১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু: পাকিস্তানের সেই হাসপাতাল যেন ছিল ‘মরণফাঁদ’

ইসলামাবাদে গত মাসে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে যাওয়া সেই ‘ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস’ হাসপাতালে কোনও অগ্নিসংকেতব্যবস্থা এবং আগুন নেভানোর স্বয়ংক্রিয় পানির ফোয়ারা ছিল না- বলছে তদন্ত প্রতিবেদন।

আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু: পাকিস্তানের সেই হাসপাতাল যেন ছিল ‘মরণফাঁদ’

ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 17 Sep 2026, 09:11 PM

Updated : 17 Sep 2026, 09:11 PM

পাকিস্তানের ইসলামাবাদের একটি হাসপাতালে গত মাসে আগুনে ১৪ নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনার সরকারি তদন্তে হাসপাতালটিতে অগ্নিনিরাপত্তায় ব্যাপক ঘাটতিসহ অব্যবস্থাপনাও তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

তদন্তে দেখা গেছে, নবজাতকদের ওয়ার্ডে কোনও কার্যকর অগ্নিসংকেতব্যবস্থা এবং আগুন নেভানোর স্বয়ংক্রিয় পানির ফোয়ারাও ছিল না। তাছাড়া, জরুরি বহির্গমণ পথের কয়েকটি দরজাও তালাবদ্ধ বা বন্ধ করা ছিল।

গত ২৬ অগাস্ট পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (পিআইএমএস) হাসপাতালে আগুন লাগে। এ অগ্নিকাণ্ডে ১৪ নবজাতকের মৃত্যু হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক অগ্নিনির্বাপক কর্মী বিবিসি-কে বলেছেন, তিনি অন্যান্য উদ্ধারকর্মীদের কাছ থেকে শুনেছেন যে, হাসপাতালটিতে ঢোকা অত্যন্ত কঠিন ছিল।

দরজাগুলো তালাবন্ধ ছিল। তাই ভেতরে ঢোকার জন্য তাদেরকে জানালা ভাঙতে হয়েছিল। এমনকি ভেতরে ঢোকার পরও ওয়ার্ডের দিকে যাওয়ার দরজাগুলো বন্ধ ছিল।

ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস (পিআইএমএস) হাসপাতাল তদন্ত প্রতিবেদন এবং বেরিয়ে আসা তথ্য নিয়ে কোনও মন্তব্য করেনি। দমকলকর্মীটি জানান যে, আগুন নেভানোর পর তিনি সেখানে পৌঁছেছিলেন।

সেখানে গিয়ে যা দেখেছিলেন তাও বর্ণনা করা কঠিন জানিয়ে ওই দমকলকর্মী বলেন, শিশুদের মাথার ওপরে থাকা চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো গলে তাদের গায়ের ওপর পড়েছিল।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, ভেতরের অব্যবস্থাপনা ও প্রাতিষ্ঠানিক ত্রুটির কারণে এয়ার কন্ডিশনার থেকে ছোট একটি বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ পরে বিশাল বিপর্যয়ে রূপ নেয়।

২৬ অগাস্ট সকালে হাসপাতালের ভেতরে থাকা অনেকের জন্য প্রথম সতর্কবার্তা ছিল মানুষের চিৎকার। অগ্নিকাণ্ডের দিন, কর্তৃপক্ষ ধারণা প্রকাশ করে বলেছিল যে ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের স্ফুলিঙ্গ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনেও এই স্ফুলিঙ্গকেই আগুনের সম্ভাব্য উৎস হিসাবে মনে করা হচ্ছে। এই স্ফুলিঙ্গের কারণ ছিল একটি অতিরিক্ত উত্তপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহকারী তার। যদিও বৈদ্যুতিক ত্রুটিটি ঠিক কী ছিল তা এখনও অস্পষ্ট।

হাসপাতালের এসিগুলো মেরামত বা সার্ভিসিং করা হয়েছিল। তকে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সেগুলো পুরোপুরি নিরাপদ কিনা সেটি পরীক্ষা করা হয়নি।

