২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০ আশ্বিন ১৪৩৩

সাইবার অপরাধ: বাংলাদেশেও ডেরা গাড়ছে আন্তর্জাতিক চক্র?

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চলকে অপরাধীরা নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করলেও বাংলাদেশে এই ঝুঁকি কম বলে মনে করা হয়, বলছে ইউএনওডিসি।

সাইবার অপরাধ: বাংলাদেশেও ডেরা গাড়ছে আন্তর্জাতিক চক্র?

কম্বোডিয়ার নমপেনের স্ক্যাম সেন্টারে পাচার হওয়া নয় বাংলাদেশি নাগরিককে আটক করে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

মাছুম কামাল মাছুম কামাল

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 26 Sep 2026, 01:21 AM

Updated : 26 Sep 2026, 01:21 AM

তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে অনলাইনে সাইবার অপরাধে জড়িতরা বা সাইবার স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে বাংলাদেশ থেকে শুধু মানব পাচারই হচ্ছে না, বরং প্রতারকদের ‘হাব’ হয়ে ওঠার ঝুঁকিতেও আছে বাংলাদেশ।

গেল বুধবার ঢাকায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ সংক্রান্ত সংস্থার (ইউএনওডিসি) এক আঞ্চলিক প্রতিবেদনে এ উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

‘ট্রাফিকড টু স্ক্যাম: সাউথ এশিয়ান রেসপন্সেস টু ট্রাফিকিং ইন পারসন্স ফর দ্য পারপাস অব ফোর্সড ক্রিমিনালিটি ইন স্ক্যাম অপারেশনস’ শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার পাঁচটি দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অর্থায়নে পরিচালিত ‘প্রিভেন্টিং অ্যান্ড অ্যাড্রেসিং ট্রাফিকিং ইন হিউম্যান বিইংস অ্যান্ড স্মাগলিং অব মাইগ্র্যান্টস ইন সাউথ এশিয়া (২০২৪–২০২৭)’ প্রকল্পের অংশ হিসেবে এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, ভুটান, মালদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা—এ অঞ্চলের প্রতিটি দেশই এখন এই নতুন ধারার মানবপাচারের শিকার হচ্ছে।

১০৩ জন ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য ও গবেষণার ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়। প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে—বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা এখন কেবল সাইবার অপরাধে মানবপাচারের প্রধান উৎসস্থলই নয়, বরং চক্রগুলোর নতুন কেন্দ্র বা ‘হাবে’ পরিণত হচ্ছে।

এক মাসেই দুই ‘চক্র’ ধরা

শুধু চলতি মাসেই কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে সাইবার অপরাধে যুক্ত থাকার অভিযোগে দুটি আন্তর্জাতিক চক্রের কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ।

গেল ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার সাত তলা একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে চীন, পাকিস্তান, লাউস, নেপাল ও ভিয়েতনামের ২০ নারীসহ ৬৩ নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।

এসব বিদেশি নাগরিকরা বৈশ্বিকভাবে ‘অনলাইন প্রতারণার’ ফাঁদ তৈরি করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ বলছে, ‘সুবিধাজনক’ স্থান ভেবে চক্রটি বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে।

মামলার তদন্ত এবং অভিযানে থাকা একাধিক পুলিশ সদস্য বিডিনিউজ টেয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, মূলত এ চক্রটি বিভিন্ন ধরনের সাইট খুলে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে ‘প্রতারণার’ আশ্রয় নিত এবং ‘হ্যানি ট্র্যাপের’ মত ঘটনা ঘটাত বলে তাদের কাছে প্রাথমিক তথ্য আছে।

Image

চট্টগ্রাশের খুলশী এলাকার একটি ভবন থেকে জব্দ করা প্রতারণার জন্য সেখানে আনা বিভিন্ন সরঞ্জাম।

তারা বলেছেন, এ বিদেশিদের ‘প্রতারণার’ প্রথম বিষয় ছিল অনলাইন শপিং সাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যের অর্ডার নিয়ে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ ও পণ্য না দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা।

