জাসদ কার্যালয়ে গণআটক: মব কি এবার রাষ্ট্রসম্মত হলো?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি নাগরিকের সভা করার সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা করছে, নাকি মবের আদেশ বাস্তবায়ন করছে?
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভায় যা ঘটেছে, তা নাগরিকের মৌলিক অধিকার আর রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক আচরণের চরম বৈপরীত্যকে ফুটিয়ে তোলে। তাই মব এবার রাষ্ট্রসম্মত হলো কিনা সে প্রশ্ন আসতেই পারে?
২৬ সেপ্টেম্বর শনিবার রাজধানীর গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলটির প্রতিনিধি সভা আয়োজন করা হয়েছিল। জাসদের দাবি, সভার কথা ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর লিখিতভাবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার, পুলিশের মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার ও পল্টন থানাকে জানানো হয়েছিল এবং আবেদনের কপিতে প্রাপ্তিস্বীকারের সিল ও সই আছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, এমন আবেদনের কথা তাদের জানা নেই।
সেদিন ঘটনাগুলো কোন ক্রমে ঘটেছে, সেটাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশের অভিযান শুরুর আগেই পল্টন থানা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা কার্যালয়টি ঘিরে ফেলেন। যুবদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রবিউল ইসলাম নয়ন নিজেই সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, সকালে তাদের ‘নেটওয়ার্কে’ খবর আসে, তারা প্রশাসনকে অবহিত করেন এবং তারপর প্রশাসন আসে।
জাসদের অভিযোগ, এ সময় তাদের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা হয়। যুবদল বলছে, তারা কারও গায়ে হাত দেয়নি। যদিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, পুলিশের উপস্থিতিতেই সভায় অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হচ্ছেন। এরপর পুলিশ এসে প্রায় তিনশো মানুষকে প্রিজন ভ্যানে তুলে থানায় নিয়ে যায়। তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্যও। মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার বলেছেন, “আমরা তাদের নিরাপত্তার স্বার্থে থানায় নিয়ে গেছি।”
এখানে বেশকিছু গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।
প্রথম প্রশ্ন যুবদলকে নিয়ে। একটি রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন কোন আইনে আরেকটি বৈধ দলের সভা ঘেরাও করতে পারে? সংবিধানের ৩৭ অনুচ্ছেদ প্রত্যেক নাগরিককে শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্রভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার দিয়েছে। এই অধিকারে যুক্তিসংগত বাধানিষেধ আরোপ করতে পারে কেবল আইন—কোনো দলের কর্মী নয়। ফৌজদারি কার্যবিধি একজন সাধারণ নাগরিককে বড়জোর এটুকু অনুমতি দেয়: চোখের সামনে কেউ জামিন-অযোগ্য আমলযোগ্য অপরাধ করলে তাকে আটক করার। কিন্তু শত শত মানুষের একটি সভা ঘিরে রেখে অবরুদ্ধ করার অধিকার কোনো আইন কাউকে দেয়নি। দণ্ডবিধিতে যাকে অবৈধ অবরোধ (wrongful confinement) বলা হয়, তার সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায়? যুবদল বলছে, তারা আইন নিজের হাতে তুলে নেয় না। কিন্তু নিজস্ব ‘নেটওয়ার্কে’ নজরদারি চালিয়ে ঠিক করা কে কোথায় সভা করতে পারবে, তারপর সেই সভা ঘেরাও করে পুলিশ ডেকে আনা—এটা কি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার উদাহরণ হিসেবে যথেষ্ট নয়।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি আরও গুরুতর এবং সেটা পুলিশকে নিয়ে। উপকমিশনার বলছেন, আটক করা হয়েছে ‘নিরাপত্তার স্বার্থে’। সভায় উপস্থিত মানুষের নিরাপত্তা যদি সত্যিই ঝুঁকিতে থাকে, তবে সেই ঝুঁকি তৈরি করেছিল কারা? ভেতরে যারা সভা করছিলেন, তাদের অনেককে হাতকড়া পরিয়ে প্রিজন ভ্যানে তোলা হলো। অথচ বাইরে যারা ঘিরে রেখেছিলেন, তাদের কাউকে আটক করার খবর নেই। এর দুটি ব্যাখ্যাই সম্ভব এবং দুটিই ভয়াবহ। হয় পুলিশ ক্ষমতাসীন দলের একটি অঙ্গসংগঠনের চাপে এই গণ আটকের ঘটনা ঘটিয়েছে—অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় বাহিনী দলের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে; নয়তো একটি বৈধ দলের সাংবিধানিক সভার অধিকার রক্ষা করতে পুলিশ ব্যর্থ হয়েছে, আর সেই ব্যর্থতা ঢাকতে ভুক্তভোগীদেরই আটক করেছে। সংবিধান পুলিশের কাছে চায় নাগরিকের সভা করার অধিকার রক্ষা। ঘেরাওকারীদের হাত থেকে সভাকে বাঁচানোর বদলে সভাটাকেই তুলে নেওয়া সেই দায়িত্বের ঠিক উল্টো।
