রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: অনুকম্পা নয়, সুযোগ কাজে লাগানোর সময় এখনই
মিয়ানমার, চীন ও আরাকান আর্মির জটিল সমীকরণের মাঝে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ কীভাবে নিজের ভৌগোলিক ও বাণিজ্যিক অবস্থানকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দরকষাকষির হাতিয়ার করতে পারে?
বিগত ১৩ বছর ধরে রোহিঙ্গা ইস্যুকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলেছে নানান রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ। কত রথী-মহারথী এলেন এবং রোহিঙ্গাদের ঘিরে শান্তিতে নোবেল পাওয়ার স্বপ্নপূরণের জাল বুনতে বুনতে চলেও গেলেন। কত বিশ্বনেতা এলেন, আশ্বাস দিলেন—কোটি কোটি ডলার এনে রোহিঙ্গাদের সুখে-শান্তিতে রাখবেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল মিষ্টি কথায় সহমর্মিতা জুগিয়েছে, আর দাতা সংস্থাগুলোর দানের সিংহভাগই খরচ হয়েছে রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয়ের তদারকিতে।
কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বছর গড়ালেও অভাগা বাংলাদেশের কাঁধে চেপে বসা বিশাল এই মানবিক ও আর্থিক বোঝা এতটুকু কমেনি; দিনে দিনে তা আরও ভারী হয়েছে। অন্যদিকে, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে এবং নিজ ভিটেমাটিতে ফেরার সম্ভাবনা দিনের পর দিন ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে।
জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া পাঁচ দফা প্রস্তাব শুনে একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে মনের ভেতরে কেবল দীর্ঘশ্বাসই জেগেছে। বিগত ১৩ বছর ধরে এই বিশাল মানবিক, সামাজিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বহন করার পর আজও আন্তর্জাতিক মঞ্চে আমাদের বলতে হচ্ছে—‘একটি রোডম্যাপ প্রয়োজন’। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশের কাঁধে চেপে বসা এই সংকট দূর করতে আমরা যে নিজস্ব কোনো টেকসই কৌশল গড়ে তুলতে পারিনি, এটি তারই প্রমাণ।
কেন গত ১৩ বছরে আমরা এমন কোনো দেশপ্রেমিক, বুদ্ধিমান ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি বা দল গড়ে তুলতে পারলাম না—যাঁরা এই রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে পারতেন? কেন দেশের এই ক্যান্সারসদৃশ সমস্যার সমাধান আমরা খুঁজে পেলাম না? এটা কি আমাদের যোগ্যতার ঘাটতি, নাকি এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব বোঝার অক্ষমতা? নাকি বিদ্বানদের দেশপ্রেম, আমলাদের সদিচ্ছা আর রাজনৈতিক নেতাদের অঙ্গীকারের অভাব? রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান একটি জটিল বিষয়; তবে স্বচ্ছ ভাবনা আর একাগ্রতা থাকলে এবং দেশের দায়িত্বশীল গোষ্ঠী নিবেদিত হলে এতদিনে একটা সমাধান পাওয়া যেত।
আজকের দিনে রাখাইনের বাস্তবতা যতটা বদলেছে, আগের তিন দশকেও ততটা বদলায়নি। আরাকান আর্মি এখন রাখাইন রাজ্যের প্রায় ৮০–৮৫ শতাংশ—অর্থাৎ ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪–১৫টি নিয়ন্ত্রণ করছে এবং বাংলাদেশ-মিয়ানমারের পুরো ২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত তাদের দখলে। নেপিডোর সামরিক-সমর্থিত সরকার, যা ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে মিন অং হ্লাইংকে প্রেসিডেন্ট করে বেসামরিক রূপ নিয়েছে, এখন কেবল সিত্তওয়ে, কিয়াউকফিউর মূল অংশ এবং কয়েকটি বিচ্ছিন্ন এলাকা ধরে রেখেছে। চীন প্রকাশ্যে নেপিডোকে সমর্থন করে এবং গোপনে আরাকান আর্মির সঙ্গে যোগাযোগ রাখে; উভয়ের ওপর প্রকৃত প্রভাব আছে এমন একমাত্র বহিঃশক্তি চীনই। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী চীন সফর করে আসার পর পরিস্থিতি আরও পাল্টে গেছে।
এখন এর ফলে বাংলাদেশের সামনে একটি সহজ কিন্তু কঠিন সত্য দাঁড়িয়েছে: রোহিঙ্গারা কোথায় ফিরবে তা ঠিক করবে আরাকান আর্মি; আইনগতভাবে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃত হবে কি না, তা এখনও ঠিক করে নেপিডো; আর যেকোনো ব্যবস্থার নিশ্চয়তা দিতে বা তা আটকে দিতে পারে চীন। পাশাপাশি, রোহিঙ্গারা নিজেরাই ঠিক করবে তারা আদৌ ফিরবে কি না। বাস্তবতা হলো, কোনো একক পক্ষ একা প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে পারে না, কিন্তু প্রত্যেকেই তা আটকে দিতে পারে। তাই একটি রোডম্যাপ মানেই হলো একটি কার্যকর কৌশলপত্র; মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গা সমস্যার সবচেয়ে বড় বোঝা বহনকারী পক্ষটিই হলো বাংলাদেশ। কাজেই আমাদের কূটনীতিকদের বলব, দয়া করে বল অন্য কারও কোর্টে ঠেলে দেবেন না। আর সারা দুনিয়াতে কেউ বসে নেই বাংলাদেশের জন্য রোডম্যাপ তৈরি করতে। আমরা অনেক বছর এই সমস্যা মাথায় নিয়ে চলছি আর এর খেসারতও দিয়ে যাচ্ছি। আর নয়, আমাদের সামনে এখন এক অপার সুযোগ এই সমস্যার একটি যৌক্তিক সমাধান বের করার; অতীত নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করে এগিয়ে যাওয়া আবশ্যক।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে প্রস্তাবগুলো দিয়েছেন তা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমার বিবেচনায় এই প্রস্তাবগুলো যারা তৈরি করেছেন, তারা প্রধানমন্ত্রীর সত্যিকার চাওয়া বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছেন। রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, শরণার্থীদের নিরাপত্তা দিতে হবে—তা কে না জানে! কিন্তু কী সেই রোডম্যাপ, তা কিন্তু কেউ বলে দেবে না; কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে বা কে তার দায়িত্ব নেবে—তাও উল্লেখ নেই।
রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বিগত সরকারগুলোর আন্তরিকতা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ আছে। আমার মতো হাজারো মানুষ মনে করে, বিগত সরকারপ্রধানদের কাছে রাষ্ট্রের এই এক নম্বর নিরাপত্তা সংক্রান্ত সমস্যাটির কোনো অগ্রাধিকার ছিল না। দেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব এখনও নীতিনির্ধারকদের কাছে অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান খুঁজতে হলে সবার আগে এর মূল অংশীজনদের ভূমিকা চিহ্নিত করা জরুরি। প্রথমত, বাংলাদেশ—যে দেশটিকে প্রায় ১২ লাখ শরণার্থীর বিশাল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বোঝা বহন করতে হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মিয়ানমার—যাদের নিষ্ঠুর নির্যাতন ও বিতাড়নের শিকার এই জনগোষ্ঠী। তৃতীয়ত, স্বয়ং রোহিঙ্গারা; এবং চতুর্থত, চীন—মিয়ানমারে বিপুল অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, দেশটির সরকারের ওপর অর্থনৈতিক প্রভাব ও আরাকান আর্মির ওপর নিয়ন্ত্রণের কারণে যাদের ভূমিকা অত্যন্ত নির্ণায়ক। আর এই পুরো সমীকরণে নতুন ও প্রভাবশালী অংশীজন হিসেবে উদয় হয়েছে আরাকান আর্মি।
এসব অংশীজনের চাওয়া-পাওয়ার সঠিক হিসাব কষেই আমাদের কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশের মূল প্রত্যাশা হলো রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও পূর্ণাঙ্গ প্রত্যাবাসন, ঝুঁকিমুক্ত আন্তর্জাতিক সীমান্ত এবং সীমান্তজুড়ে মাদক পাচারের কুৎসিত চর্চা বন্ধ করা। অন্যদিকে মিয়ানমার চায় আরাকান আর্মি যেন রাজনৈতিক বৈধতা না পায় এবং তারা কেবল শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের কার্যালয়ের তালিকাভুক্তদেরই ফেরত নিতে আগ্রহী। রোহিঙ্গাদের দাবি স্পষ্ট: নিজ ভিটেমাটিতে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন, বাজেয়াপ্ত সম্পত্তি পুনরুদ্ধার এবং আইনি নিপীড়ন থেকে মুক্তি। চীনের লক্ষ্য নিরাপদ যোগাযোগ অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ, ‘আরসা’র বিলুপ্তি এবং চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের ব্যবহার সুবিধা পাওয়া। আর আরাকান আর্মির অগ্রাধিকার হলো স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ড, মুক্ত বাণিজ্য, নিরবচ্ছিন্ন রসদ ও খাদ্য সরবরাহ এবং রোহিঙ্গাদের অস্ত্রহীন রাখা।
এসব সমীকরণ মাথায় রেখে বাংলাদেশের উচিত নিজস্ব প্রত্যাবাসন কৌশল ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা। এই কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হতে হবে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন, ভূমির মালিকানা পুনরুদ্ধার, রাখাইনের সমাজে তাদের পুনরেকত্রীকরণ এবং চায়না-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর (সিএমবিইসি) প্রকল্পের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে তাদের যুক্ত করা।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোনো অনুকম্পা চাওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং বিশ্ব পরিস্থিতি আজ বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ এনে দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের পটভূমিতে বদলে যাওয়া বৈশ্বিক বাস্তবতা এবং মালাক্কা প্রণালি এড়িয়ে বিকল্প পথ তৈরির জন্য চীনের কৌশলগত নির্ভরতা—এ দুটি বিষয়ই এখন কৌশলগত সুবিধা হিসেবে বাংলাদেশের হাতে রয়েছে।
চীনের অর্থনীতি ও যোগাযোগ করিডোর প্রস্তাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বাংলাদেশ দেরি করলে হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে বড় এক কৌশলগত সুবিধা। এতে কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অর্থনৈতিক প্রসারের সুযোগ নষ্ট হবে না, বরং রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর সম্ভাব্য দরকষাকষির মূল হাতিয়ারটিও হারিয়ে যেতে পারে। পরিণতিতে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাংলাদেশকে হয়তো আরও বহু বছর অনিশ্চিত অপেক্ষায় প্রহর গুনতে হবে।
এ টি এম জিয়াউল হাসান: ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, আর সি ডি এস, পি এস সি (অব.)। ইমেইল: zhasansohel241@gmail.com