তারা বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইট অ্যাপ হ্যাক করার প্রক্রিয়া করেছিলেন, এজন্য ভবনের ফ্ল্যাটে বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস স্থাপন করেছিলেন।

তাদের কাছ থেকে প্রতারণায় ব্যবহৃত ১৩৪টি মোবাইল ফোন, ৫৭টি ল্যাপটপ, ১টি অ্যাপল ট্যাব, সিপিইউ, মনিটর, পেনড্রাইভ, সিমকার্ডসহ বিপুল পরিমাণ ডিজিটাল, সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া তিনটি পাকিস্তানি ও একটি কম্বোডিয়ার জাতীয় পরিচয়পত্রও জব্দ করা হয়েছে।

এর আগে গেল ৩ সেপ্টেম্বর রাত থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত কক্সবাজার শহরের হোটেল সি-প্যালেসে অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোন, ৪০টি ল্যাপটপ ও যোগাযোগ সরঞ্জামসহ চীনের ছয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ।

অনলাইনভিত্তিক প্রতারণার অভিযোগে করা মামলায় তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।

কক্সবাজারে চীনা চক্র আটকের ঘটনায় প্রথমে অভিযোগ করা হয়েছিল রামু থানায়।

জানতে চাইলে রামু থানা পুলিশের পরিদর্শক মো. মনিরুল ইসলাম ভূঁইয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মামলাটি বর্তমানে সিআইডি ঢাকা তদন্ত করছে। সাইবার স্ক্যাম সেন্টার চালানোর অভিযোগে ওই চক্রটির বিরুদ্ধে থানায় একজনের অভিযোগের পর অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়।”

Image

কক্সবাজারে গ্রেপ্তার করা চীনা নাগরিক।

জাতিসংঘের প্রতিবেদনে কী আছে?

তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) খাতে ডাটা এন্ট্রি, আইটি স্পেশালিস্ট, কাস্টমার সার্ভিসসহ নানা পদে উচ্চবেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি তরুণদের থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ায় পাচার করা হচ্ছে বলে ইউএনওডিসি আঞ্চলিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অন্যান্য উপায়ের পাশাপাশি নতুন পদ্ধতিতে প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনানুষ্ঠানিক দালালের ফাঁদে ফেলে ট্যুরিস্ট ভিসায় তাদের বিদেশে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানে পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে তাদের বন্দি করা হচ্ছে সুরক্ষিত ‘স্ক্যাম কম্পাউন্ডে’ এবং জোরপূর্বক বাধ্য করা হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টোকারেন্সি’ ও ‘রোমান্স স্ক্যাম’ পরিচালনা করতে।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২২ সাল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে বাংলাদেশি ভুক্তভোগীদের উপস্থিতি শনাক্ত হচ্ছে। প্রধানত সামাজিক যোগাযোগামাধ্যম, অনুমোদিত এজেন্সি বা স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে ৮০০ থেকে দেড় হাজার ডলার বেতনের চাকরির লোভ দেখানো হয়।

Image

মিয়ানমারের একটি স্ক্যাম সেন্টার থেকে উদ্ধার আট বাংলাদেশি গেল ২২ জানুয়ারি দেশে ফেরেন।

দালালি ফি বাবদ ২ হাজার থেকে ৫ হাজার ডলার তুলতে অনেক পরিবার জমি বন্ধক রাখে। অন্যান্য দেশের ভুক্তভোগীরা উচ্চশিক্ষিত হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে গ্রাম বা মফস্বলের ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষিত তরুণরা এই চক্রের মূল নিশানা।

এ ছাড়া থাইল্যান্ড, কানাডা বা অস্ট্রেলিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাতে যাওয়ার কথা বলেও অনেককে কম্বোডিয়ায় নেওয়া হয়।

অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদেরও উচ্চ বেতনের ‘টোপ’ দিয়ে পরবর্তীতে এসব স্ক্যাম সেন্টারে পাচার করার তথ্য মিলেছে।

গেল শনিবার কম্বোডিয়ার রাজধানী নমপেন থেকে ৯ বাংলাদেশিকে সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আটক করা হয়েছে বলে খবর এসেছে।

