভিযোগ উঠেছে। এই প্রক্রিয়ায় যারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় থাকেন, তাদেরই একটি অংশ আবার নিজের সন্তানদের জন্য দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয় বেছে নেন। ফলে একধরনের দ্বৈত মানদণ্ড তৈরি হয়, যেখানে দেশের প্রতিষ্ঠান শুধু সাধারণ মানুষের সন্তানদের জন্য থেকে যায়।
যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ, বরাদ্দ ও পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেন, তাদের নিজেদেরই যদি দেশের প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা না থাকে, তাহলে সংস্কারের প্রকৃত তাগিদ তৈরি হয় কীভাবে? একটি প্রতিষ্ঠান তখনই ভালো হয়, যখন তার সুবিধাভোগী ও সিদ্ধান্তগ্রহণকারী দুই পক্ষই সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। কিন্তু সিদ্ধান্তগ্রহণকারীরা নিজেরাই যখন বিকল্প ব্যবস্থা বেছে নেন, তখন প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
গত বছর ১১ হাজার কোটি টাকা পাঠানো হয়েছে বিদেশে সন্তানদের পড়াশোনার জন্য; আগামী দিনে এই সংখ্যাটি বাড়বেই, কখনো কমবে না। কারণ, তা কমানোর জন্য যেসব পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন, তা আমাদের নীতিনির্ধারকরা দেখেন না।
এই সমস্যা থেকে বের হওয়ার জন্য সরকারকে অবশ্যই উচ্চশিক্ষা বাজেট বৃদ্ধি করে গবেষণা ও অবকাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে; যাতে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে যোগ্যতাভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করা প্রয়োজন; যাতে শিক্ষক নিয়োগ প্রকৃত মেধা ও গবেষণা-সক্ষমতার ভিত্তিতে হয়—প্রভাব বা আর্থিক লেনদেনের ভিত্তিতে নয়। বৈদেশিক মুদ্রায় বিপুল অঙ্কের শিক্ষাব্যয়ের উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছতা আনা দরকার, বিশেষত যেসব ক্ষেত্রে ব্যয়কারীর ঘোষিত আয়ের সঙ্গে প্রকৃত ব্যয়ের সামঞ্জস্য থাকে না।
নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেয়ে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর মান উন্নয়নে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। কারণ সরকারকে মনে রাখতে হবে, এটা কোনো শিল্পকারখানা নয় যে আপনি প্রোডাক্ট বের করবেন আর সেল করবেন। কিন্তু সেই প্রোডাক্ট যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উতরে যেতে না পারে, তা গলার কাঁটা হিসেবে দাঁড়াবে; ঠিক যেমন আমাদের বেকার সমস্যা আমাদের দেশের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ড. নাদিম মাহমুদ গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: [email protected]