Published : 21 Jul 2026, 02:23 PM
বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু একটা টুর্নামেন্ট নয়; বিশ্বক্রীড়ার সবচেয়ে বড় আস্থার প্রতীকও। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর বিশ্বাস—এই মঞ্চে অন্তত নিয়মের মাপকাঠিতে সবাই সমান। ছোট দেশের একজন খেলোয়াড় আর বিশ্বসেরা তারকা—দুজনই একই আইন, একই রেফারি এবং একই বিচারব্যবস্থার অধীন। ফুটবলের মূল সৌন্দর্য আর শক্তির জায়গা এখানেই। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের পর সেই পরম আস্থার দেয়ালেই যেন চির ধরেছে, কোটি মানুষের সেই বিশ্বাস আজ এক বিরাট প্রশ্নের মুখে।
এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা—মার্কিন ফরোয়ার্ড ফোলারিন বালোগানের লাল কার্ড প্রত্যাহার। বালোগান বিতর্কের সূত্রপাত বসনিয়া-হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ম্যাচে। প্রতিপক্ষের গোড়ালিতে বিপজ্জনক ট্যাকলের জন্য মাঠের রেফারি সরাসরি লাল কার্ড দেখান এই ফুটবলারকে। ভিএআরও সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। অর্থাৎ মাঠের রেফারি ও প্রযুক্তি—উভয়েই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। অথচ পরে সেই শাস্তি স্থগিত করা হয়। ফিফার ব্যাখ্যা, তাদের ডিসিপ্লিনারি কোডে এমন ক্ষমতা রয়েছে।
ক্ষমতা থাকলেই কি তার প্রয়োগ ন্যায়সংগত হয়ে যায়? আইনের প্রকৃত শক্তি তার অস্তিত্বে নয়, সমান প্রয়োগে। যদি কোনো বিশেষ দলের জন্য নিয়ম নমনীয় হয়, আর অন্যদের জন্য কঠোর থাকে, তবে সেটি আর ন্যায়বিচার থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে বিশেষ সুবিধা। আর এখানেই জনমনে সন্দেহের জন্ম।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, বিষয়টি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। এসব দাবির সত্যতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ঘটনাপ্রবাহ এমন একটি ধারণা তৈরি করেছে যে, মার্কিন রাজনৈতিক প্রভাব এবারের বিশ্বকাপে অস্বাভাবিকভাবে প্রবল ছিল। বালোগানের শাস্তি পরিবর্তনের পেছনে রাজনৈতিক চাপ কাজ করে তা খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সরল স্বীকারোক্তিতে প্রমাণ গিয়েছে। তবে এ ঘঠনা কেবল একটি লাল কার্ডের বিতর্ক নয়; ফুটবলের আত্মার ওপর আঘাত বলে উদাহরণ হয়ে থাকবে। মাঠে নেওয়া সিদ্ধান্ত যদি মাঠের বাইরের প্রভাবের কারণে বদলে যায়, তাহলে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার সংকট। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ভিএআরের প্রয়োজন কী? রেফারির প্রয়োজন কী? নিয়মের বইয়ের প্রয়োজনই বা কোথায়?
