Published : 20 Jul 2026, 08:39 PM
সম্পর্কের শুরুতে সবকিছু বেশ ভালোই চলে। তবে সঙ্গী যখন একটু বেশি কাছে আসতে চান, ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলেন কিংবা একটু বেশি ভালোবাসা প্রকাশ করেন, তখনই অনেকের মনে এক ধরনের অজানা ভয় বা অস্বস্তি তৈরি হয়।
এই অস্বস্তি থেকে বাঁচতে অনেকেই হুট করে সম্পর্ক ভেঙে দেন বা যোগাযোগ বন্ধ করে দেন।
মনস্তত্ত্ব এবং সম্পর্কের আধুনিক পরিভাষায় এই প্রবণতাকে বলা হচ্ছে ‘পাফার ফিশ’ ধারা।
বাস্তবের ‘পাফার ফিশ’ বা পটকা মাছ যেমন কোনো বিপদের আভাস পেলে নিজেকে বাঁচাতে শরীরে কাঁটা ফুটিয়ে ফুলে ওঠে, তেমনি সম্পর্কে থাকা কিছু মানুষও মনের অজান্তেই এই আচরণ করেন।
যখনই কেউ তাদের খুব কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেন এবং নিজেদের মানসিকভাবে দুর্বল বা ‘ভালনারেবল’ অনুভব করেন, তখনই এই ধরনের মানুষ সঙ্গীর সঙ্গে কথা বলে সমস্যার সমাধান করার চেয়ে, নিজেদের চারপাশে এক ধরণের অদৃশ্য কাঁটাযুক্ত দেয়াল তৈরি করে তাকে দূরে ঠেলে দেন।
নিবন্ধিত মার্কিন ম্যারেজ অ্যান্ড ফ্যামিলি থেরাপিস্ট এবং ‘হোয়াই ডু আই কিপ ডুইং দিস?’ বইয়ের লেখক কাটি মর্টন প্রথম এই মনস্তাত্ত্বিক তত্ত্বটি জনপ্রিয় করে তোলেন।
এই বিশেষজ্ঞের মতে, এটি মূলত মানুষের এক ধরনের অবচেতন মানসিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যা সম্পর্কের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
একজন ‘পাফার ফিশ’ সঙ্গীর প্রধান লক্ষণসমূহ
নিউইয়র্কের নিবন্ধিত থেরাপিস্ট জুলি নিউম্যান সেল্ফ ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলেন, “পাফার ফিশ স্বভাবের মানুষদের মধ্যে মূলত এড়িয়ে চলার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।”
তাদের সাধারণ কিছু লক্ষণের মধ্যে আছে:
যোগাযোগে অনিহা: মেসেজের উত্তর দিতে দীর্ঘ সময় নেওয়া, নিজে থেকে কোনো টেক্সট না করা কিংবা সঙ্গীর জীবনের খোঁজখবর নেওয়ার ক্ষেত্রে উদাসীনতা দেখানো।
হুট করে উধাও হওয়া বা ঘোস্টিং: সম্পর্ক একটু গভীর হওয়া মাত্রই কোনো কারণ না দেখিয়ে হঠাৎ কথা বলা বন্ধ করে দেওয়া বা নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।
অহেতুক ঝগড়া করা: সম্পর্ক যখনই গুরুতর বা সিরিয়াস দিকে মোড় নেয়, তখনই তারা ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অবান্তর ঝগড়া বাঁধিয়ে সম্পর্কটি নষ্ট করার চেষ্টা করেন।
মানুষ যে কারণে ‘পাফার ফিশ’-এর মতো আচরণ করে?
ডা. জুলি নিউম্যানের মতে, “এর পেছনে মানুষের ‘অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল’ বা সম্পর্কের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বড় ভূমিকা রাখে। যারা ‘অ্যাভয়েড্যান্ট অ্যাটাচমেন্ট’ বা এড়িয়ে চলার মানসিকতায় ভোগেন, তারা নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে চারপাশ থেকে সম্পর্ক গুটিয়ে নেন।”
এছাড়া অতীতের কোনো বিষাক্ত সম্পর্ক, প্রাক্তনের দেওয়া প্রতারণা কিংবা শৈশবে পরিবারে দেখা কোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতা থেকে এই ভীতি তৈরি হতে পারে।
তারা ধরে নেন যে, সম্পর্ক গভীর হওয়া মানেই দিনশেষে সমালোচনা বা কষ্টের শিকার হওয়া। ফলে আঘাত পাওয়ার আগেই তারা উল্টো সঙ্গীকে আঘাত করে দূরে সরিয়ে দেন।
এই মানসিকতা থেকে মুক্তির উপায়
কাটি মর্টন এবং জুলি নিউম্যানের মতে, এই স্বভাব সম্পূর্ণ দূর করা কঠিন হলেও কিছু সহজ অভ্যাসের মাধ্যমে সুস্থ সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।
নিজের স্বভাবকে চেনা: যখনই কারও ওপর রাগ বা এড়িয়ে যাওয়ার ইচ্ছা জাগবে, তখন নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত যে. এই ভয়ের উৎস কোথায়। কোনো বিষাক্ত প্রাক্তন বা পারিবারিক ট্রমার কারণে এমনটা হচ্ছে কি-না, তা চিহ্নিত করা দরকার।
দূরে না গিয়ে কথা বলা: কোনো বিষয়ে খারাপ লাগলে বা ভয় কাজ করলে সঙ্গীকে এড়িয়ে না গিয়ে, সরাসরি শান্তভাবে কথা বলা উপকারী। মুখোমুখি আলোচনা করলে অনেক ভুল বোঝাবুঝি নিমেষেই দূর হয়ে যায়।
স্পষ্ট বাউন্ডারি বা দেয়াল তৈরি করা: নিজের জন্য ব্যক্তিগত সময়ের প্রয়োজন হলে সঙ্গীকে তা স্পষ্ট করে বুঝিয়ে বলা উচিত। হঠাৎ কথা বন্ধ না করে বরং বলা যেতে পারে- ‘আমি আজ একটু মানসিক ক্লান্তিতে আছি, আমরা আগামীকাল সকালে কথা বলি’।
সঙ্গী যদি ‘পাফার ফিশ’ হন তবে করণীয়
যদি নিজের সঙ্গীর মধ্যে এই লক্ষণগুলো থাকে, তবে তাকে সরাসরি ‘তুমি কি রেগে আছ?’, এমন প্রশ্ন না করার পরামর্শ দিয়েছেন কাটি মর্টন।
এর বদলে খুব নরম সুরে বলা যেতে পারে, ‘আমি খেয়াল করেছি ইদানীং তুমি কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখছ’।
এরপরও যদি তিনি নিজের ভুল স্বীকার না করে অনড় থাকেন এবং বারবার দূরে ঠেলে দিতে থাকেন, তবে নিজের আত্মসম্মান বজায় রাখতে সেই সম্পর্কটি পুনর্বিবেচনা করাই শ্রেয়।
আরও পড়ুন
আপাতদৃষ্টিতে ‘শান্ত’ ছেলেই কি সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর?
সম্পর্কের বেড়াজাল পেরিয়ে নিজের ইচ্ছায় একা থাকার সুফল