সেখান থেকে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন আলামত জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া লাওস চলতি সপ্তাহে বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিট বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।

৩ হাজার ডলারে তরুণকে বিক্রি

প্রতিবেদনে যুক্ত করা এক বাংলাদেশি ভুক্তভোগীর সুনির্দিষ্ট কেস স্টাডিতে অপরাধের ভয়াবহ রূপ ফুটে উঠেছে।

ডাটা এন্ট্রি ও আইটি স্পেশালিস্টের লোভনীয় চাকুরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ট্যুরিস্ট ভিসায় ওই বাংলাদেশি তরুণকে কম্বোডিয়া নেওয়া হয়। এর জন্য দালালি ফি হিসেবে নেওয়া হয় ৩ হাজার ডলার।

পৌঁছানোর পরপরই তার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং চার মাসের ব্যবধানে তাকে তিনটি ভিন্ন স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগীর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাকে প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা কম্পিউটার বা মোবাইলের সামনে বসিয়ে ভূয়া প্রেমের অভিনয় বা ক্রিপ্টো বিনিয়োগের প্রলোভনে বিদেশি নাগরিকদের ঠকানোর লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হত।

লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হলে বা কথা না শুনলে শারীরিক নির্যাতন, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট করা এমনকি পানিতে ডুবিয়ে রাখার মতো শাস্তি দেওয়া হত।

Image

কম্বোডিয়ার নমপেন শহরের একটি স্ক্যাম সেন্টারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে জব্দ সরঞ্জাম।

এশিয়ায় কোথায় কী ধরনের স্ক্যাম সেন্টার?

ইউএনওডিসি তাদের প্রতিবেদনে দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ অপরাধের প্রকৃতি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় স্ক্যাম সেন্টারগুলোর ধরনে কিছু পার্থক্য তুলে ধরা হয়েছে।

তাতে বলা হয়েছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও লাওসে সশস্ত্র পাহারা, কাঁটাতার ও বৈদ্যুতিক বেষ্টনীতে ঘেরা বড় বড় ‘কম্পাউন্ড’ বা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে (এসইজেড) কেন্দ্র করে কোটি কোটি ডলারের স্ক্যাম সেন্টার পরিচালনা করা হয়।

অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়া ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অপরাধীরা একই ছাতা বা বড় কম্পাউন্ডের বদলে ছদ্মবেশে ছোট ছোট এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কাজ করছে।

তারা আবাসিক হোটেল, ভাড়া করা ফ্ল্যাট, প্রাইভেট ভিলা কিংবা বৈধ রেজিস্টার্ড আইটি কোম্পানির আড়ালে লুকিয়ে এসব স্ক্যাম সেন্টার ও অবৈধ অনলাইন জুয়ার নেটওয়ার্ক চালাচ্ছে।

বাড়িওয়ালাকে গোপন রাখার বিনিময়ে চড়া হারে অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়ার প্রমাণও মিলেছে।

ফলে অপরাধী চক্রগুলোকে সহজে শনাক্ত করা কিংবা সেখানে বন্দি থাকা পাচারের শিকার ব্যক্তিদের খুঁজে বের করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

চট্টগ্রামের খুলশীতে যে ভবন থেকে বিদেশিদের আটক করা হয়, সে ভবনটির মালিক একজন প্রবাসী। দেড় মাস আগে তারা ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন। মহসিন নামে এক ব্যক্তি এই বিদেশিদের ভবনটি ভাড়া করে দিয়েছিলেন, যার সঙ্গে চীনা নাগরিকদের সখ্যতা আছে।

নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার শামীম হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাকিব নামে অপর এক জনের মাধ্যমে মহসিন ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত হয়েছি। তবে ভাড়া নেওয়ার সময় ভাড়াটিয়া বা তাদের প্রতিনিধির সাথে বাড়িওয়ালার যে চুক্তিপত্র হয়েছে তার কোনো কপি থানায় জমা দেওয়া হয়নি।”

Image

কম্বোডিয়ার বিভিন্ন ‘সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড’ থেকে উদ্ধার হওয়া ৫২ বাংলাদেশি জুনে দেশে ফেরেন। তারা বলেছেন, তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনলাইনে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে বাধ্য করা হতো।

অপরাধী না ভুক্তভোগী?