এবারের বিশ্বকাপে বিতর্ক যেন একটির পর একটি স্তূপ হয়ে জমেছে। আর্জেন্টিনা–মিশর ম্যাচে আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সে মিশরের প্রাপ্য বলে মনে করা একটি স্পষ্ট ফাউল ভিএআরের নজর এড়িয়ে যাওয়ায় রেফারিং নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। অনেক বিশ্লেষকের মতে, ওই পেনাল্টি দেওয়া হলে ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত। অথচ একই ধরনের ঘটনায় অপেক্ষাকৃত ছোট দলগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মের কঠোর প্রয়োগের অসংখ্য নজির রয়েছে।
এবার ইরানের ফুটবল দল যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ও প্রবেশগত নানা বিধিনিষেধের শিকার হয়েছে, যা তাদের প্রস্তুতিকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈরিতামূলক সম্পর্ক থাকার কারণে ইরানকে মাঠে এবং মাঠের বাইরে অন্যায় আচরণের সম্মুখীন হতে হয়েছে।
গোল্ডেন বল নির্বাচনও বিস্তর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। পুরো টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত ব্যক্তিগত নৈপুণ্য দেখিয়েও লিওনেল মেসি সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার পাননি; সেটি গেছে স্পেনের অধিনায়ক রদ্রির হাতে। ৩৯ বছর বয়সেও লিওনেল মেসি ছিলেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসা। পুরো টুর্নামেন্টে তিনি ৮টি গোল করেন এবং ৪টি অ্যাসিস্ট দেন। তার নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছায়। এছাড়া পাঁচটি ম্যাচে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতে তিনি নিজের ধারাবাহিকতা ও প্রভাবের প্রমাণ দেন।
এই পারফরম্যান্সের পর অনেক ফুটবল বিশ্লেষক ও সমর্থকের মতে, মেসিই ছিলেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফুটবলার। সুইডেনের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ বলেছেন, ‘এমন একটি টুর্নামেন্টের পর রদ্রি যদি গোল্ডেন বল জেতেন, যেখানে ম্যাচের ফলাফলে তার প্রভাব ছিল নগণ্য। তবে আমাকে বলুন, মেসি আর কী করতেন? গোল করা, অ্যাসিস্ট করা, নেতৃত্ব দেওয়া, সুযোগ তৈরি করা কিংবা আবারও নিজের দেশকে একাই টেনে নিয়ে যাওয়া? ঠিক এসব কিছুই তো তিনি করেছিলেন।’
গোল্ডেন বল প্রাপ্ত খেলোয়ার নির্বাচনের মানদণ্ড নিয়ে ফিফার অস্পষ্টতা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
প্রতিটি ঘটনার আলাদা ব্যাখ্যা থাকতে পারে, কিন্তু সবকটি বিতর্ক একসঙ্গে এমন একটি অস্বস্তিকর ধারণা তৈরি করেছে, ফিফার সিদ্ধান্তগুলো কি সত্যিই কেবল ফুটবলীয় যুক্তির ভিত্তিতে নেওয়া হচ্ছে, নাকি সেখানে রাজনীতি, বাণিজ্যিক স্বার্থ এবং ক্ষমতার অদৃশ্য প্রভাব ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে?
ফিফা বহুদিন ধরেই দাবি করে আসছে, তারা রাজনীতিমুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু বাস্তবতা কি সেই দাবিকে সমর্থন করছে? নাকি প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে এমন জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে নিয়মের বইয়ের চেয়ে ক্ষমতার ফোনকল বেশি কার্যকর?
কোনো প্রতিষ্ঠানকে শুধু নিরপেক্ষ হলেই চলে না; তাকে নিরপেক্ষ বলেও মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে হয়। বিচারব্যবস্থার মতো ক্রীড়া প্রশাসনেও ‘ন্যায়বিচার হওয়া’ যেমন জরুরি, ‘ন্যায়বিচার হয়েছে বলে মানুষের বিশ্বাস’ আরও জরুরি। এখানেই ফিফা শোচনীয়রকম ব্যর্থ। তারা বর্তমানে বিশ্বপুঁজির সেবাদাসে পরিণত হয়েছে যেন!
ডনাল্ড ট্রাম্প শান্তিতে নোবেল পাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। নোবেলের জন্য সব রকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এবারের বিশ্বকাপ আয়োজনকে ট্রাম্পের সফল কূটনৈতিক অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও সম্প্রীতির বাণীও উচ্চারিত হচ্ছে। এর আগে নোবেল শান্তি পুরস্কারকে ঘিরেও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এবার বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে বিশ্বকাপ ফুটবলের গোল্ডেন বল। এরপরও হয়তো ডনাল্ড ট্রাম্প—‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’—বলতে বলতেই একদিন নোবেল শান্তি পুরস্কারও বাগিয়ে নিতে পারেন। ফিফাকে দিয়ে রীতিমতন একটা শান্তি পুরস্কার প্রবর্তন করে, সেটি ট্রাম্প বাগিয়েও নিয়েছেন বলে দুর্নাম নেহায়েত কম হয়নি। ফিফা জানে, নিয়মের ব্যাখ্যার চেয়ে হোয়াইট হাউসের আশীর্বাদ তাদের কাছে অনেক বেশি দামি!
