Published : 13 Sep 2026, 09:46 PM
চট্টগ্রামে গ্রেপ্তার বিদেশি নাগরিকরা বৈশ্বিকভাবে ‘অনলাইন প্রতারণার’ ফাঁদ তৈরি করছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশ বলছে, ‘সুবিধাজনক’ স্থান ভেবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন।
গত বৃহস্পতিবার খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার সাত তলা একটি ভবনে অভিযান চালিয়ে চীন, পাকিস্তান, লাউস, নেপাল ও ভিয়েতনামের ২০ নারীসহ ৬৩ নাগরিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তাদের বিরুদ্ধে খুলশী থানায় সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা করা হয়েছে। মামলাটি তদন্ত করছে নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।
পুলিশ জানায়, ভবনটির মালিক একজন প্রবাসী। দেড় মাস আগে তারা ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন। মহসিন নামে এক ব্যক্তি এই বিদেশিদের ভবনটি ভাড়া করে দিয়েছিলেন, যার সঙ্গে চীনা নাগরিকদের সখ্যতা আছে।
নগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার শামীম হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রাকিব নামে অপর এক জনের মাধ্যমে মহসিন ভবনটি ভাড়া নিয়েছিলেন বলে নিশ্চিত হয়েছি। তবে ভাড়া নেওয়ার সময় ভাড়াটিয়া বা তাদের প্রতিনিধির সাথে বাড়িওয়ালার যে চুক্তিপত্র হয়েছে তার কোনো কপি থানায় জমা দেয়া হয়নি।”
ভবনে বিদেশি থাকার বিষয়টিও পুলিশকে অবহিত করা হয়নি, বলেন তিনি।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এই কর্মকর্তা বলেন, মহসিন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। শুক্রবার একটি মাদক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
“আশা করছি তাকে জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার বিদেশিদের পাসপোর্ট সংক্রান্ত তথ্যসহ অনেক কিছু জানা যাবে।”
মামলার তদন্ত এবং অভিযানে থাকা একাধিক পুলিশ সদস্য বিডিনিউজ টেয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, মূলত এ চক্রটি বিভিন্ন ধরনের সাইট খুলে অনলাইন মার্কেটিংয়ের নামে ‘প্রতারণার’ আশ্রয় নিত এবং ‘হ্যানি ট্র্যাপের’ মত ঘটনা ঘটাত বলে তাদের কাছে প্রাথমিক তথ্য আছে।
তারা বলেছেন, এ বিদেশিদের ‘প্রতারণার’ প্রথম বিষয় ছিল অনলাইন শপিং সাইটের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্যের অর্ডার নিয়ে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ ও পণ্য না দিয়ে টাকা আত্মসাৎ করা। তারা বিভিন্ন ধরনের ওয়েবসাইট অ্যাপ হ্যাক করার প্রক্রিয়া করেছিলেন, এজন্য ভবনের ফ্ল্যাটে বিভিন্ন ধরনের ডিভাইস স্থাপন করেছিলেন।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে লাউসের একজন নাগরিক ছাড়া অন্য কেউই ইংরেজি বলতে পারেন না। মোবাইলের সাহায্যে এবং পাকিস্তানি ও নেপালি কয়েজনের মাধ্যমে হিন্দি-উর্দুতে কথা বলেছেন তারা।
গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে কয়েকজন পুলিশকে জানিয়েছেন, নিজ দেশে এবং দেশের বাইরে ভালো চাকরি করতেন তারা। বেশি বেতনের আশায় তারা বাংলাদেশে এসেছিল এজেন্টদের মাধ্যমে। তিন থেকে চারশ’ ডলার বেতনে তাদের এ দেশে আনা হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে তিন/চার জন করে করে তারা ভবনটিতে এসেছিলেন।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এক পাকিস্তানি ও এক নেপালি, তাদের মধ্যে পাকিস্তানি একজনের মাসিক বেতন ধরা হয়েছিল ৩৫০ ডলার ও নেপালি ব্যক্তির বেতন ধরা হয়েছিল ৩০০ ডলার।
এ বিদেশিদের যারা বাংলাদেশে এনেছিল, তাদের পুলিশ খুঁজছে বলে জানান তদন্তকারী সংস্থার এক কর্মকর্তা।
শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ফয়সাল আহাম্মেদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, চীন, লাউস, কম্বোডিয়াসহ বিভিন্ন দেশে অনলাইন প্রতারণা নিয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক অভিযান চলার কারণে প্রতারকরা বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছেন।
তাদের দেশি-বিদেশি আরও সহায়তাকারী রয়েছে এবং চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তারা অবস্থান করছে।
গ্রেপ্তার বিদেশিদের মধ্যে লাউসের ৩৬ জন, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের পাঁচ ও নেপাল এবং ভিয়েতনামের এক জন করে।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এক কর্মকর্তা বলেন, গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে অন্তত ৫০ জন একাধিকবার কম্বোডিয়া ভ্রমণ করেছেন। সেখান থেকে বোঝা যায়, এ চক্রটি সেখানে এ ধরনের কোনো কাজ করত।
“পরে তারা সুবিধাজনক স্থান হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে। তাদের পাসপোর্ট পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।”
গ্রেপ্তার কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, তাদের জানানো হয়েছিল অনলাইনে পণ্য বিক্রি করা হবে এখান থেকে। যে কারণে এ ৬৩ জনের বাইরে আরও লোকজন আসার কথা ছিল। সবাইকে মালামাল বিক্রির বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ চলছিল। পূর্ণাঙ্গ প্রশিক্ষণ শেষে তারা মূল কাজে যেতেন। তার আগেই চক্রটি ধরা পড়ে গেছে।
কাউন্টার টেরোরিজমের ওই কর্মকর্তা বলেন, এ চক্রটির মূলে রয়েছে কয়েকজন চীনা নাগরিক। তারা চীন থেকে মালামাল এনে ব্যবসা করার কথা ছিল।
ওই ভবন থেকে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের কাজটি অনেকটা ‘কাটআউটের’ মতো। এক জনের কাজ সম্পর্কে অন্য জন জানেন না। তাদের একেক জনকে একেক কাজের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। এমনকি তারা বাসা থেকে বের হতন না।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের উপ-কমিশনার শামীম হোসেন বলেন, তাদের কাছ থেকে জব্দ করা ডিভাইসগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলছে। পরীক্ষা হলে অনেক কিছু স্পষ্ট হবে।
এ চক্রের সঙ্গে চীনা নাগরিকদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমরা বেশকিছু নাম পেয়েছি। যেহেতু ওইসব ব্যক্তিদের কোনো বিস্তারিত পরিচয় পাইনি, সেহেতু কোন দেশের নাগরিক, সেটা পরিষ্কার করা যাচ্ছে না।
উপ কমিশনার শামীম বলেন, “মূলত এ চক্রটি বাংলাদেশকে ব্যবহার করে, বাংলাদেশি আইপি অ্যাড্রেস ব্যবহার করে প্রতারণা করার পরিকল্পনা নিয়েছিল। অনলাইনের যেহেতু কোন সীমানা নাই তাই, বাংলাদেশে বসে তারা এটি করতে পারলে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হতো এবং নানা ধরনের সমস্যা হতো।”
আগের খবর:
চট্টগ্রামে ১৭০ ডিভাইসসহ ৬৩ বিদেশি নাগরিক আটক, অনলাইন প্রতারক চক্রের সন্দেহ