পর্যটনে বাংলাদেশ: সম্ভাবনার দেশ, দায়িত্বহীনতার শিল্প
বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত এবং ম্যানগ্রোভ বন সত্ত্বেও পর্যটন আয়ে কেন পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ?
বাংলাদেশের পর্যটন খাত নিয়ে সংশয়ের কোনো কারণ নেই; প্রশ্ন থাকা উচিত শুধু একটা—এত সম্ভাবনা নিয়েও আমরা কেন এখনো পিছিয়ে? বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত, সুন্দরবনের মতো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী ম্যানগ্রোভ বন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়, উত্তরবঙ্গের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য—এসব নিয়ে আমরা যত গর্ব করি, বাস্তবতা ততটাই বিপরীত।
বিশ্ব অর্থনীতিতে পর্যটন খাতের অবদান এখন প্রায় ১১ ট্রিলিয়ন ডলার। বৈশ্বিক মন্দা ও মূল্যস্ফীতি সত্ত্বেও এই খাত সত্যিকারের অর্থনৈতিক কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। অথচ বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটনের অবদান এখনো দুই থেকে তিন শতাংশের ঘরে আটকে। সরকার যদিও এই হার ছয় থেকে সাত শতাংশে নেওয়ার কথা বলছে। এশিয়ার পর্যটন আয়ের প্রায় ছিয়াশি শতাংশই আসে ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনাম থেকে; সেই তালিকায় বাংলাদেশের অংশীদারত্ব প্রায় নগণ্য।
কেন এই ব্যবধান, সেটা বুঝতে প্রতিবেশীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনামের প্রাকৃতিক সম্পদ আমাদের চেয়ে বেশি নয়; পার্থক্য গড়ে দিয়েছে নীতি, পরিকল্পনা আর দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার। আমাদের সমস্যা প্রথমত অবকাঠামোয়। শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সরাসরি বিমান রুট, প্রতিযোগিতামূলক ভাড়া আর লজিস্টিকস ছাড়া শুধু একটি টার্মিনাল কোনো দেশকে পর্যটন হাব বানাতে পারে না। দ্বিতীয়ত—ভিসা জটিলতা। যেখানে ভিয়েতনাম আকাশপথে ভিসা সহজ করেছে, মালয়েশিয়া বেসরকারি এয়ারলাইনসকে ভিসা সুবিধায় যুক্ত করেছে। তৃতীয়ত—বিনিয়োগের ঘাটতি। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের খসড়া পরিকল্পনায় দশটি পর্যটন সার্কিট গড়তে প্রায় ১.০৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দরকার বলে উল্লিখিত হয়েছে, অথচ জমির অনিশ্চয়তা আর নীতিগত ধারাবাহিকতার অভাবে বেসরকারি খাত এগিয়ে আসছে না।
মহাপরিকল্পনার দীর্ঘসূত্রতাও কম দায়ী নয়। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনার খসড়া ২০২৩ সালে শেষ হলেও, ছয় বছর পেরিয়েও তা জাতীয় পর্যটন কাউন্সিলের চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি এবং বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। একটি দেশ যখন নিজের ভবিষ্যৎ ঠিক করতে ছয় বছর নিয়ে নেয়, তখন বিনিয়োগকারী কীভাবে আস্থা রাখবেন? দক্ষ জনবলের প্রশ্নেও একই দুর্বলতা; হোটেলকর্মী থেকে ট্যুর গাইড, সবার প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত। রাজশাহীর মতো অঞ্চলে পুঠিয়ার মন্দির স্থাপত্য, বাঘা মসজিদ, বরেন্দ্র জাদুঘরের মতো নিদর্শন থাকা সত্ত্বেও সঠিক প্রচার আর যোগাযোগ সুবিধার অভাবে জাতীয় পর্যটন মানচিত্রে এগুলো সেভাবে জায়গা পায়নি।
কিন্তু আসল গল্পটা আরও গভীরে, এবং সেটা বোঝার জন্য একটাই সহজ প্রশ্ন যথেষ্ট—আমরা বিদেশে ঘুরতে যাওয়া নিয়ে যতটা আগ্রহী, আর বিদেশিদের এখানে আনার বিষয়টা ততটা গুরুত্ব দিই না। বিশ্ব পর্যটন ও ভ্রমণ পরিষদের তথ্য অনুযায়ী—প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ত্রিশ লাখের বেশি মানুষ দেশের বাইরে ঘুরতে যান, শুধু ভারতেই যান প্রায় বিশ লাখ। ২০২২ সালে ভারতে বেড়াতে যাওয়া বিদেশিদের মধ্যে বাংলাদেশ ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎস দেশ, যুক্তরাষ্ট্রের ঠিক পরেই। এই বিশাল সংখ্যার উল্টো দিকে বাংলাদেশে আসা বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা এত কম যে জিডিপিতে অবদান তিন শতাংশ ছুঁতেই হিমশিম খায়। আমরা বিদেশি মুদ্রা বাইরে পাঠাচ্ছি হাসিমুখে; অন্যদিকে নিজের দেশে অর্থ আনার মতো আকর্ষণীয় প্রস্তাব তৈরি করতে পারিনি।