পুলিশের আরেকটি যুক্তি ছিল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের এই রণধ্বনি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় স্লোগানের মর্যাদা হারিয়েছে ঠিকই, কিন্তু কোনো আইন বা আদালত একে নিষিদ্ধ করেনি।
বলা হচ্ছে, জাসদের সভায় আওয়ামী লীগের কোনো সমর্থক থেকে থাকলে তাদের ‘আশ্রয়’ দেওয়ার দায়ে জাসদও আইনত দণ্ডনীয়। এটা ঠিক যে এটি হাসানুল হক ইনুর জাসদ, যা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী ছিল এবং ইনু নিজে হাসিনা সরকারের তথ্যমন্ত্রী ছিলেন; কিন্তু জোটের ইতিহাস কোনো বৈধ দলের সভাকে বেআইনি করে না। তর্কের খাতিরে ধরে নিই, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার আইনটি বৈধ। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে তিনটি কাজকে অপরাধ বলা হয়েছে: নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্য হওয়া (৮ ধারা), সেই সংগঠনের পক্ষে সভা বা প্রচার চালানো (৯ ধারা), এবং সন্ত্রাসী কাজে জড়িত কাউকে জেনেশুনে আশ্রয় দেওয়া (১৪ ধারা)। নিষিদ্ধ হয়েছে একটি দলের কার্যক্রম, কোনো মানুষের রাজনৈতিক অতীত নয়। একজন কর্মী বা সমর্থক যদি নিজের দলের কোনো কর্মসূচিতে না গিয়ে অন্য একটি বৈধ দলের সভায় যান, তাহলে সেই দলের অপরাধ কোথায়?
আর যদি সেটা অপরাধই হয়, তবে জাসদ একা কেন? এ বছরের এপ্রিলে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রকাশ্যে বলেছেন, অপরাধে জড়িত নন এমন ছাত্রলীগ কর্মীরা এনসিপিতে যোগ দিতে পারবেন। জানুয়ারিতে পিরোজপুরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক নেতার বিএনপিতে যোগ দেওয়ার খবর সংবাদ ও সামাজিক মাধ্যমে বহুল আলোচিত হয়েছিল। জুলাইয়ে লক্ষ্মীপুরে আওয়ামী লীগের এক স্থানীয় নেতাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সভায় উপস্থিত প্রত্যেকের রাজনৈতিক অতীত যাচাই করা যদি আয়োজক দলের আইনি দায় হয়, তবে সেই দায় থেকে বিএনপি, জামায়াত বা এনসিপি কেউই মুক্ত নয়। মাপকাঠি একটাই হতে হবে: হয় সবার জন্য, নয়তো কারও জন্যই নয়।
পুলিশ নিজেই বলেছে, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জাসদের নেতা-কর্মী, তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে; বাকিদের বিরুদ্ধে যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ আগে তিনশো মানুষকে তুলে নাও, পরে খুঁজে দেখো কে কোন দলের। আইনের শাসনে আগে অপরাধ চিহ্নিত হয়, তারপর গ্রেপ্তার।
ইউনূস প্রশাসনের সময় বিএনপি নিজেই বলেছিল, নির্বাহী আদেশে কোনো দল নিষিদ্ধ করা উচিত নয়, সে সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ। আর যুবদল নেতা নয়ন নিজেই বড় অঘটন না ঘটার কৃতিত্ব দিয়েছেন মব-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দলীয় প্রধান তারেক রহমানের কঠোর নির্দেশনাকে। সেই নির্দেশনা থাকা অবস্থাতেই তার দলের অঙ্গসংগঠন একটি বৈধ দলের সভা ঘিরে ধরল, আর পুলিশ এসে তুলে নিল সভায় উপস্থিত মানুষদের।
আইনহীন দেশ বোঝাতে বাংলায় একটা পুরোনো কথা আছে: মগের মুল্লুক। ২৬ সেপ্টেম্বর গুলিস্তানে যা ঘটল, তার জন্য আরও নির্দিষ্ট শব্দটি গত দুই বছরে চাউর হয়েছে বেশ ভালোভাবেই—‘মবের মুল্লুক’। আগে মব ঘিরে ধরে, তারপর রাষ্ট্র এসে মবের অভীপ্সিত কাজটা শেষ করে দেয়। এতদিন আমরা যা জনশ্রুতিতে জেনেছি, গতকাল রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই তাকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিল।
ড. আশফাক আনুপ: অ্যাফিলিয়েট একাডেমিক, কিংস কলেজ লন্ডন। ইমেইল: ashfaque.anup@gmail.com
