গণতন্ত্রের আম্পায়ার যখন প্রশ্নের মুখে: ভারতে নির্বাচন কমিশন বিতর্ক
ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ পড়ার অভিযোগ এবং কমিশন পরিচালনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের একতরফা সিদ্ধান্ত—ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের তিন সদস্যের অভ্যন্তরীণ মতভেদ এখন প্রকাশ্যে।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো সর্বশেষ রাজনৈতিক সফরে ভারতে এসেছিলেন ২০০৩ সালে। তবে ২০০৫ সালে তিনি শেষবার এসেছিলেন বটে, কিন্তু সেবারের উদ্দেশ্য ছিল সপরিবারে আজমির শরিফ জিয়ারত। এর দুই বছর পরই তো তিনি বোমা হামলায় নিহত হলেন।
২০০৩ সালের ডিসেম্বরের সেই সফরে বিজেপির তখনকার সভাপতি এল কে আদভানির বাসভবনে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিয়েছিলেন। আদভানি ও বেনজিরের চমৎকার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্ক ছিল, যার একটি বড় কারণ ছিল তাদের উভয়েরই জন্ম পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে।
আদভানি সেদিন খাবার টেবিলে বসে বেনজিরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনার চোখে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে সবচেয়ে বড় তফাৎ কী?’
সেদিন নাকি দ্বিধাহীন কণ্ঠে বেনজির জবাব দিয়েছিলেন, “দুটো। ভারত একটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন এবং অরাজনৈতিক সেনাবাহিনী তৈরি করতে পেরেছে, যেটি পাকিস্তান পারেনি।”
এ নিয়ে স্বয়ং আদভানির একটা লেখা পাওয়া যায় বিজেপির অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে।
২.
অথবা ২০১৭ সালের ‘নিউটন’ সিনেমার কথাই ধরা যাক না।
নূতন কুমার, যার ডাকনাম নিউটন—অতিআদর্শবাদী তরুণ সরকারি চাকরিজীবী। নিয়মকানুনের ব্যাপারে কোনো আপস করতে রাজি নন তিনি। ছত্তিশগড়ের মাওবাদী ও গেরিলা-উপদ্রুত এক প্রত্যন্ত জঙ্গলে লোকসভা নির্বাচনের ৭৬ জন ভোটারের ভোটগ্রহণের জন্য একজন প্রিসাইডিং অফিসার দরকার হলে, নিউটন স্বেচ্ছায় সেই ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব নেন। তার সঙ্গে সহকারী হিসেবে যোগ দেন লোকনাথ নামের এক বয়স্ক সরকারি কর্মচারী।
ভোটগ্রহণের জন্য নির্ধারিত কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর নিউটনের সঙ্গে স্থানীয় কমান্ডার আত্মা সিংয়ের দেখা হয়। আত্মা সিং বাস্তববাদী মানুষ। তিনি নিউটনকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, এখানে ভোট নেওয়া অসম্ভব এবং নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের কোনো একটা নিরাপদ ক্যাম্পে থেকেই ভুয়া ভোটগ্রহণ শেষ করে ফিরে যাওয়া উচিত। কিন্তু নিউটন তার সিদ্ধান্তে অটল—তিনি বুথেই যাবেন এবং নিয়ম অনুযায়ী ভোট নেবেন।
ভোটের দিন বুথ খোলার পর দেখা যায়, কোনো ভোটারই ভোট দিতে আসছেন না। কারণ, মাওবাদীরা ভোট বর্জনের ডাক দিয়েছে এবং গ্রামবাসীরা ভয়ে ঘর থেকে বের হচ্ছে না। ঘটনাচক্রে এক বিদেশি সাংবাদিক সেখানে পৌঁছে যান নির্বাচন কাভার করতে। ভারতের গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী, সেটা দেখানোই সেই সাংবাদিকের প্রধান লক্ষ্য।
ফলে জোরজবরদস্তি করে কয়েকজন ভোটারকে লাইনে এনে দাঁড় করানো হলেও, একসময় নিউটন বুঝতে পারেন, এই আদিবাসী গ্রামের বাসিন্দারা ভারতের গণতন্ত্র, নির্বাচন বা প্রার্থী—কোনো কিছু সম্পর্কেই জানে না। তারা এমনকি এটাও বোঝে না যে ভোট দিলে তাদের কী লাভ হবে। নিউটন তখন গ্রামবাসীদের ধরে এনে ভোটিং মেশিন কীভাবে কাজ করে, তা বোঝানোর চেষ্টা শুরু করেন।
হঠাৎ জঙ্গল থেকে গুলির আওয়াজ শোনা যেতে শুরু করলে, কমান্ডার আত্মা সিং দাবি করেন যে মাওবাদীরা আক্রমণ করেছে এবং সবার উচিত দ্রুত নিরাপদ স্থানে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। কিন্তু নিউটন খেয়াল করেন যে, এটি আসলে কমান্ডারের সাজানো নাটক, যাতে তাড়াতাড়ি ভোট বন্ধ করে তারা এলাকা ছেড়ে যায়। যখন নিউটন দেখেন কয়েকজন আদিবাসী ভোটার তখনো ভোট দিতে বাকি আছেন, তিনি বুথ ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি কমান্ডারের বন্দুকের নলের সামনে দাঁড়িয়ে যান এবং নিজের ডিউটির শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত বুথ পাহারা দেন।
৩.
বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্রের দেশ হিসেবে ভারতকে গোটা পৃথিবী থেকে যে জিনিসটি আলাদা করেছে, সেটি হলো এর অবাধ নির্বাচন ব্যবস্থা। আর কিছু না হোক, মানুষ এখনো কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারে।
কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে নির্বাচন ব্যবস্থা, ভোটাধিকার ও কমিশনে সরকারের হস্তক্ষেপ নিয়ে যে সব কানাঘুষা শোনা যাচ্ছিল, সেসবকে নাড়িয়ে দিয়েছে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ পত্রিকার সাংবাদিক ঋতিকা চোপড়ার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ঋতিকার প্রতিবেদনে ভারতীয় নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ নজিরবিহীন ফাটল এবং ভোটার তালিকা থেকে কোটি কোটি মানুষের নাম কীভাবে বাদ পড়েছে, সেটি উঠে এসেছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যবিশিষ্ট। দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী গত ১০ মাসে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি ও ভিন্নমত পোষণ করে ভেটো দিয়েছেন বলে ঋতিকা তার প্রতিবেদনে লিখেছেন।
এর মধ্যে একটি হলো ভোটার তালিকায় কারচুপির অভিযোগ। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ কার্যক্রম বা স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন, যেটিকে সংক্ষেপে এসআইআর বলা হয়—সেই কার্যক্রমের নিবন্ধনের ‘ফর্ম-৬’ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই দুই কমিশনার তীব্র আপত্তি তুলেছিলেন। তাদের অভিযোগ ছিল, নিয়ম না মেনে এবং তাদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়েই প্রধান নির্বাচন কমিশনার একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এই কার্যক্রমের মাধ্যমেই গত এক বছরে বিভিন্ন রাজ্যে অন্তত ১৩ কোটি মানুষকে ভোটার তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে ২৭ লাখ মানুষ ভোট দিতে পারেননি, যদিও শুরুতে এ সংখ্যা ছিল ৯৭ লাখ। দিল্লিতে তালিকার বাইরে ছিল ৩৩ লাখ ভোটার। বিভিন্ন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এসব ভোটার যেসব এলাকায় বাদ পড়েছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেখানে বিজেপির প্রার্থীরা জিতেছেন।
খুব স্বাভাবিকভাবেই বিরোধী দলগুলো এই খবরে চটেছে। ভোটার তালিকা ও ভোট কারচুপি নিয়ে এতদিন তারা মিনমিন করে যেসব অভিযোগ করে আসছিল, এবার তার পালে হাওয়া লেগেছে। প্রায় সব বিরোধী দল নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘ভোট চুরি’ এবং ‘দেশদ্রোহিতা’র অভিযোগ এনে একযোগে সোচ্চার হয়েছে।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। ২৫ তারিখ সারা দেশে রাজ্য নির্বাচন অফিসগুলোর সামনে কংগ্রেস বিক্ষোভ করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো স্পষ্ট বলেছেন যে, নির্বাচন কমিশনের পক্ষপাতিত্বের কারণে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি জিতেছে। তিনি সিইসির অভিশংসন ও গ্রেপ্তার দাবি করেছেন, পাশাপাশি দাবি করেছেন আবার ভোটের। অরবিন্দ কেজরিওয়াল ও উদ্ধব ঠাকরে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের তীব্র সমালোচনা করে দিল্লি ও মহারাষ্ট্রসহ বিভিন্ন বিধানসভার ভোট বাতিল করে নতুন করে ভোট নেওয়ার দাবি তুলেছেন। ৩০ তারিখ বিরোধীদের জোট ‘ইন্ডিয়া’র মিটিং ডাকা হয়েছে। সেখান থেকে বড়সড় কর্মসূচির ডাক আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মাস দুয়েক আগে শিক্ষামন্ত্রীর চাকরি খেয়ে হইচই ফেলে দেওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ জ্ঞানেশ কুমারকে পদত্যাগের জন্য ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে। তা না হলে আগামী মাসের ২ তারিখ থেকে তারা যন্তরমন্তরে ধর্নায় বসবে।
এর মধ্যে আলোচনায় ঘি ঢেলেছে ২০২৩ সালের পুরোনো একটি প্রসঙ্গ। ২০২৩ সালের আগে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ করত কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা গঠিত একটি কমিটি। কমিটির সদস্য ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলনেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি। কিন্তু সে বছর নরেন্দ্র মোদী সরকার নতুন আইন পাস করে, যেখানে প্রধান বিচারপতিকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। তার পরিবর্তে আনা হয় প্রধানমন্ত্রী মনোনীত এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে। বিরোধীদের তখন অভিযোগ ছিল, এর মধ্য দিয়ে সরকার মনোনীত প্রার্থীর নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।
বর্তমানে যে তিনজন নির্বাচন কমিশনার রয়েছেন—জ্ঞানেশ কুমার, সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী এবং এর আগের কমিটির কমিশনাররা সবাই মোদী সরকারের মনোনীত। রাহুল গান্ধী অবশ্য তখন প্রবল আপত্তি তুলেছিলেন। এবার তিনি সেটিই মনে করিয়ে দিলেন, ‘কী, বলেছিলাম না?’