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বজুড়ে ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সাইবার স্ক্যামে পাচার হওয়া ভুক্তভোগীদের ৭৪ শতাংশকেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নেওয়া হয়েছিল, যার বড় অংশই ছিলেন প্রযুক্তি ও ভাষায় দক্ষ ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সি পুরুষ।

প্রতিবেদনে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলা হয়েছে, প্রতারণা কার্যক্রমে যুক্ত ব্যক্তিদের সবাইকে সরাসরি ‘অপরাধী’ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।

প্রতারণা, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও শারীরিক নির্যাতনের মুখে পড়ে অনেকে এসব অনলাইন অপরাধে যুক্ত হতে বাধ্য হন। আপাতদৃষ্টিতে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে দেখা গেলেও তারা প্রকৃতপক্ষে মানবপাচারের ‘ভুক্তভোগী’।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় বেশ কিছু আইনি ও কৌশলগত জটিলতা চিহ্নিত করেছে ইউএনওডিসি।

তারা বলছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হল জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য হওয়া ব্যক্তিদের শাস্তি না দিয়ে ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে আলাদা করা। কিন্তু এ নীতি প্রয়োগ হয় না।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো স্ক্যাম সেন্টারে অভিযান চালালে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের সরাসরি ‘অপরাধী’ হিসেবে ধরে ফেলে।

প্রচলিত মানবপাচার বিরোধী অবকাঠামো মূলত নারী ও শিশুদের কেন্দ্র করে তৈরি। ফলে প্রতারণার অপরাধ যাদের দিয়ে জোর করে করানো হয় সেই ভুক্তভোগী প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষরা আইনি ও পুনর্বাসনের কোনো সুনির্দিষ্ট সহায়তা পাচ্ছেন না।

কেবল ভুক্তভোগীদের মৌখিক জবানবন্দির ওপর তদন্ত নির্ভর করায় হোতারা ধরা পড়ে না। ক্রিপ্টো লেনদেন, অনলাইনে অপরাধীদের তথ্য ও কর্মকাণ্ডের চিহ্ন খোঁজা বা নজরদারির ক্ষেত্রে দক্ষতার অভাব রয়ে গেছে।

Image

কম্বোডিয়ার একটি স্ক্যাম সেন্টার। ছবি: রয়টার্স

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সাইবার ক্রাইম ইউনিট, ইমিগ্রেশন ও মানবপাচার বিরোধী সেলগুলোর মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদানও আশানুরূপ নয় বলছে জাতিসংঘ।

ইউএনওডিসির পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশের আইনি কাঠামোর ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে প্রণীত নতুন আইনে ‘জোরপূর্বক অপরাধে বাধ্য করা’-কে মানবপাচারের অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তদন্তের ক্ষেত্রে বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মূলত স্থানীয় দালালদের গ্রেপ্তারেই সীমাবদ্ধ থাকে, আন্তর্জাতিক হোতারা অধরাই থেকে যায়। সেই সঙ্গে ডিজিটাল ও আর্থিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের দক্ষতার অভাব রয়েছে। বিচারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে ভুক্তভোগীরা আদালতের বাইরে টাকা নিয়ে আপস করতে বাধ্য হয়।

এছাড়া বিদেশ থেকে ফেরত আসা বাংলাদেশিদের পাচারের শিকার কী না তা ইমিগ্রেশনে নিয়মিত যাচাই করা হয় না।

সরকারি অনুদান কেবল বৈধ অভিবাসীদের জন্য বরাদ্দ থাকায় অবৈধভাবে যাওয়া ভুক্তভোগীদের নিজ খরচে ফিরতে হয়, যা তাদের আবার নতুন ঋণে ফেলে পুনঃপাচারের ঝুঁকিতে বাড়ায়।