এই ভারসাম্যহীনতার একটা বড় দায় কূটনৈতিক অবহেলার। শ্রীলঙ্কা ২০২৫ সালে যেসব দেশকে ভিসা ফি মওকুফ সুবিধা দিয়েছে, সেই শীর্ষ বিশ দেশের তালিকায় একমাত্র বাংলাদেশই বাদ পড়েছে; তারপরও বাংলাদেশ থেকে শ্রীলঙ্কাগামী পর্যটক ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কেও একই ছবি। ২০২৫ সালে ভারতে বাংলাদেশি পর্যটকের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় তিয়াত্তর শতাংশ কমেছে, মূলত রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও ভিসা জটিলতায়। তারপরও ভারত, চীন বা মধ্যপ্রাচ্য থেকে পর্যটক টানার মতো কোনো সমান্তরাল কূটনৈতিক উদ্যোগ আমাদের চোখে পড়ে না।
দ্বিতীয় দায়—বাজার বিশ্লেষণের অভাব। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে আসা পর্যটন ভিসার আবেদনের প্রায় পঁচিশ শতাংশই কাশ্মিরের জন্য। বাংলাদেশিরা পাহাড় আর শীতল আবহাওয়া খুঁজতে হাজার মাইল পাড়ি দিচ্ছেন, অথচ রাঙামাটি, বান্দরবান বা সাজেকে একই অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও অবকাঠামো আর বিপণনের অভাবে নিজেদের নাগরিকদেরই ধরে রাখতে পারছি না।
তৃতীয় দায়—বেসরকারি খাতের স্বল্পদৃষ্টির। ভ্রমণ এজেন্সিগুলো আউটবাউন্ড ব্যবসাকেই বেশি লাভজনক মনে করে, কারণ প্যাকেজ তৈরি সহজ এবং ঝুঁকি কম। ইনবাউন্ড পর্যটনের জন্য যে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কিং দরকার, সেই পথে হাঁটার সাহস কম মানুষ দেখান। ফলে আমাদের ভ্রমণ শিল্প একমুখী হয়ে থেকে গেছে—বাংলাদেশিদের বিদেশ পাঠানোর যন্ত্র, বিদেশিদের এখানে আনার সেতু নয়।
তাহলে করণীয় কী? পর্যটনকে বিচ্ছিন্ন কোনো খাত হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিতে হবে। জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা দ্রুত চূড়ান্ত করে বাস্তবায়নে যেতে হবে, যাতে সরকার বদলালেও নীতি ও পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা থাকে। বিমান চলাচল, যোগাযোগ, ভিসা, বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। কূটনীতিকদেরও পর্যটনকে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ করতে হবে; সহজ ভিসা, সরাসরি ফ্লাইট, যৌথ প্রচার ও পারস্পরিক পর্যটন সুবিধার মাধ্যমে বিদেশি পর্যটক টানার উদ্যোগ নিতে হবে।
একই সঙ্গে পুঠিয়া, বাঘা, বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্যকে পরিকল্পিত পর্যটন সার্কিটে যুক্ত করে দেশীয় পর্যটকের জন্য যোগাযোগ, আবাসন, নিরাপত্তা ও সেবার মান বাড়াতে হবে। এতে দেশের মানুষ নিজের দেশেই ভ্রমণে আগ্রহী হবেন, তৈরি হবে একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ পর্যটন বাজার। সেই ভিত্তির ওপর বিদেশি পর্যটকের জন্যও বাংলাদেশকে নতুন করে তুলে ধরা সহজ হবে।
পাশাপাশি হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন, ইকো-ট্যুরিজম ও অন্যান্য পর্যটনসেবায় বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে সহজ অনুমোদন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও প্রয়োজনীয় কর-সুবিধা দিতে হবে। কারণ বাংলাদেশের সমস্যা সম্ভাবনার অভাব নয়, বরং সেই সম্ভাবনাকে অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপ দেওয়ার মতো সমন্বিত পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও ধারাবাহিক বাস্তবায়নের ঘাটতি।
পর্যটন ও এভিয়েশন উন্নয়নের সব সমাধান বিপুল অর্থ ব্যয় করে হয় না; অনেক কার্যকর পদক্ষেপের জন্য প্রয়োজন মূলত নীতিগত সিদ্ধান্ত ও ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। আমরা কি নিজেদের নাগরিকদের বিদেশমুখী স্রোত দেখে শুধু আক্ষেপ করে যাব, নাকি সেই একই আগ্রহকে দেশের ভেতরে ফেরানোর এবং বিদেশিদের আকৃষ্ট করার কৌশলে রূপান্তরিত করব? প্রতিবেশী দেশগুলো যখন নিজেদের প্রাকৃতিক সম্পদকে অর্থনৈতিক ইঞ্জিনে রূপান্তর করছে, তখন প্রশ্ন করার সময় এসেছে—এই সম্ভাবনাকে বাস্তব রূপ দেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আমরা কবে তৈরি করব?
শোয়েব সাম্য সিদ্দিক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক। ইমেইল: shammo4n@gmail.com