এই আইন নিয়ে যে মামলা চলছিল, সেটি এখন পুনরুজ্জীবিত হয়েছে। পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রধান বিচারপতির বিবেচনার জন্য। কিন্তু তার আগে বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ক্রিকেটের তুলনা টেনে বোমা ফাটিয়েছেন। বলেছেন, ক্রিকেট খেলায় যারা ব্যাট করবে, তারাই যদি আম্পায়ার ঠিক করে, তাহলে সন্দেহ তো থাকবেই। এর অর্থ হলো, নির্বাচন কমিশনের স্বাধীন হওয়াই যথেষ্ট নয়; কমিশন যে বাস্তবিকই নিরপেক্ষ, তা দেখানোও জরুরি।
এই একটি উপমাই আসলে পুরো বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা সমস্যাটিকে সামনে আনার জন্য যথেষ্ট।
গণতন্ত্রে নির্বাচন কমিশন শুধু একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি ভোটারের আস্থার শেষ আশ্রয়। সরকার বদলাবে, দল বদলাবে, প্রধানমন্ত্রী বদলাবেন, মুখ্যমন্ত্রী বদলাবেন—কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানটি ভোটের মাঠে আম্পায়ারের ভূমিকা পালন করবে, তার ওপর যদি এক পক্ষের প্রভাব থাকার সামান্যতম সন্দেহও তৈরি হয়, তাহলে শুধু একটি নির্বাচন নয়, পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
৪.
ফলে, বেনজির ভুট্টো দুই দশক আগে আদভানিকে যে কথাটি বলেছিলেন বলে প্রচলিত আছে, তার গভীরতা একটু ভালোভাবেই বোঝা যাচ্ছে। একটি দেশের গণতন্ত্র কতটা শক্তিশালী, তা শুধু কত মানুষ ভোট দিলেন, কতগুলো দল নির্বাচনে অংশ নিল এবং কারা জিতল—এসব দিয়ে বিচার করা যায় না। আসল পরীক্ষা হলো, ক্ষমতাসীন দল হেরে গেলেও নির্বাচন কমিশন কি একইভাবে নিরপেক্ষ থাকবে? বিরোধী দলের ভোটারও কি একই নিশ্চয়তায় ভোট দিতে পারবেন? আর সবচেয়ে বড় কথা—হেরে যাওয়া দলও কি ফল মেনে নেবে এই বিশ্বাসে যে, আম্পায়ার অন্তত খেলাটি সৎভাবে পরিচালনা করেছেন?
‘নিউটন’ চলচ্চিত্রের সেই অন্ধকার জঙ্গলে একজন সরকারি কর্মচারী শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বুথ আঁকড়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কারণ তার কাছে ভোট শুধুমাত্র প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল না—এটি ছিল রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব। গণতন্ত্রের আসল শক্তি সেখানেই।
ঋতিকা চোপড়াকে নিয়ে দুটো কথা বলে শেষ করি। ভারতের নির্বাচন ও ভোটার তালিকা নিয়ে ঢাক গুড়গুড় পরিস্থিতিতে ঋতিকার প্রতিবেদন যে বিরোধীদের জন্য এক পশলা স্বস্তির বৃষ্টি, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। ঋতিকা বুঝিয়ে দিয়েছেন, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
রাজু নূরুল উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহায়তায় পূর্ব আফ্রিকার কয়েকটি দেশে পরিচালিত প্রকল্পে ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত। ই-মেইল: raju_norul@yahoo.com