আইনে বাধ্য হয়ে অপরাধ করা ভুক্তভোগীদের সাজা না দেওয়ার বিধান থাকলেও সঠিক প্রক্রিয়ার অভাবে অনেক সময় ভুক্তভোগীরাই উল্টো মামলার মুখোমুখি হন।

কম্বোডিয়াভিত্তিক মানবপাচার ও সাইবার স্ক্যাম চক্রের শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বাসিন্দা ইব্রাহিম খলিলুল্লাহ।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রেস্টুরেন্টে ভালো চাকরির লোভে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তিনি ও তার চাচাতো বোন জামাই ফাহিম মোল্লা কম্বোডিয়া যান। রাব্বি হাসান নামের এক দালাল তাদের ভালো সুযোগ-সুবিধার প্রলোভন দেখান।

যাওয়ার জন্য ব্যাংক থেকে ৪ লাখ টাকা ঋণ এবং শ্বশুরের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা ধার করে মোট ৬ লাখ টাকা দিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু কম্বোডিয়া পৌঁছানোর পর তাদের কোনো চাকরি না দিয়ে সাইবার স্ক্যাম সেন্টারে আটকে রেখে জিম্মি করা হয়। প্রায় তিন মাস চরম ভোগান্তির পর টিকিট ও হোটেলের বিপুল খরচ বহন করে চলতি মাসের ৩ তারিখে তারা দেশে ফেরেন।

দেশে ফিরলেও ইব্রাহিমের সংকট কাটেনি। তার প্রবাসে থাকার সময় ১৩ বছর বয়সী এক সন্তান মারা যায় এবং সম্প্রতি আরেকটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। ব্যাংক ঋণ ও সুদের বোঝা বেড়ে বর্তমানে তার দেনার পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে, যার ফলে পাওনাদারদের চাপে তিনি চরম মানসিক ও সামাজিক সংকটে পড়েছেন।

কম্বোডিয়া থেকে ফিরে আইনি প্রতিকার চাইতে গেলে সেখানেও নতুন হয়রানির শিকার হন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

Image

কম্বোডিয়ায় যাদের স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়, তাদের অনেকেই ফিরে এসে ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা বলেছেন।

‘কঠিন অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে’

সাইবার স্ক্যাম ও অনলাইনে ভুয়া নিয়োগের মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক তাসনিম সিদ্দিকী।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা একেবারেই ভীষণ কঠিন একটা অবস্থায় আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে।”

এজন্য চাকরিপ্রার্থীরা যেন কোনো অবস্থাতেই জনশক্তি কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণব্যুরো-বিএমইটি ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যাচাই ছাড়া অনলাইন অফারে বিদেশে না যায়, সে বিষয়ে রেডিও ও টিভিসহ সব মাধ্যমে জোর প্রচার চালানোর বিষয়ে জোর দেন অধ্যাপক তাসনিম।

“প্রচলিত বিএমইটি ছাড়পত্রের বাইরে গিয়ে ব্যক্তি পর্যায়ে বা অনলাইনে পাওয়া চাকরির ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষের (যেমন: পররাষ্ট্র বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়) পূর্ব অনুমতি বা ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক করতে হবে।”

তার মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যেসব দেশে এসব স্ক্যাম সেন্টার গড়ে উঠেছে, সেসব দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে অপরাধীদের যৌথভাবে চিহ্নিত করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি সতর্ক করে বলেন, “২০১৪ সালে থাইল্যান্ড-মালয়েশিয়া সীমান্তে সাগরপথে নৌকায় পাচারের পর যে গণকবরের ঘটনা ঘটেছিল, বর্তমানের এই ডিজিটাল স্ক্যামগুলো একই ধরনের পাচারের একটি আধুনিক ও শিক্ষিতদের লক্ষ্য করে চালানো রূপ। তাই দ্রুত গ্লোবাল ফোরামে বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা প্রয়োজন।”

ইউএনওডিসির প্রতিবেদনেও এ বিষয়ে কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

>> বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের সাত দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক জোট বিমসটেক ও আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে রিয়েল-টাইম তথ্য আদান-প্রদান করা।