অথচ ফুটবল কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যক্তিগত মঞ্চ নয়। এটি কোনো পরাশক্তির কূটনৈতিক অস্ত্রও নয়। এটি সেই শিশুর, যে খালি পায়ে বল নিয়ে স্বপ্ন দেখে; সেই শ্রমিকের, যে রাত জেগে ম্যাচ দেখে; সেই কোটি সমর্থকের, যারা বিশ্বাস করে—মাঠে অন্তত নিয়মের কাছে সবাই সমান।
এবারের ফাইনালে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চের ঘটনাটিও তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্বকাপের ট্রফি হাতে স্পেনের অধিনায়ক যখন উল্লাসে ভাসছেন, তখন হয়তো ডনাল্ড ট্রাম্পের মনেও এক অস্বস্তিকর বিদ্রূপ কাজ করছিল। যে দেশের হাতে তাকে ট্রফি তুলে দিতে হলো, সেই স্পেনই ইরানে সামরিক হামলার ক্ষেত্রে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। শুধু তাই নয়, স্পেনের জাতীয় দলের তারকা খেলোয়াড় লামিন ইয়ামাল প্রকাশ্যেই ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন, আর স্পেন সরকারও গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের কড়া সমালোচনা করে অস্ত্র রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপসহ একাধিক কঠোর অবস্থান নিয়েছে। এমন এক দেশের বিজয়ের মুহূর্তে স্টেডিয়ামজুড়ে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে ওঠা দুয়োধ্বনি আর মঞ্চে তার সংযত, কাঠিন্যভরা হাসির বিপরীতে স্পেনের খেলোয়াড়দের উচ্ছ্বাস যেন ছিল দুটি ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতীক। সেই দৃশ্য আরও একবার মনে করিয়ে দিল, ফুটবল কখনো কখনো শুধু একটি খেলার ফল নয়; এটি ক্ষমতা, আদর্শ এবং জনমতেরও এক নীরব ভাষ্য।
ফুটবল কোটি মানুষের আবেগের নাম, কারণ তারা বিশ্বাস করে, মাঠে সবাই সমান। ছোট দেশের খেলোয়াড় আর বিশ্বসেরা তারকা একই নিয়মে খেলেন। এই বিশ্বাসটাই ফুটবলের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর সেই বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে সেটি আর প্রযুক্তি, অর্থ কিংবা চাকচিক্য দিয়ে ফিরিয়ে আনা যায় না।
আজ যদি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ব্যতিক্রম হয়, কাল অন্য কোনো পরাশক্তির জন্যও হবে। তারপর একসময় ছোট দেশগুলোর সমর্থকেরা বিশ্বাস হারাবে। তারা ভাববে, ম্যাচ শুরু হওয়ার আগেই কিছু দল এগিয়ে থাকে, প্রতিভার কারণে নয়, প্রভাবের কারণে।
এটাই ফুটবলের সবচেয়ে বড় পরাজয়।
এই ফিফাই তো পেট্রো-ডলারের লোভে ২০২২ বিশ্বকাপের আয়োজক স্বত্ব তুলে দিয়েছিল কাতারের হাতে, আর ২০৩৪-এর স্বত্ব তুলে দিয়েছে সৌদি আরবের হাতে। কিন্তু এবারের ঘটনাগুলো আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। আজ প্রমাণিত হলো, ফিফার সব নিয়মকানুন কেবল ক্ষমতাহীন দেশগুলোর জন্য। আপনি যদি আয়োজক দেশ হন বা টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক হাতিয়ার হন, তবে ফিফার নিয়ম আপনার কাছে দাসত্ব করতে বাধ্য। ফিফা আজ আর ফুটবলের অভিভাবক নয়; তারা পরিণত হয়েছে ক্ষমতার দালালে। যে খেলাটায় নিয়ম সবার জন্য সমান নয়, সে খেলাটা আর যাই হোক, ফুটবল নয়। ফুটবলপ্রেমী হিসেবে আমাদের আজ শুধু একটাই কাজ বাকি, ফিফার এই নগ্ন পুঁজিবাদের সামনে দাঁড়িয়ে ফুটবলের মৃত্যুতে শোকপালন করা! তবে তার আগে দুয়োধ্বনিতে কাজ হয় কিনা দেখা যাক আরও কিছুকাল।
চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামনিস্ট। ই-মেইল: [email protected]