২০১৮ সালেই এসিগুলো বদলে নতুন ও উন্নত প্রযুক্তির এসি লাগানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু আট বছর কেটে যাওয়ার পরও সেই কাজ আর করা হয়নি।

দুর্ঘটনার তদন্তে বলা হয়েছে, হাসপাতালের নবজাতক ইউনিটে ধোঁয়া শনাক্তকরণ ব্যবস্থা, অগ্নিসংকেত ব্যবস্থা ও স্প্রিংকলার ব্যবস্থা কার্যকর ছিল না।

আগুন লাগার পর ইউনিটের কর্মীদের নবজাতকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণ বা মহড়া দেওয়া ছিল না। জরুরি পরিস্থিতিতে অক্সিজেন সরবরাহ কিভাবে বন্ধ করতে হয়, সে বিষয়েও কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি।

বেশ কয়েকজন মানুষ হাসপাতালে বিশৃঙ্খল ও বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি দেখার বর্ণনা দিয়েছেন। ওয়ালিদ নামের একজন বলেন, সেখানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র এবং নিয়মকানুন থাকা উচিত ছিল, কিন্তু কেউ কিছুই করছিল না। সবাই কেবল দৌড়াচ্ছিল।

গফুর নামের আরেকজন জানান, তিনি সাত-আট জনের একটি দলের সঙ্গে ছিলেন, যারা চারপাশের অতিরিক্ত ও ঘন ধোঁয়া দূর করার রাস্তা খুঁজছিলেন।

দমকল বাহিনী আসার আগেই তারা করিডোরের শেষ প্রান্তের কাঁচের গ্লাস বা প্যানেল ভেঙে ধোঁয়া বের করার ব্যবস্থা করেছিলেন।

ঘটনার দিন ভোর ৬টা ৩৮ মিনিটে প্রথম আগুন লাগার বিষয়টি টের পাওয়া যায়। তবে জরুরি সেবায় খবর দেওয়া হয় প্রায় ২০ মিনিট পর, ৬টা ৫৪ মিনিটে এবং উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান ৭টা ১ মিনিটে।

বিবিসি-র সাথে কথা বলা সেই দমকলকর্মীর মতোই গফুরও বলেছেন যে, উদ্ধারকারী কর্মীরা হাসপাতালের কিছু দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে বেশ হিমশিম খাচ্ছিলেন।

ওই সময়ে, হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক বিবিসি নিউজকে বলেছিলেন যে, নবজাতকদের ওয়ার্ডের দরজাটি তালাবদ্ধ ছিল না, তবে সেখানে পাহারার ব্যবস্থা ছিল। কারণ, এর আগে সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে বাচ্চা চুরির (অপহরণের) ঘটনা ঘটেছিল।"

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপত্তার জন্য সাধারণ মানুষের চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা কড়াকড়ি থাকা স্বাভাবিক হতে পারে। কিন্তু জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত দরজা বা পথগুলো কোনোভাবেই বন্ধ বা অবরুদ্ধ রাখা উচিত না।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এর আগেও অগ্নিঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছিল বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অগাস্টের অগ্নিকান্ডের এক মাস আগে হাসপাতালটিতে নার্সিং হোস্টেলে আগুন লেগেছিল। এরপরও অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকরভাবে উন্নত করা হয়নি।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আগে থেকেই ঝুঁকিগুলো জানত, তাদের সতর্ক করা হয়েছিল এবং তাদের নির্দিষ্ট কিছু দায়িত্বও ছিল। কিন্তু তারা সেগুলোকে আমলে নিয়ে একটি ভালো নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি। এই ব্যর্থতার মূল দায় হাসপাতাল এবং এর বড় বড় কর্মকর্তাদের ওপরই বর্তায়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ তদন্ত প্রতিবেদনে সুপারিশ করা স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপগুলো তিন মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।

সেইসঙ্গে সরকারি-বেসরকারি কার্যালয় ও ভবনগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা নিরীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৮ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।