>> বিদেশগামী অভিবাসীদের ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বিষয়ে সচেতন করতে বিশেষ প্রচারণা চালানো।

>> ডিজিটাল ও ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ব্যবহার করে হুন্ডি ও ক্রিপ্টো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া।

Image

হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্টের একটি বড় হলরুমে কম্পিউটার ল্যাব এবং একটি সাউন্ডপ্রুফ রুম তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে অভিযান চালানোর পরে কক্সবাজারের একটি হোটেল থেকে কয়েকজন চীনা নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়।

বাংলাদেশেও তৎপর? সরকার কী করছে?

বাংলাদেশেও সম্প্রতি অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতি ও টেলিগ্রামভিত্তিক স্ক্যাম সেন্টারের উপস্থিতি ধরা পড়েছে এবং চীনা নাগরিকসহ বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছে।

তবে দেশের ভেতরের এসব স্ক্যাম সেন্টারে কোনো মানব পাচারের শিকার ব্যক্তি ব্যবহার হচ্ছে কি না, তার নির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে নেই।

ইউএনওডিসির ভাষ্য, দেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও হাই-টেক পার্কের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলকে অপরাধীরা নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করলেও বাংলাদেশে এই ঝুঁকি কম বলে মনে করা হয়।

তবে বিশেষ আইনের আওতায় পরিচালিত এসব অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা শ্রম পরিদর্শকদের নিয়মিত তদারকি না থাকাটা একটি বড় ঝুঁকি।

কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে ধরা পড়া দুটি চক্রই দেশের অভ্যন্তরে বসে স্ক্যাম সেন্টার চালাতো ও চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে খবরে এসেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়য়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বলেন, “আন্তর্জাতিক চক্রের মাধ্যমে তরুণদের প্রতারিত হওয়া ঠেকাতে এবং সাইবার স্ক্যাম প্রতিরোধে ইউএনওডিসির সহায়তায় সরকারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ও স্কিম রয়েছে। এ লক্ষ্যে যৌথভাবে বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচি পরিচালনা করা হচ্ছে।”

ইমিগ্রেশনে নজরদারির ঘাটতি নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “ইমিগ্রেশন পুলিশ ও সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত বাহিনীগুলো বন্দরে নিয়মিত স্ক্রিনিং করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রতারক চক্র বিএমইটির বৈধ ছাড়পত্র বা সনদের মতো নথিপত্রের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যায়, যা ইমিগ্রেশনে আটকানো কঠিন হয়ে পড়ে।”

মনজুর মোর্শেদ বলেন, “প্রতারণা পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে বিদেশগামী তরুণ ও সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো সবচেয়ে বেশি জরুরি। এ ধরনের প্রতারণামূলক ক্যাম্পেইন রুখতে এবং নাগরিকদের সতর্ক করতে গণমাধ্যমসহ সকল পক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।”

ভবিষ্যতে ইউএনওডিসির সঙ্গে বড় পরিসরে সচেতনতামূলক প্রচার চালানের উদ্যোগ নেওয়া হবে, বলেন তিনি।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আমরা সতর্ক আছি এবং চেষ্টা চালাচ্ছি অঙ্কুরেই বিনষ্ট করে ফেলার। এই প্রতিবেদনটা সেক্ষেত্রে আমাদের জন্য সহায়ক হয়েছে।”

আরও পড়ুন:

স্ক্যাম সেন্টার: কম্বোডিয়ায় ‘বন্দি’ ৩২ জনের খোঁজ চায় পরিবার

অনলাইন প্রতারণা: দুই হাজার আইফোনসহ কক্সবাজারে ৬ চীনা নাগরিক আটক

চট্টগ্রামে ১৭০ ডিভাইসসহ ৬৩ বিদেশি নাগরিক আটক, অনলাইন প্রতারক চক্রের সন্দেহ

চট্টগ্রামে বিদেশি গ্রেপ্তার: ‘অনলাইন প্রতারণার ফাঁদ’ তৈরি করছিলেন তারা, বলছে পুলিশ